চেনা অচেনা অরুণাচলে পর্ব- ১
লামা পর্ব-
ক। ছোট্ট লামা পাঠ শেষে ফিরে আসে,খেলে আর ছোটে
খ । পাঠ শেষে ফিরে আসে লামা সবে দলে দলে, সেদিনের মতো বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ, ফিরে চলে আসে মঠে।
গ। গভীর গম্ভীর আলোচনায় মগ্ন দুই মন
ঘ। কাননে কুসুমকলি সকল ই ফুটিল
ঙ। তাওয়াং বৌদ্ধ স্কুল- লামা রা এখানে পড়াশুনা করে
আগের পর্বে বৌদ্ধ দেব দেবী দর্শন তো হোলো, কিন্তু মানুষ কোথায়? মানুষ ই তো, দেব, দেবী, দৈত্য,রাক্ষস, খোক্কস ,পুরাণ , পুজো, রীতিনীতি তৈরী করে। চলুন এবার অরুণাচল এর প্রধান দুই মানব বৈচিত্রের দিকে একটু নজর দেই। আজকে একবার ঘুরে দেখি লামা দের বিষয় - বম্বডিলা আর তাওয়াং দুই মনেস্ট্রি তেই দেখেছি ক্ষুদে লামা দের। তারা পড়ছে, খেলছে , হুটোপুটিও করছে একদম ক্ষুদে গুলো। তখন মনে প্রশ্ন জাগলো এই ছোট বয়সে এদের পরিবার থেকে দূরে কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এতে পরিবার এর কি ভূমিকা, বৌদ্ধ সমাজের কি ভূমিকা, এঁরা চাইলে কি আবার গৃহী দুনিয়াতে ফিরতে পারে? লোকাল কিছু মানুষের থেকে আর এদিক সেদিক নেট খূঁজে যা বুঝলাম এই লামা হবার প্রক্রিয়া টাও বৌদ্ধ ধর্মের মতোই সহজ সরল মধ্যম পর্যায়ের। যাওয়া আসার সুযোগ বর্তমান! কিভাবে? চলুন দেখি-
১। মনপা উপজাতির ঐতিহ্য এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের পুরোনো নিয়ম অনুযায়ী, একটি পরিবারে যদি তিন বা তার বেশি পুত্র সন্তান থাকে, তবে সাধারণত মেজো বা ছোট ছেলেকে (সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় পুত্র) মঠে সন্ন্যাসী বা লামা হওয়ার জন্য পাঠানো হতো। এখন আর জোর খাটিয়ে বা কঠোর নিয়ম মেনে পাঠানো হয় না। অনেক সময় বাবা-মা তাদের যেকোনো একটি সন্তানের আগ্রহ দেখে বা ধর্মীয় পুণ্যলাভের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় মঠে পাঠান। আবার অনেক পরিবারে একমাত্র পুত্র সন্তানকেও মঠের শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে বড় করার জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।
তারা চাইলে যেকোনো সময় গৃহী বা সাধারণ সংসারী জীবনে ফিরে যেতে পারে। বৌদ্ধধর্মে সন্ন্যাস জীবন বেছে নেওয়া বা মঠ ত্যাগ করার ক্ষেত্রে কোনো জোরজুলুম নেই।
২। অস্থায়ী ব্রত ও সিদ্ধান্ত - ছোটবেলায় মঠে যোগ দেওয়া মানেই যে সারাজীবন সেখানেই কাটাতে হবে, এমন নয়। বড় হওয়ার পর (সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি সময়ে) যদি কোনো নবীন লামা বা সন্ন্যাসী মনে করে যে সে মঠের কঠোর শৃঙ্খলা বা ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারছে না, তবে সে মঠের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে পারে। তারা আবার সাধারণ পোশাক পরতে পারে, বিয়ে করতে পারে এবং সাধারণ চাকরি বা ব্যবসা করতে পারে। সমাজ তাদের খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে এবং এর জন্য কোনো সামাজিক কলঙ্ক বা শাস্তির মুখে পড়তে হয় হয় না।
৩। লামা হবার ফলে তাদের পরিবার কি সামাজিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা পায়? মঠে সন্তানকে দান করার পেছনে কোনো সরাসরি বস্তুগত বা বাণিজ্যিক লাভ থাকে না, তবে সমাজ ও সংস্কৃতির দিক থেকে পরিবারটি বেশ কিছু বিশেষ মর্যাদা পায়:
সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা -মনপা সমাজে যে পরিবারের সন্তান লামা বা সন্ন্যাসী হয়, সেই পরিবারকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। সমাজে তাদের মান-সম্মান এবং সামাজিক মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ধর্মীয় পুণ্য -বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, নিজের সন্তানকে ধর্মের পথে বা বুদ্ধের চরণে উৎসর্গ করাকে সবচেয়ে বড় পুণ্য বা 'অক্ষয় পুণ্য' বলে মনে করা হয়। পরিবার বিশ্বাস করে যে, এর ফলে তাদের বর্তমান জীবন এবং পরজন্মের ভালো কর্মফল লাভ হবে।
৪। বিনামূল্যে শিক্ষা ও ভরণপোষণ- অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে, মঠে যোগ দেওয়ার পর সেই বাচ্চার থাকা, খাওয়া, পোশাক এবং শিক্ষার (ধর্মীয় ও আধুনিক দুই-ই) সমস্ত দায়িত্ব মঠ কর্তৃপক্ষ বহন করে। ফলে দরিদ্র বা সাধারণ পরিবারের ওপর থেকে সন্তানের পড়াশোনা ও বড় করার আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
৫। পারিবারিক শুভকামনা- যেকোনো শুভ কাজ বা পারিবারিক সংকটে মঠের লামারা সেই নির্দিষ্ট পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং তাদের বাড়িতে এসে বিশেষ প্রার্থনা বা পুজো সম্পন্ন করেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি সম্পূর্ণ একটি আত্মিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের জায়গা, যেখানে জোরের চেয়ে শ্রদ্ধার স্থান অনেক বেশি।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ- ৭ জুন ২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন