"চল, হয়ে যাবে !"
"চল, হয়ে যাবে !"
বার বার এই কথাটা মনে পড়ছে, মনে আসছে। নিজের কাছের মানুষ চলেগেলে, হঠাৎ হারিয়ে গেলে প্রাথমিক ধাক্কাটা চলতে থাকে দুই'তিন-চার দিন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে : একটা ঘোরের মতন! তারপর- ধীরে ধীরে শূন্যতার বাণী সময়ের প্রলেপ লাগিয়ে দেয় হৃদয়ের অকস্মাৎ ক্ষতস্থানে, দগদগে ঘা হয়ত প্রকাশিত হয়না কিন্তু স্মৃতির অতলে বাস করে চিরতরে, সাথে থেকে যায় কিছু প্রশ্ন? কেন ও কিভাবে?
কিভাবে একটা ছেলে চরম অভাব থেকে পৌছে গেল এক অভ্রলিংহ সাফল্যে?
না , সেই ভাবে একটা পড়ার আদর্শ পরিবেশ বলতে যা বোঝায় তা কোনোদিনই তার ছিল না। ভাড়া বাড়িতে পরিবারের ৯ জন মানুষ এর সাথে একটা ঘরে থেকে ছেলেটার লড়াই শুরু। ডাল ভাত এর বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তার সামনে বিরিয়ানি স্বপ্নতো অলীক, সেরকম কোনো বস্তু যে পৃথিবীতে আছে এটাই জানা ছিল না! ১২ ক্লাসে উঠেও জানত না শামি কাপুর ছেলে না মেয়ে! আসে পাশে পাড়ার মানুষের কাজে ফাই ফরমাসে হাসি মুখে এগিয়ে যেত। ইংরেজির নাম শুনলে উল্টোদিকে দৌড় দিত!
হঠাৎ এই জীবন ধারাপাতে সেই ছেলেটাই পাশা পাল্টে দিল, একের পর এক রূপকথা র জন্ম দিল।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট এন্ট্রান্স এ পঞ্চম স্থান অধিকার করল। সবাই বিস্মিত এটা কি ভাবে সম্ভব! কোনো বিশেষ কোচিং তো ছিলই না, সাধারণ পাঠ্যবই যার সম্বল- রেফারেন্স বই কেনার কথা দুর অন্ত সে এই কার্য কি ভাবে করল? পরিবারের লোক যাকে নিয়ে ভেবেছিল হয়ত টেনে টুনে গণ্ডি পার করবে সে কিভাবে পারল?
আসলে সমাজ ভেবে নেয় যার হাতে আছে গাণ্ডীব সেই জেতে যুদ্ধ, কিন্তু সমাজ ভুলে যায় অনেকে নিজের ভাগ্য নিজেই বানায় গাণ্ডীব কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তুলে নেয় বিজয় ধনুক!
ছেলেটার সেই বিজয় ধনুক ছিল মনের জোর আর জেদ, ব্রহ্মাস্ত্র ছিল গণিত! ছোট বেলা থেকে বাজার হাটে লোকের কলাটা মুলটা এনে দিতে দিতে অজান্তে অবচেতনে গণিত এর বাস শুরু মুখেমুখে হিসেব এর মাধ্যমে। সেই গণিতই তাঁকে পৌছে দিল একএক করে শিখরে। তবে, সেদিন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট এ গণিত যদি তার কবচ কুন্তল হয়ে দাড়ায় তো ইংরেজি হয়ে দাড়াল সুত্পুত্রের পরিচয়! ইংরেজি বুঝতে না পারার দরুন করুণ মুখে নেমে এল ,বেদনাহত মনে জেগে উঠল তীব্র জেদ, বিশ্বভারতী হোক বা উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় সেই গণিতের গুণে আবার দরজা গেল খুলে।
এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, দিল্লীর জহর লাল ইউনিভার্সিটি তে কম্পুউটার নিয়ে পড়াশুনার প্রবেশপত্র। ধীরেধীরে চলল জীবন প্রবাহ এগিয়ে। পি এইচ ডি করতে করতে একদিকে শিক্ষকতা শুরু হোল সেই জহর লাল ইউনিভার্সিটিতেই। তারপরে হঠাৎ সব ছেড়ে নেমে এল তথ্যপ্রযুক্তির ইঁদুর দৌড়ে।
সেদিন টিসিএস, ইনফোসিস আইবিএম ফিরিয়ে দিল উচ্চমাধ্যমিক এ ৬০ শতাংশ নেই বলে, আবার জেগে উঠল জেদ! কোনো পরোয়া নেই অন্য কোম্পানি তে ঢুকল ভারতী এয়ারটেল থেকে মঞ্জুশ্রী, কিংবা পোলরিস।
তারপর হঠাৎ মনে হল বিদেশ যাবে! স্পনসর যোগাড় করে উঠে পড়ল বিমানে , সুখের জীবন উচ্চ-চাকরী সব ছেড়ে ঝাপিয়ে পড়ল নাবিকের মতন নতুন চ্যালেঞ্জ এর সন্ধানে!
মার্কিন মুলুকে গিয়ে পড়ল বিপাকে, একের পর এক অফিসে ঘুরছে নিজের কিছু পুঁজির সম্বল করে কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না! সবাই কোম্পানির মাধ্যমেই দেশ থেকে চাকরী নিয়েই যায় সেই খানে চলছে তার এক বিপরীতমুখী লড়াই, নিজেকেই খুঁজে নিতে হচ্ছে নিজের রুজি-রুটি। অবশেষে তিন-চার মাস পরে প্রবেশ করল এক মার্কিন কোম্পানি তে, নিজের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতায়। সেই খান থেকে ঘুরে দাড়িয়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করল ক্রমে ক্রমে। একের পর এক বড়বড় সংস্থায় একএক করে সাফল্যের সাথে বিরাজ করল দেড় যুগ।
এর ফাঁকে, নিয়মিত যোগাযোগ রাখল জীবনের প্রতি পদে প্রতি বাঁকে যেযে মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
প্রত্যেক কে নিয়ম করে ফোন বা দেশে এসে দেখা করা সব কিছুই করেছে নিয়মমাফিক। যে যখন যে ভাবে সাহায্য চেয়েছে সব দিক থেকে পাশে দাড়িয়ে গেছে মানুষ টা!
কিন্তু শেষে ,
এমন আরেকটা চ্যলেঞ্জ নিয়েছিল সেটা থেকে ফিরে আসা ছিল অস্ম্ভব, তবুও মনের জোর ছিল সে জিতবে, সেই জেদ মনের জোর যা তাঁকে জিতিয়ে দিয়েছিল জীবনের সব যুদ্ধে। কিন্তু এইবার সেই মন টাই জেগে রইল না চরম যুদ্ধে সাথী হবার জন্য। চরমতম মুহুর্তে মন রইল অচেতন।
এমন আরেকটা চ্যলেঞ্জ নিয়েছিল সেটা থেকে ফিরে আসা ছিল অস্ম্ভব, তবুও মনের জোর ছিল সে জিতবে, সেই জেদ মনের জোর যা তাঁকে জিতিয়ে দিয়েছিল জীবনের সব যুদ্ধে। কিন্তু এইবার সেই মন টাই জেগে রইল না চরম যুদ্ধে সাথী হবার জন্য। চরমতম মুহুর্তে মন রইল অচেতন।
তাই তো মৃত্যুদেব ও জ্ঞানত অব্স্থায় নিয়ে যেতে পারল না তাঁকে! অঞ্জ্লিক এর মৃত্যুবাণ ছুড়তে হল যখন সেই মানুষ টা অচেতন, অপারেশন থিয়েটার এ এনেস্থেশিয়ায় নিশ্চল, নীরব। সেদিন যদি আবার একবার বিজয় ধনুকের মতন "মন" টা জেগে উঠত কেউ পারত না তাঁকে পরাজিত করতে।
শুধু একটাই প্রশ্ন সেদিন একবার কেন জেগে উঠলি না ছোটমামাই? তোর যা মনের জোর তুই জেগে থাকলে তুইই জিততিস মামাই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন