মোদের হরফ বাংলা লেখা,অক্ষর পথে আঁকা কতো রেখা!

মোদের হরফ বাংলা লেখা,
জানতে কি চাও- অক্ষর গুলোর পথচলা?

আচ্ছা, এই যে অক্ষর গুলো লিখছি দিনের পরদিন, মানে মনের ভাব- ভাষা প্রকাশ করছি সেই বাংলা আক্ষরিক চিহ্ন গুলো এলো কোথা থেকে বলুন তো? খুঁজতে শুরু করে অবাক হয়ে গেলাম।
একটু একটু করে পিছন পানে গিয়েছি আর বিস্ময়কর অক্ষর ইতিহাস খূঁজে পেয়েছি। ও মা! এই পেছন পানে ঘুরতে গিয়ে দেখি বাংলা অক্ষরের উপর দিগ্বিজয়ী সম্রাট, রাজা, বিদেশী বণিক, কর্মকার, বিদ্বান, এপেল করপোরেট থেকে বাংলাদেশী অনেকেই হাত বুলিয়েছেন; পরম যত্নে- লালন করে স্নেহ দিয়ে কলেবরে বৃদ্ধি করার সাথে যুগোপযোগীও করে তুলেছেন! শুনবেন নাকি সেই অক্ষর যাত্রা পর্ব? -চলুন তাহলে একবার ঘুরেই দেখা যাক বাংলার অক্ষর অভিযান!

১। ওহ, খ্রিস্টপূর্ব ২৭০! ঐ তো দেখতে পাচ্ছি মৌর্য সম্রাট অশোক এর অনুপ্রেরণায় ব্রাহ্মী লিপি ফুটে উঠছে প্রায় ২৩০০ বছর আগে।

২।তারপর ? চারশ বছর পরে কুষাণ সম্রাট কনিস্ক  এর মাথায় ঘুরছে পরিবর্তিত পরবর্তী ব্রাহ্মী লিপি। আহা, এখন কনিস্কের মাথা নেই তো কি হয়েছে, তখন তক্ষশীলা পৃষ্ঠপোষক এর মাথায় অনেক কিছু ছিল, ব্রাহ্মী লিপি নিয়ে পরীক্ষাও ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ে।

৩। এর ঠিক ৪০০ বছর পরে ঐ যে দেখুন বাংলা অক্ষর এর প্রথম গুপ্তধন। গুপ্ত সময়েই প্রথমবার কিছু বাংলা অক্ষরের প্রাগৈতিহাসিক রূপ ফুটে বেরোল- যদিও সেটাও  তৃতীয় পর্যায়ের ব্রাহ্মী হরফ - সময়কাল প্রায় চতুর্দশ শতাব্দী।
 
৪। আবার ৪০০ বছর পার,বাংলার পাল যুগ! অষ্টম -দশম শতক কাল। এইবার বেশ কিছু বাংলা অক্ষর শুরু করল চোখ মেলা- যদিও পর্যায় টা সেই "ছোট খোকা বলে অ, আ শেখেনি সে কথা কওয়া" ! চতুর্থ পর্যায়ের ব্রাহ্মী হরফ থেকে ভূমিষ্ঠ হোল ছোট্ট  বাংলা অক্ষর!

৫। চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবসাহিত্য দিয়ে বাংলা লিপি হামাগুড়ি দিতে দিতে নড়বড়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করলো।

৬। ১৫০০ শতকের দিকে বাংলার যুগপুরুষ নিজে লিখলেন না কিছু, কিন্তু তাঁকে কেন্দ্র করে বাংলা আক্ষরিক ভাবে নিজের আগমন বার্তা ঘোষণা করে দিল- শ্রীচৈতন্য প্রভাবে প্রচুর নতুন লেখার প্রকাশ, যতো লেখা ততো বাংলা অক্ষরের পরিবর্তন, উন্নয়ন।

৭।বণিকের বেশে লিখে দিলো এসে- ১৬৬০ থেকে ১৭৮০ এর মধ্যে ব্লক মুদ্রণ এর চেষ্টা হোলো বাংলা অক্ষর ছাপার- লন্ডন , আমস্টারডমের মাটিতে ছাপার উদ্যোগ।
যদিও সেই প্রচেষ্টা ছিলো অন্য বিদেশী ভাষার অক্ষরের উপর হাত বুলিয়ে বাংলা অক্ষর আঁকার কাজ, ফল অত্যন্ত হতাশজনক- অন্য হরফে বাংলা লিপি তেমন দাগ কাটলো না ব্লকে। লন্ডনে জ্যাকসনের তৈরী লিপি দাগ কাটলো না!
- "হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন; অবহেলা করি"!

৮। একরাশ হতাশার পরে বাংলা আক্ষরিক ভাবে নিজের রূপে এইবার জেগে উঠলো- সঠিক ভাবে অক্ষর সৃষ্টির সময় এসে গেছে! বাংলা অক্ষর মুদ্রণের মাহেন্দ্রক্ষণ! 
দুই ইংরেজ হ্যালহেড এবং উইলকিন্স এর অনুপ্রেরণায় খুশমত মুন্সির হস্তাক্ষর কে একা কাঁধে ভগীরথ এর মতো স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নিয়ে এলো সেই মানুষ টা- বাংলা অক্ষরের বিশ্বকর্মা পঞ্চানন কর্মকার। ধাতুর ব্লকে খোদাই হোলো বাংলা অক্ষর, প্রথম বার প্রায় সঠিক রূপে আত্মপ্রকাশ। উইলিয়ম কেরীর ছাপাখানায় বাংলা অক্ষর ঠাই পেলো  কুলীন গোত্রে- বাঙালীর দুয়ারে নবজাগরণ - রেনেসাঁস এর নবারুণ দেখা গেলো বঙ্গে।

৯। বর্ণপরিচয় পর্ব:-বাংলা অক্ষরের পালক এসে হাল ধরলেন,শুরু হোলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পর্ব। বাকি অক্ষরের ফিনিশিং টাচ দিলেন ঈশ্বর।
ভাবলাম এইখানেই শেষ করে দেই, তারপরে দেখলাম হয়তো শেষ হয়েও শেষ হবে না এ লেখা! যে মাধ্যমে লিখছি কাজ করছি সেটাও তো বাংলা অক্ষর- আজকের ডিজিটাল অক্ষর! 

১০। সেই ডিজিটাল বাংলা অক্ষরের প্রাক পর্যায় ছিল খবরের কাগজে মুদ্রণ। আনন্দবাজারে ১৯৩৫ সালে লাইনোটাইপ এবং ১৯৩৭ সালে বাংলার সরকারি ছাপাখানাতে আসে মনোটাইপ যন্ত্র, লাডলো ১৯৫৬, কম্পিউটার আসার আগের পর্যায়ে এর মাধ্যমেই বাংলা ছাপার কাজ এগোচ্ছিল।

১১। ১৯৭৮ কম্পিউটর এ বাংলার আদি ডিজিটাল হরফ শুরু হলেও এক বিশাল অসুবিধা শুরু হয় । এক মাধ্যম বা যন্ত্রে তৈরী অক্ষর অন্য যন্ত্রে গিয়ে পুরো উদোর পিণ্ডি এর ওর ঘাড়ে উঠে যাচ্ছিল!

আচ্ছা মনে পড়ছে কিছু?এই কয়েক বছর আগের কথা! ধরুন , একটি কম্পিউটার বা মোবাইলে "ঝাল" কথাটা লিখে অন্য আরেকজন কে সেটা তার কম্পিউটারে দেখতে বললেন, ব্যস "ঝ" বিদ্রোহ করে অন্য সিস্টেমে বলল এ "হাতল" আমি দেখাব না! কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড "ঝাল" এর "ঝ" ,হয়ে গেছে "ব"! ব্যস গালাগালি লিখে মান সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু।

১২। এই পর্যায়ে ASCII, ANSI ,ISCII  থেকে যাত্রা শুরু করে ডিজিটাল বাংলা হরফ নিজের জন্য বিশ্ব ভাষা মাঝে একটা স্থান খূঁজে ফেরে খ্যাপার মতো- 
ASCII, ANSI এগুলো হোলো আমেরিকান মতে ডিজিটাল লেখা, এতে অসুবিধা হোলো বিদেশী হরফ আকৃতির উপর নির্ভরশীল ডিজিটাল বাংলা হরফ লেখা এবং যা সেই পঞ্চানন কর্মকার এর আগের যুগের মতো অবস্থা প্রায়! বাংলা কম্পিউটার ডিজিটাল হরফের তখন ডিজিটাল ক্ষেত্রে অনাহূত অবস্থা- "আমায় একটু যায়গা দাও, মন্দিরে বসি"।

১৩। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হোলো,
অবশেষে "ইউনিকোড" ব্যবস্থা  এলো এপেল আর জেরক্স কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে।
শুধুমাত্র আমেরিকান মত এর বদলে এলো বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান ভাষার নিজস্ব মতে লিপি প্রকাশ এর উপায়। মানে, ব্যাপারটা এরকম দাড়ালো-  বাংলা ডিজিটাল অক্ষর আগে আমেরিকা বা ল্যাটিন এর ভাড়া করা ঘরে ওদের মতো করে থাকতো, যুক্তাক্ষর এবং অন্য শব্দ গুলো নিয়ে এই ASCII ANSII তে ঝামেলা হচ্ছিল, ইউনিকোড এসে বাংলা অক্ষর কে বললো এই নাও তোমার নিজের বাড়ি জমি, নিজেকে নিজের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে নাও। 

১৪। এই ঘর সংসার সাজানোর পর্বে এসে উপস্থিত হোলো এক বাংলাদেশী যুবক- নাম মেহেদি হাসান! কিবোর্ড এ সহজ টাইপের জন্য বাংলা লেখার সফটওয়ার এসে গেলো ২০০৩ সালে। মেহেদি ঘোষণা করলেন- এই সফটওয়ার ফ্রি, একটি টাকাও সে নেবে না এই ডিজিটাল বাংলা বর্ণমালার জন্য! "ভাষা হোলো উন্মুক্ত", 
ওহ হ্যা সফটওয়ার এর নাম টাও কিন্ত - "অভ্র"  ❤।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
পুনশ্চ: অনেক তথ্য পেয়েছি সেতু প্রকাশনীর "বঙ্গ ইতিহাস প্রবাহ" বইটি তে সৌভিক ঘোষাল এর লেখা "বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিবর্তন" প্রবন্ধটি থেকে। যদি বিস্তারিত জানতে মন চায় বইটি সংগ্রহ করে লেখাটি দেখতে পারেন, অনেক বিশদে অনেক কিছু জানতে পারবেন, বেশ ভালো লেখা। এর সাথে পঞ্চানন কর্মকার এর উপর নাটক দেখেও বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছি যা ব্যবহৃত হয়েছে এই লেখায়। ধন্যবাদ।।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"