গুরু ভার ,ছাত্র মাঝে প্রকাশিত আলোক পূর্ণিমা র।।
"স্যর আপনি সত্যি চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে?" - হতাশ সুরে ক্লাস টিচার অজয় স্যর কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল পল্লব। স্কুলছুটির পর স্কুলের গেটের বাইরে স্যর এর সাথে দেখা হোলো অবশেষে। বদলীর নির্দেশিকা সূত্রে অন্য স্কুলে চলে যেতে হচ্ছে অজয় ব্যানার্জি কে। শেষবারের মতোন জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র প্রথম স্কুল থেকে বেরিয়েই ক্লাস নাইন এর পল্লবের সাথে দেখা হয়ে গেলো। পল্লব হয়তো অপেক্ষা করছিলো।এমনিতে ছেলেটা চুপচাপ ,কিন্তু বেশ বুদ্ধিমান-ধীর-স্থির; ক্লাসে প্রথম হয় নিয়মিত। ছেলেটা সত্যি কষ্ট পাচ্ছে, তাই নিভৃতে দেখা করবে বলে দাড়িয়ে আছে। অজয় এগিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পল্লব কে বললো- "কি করবো বল সরকারী নির্দেশ। আমার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।" - আরো কিছু বলতে উদ্যত হয়েও থমকে যেতে হোলো অজয় কে - দেখতে পেলো হন্তদন্ত হয়ে বিপ্লব দৌড়ে আসছে ওদের দিকেই। এই আরেকটা ছেলে- সর্বদা বনবন করে ঘুরে চলেছে, পড়াশুনায় ভালোই ,প্রথম না হলেও দুই থেকে পাঁচ এর মধ্যে ঘোরে। কখনো সখনো আবার দশের বাইরেও চলে যায়। কিন্তু ক্লাসের মধ্যে সব বিষয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, হ্যা মারপিট ও করে আবার ক্লাস মনিটর এর গুরু দায়িত্বভার ও ওর ই কাঁধে। যাইহোক, ঝড়ের মতোন এসে আছড়ে পড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো - "ভাগ্যিস দেখা হোলো। ক্লাসের সবার খাতা গুলো গুছিয়ে রাখতে একটু দেরি হয়ে গেলো, স্যর আবার কবে দেখা হবে? আপনি দেখুন না কিছু ভাবে যদি থেকে যেতে পারেন। আপনি এতো সুন্দর ভাবে অঙ্ক গুলো বুঝিয়ে দেন কে আর বোঝাবে বলুন তো? আপনি থেকে যান স্যর, যেতে হবে না"। বিপ্লব এর কথা শুনে হেসে অজয় স্যর বলে-অঙ্ক বোঝানো নিয়ে অসুবিধা হবে না। নতুন স্যর খুব ভালো ভাবে তোদের বোঝাবে -
এই কথা শুনেও দুই ছাত্র পল্লব-বিপ্লব মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে। তখন কি একটা ভেবে অজয় ওদের একটা প্রস্তাব দেয়। "শোন মন খারাপ করিসনা। আমি আমার প্রাইভেট মোবাইল নম্বর টা শেয়ার করছি শুধু তোদের দুজনের সাথে, এতে যোগাযোগ করিস যখন তোদের কোনো প্রশ্ন আসবে মনে। আর, আজ থেকে ঠিক এক বছর পরে ফিরে এসে আমি তোদের একটা পরীক্ষা নেবো এইখানে দাড়িয়ে" এই বলে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে অজয় স্যর চলে গেলেন নতুন দিশায়।
এক বছর পর...
অজয় স্যর এর সামনে পল্লব-বিপ্লব উপস্থিত, দুজনেই এক বছর ধরে স্যর এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিল মোবাইল এর মাধ্যমে। পল্লব এর সাথে আলোচনা একটু বেশী হয়েছে, পল্লব এক উত্তরে খুশী না হয়ে আরো জানতে চাইতো, আরো জটিল পদ্ধতিতে। ওদিকে বিপ্লব কোনো প্রশ্ন বা পদ্ধতি কে জানতে চাইতো অরো সরলতর উপায়ে। দুজনের পাঠ এর এই বৈপরীত্য ই অজয় স্যর কে বেশ কিছু প্রশ্নের সামনে দাড় করিয়েছে, সেই নিয়েই আলোচনা।
প্রথমেই পল্লব কে স্যর এর প্রশ্নের সন্মুখীন হতে হোলো।
"পল্লব তুই একটি সহজ বিষয় কে মাঝে মাঝে জটিল ভাবে ভেবে ফেলিস কেনো? তোর মধ্যে কি আরো জিজ্ঞাস্য জাগ্রত হয়?" - পল্লব অজয় এর দিকে তাকিয়ে ধীরে আস্তে বললো - "হ্যা স্যর। আমি যখন একটা উত্তর পাই তখন আরো অন্য যুক্তি আসে, সেই জন্য আরো প্রশ্ন করি"।
অজয় হেসে বললো- অনেক সময়ে আমি তো তোর বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না ,পল্লব ! তখন কি করিস? ঐ খানে থেমে যাস?
পল্লব এই বার স্যর এর এই প্রশ্নে বিব্রত বোধ করল। মুখে একটু অস্বস্তি , একটু লজ্জার রক্তিম আভা ফুটে বার হোলো। - অজয় স্যর পিঠে হাত দিয়ে আশ্বস্ত স্বরে বললো- নির্ভয়ে বল। যা সত্যি তাই বলবি।- স্যর এর অভয়ে মাথা তুলে পল্লব আস্তে নীচু স্বরে বললো- আমি তখন অন্য কোথাও, অন্য বই বা অন্য স্যর বা গুগল থেকে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। আমি হয়তো ভুল করি স্যর, আপনাকে জানানো উচিৎ ছিলো। -
পল্লবের উত্তর শুনে হেসে অজয় বলে ওঠে- "একদম ঠিক করিস। নিজের প্রশ্ন এর উত্তর না এলে থামবি না, সে যদি সামনে ঈশ্বর এর মতোন কেউ আসে আর সেও উত্তর দিতে অপারগ হয় নিজের খোঁজ চালিয়ে যাবি। এটাই পৃথিবী তে আবিষ্কার এর আলোক বয়ে এনেছে যুগে যুগে। আমি খুব খুশী হলাম তোর এই যুক্তির সাথে আপোসহীন মনোভাবে। এগিয়ে চল পল্লব।"-
অজয়ের কথায় প্রশংসা ও উত্সাহ পেয়ে পল্লব উদ্ভাসিত হয়ে স্যর এর দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো।
বিপ্লব এতোক্ষণ মিটিমিটি হাসছিল, স্যর এইবার পল্লব পর্ব মিটিয়ে বিপ্লব এর দিকে তাকিয়ে বললো- তুই আবার এতো সহজ সরলে উত্তর চাস কেনো বলতো? আমি যতো সহজে বোঝাই তাও দেখি তুই আরো সরলে বুঝতে চাস! ব্যাপারটা কি? আমি জানি তুই প্রথমেই ব্যাপারটা বুঝে যাস তবুও কেনো সহজ-সরলীকরণে এক বিষয়ের দুই তিনটে উপায় শিখিস? কি ব্যপার বলতো।
স্যর এর কথা শুনে বিপ্লব একটু হেসে বলে - স্যর আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি প্রথম পদ্ধতি তেই বুঝে নেই আপনি কি বলেছেন।
অজয় অবাক হয়ে বলে- তাহলে কেনো আমাকে দিয়ে ঐ ভাবে আবার দুই তিন সহজতরো উপায় তৈরী করাতে চাস? মজা করিস নাকি আমার সাথে। - এই শুনে বিপ্লব জিভ কেটে বলে - না না স্যর, আপনি আমার শ্রদ্ধার মানুষ, আপনাকে নিয়ে আমি মজা করিনা! অজয় বিস্মিত হয়ে বলে ওঠে - তাহলে? তাহলে কেনো দুই তিন উপায় জানতে চাস। আমাকে অনেক ভেবে অরো সহজ ব্যাখ্যা তৈরী করতে হয় তোর আবদারে, সময় তো লাগে নাকি?
এইবার বিপ্লব একটু স্মিতহেসে বললো- স্যর আসলে ঐ সহজ সরল তিনটে উপায় আমি ক্লাসের সবার সাথে শেয়ার করি। আপনি নিজেও জানেন আমাদের শ্রেনী তে কিন্তু বুদ্ধি ও ব্যুত্পত্তির মাপকাঠিতে শ্রেনী বিভাগ আছে,কেউ একটু জটিল বিষয় সহজে বোঝে যেমন পল্লব আবার কেউ হয়তো খুব সহজ জিনিষ ও জটিল ভাবে, তখন তাদের জন্য ঐ সহজ থেকে সহজতর উপায় টা আমি শেয়ার করি। আমি যেহেতু ক্লাস মনিটর আমার চোখে প্রত্যেকের খাতার মাধ্যমে ধরা পড়ে কে কিভাবে ভাবছে, তাই আপনাকে একটু জ্বালতন করি। "
হতবাক অজয় বিপ্লব এর দিকে চেয়ে রয়। তারপর আবেগতাড়িত হয়ে বলে ওঠে তুই তোর সব বন্ধু কে অঙ্কে হেল্প করিস?
বিপ্লব হাসতে হাসতে উত্তর দেয়- স্যর হেল্প না, ওটাই বন্ধুত্ব। এখন ক্লাসে সবাই অঙ্কে বেশ উন্নতি করেছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করছে, কি রে পল্লব স্যর কে বল!
পল্লব মাথা নেড়ে বলে, "হ্যাঁ স্যর এটা এখন হচ্ছে। সবাই অঙ্ক নিয়ে কিছু না কিছু ভাবে ক্লাসে। বিপ্লব ক্লাসে সবার চিন্তায় অঙ্কে বিপ্লব এনেছে। এখন অঙ্ক আর ভয় না,কমবেশী ভালোবাসার বিষয়।"
পল্লবের উত্তর শুনে বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে স্যর বিহ্বল হয়ে বলে ওঠে- তুই জানিস না বিপ্লব, তুই কি করেছিস। আমি ধন্য হলাম অজান্তে এই বিষয়ে তোর মাধ্যমে জড়িয়ে গিয়ে। নিজের সাথে সমাজ কে একসাথে একতালে নিয়ে এগিয়ে চলার ক্ষমতা অর্জন হলে সেই সমাজ ধন্য , সেই সমাজ জন-গণ-মনের এক যোগ্য নেতার জন্ম দেয়।
অজয় অশ্রু বিগলিত হয়ে দুই ছাত্র কে জড়িয়ে ধরলো।তখন,
সন্ধ্যের বৃষ্টি স্নাত পরিস্কার শ্রাবণ আকাশে গুরুপূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
নীচে এক শিক্ষক ভেবে চলেছে পৃথিবীতে কতো ধরনের ছাত্র হয়- কেউ গুরুর দেওয়া বিদ্যায় সন্তুষ্ট না থেকে ঘষেমেজে নিজেকে দ্রোণ শিষ্য থেকে অর্জুন এ পরিণত করে,
আবার কেউ গুরুর থেকে ভালোবাসার সহজ সরল পন্থা শিখে প্রেম এর সহজ সরল শিক্ষা দিয়ে গনজাগরণ ঘটিয়ে মানুষ কে সমাজ কে উদ্ধার করে , ঈশ্বরপুরী র শিষ্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য এর পথে পথে।।
পুনশ্চ: গুরু পূর্ণিমা নিয়ে আগের লেখা নীচের লিঙ্কে।। এটা ২ বছর আগের লেখা।
https://avrasoura.blogspot.com/2022/07/blog-post_14.html
©️ অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ২১ জুলাই, ২০২৪
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন