"এ মণিহার আমার নাহি সাজে।আরো ডাক্তারি বিদ্যা শিখলে কাজে লাগবে সমাজে।।"

পরীক্ষায় ডাক্তারির সব বিষয়ে প্রথম,স্বর্ণপদক এর দোরগোড়ায় দাড়িয়ে সেই মহিলা শুনতে পেলো- "মেয়েরা ডাক্তারি পড়তে আসার আগে থেকে এই স্বর্ণপদক শুধু ছেলে রাই পেয়ে এসেছে। তাই কোনো মহিলা প্রথম হতে পারে, কিন্তু প্রথম পদক এর সম্মান সে পাবে না! এটা শুধু ছেলেদের পদক" - ভাবতে পারছেন দাবি টা কিরকম? আজকাল নিট-স্লেট-চাকরীর পরীক্ষাতে যদি চুরির কথা বলা হয় তাহলে এই ঘটনা টাকে কি বলবেন?- দিনে দুপুরে ডাকাতি।

আহা, না তেমন চিন্তার কিছু নেই এখন সমাজে চুরি টাই শুধু হয়! শিক্ষা ডাকাতি টা হোতো, পাস্ট টেনস। হয়তো একশ বছর আগেই হোতা । তা এই চিকিৎসক দিনে হঠাৎ এই বিষয়টা উত্থাপন করলাম কেনো বলুন তো? আসলে একজন কে আজকে সসম্মানে বন্দনা করব - হ্যা তিনিও ডাক্তার। বিখ্যাত। দেখুন তো চেনেন কি না? 
উপরের ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রথম হওয়া মহিলার উত্তর টাও শুনবেন? আচ্ছা তার আগে ওনার পরিচয় ব্যক্ত করি। উনি ১৮৮৬ সালে পূর্ববঙ্গে জন্মেছিলেন, বারো ভুইয়ার বিখ্যাত প্রতাপাদিত্যের বংশধর। প্রচন্ড স্মৃতিধর ইনি ভাইদের সাথে শৈশবে পড়ার অনুমতি পান নি, ভাইরা সুর করে যা পড়ত উনি অক্ষর না জেনে শুধু শুনে-শুনেই খুব শীঘ্র তা বুঝে নিতেন । তৎকালীন পরিবার ও পরিবেশ এর অনেক বাধা সত্ত্বেও তার পিতা বুঝেছিলেন এই মেয়ে সত্যিই বিদ্যাবতী- তাই নিভৃতে শিক্ষা শুরু হয়েছিল। এরপরে: বাল্য বিবাহ- অকাল বিধবা- পিতা-মাতা র মৃত্যুর পরে ভাই দের থেকে গলাধাক্কা  ও সম্পত্তি র বঞ্চিত অধিকার- কুড়ি বছরে বৈধব্য কালে বেনারস গমন- সেখানে যৌবনের সকল প্রলোভন কে দূরে সরিয়ে এক শিক্ষা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হলেন; বাচ্চাদের শেখাবেন এবং সাথে নিজে আরো অনেক বিষয় শিখবেন। নিজের অভিভাবক নিজে, এরপর আরো শিখতে চেয়ে দেখলেন সেই হেতু কলকাতায় ফিরতে হবে। কিন্তু সেখানে তার হাতে পড়াশুনার পয়সা নেই। তিনি এক ব্রাহ্ম কে পুনর্বিবাহে রাজি হলেন এই শর্তে- তাঁকে নিখরচায়  ব্রাহ্ম প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সেই যে সুযোগ পেলেন সেই সুযোগ এর সদ্ব্যবহার করে ডাক্তারি পড়তে শুরু করলে মেডিকেল স্কুলে। এটি কিন্তু মেডিক্যাল কলেজ এ ভর্তি হবার আগের ভাগ। এই মেডিকেল স্কুল পরিচিত ছিল ক্যম্বএল মেডিক্যল স্কুল নামে যা বর্তমানে সুপরিচিত নীলরতন সরকার হাসপাতাল(NRS) ।
এইবার একবার  দেখুন সেদিন ঐ প্রথম স্থানাধিকারী স্বর্ণপদকের বিনিময়ে কি চাইলেন? - বিনয়ের সাথে বলে উঠলেন সভার সবার মাঝে- "আমি দরিদ্র, আমার কছে স্বর্ণপদকের থেকে অনেক দামী শিক্ষা অর্জন। ঐ পদক আমার চাই না, ওদের দিয়ে দিন।শুধু যদি পারেন আমাকে একবার মেডিকেল কলেজ এর সার্টিফিকেট পরীক্ষার কোর্সে বিনামূল্যে ভর্তির সুযোগ করে দিন। তাহলে আমি আরো অনেক পড়তে পারব, আরো অনেক জানতে পারব। অনেক অসহায় মহিলার চিকিতসা করতে পারবো।"- স্বর্ণ কবজ কুন্তল ফিরিয়ে দিয়ে চেয়ে নিলেন এক পুরুষঘাতিনী মহা অস্ত্র- শিক্ষা ও শিক্ষার অধিকার। কে বলুন তো এই মহীয়সী?
ইনি হলেন একক প্রচেষ্টায় নিজের শিক্ষাকে পাথেয় করে হাজার বাধা পার হয়ে জিতে যাওয়া চরিত্র:  সেই যুগের বিখ্যাত ডাক্তার হৈমবতী সেন! কাদম্বিনী গাঙ্গুলির সমসাময়িক হলেও বছর দশেক পরে হৈমবতী র আবির্ভাব। তিনি নিজের জীবন কাহিনী খেরোর খাতায় লিখে গেছেন- এক মহিলার সকল প্রতিকূল এর বিরুদ্ধে জয়ের কাহিনী। সেই লড়াকু বিদ্যার্জন কাহিনী যে কোনো চিত্রনাট্য কে গুণে গুণে দশ গোল দেবে।
তার মেডিক্যল স্বর্ণপদক নিয়ে ঘটনাটিকে নির্দিধায় বলা যায়-
"এ মণিহার আমার নাহি সাজে।
আরো ডাক্তারি বিদ্যা শিখলে কাজে লাগবে সমাজে।।"


আজ ডাক্তার দিনে প্রণাম ও অভিনন্দন জনাই সকল ডাক্তার দের যারা জ্ঞানের মাধ্যমে কঠিন তপোস্যায় জয়ী হয়ে সমাজ কে রোগমুক্ত করে চলেছে নিরলস ভাবে। মানুষ কে বাঁচিয়ে তোলার শিক্ষা বড় শিক্ষা-সর্বোত্তম বিদ্যা- মহান জ্ঞান।।
সব ডাক্তার ভালো থাকুক, সবার ভালো করুক।।
 
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। পয়লা জুলাই ২০২৪

সূত্র- চিরশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা   "জানবাজার থেকে বাগবাজার" । মিত্র ঘোষ থেকে প্রকাশিত এই বইটি  সেই যুগের বিখ্যাত নারীদের কৃতী কীর্তি সমাজ দর্পণের মাধ্যমে তুলে ধরেছে । ভালো বই। শেখার জানার বই।  



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"