হাতুড়ি অনেক আছে শ্রমিক দেবতার সাথে।একটি ছাড়া, বাকি গুলোর দাম নেই শ্রমিকের হাতে।।
হাতুড়ির হাতল টা ছিটকে পড়ল মাটিতে। ভেঙ্গে দুই খন্ড হয়ে গেছে। দিনের নিভু আলোয় ভাঙ্গা হাতুড়ির দিকে তাকিয়ে দুশ্চিন্তার কালো রেখার ভাঁজ টা গাঢ় হোলো কপালে - এখনো বেশ কিছুটা কাজ বাকি, দিনের আলোও প্রায় শেষ হতে চলল। হায় ভগবান! কি করব এখন? আজ কাজ শেষ না করলে তো বাড়িতে চুলাও ধরবে না রাতে। মালিক তো একটা পয়সাও দেবে না অর্ধেক কাজের জন্য। আবার কি একটা অভুক্ত রাত আসতে চলেছে? কিন্তু কি উপায় হবে এখন, হাতুড়িই তো ভেঙ্গে গেলো। পাথর ভাঙ্গব কিভাবে? দুশ্চিন্তায়-হতাশায়-ভয়ে ইষ্ট দেব কে ডাকতে শুরু করলো। সেই কাতর ডাক শুনে বিশ্বকর্মা র ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবে তাকিয়ে দেখছে কাতর হয়ে আকুল ভাবে তাঁকে ডেকে চলেছে পাথর ভাঙ্গা মানুষ টা। অগত্যা ভক্তের প্রাণের ডাকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলো সমস্যা সমাধানে। সেই অভাগার সামনে আভির্ভূত হয়ে বললো- হমম, তোমার হাতুড়ি ভেঙ্গে গেছে তাই তো? একটা হাতুড়ি দিলেই ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু তুমিই বলো বদলে তুমি আমাকে কি দেবে? সেই হতভাগ্য মানুষ টা হঠাৎ সামনে ইষ্ট দেব কে দেখে বিহ্বল। সেই বিহ্বলতা র আবেশেই বললো হে দেব বলুন কি চাই আপনার? আমারতো দেবার তেমন কিছু নেই। আপনি আরাধ্য ,আপনিই বলুন কি চাই?
বিশ্বকর্মা এই শুনে বললো- তোমার ভক্তি তে মুক্তির আকুলতা রয়েছে। ঠিক আছে দেখি কি করা যায়! একটা হাতুড়ি যোগবলে এনে দিতে উদ্যত হতেই মনের মাঝে বেজে উঠল এসগার্ড থেকে লোকি আর স্বর্গ থেকে শনি র সন্দিহান বার্তা।- এই বিশু কি করছিস? এইভাবে চাইলো আর দিয়ে দিচ্ছিস। অন্তত সেই জল দেবতার স্টাইলে একটু পরীক্ষা করে দেখ ও মনের দিকে কতোটা পরিপূর্ণ ?" - বিশ্বকর্মাও এইবার ধন্দে পড়ে গেলো। কি পরীক্ষা করা যায়? তারপর আগের বছর এর প্রশ্ন পত্রের সাথে মিল রেখে জলদেবতার রেফারেন্স এ চারটে হাতুড়ি সামনে রেখে দিলো-
১। থরের অব্যর্থ যুদ্ধবাজ হাতুড়ি: মিওলনির।
২। বিশ্বকর্মার নিজস্ব সর্ব নির্মাণ সম্পন্ন হাতুড়ি।
৩। স্যাকরার একটা সোনার ঠুক ঠুক হাতুড়ি।
৪। আর একটা ধুলো রক্ত মাখা পাথর ভাঙ্গা হাতুড়ি।
বিশ্বকর্মা এই গুলো সামনে সাজিয়ে বললো- আমার হাতির ডাক শোনার আগে একদম এগুলোর দিকে হাত বাড়াবে না। না হলে সব ক্যান্সেল হয়ে যাবে কিন্তু। তারপর হাতি কে বৃংহণে আকাশ বাতাস কাপিয়ে দিতে ইশারা করলো। তারপর বিশাল বিষম শব্দ শুনে স্মিত হেসে দিদি নম্বর ওয়ানের স্টাইলে বললো- "এবার বলো"।
মানুষ টা ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করলো চারটে হাতুড়ি। তারপর ধীরে এগিয়ে চতুর্থ টা তুলে নিলো। বিশ্বকর্মা অবাক হয়ে বললো তুমি বাকি গুলোর একটাও নিলে না কেনো? ঐ গুলোতো বিখ্যাত ছিলো। লোকটা হেসে বললো আপনিই কি শুধু জলদেবতার গল্প পড়েছেন? আমিও জানি। তাই অতি লোভে তাঁতি নষ্ট করতে যাবো কেনো, তার থেকে যা দরকার সেটাই তুলে নিলাম। আমি কোনো যুদ্ধে যাব না তাই থরের হাতুড়ি আমার কাজে লাগবে না। আপনার মতো জ্ঞান আমার নেই, তাই কোথায় কোন বিষয়ে কতটা ঘা কতো জোরে দিতে হবে তা আমি ঠিক করতে পারব না। আর স্যাকরার হাতুড়ির দশ টা ঠুক ঠুক করার মতোন সোনা আমার নেই। এই শেষ হাতুড়িটাই আমার দরকার, এটা হাতে থাকলে আমি নিজের জন্য নিজের দুনিয়া তৈরী করে নেবো, যা বাকি তিনটের ক্ষেত্রে একদমই অপ্রযোজ্য। আর নিজের কাজে নিজের যোগদান না থাকলে সেই কাজ এর উৎকর্ষতাও বাড়বে না। আমি পাথর ভাঙ্গতে সিদ্ধহস্ত ,তাই আমার পাথর ভাঙ্গা হাতুড়িটাই চাই হে দেব। বাকি টা আমি বুঝে নেবো। কিন্তু, একটা প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞেস করতে পারি।
বিশ্বকর্মা আবেগে আপ্লুত হয়ে বললো- কি প্রশ্ন, অবশ্যই বলো।
- দেব, এই হাতুড়ি টায় রক্ত লেগে আছে কেনো? কার হাতুড়ি এটা?
বিশ্বকর্মা স্মিতহেসে বললো ওটা-সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার হাতুড়ি। ওটা যন্ত্র কে নিজের কাজ আর শক্তি দিয়ে রক্তের মধ্যমে হারিয়ে দেওয়ার কাহিনী- ওটা জন হেনরীর হাতুড়ি।
উত্তর শুনে সেই হাতুড়ি টা মাথায় ঠেকিয়ে পাথরের দিকে এগিয়ে গেলো সে। অত:পর মানুষটি প্রবল উদ্যমে পাথর ভাঙ্গতে শুরু করলো।
এদিকে লাল রক্ত মিশ্রিত হাতুড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে শ্রমিক এর হাতে তুলে দিয়ে দেবতা আজ অতি প্রসন্ন- বাকি তিনটে হাতুড়ি নিয়ে ফিরে গেলো তারার দেশে; স্বর্গে। যাওয়ার সময়ে শ্রমিক দেবতাও শ্রমিকের জয় গানে মিলে মিশে গেলো আজ। অনুধাবন করলো নিজের শ্রমিক সত্তার - দুনিয়ার সব শ্রমিক হেনরী র হাতুড়ি টা তুলে নাও শক্ত হাতে, একটাই হাত শ্রমিকের হাত। একটাই একতা শ্রমিকের একতা।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।। ১ লা মে, ২০২৪। শ্রমিক দিবস।।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত
মে দিবস নিয়ে আগের লেখা নীচের লিঙ্কে:
https://avrasoura.blogspot.com/2023/04/blog-post_30.html
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন