দণ্ডিতের সাথে দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে, সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার- তখনই হবে। মন, বড়ো অবুঝ এই মন কিছুতে ভাবেনা হায়!
শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে রাজ্য তোলপাড়। কোর্টের এক স্পর্শে ২৫০০০ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মী র জীবন হঠাৎ এক অন্ধকার টানেলে প্রবেশ করেছে। সেই নিকষ কালো টানেল এর শেষে আদৌ আলো আছে কি নেই সেটাই চতুর্দিকে আলোচ্য। ভেসে উঠছে অনেক গুলো ভাবনা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনি-আমি আমরা সমাজ কি চাইছি- কি ভাবছি?
সবাই কি দুষ্ট এর দমন শিষ্ট এর পালন চাইছি একযোগে? কিছু মতবিরোধ মতপার্থক্য কি দেখা যাচ্ছে? আসলে, আমাদের মধ্যেই কিন্তু কোর্টের বিচারের উপর ভিত্তি করে সমাজিক বিচারে শ্রেনীবিভাগ প্রত্যক্ষ হচ্ছে। সেটাই ফুটে বেরচ্ছে বিতর্কে আলোচনায়; চায়ের দোকানে-অফিস আড্ডায়- বাজারের পথে অথবা সমাজমাধ্যমে ফেসবুক-হোয়াটসএপ-টুইটারে।
একটা মানসিক- মানবিক সূক্ষ শ্রেনীবিন্যাস এর চরিত্রও প্রকট হচ্ছে ধীরে ধীরে। কিভাবে?
সবাই শিক্ষক দের নিয়েই বলছে। আমরা না হয় শিক্ষক দের নিয়ে যারা এতো ভাবছে, আলাপ-আলোচনা করছে সেই মানুষ গুলো - অর্থাৎ আমাদের নিজদের নিয়েই একটু ভেবে দেখি, আজ। চলুন তাহলে নিজেদেরকে নিজেরাই দেখি - দেখবেন নাকি নিজদের সমাজের ভিন্ন চরিত্র গুলোকে?
- ঐ তো, ঐ যে দেখতে পাচ্ছেন;
প্রথমেই রয়েছেন একদল মানুষ। এনারা মুড়ি-মিছরি এক ভেবে একদরে সবাই কে নির্দিধায় প্রবঞ্চক বোলে দাগিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন , কারণ কোর্ট সবার চাকরী বাতিল করেছে। সেই সূত্রে এদের চোখে সবাই দোষী। এদের মধ্যে কিছু মানুষ আবার হয়তো এক অতভূত আনন্দ প্রকাশ করছে- কমেন্ট করছে- চাকরী গেছে শুনে। বেশ কিছু নিরপরাধ বিনা দোষে দণ্ডিত জেনেও এরা মানে না মানা। এদের কাছে ২৫০০০ ই অসৎ- যতক্ষণ না নিরপরাধ হয়ে পুনরুজ্জীবন লাভ করে চাকরীতে বহাল হচ্ছে।
এইবার আসি - দ্বিতীয় দলের ব্যপারে। আরেকদল আছে যারা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের বস্তা মাথায় চাপিয়ে সমবেদনার প্রলেপ নিয়ে ঘুরছে। আহা-উহু করছে সামনে-সমান। কিন্তু আড়াল হলেই পিছনে ফিসফিস করে ফিস ভক্ষণ কারী বিড়াল তপস্বীর মতন চুপিসারে নারকীয় মজা দেখছে- চাকরী গেছে - চাকরী গেছে বোলে মনে মনে উল্লাস নৃত্য করছে!
আবার,তৃতীয়ত আরেকদল আছে। হয়তো সত্যিই চিন্তিত। বিনাদোষে বিনামেঘে বজ্রপাতে ভবিষ্যত শঙ্কিত সৎ শিক্ষকদের চিন্তায় চিন্তান্বিত। এদের ভাবনায় রয়েছে একটাই দাবি- সৎ মানুষদের ক্ষতি যাতে না হয়। বাকি অসৎ-প্রবঞ্চক দের কঠোর থেকেও কঠোর শাস্তি হোক।
কি ভাবছেন, শেষ সব চরিত্রায়ণ?
সত্যি হয়তো শেষ হোতো এখানেই, কিন্তু মনুষ্য চরিত্র বড়োই বিচিত্র। ক্ষণে ক্ষণে সে যে চমক দেখায়। মানুষই তো দেবতা কে গড়ে তাই কোনো মানুষ হয়তো ভেবে ওঠে আমি সৎ এর ও মা অসৎ এর ও মা, আবার কেউ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে কেঁদে বলে ওঠে যে মেরেছে সেও আমি ; যে মরেছে সেও আমিই- জিতেছিও আমি; হেরেছিও আমি। আসলে আমিই সবাইকে হারিয়ে -নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছি!
সেরকমই বিরল কিছু মানুষের মন হয়ত চতুর্থ এক ধারায় দেখা যায়। সেই মনে প্রথমে ভেসে উঠছে হাজার দিন রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টি-ঠান্ডা-ডান্ডা উপেক্ষা করে নিজের ন্যায্য চাকরীর দাবিতে অনশনে বসে থাকা সব হারানো কয়েকটা প্রজন্মের কথা। তারপর ভেসে উঠছে সৎ উপায়ে চাকরী পেয়েও হঠাৎ চাকরী চলে যাওয়ার বেদনাক্লিষ্ট মানুষ গুলোর কথা। আবার সেই মনেই পরমুহুর্তে ভেসে উঠছে অসৎ উপায়ে ন্যায্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে চাকরী কিনে নেওয়া- সেই মানুষ গুলোর অন্যায়ের কথাও, তারা অন্যায় করেছে চাকরির ব্যপারীর সাথে বিশাল মূল্যে রফা করেছে। সেই সাথে দেখতে পাচ্ছে ভিটেমাটি-জমি-যায়গা সর্বস্ব পণ করে চাকরির জন্য বেচে দেওয়া করুণ মুখের ছবি। কিন্তু, এখন তো সব শেষ। তারা কি করবে? লজ্জায়-ক্লেশে ভূলের মাশুল দিতে গিয়ে কি হারিয়ে যাবে তারা? ওদিকে সেই হাজার হাজার বঞ্চিত প্রার্থী কি করবে? আর নিরপরাধ নিন্দিত দণ্ডিত তারাই বা কি করবে ?
এই চতুর্থ শ্রেনীর ভাবজগৎ এর মানুষ গুলোর সবাইকে নিয়ে চলার-ভাবার অসুবিধা হয় সব থেকে বেশী। এরা সবাই কে নিয়ে এগোতে চায়- কিন্তু সাধ-সাধ্য ও বাস্তবতার মধ্যে এক বিষম লড়াই উপস্থিত হয় এদের মনোজগৎ এ। এই জন্যেই হয়তো এই চতুর্থ বর্গের মানুষ বিরল।
থাক, চার নম্বর থাকুক নিজের মতন। চলুন আমরা; আমি আপনি সবাই প্রথম তিন প্রকার এর মধ্যেই ঘুরি। সবাই কে নিয়ে চলার মানুষ দের বিবরণ শুধু খাতায় কলমে আর মন্দিরেই হোক- বাস্তবের জন্য নয়। হয়তো এই চতুর্থ পর্যায় হোলো মানুষ থেকে ভগবান হওয়ার ধাপ। সহনশীলতার নরম আবরণে সবাইকে একসাথে নিয়ে চলার পথ কঠিন এর থেকেও কঠিনতরো। তাই এই বিরল-বিচিত্র-বিশাল একমণী মন এর পথ শুধু ভগবান এর জন্যেই নির্ধারিত থাকুক।
দণ্ডিতের সাথে দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার তখনই হবে।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ২৬/০৪/২০২৩
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন