নীরবে হাসে শান্ত সমাজ শিব , রুদ্র রূপে দল বাঁধে বঞ্চিত জীব।।
সেই ট্যাক্সি চালকের কথাটা মনে আছে? সেই যে, ঐ লোকটা - একদিন ভাড়া খাটার সময়ে বৃদ্ধ প্যাসেঞ্জাররে আনমনে হারিয়ে যাওয়া বাক্স ভর্তি টাকা -সারা জীবনের সঞ্চয় ফিরিয়ে দিয়েছিল- মেয়ের বিয়ের আগের দিন আতংক আত্মহনন থেকে রক্ষা করেছিল সেই বৃদ্ধকে।
সেই সহকর্মীর কথা মনে আছে? যে দিনরাত জেগে টেবিলের সব কাজ তুলে দিয়েছিল। সেই কাজের করিকুরি উপর মহলে প্রদর্শনের বিনিময়ে তার যায়গায় যখন অন্য কারো প্রমোশন হোলো। তখনও সেই আত্মভোলা সহযোদ্ধাটি একবারও নিজের জন্য হা-হুতাশ না করে মিলেমিশে পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা করল।
সেই অটোচালকের কথা মনে আছে? গভীররাতে একডাকে বাড়ির অসুস্থ লোকটাকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানির সময়ে যে কালবিলম্ব না করে পৌছে দিয়েছিল হাসপাতালে।
সেই মুদির দোকানি কে মনে আছে? যে, করোনা কালে দুর্লভ হয়ে যাওয়া মাসকাবারি বাড়িতে পৌছে দিতো হাসিমুখে - মৃত্যু ভাইরাস কে পাস কাটিয়ে।গ্রাহক জীবনযুদ্ধে কঠিন সময়ে পাশ করেন- বেঁচে থাকেন এই আশায়।
আবার, সন্তানের বেকার শিক্ষককে দেখুন। সবার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে, ভালো ভাবে উতরে যায় পরীক্ষাতে- এই ভেবে একের পর এক এক্সট্রা ক্লাশ করিয়ে মেডেল জিতিয়ে আনলো, হাসি মুখে- এক্সট্রা "চার্জ" না করেই।
এইভাবেই একটু তল্লাশি করলেই অনেক চরিত্র র্যাডারে ধরা পড়ছে। এঁদের সামনে সাত রাজার ধন রেখে দিলেও নিস্পৃহ, স্পর্শও করবে না! এঁরা সমাজের আপদে-বিপদে ঝাপিয়ে মানুষের উপর বয়ে যাওয়া ঝড় নিজদের দিকে টেনে নেবে - অন্যের উপর বর্ষিত বিষ নির্বিকার চিত্তে পান করবে, নীরব নীলকন্ঠ হয়ে হলাহল জ্বালা আত্মস্থ করে নেবে। শিবের নির্বিকার নিরাসক্ত শান্তরূপে পাশে দেখতে পাবেন এদের আজীবন।
কিন্তু না ,উপকার পাওয়া সমাজ হোলো প্রজাপতি দক্ষ - একটু ঘি ঢেলে যজ্ঞ না করলে সমাজের অন্তরাত্মা শান্ত হবে না। তাই বাড়ির সামনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এর সেই ট্যাক্সি সারাদিন ভাড়া না পেলেও সবাই ঠান্ডা অ্যাপের গাড়িতে চড়ে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে, উপকারী সহকর্মী কে আরেকটু কাজের নামে চাপ দেবে- তারই কাজে-কাঁধে চেপে আজ তার বস হয়েছে,কথায়-ঝাঝে পলকে বুঝিয়ে দেবে টিকটিকি আর ডাইনোসোর এক নয়। সকাল বিকেল খুচরো চাওয়া সেই রাতের ফেরেস্তা অটোর সাথে মুখে মারিতং করবে, অটোর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি কামনা করবে। মুদির দোকান তো এখন করোনার পরে আদিম ইতিহাস, ফিরে পাওয়া মলে-অ্যাপে ডালে-চালে অফারে ভেসে যাওয়ার অভ্যাস। সন্তানের শিক্ষকের মাইনে দিন- "দিন" গুণে হাজিরা খাতা মিলিয়ে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাস্টার না এলে যুক্তি খাড়া করা। ক্লাশ সেভেন এর পটিগণিতে মজুরি কেটে নেওয়া-দৈনন্দিন হিসাব কষে।
এদিকে আপনি দেখছেন; সমাজ দেখছে- একি, চারদিকে এতো উত্তেজনা- রাগ -অভিযোগ- অভিমান কেনো ? আমি চাঙ্গা আছি, তাহলে সবই তো বিন্দাস-চাঙ্গাসি থাকবে। না, সেটাতো হচ্ছেই না একদম। উল্টে, আগুনে বিদ্রোহ চোখ ঠিকরে বেরচ্ছে ওদের, একসাথে। -এক ভাবে, মিলেমিশে। কাদের?
ঐ যে সেই ভাড়া না পাওয়া ট্যাক্সি,প্রমোশন না পাওয়া সহকর্মী, খুচরো না পাওয়া অটো, বিক্রি নিভুনিভু মুদি, মাইনে কাটা যাওয়া প্রাইভেট টিচার, আরো কতো সব শান্ত শিব চরিত্র।এরা সবাই আজকাল রক্তচক্ষু তে প্রায় ভষ্ম করে দিতে চাইছে কেনো?
শান্ত ধ্যানমগ্ন এক-এক জন শিব জেগে উঠছে। হর হর মহাদেব ধ্বনিতে প্রাত্যহিক চাহিদার ত্রিশূলে ভর দিয়ে ছুতে আসছে আজ,এদের নিভৃত রাগ-অভিমান একত্রিত হচ্ছে দিনকে দিন। নিপীড়িড-বঞ্চিত-শোষিত নিজদের মধ্যে, নটরাজের তাণ্ডব ভৈরব শক্তি সংহত করছে। একবার শুধু আছড়ে পড়তে চাইছে - হর হর মহাদেব রবে।
দুনিয়ার সব বঞ্চিত এক হও ভৈরবে।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন