##- ঝটিকা সফর পুনে পর্ব : তৃতীয়কাজের শেষে নিজেরে শুধাই ,ফেরার পথে মনের টানে কোন পথে পিঙ্গা পিঙ্গাই?

##- ঝটিকা সফর পুনে পর্ব : তৃতীয়
কাজের শেষে নিজেরে শুধাই ,
ফেরার পথে মনের টানে কোন পথে পিঙ্গা পিঙ্গাই?

দুইদিনের রুদ্ধশ্বাস দৌড়ঝাপ-কাজ এর পরে পশ্চিমে দেখি সুয্যি মামা আস্তে আস্তে হিসাব পত্তর গুছিয়ে নিচ্ছে। আমিও তখন দিনের শেষে অফিস ফেরত ওলার থেকে নেমে এসে হোটেলে ঢুকতে যাচ্ছি। হঠাৎ সেই মাথার ক্যাড়া চাগাড় দিয়ে উঠল- দুই দিনের এই ধরাধামে কাজ তো হোলো, কিন্তু মন কি পেলো? কিছুই তো ঘুরলাম না পুনে প্রান্তে।
সোজা ইউটার্ন আর জীবন পুরের পথিক স্টাইলে গুগল সার্চ। হোটেল এর খুব কাছেই একটা নাম দেখে মনটা কেমন পিঙ্গা পিঙ্গা করে বনশালী র সিনেমার সেটের মতন নেচে উঠল- গুগলে ভেসে উঠছে তিন-চার কিলোমিটার এর মধ্যে ভারতের ইতিহাসে চল্লিশ যুদ্ধ অপরাজেয় ব্যক্তির বাসভবন! যেখানে চিতার চাল চলন- বাজের নজর আর তরোয়াল এর বিদ্যুত বেগ কিস্তিমাতের বাস্তব ইতিহাস ধুলায়-হাওয়ায় মিশে আছে। হ্যা এসে উঠলাম বজিরাও পেশোয়ার বাসভবন শনিবাড়ওয়াডা তে।



এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মারাঠা   শক্তি ভারতের প্রধান ও অপ্র্তিরোধ্য তকমা পেয়েছিল এই বাসভবন এর পরিচালনাতেই। যদিও বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে রয়েছে সেই সব মহান পেশোয়ার ভবনটি। কে বলবে বলুন তো এই ভবন নির্মাণ এর জন্য বাংলায় সেই ছড়াটাও বিখ্যাত হয়েছিল খোকার ঘুমে, যুগে যুগে- বর্গী এলো দেশে। মারাঠা বর্গী রা এসেছিল- বঙ্গ জীবনে লুঠতরাজ-খাজনার মাধ্যমে এক বিশৃঙ্ক্ষলার সৃষ্টি করেছিল।এই ঘটনারই অর্থনৈতিক পরোক্ষ প্রভাব দেখা যায় পলাশীর প্রান্তরে আরেক শক্তির উত্থান পথে, বণিকের মাণদণ্ড থেকে রাজদন্ডে। যাই হোক সেই গল্প প্রসঙ্গ অন্য। তবে, ইতিহাস বারংবার এটাই প্রমাণ করে আজ যা অভ্রলিংহ প্রাসাদ কাল তার চিহ্ন মাত্র রবে না এই ধরাধামে। 


ঘুরে ফিরে একে একে দেখলাম পেশোয়ার ভবন, অনুভব করলাম বজিরাও-মাস্তানি-কাশীবাই র হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস। দেখতে পেলাম এই ঘর গুলো থেকেই একদিন রঘুনাথরাও-সামশেরবাহাদুর বেড়িয়ে আর ফেরেনি তৃতীয় পানিপথের প্রান্তর থেকে। আবার এইখানেই জেগে উঠেছিল দ্বিতীয় বারের মতন মারাঠা প্রত্যাশা সোয়াই মাধবরাও এর হাতে, পানিপথের থেকে ঘুরে দাড়ানোর মাধ্যমে- যশোবাই এর কাহিনী তে।

 
ধীরে ধীরে সূর্য প্রায় তটে যেতে বসেছে,সারাদিন এর সব ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো বলে শেষ প্রহরে মনের রসদ পেয়ে খুশী মনে ফিরব-ফ্লাইট ধরব ভাবছি। সামনে এক চা বিক্রেতার থেকে চা খেয়ে একটু আধটু গল্প করতে গিয়ে, সময়ে ফিরতে পারলাম না। কেনো? দোকানির মাধ্যমে সেই স্থানের কথা শুনে আরেকজন দেখলাম মনের ভিতর থেকে ডাক দিচ্ছে - আয় আয়, এসেছিস যখন ঘুরে যা। সেই ডাক শুনে আবার সেদিকে হাটতে শুরু করলাম...

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ৮/০৪/২০২৪


##- ঝটিকা সফর পুনে পর্ব দ্বিতীয়-
দুই দিনের সফর পথে পুনে।
কিছু কথা রয়ে গেলো গভীরে মনে।।

আগের পর্বে পুনের ট্রাফিক নিয়ে হৃদকম্প ধরিয়ে দিলেও সেই ট্রাফিক রুটেই এক অনন্য জীবন কাহিনীর সন্ধান পেলাম সেই পথেই।পুনে এয়ারপোর্ট এ প্লেন থেকে নেমে একটি ওলা ক্যাব বুক করলাম, প্রাথমিক গন্তব্য হোটেলে শ্রীচরণ রাখব।পরবর্তী প্ল্যান- পেটে কিছু দিয়ে তারপর না হয় কাজকম্ম নিয়ে ভাবা যাবে। ক্যবে উঠেই কাঁচ দিয়ে ছুটে যাওয়া পুনে শহরটা কে ধরার চেষ্টা করছি। আমার উত্সুক্য দেখেই বোধহয় ওলার ড্রাইভার বন্ধু প্রশ্ন টা ছুড়ে দিলো- "প্যহেলি বার?" । আমিও সোজা হ্যা বলে কর্ড লাইন দিয়ে গল্পে ঢুকে গেলাম।
এটা আমার এক বাজে অভ্যেস, রাস্তাঘাটে-ঘরের বাইরে দেশে-বিদেশে-রাজ্যে বেড়াতে গেলেই গাড়ি চালক- চা বিক্রেতা- খাবার বিক্রেতা রা সাথে গল্প জুড়ে দেই। যাই হোক সেদিন পুনের উষ্ণতা আটত্রিশ ডিগ্রি! সেই গরম হাওয়া এক মরাঠি আর এক বাঙালির পরবর্তী আলোচনার বিষয় হতে হতে কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম ক্যাবের বিষয়ে। এর পরে যে উত্তর টা পেলাম তা হয়ত মনে রাখব আজীবন। কেন?
দেখুন তো আপনার কেমন লাগে পুরো কথপোকথনের দৃশ্য টি। উত্তর টা কি ছিল সেই ড্রাইভার বন্ধুর?
না, এই ক্যাব আসলে আমার না। এই ক্যাব এর মালিক আমার বন্ধু। আমি এই বেলা চালাচ্ছি। আমি সার্ভিস করি। অবসর সময়ে এই ক্যাব চালাই।
ড্রাইভার বন্ধুর এই কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবলাম তাহলে এক্সট্রা দুই পয়সা লাভের জন্যেই মনে হয় গাড়ি চালাচ্ছে। আমার অভিব্যক্তি লুকিং গ্লাসে দেখে সেই ড্রাইভার বন্ধু রাস্তায় চোখ রেখে আমার মনের সেই কথাটাই বলে ফেলল- ভাবছেন আমি এক্সট্রা ইনকামের জন্য গাড়ি চালাচ্ছি, তাই না? - আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললাম, হ্যা ভালো তো খেটে সৎ ভাবে দুই পয়সা উপার্জন করছেন , ভালো ব্যপার তো।
স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা ইউ টার্ন নিয়ে উত্তর দিল- না, আসলে একটা পয়সাও আমি এই গাড়ি চালিয়ে  উপার্জন করছি না। আর এটা আমার টাইম পাস ও না, বলতে পারেন নিজের কিছু ডিউটি করছি।
আমি সেই ড্রাইভার বন্ধুর উত্তর শুনে বিস্মিত হয়ে বললাম - পয়সা উপার্জন করছেন না, তাহলে কিসের ডিউটি? বুঝলাম না।
গাড়িটা সিগন্যালে দাড়াল। এই বার সেই ড্রাইভার বন্ধু মুখ ঘুরিযে স্মিত হেসে বলল- আসলে এই গাড়ির যে মালিক আমার বন্ধু; আমি ওর জন্য চালাচ্ছি। ওর এরকম ছটা গাড়ি আছে। আমরা ছয় বন্ধু মিলে ওর গাড়ি গুলো দিনে যখন যে যেমন সুযোগ পাই চালাই। কেউ এক পয়সা নেই না।
আমি অবাক হয়ে বললাম কেন? মানে যার ছটা গাড়ি আছে তিনি নিশ্চয়ই বেশ বিত্তবান। তাহলে বন্ধুরা পয়সা নিচ্ছেন না কেন?
এইবার সেই ড্রাইভার বন্ধু একটু উদাস মুখে বলল- ঠিক ও বিত্তবান, সত্যিই বিত্তবান,  ছিল! এখন আর নেই!! একটা পথদুর্ঘটনায় বছর দুই হোলো মাথা বাদে দেহের সব অঙ্গ প্রায় পঙ্গু হয়ে যায়। ঐ দুর্ঘটনা ওর সব শেষ করে দিয়েছে। একসময়ে ওর চিকিৎসা ও প্রায় থমকে গেছিল। ও আর ঋণ নিতে অক্ষম সাথে আমাদের থেকে আর অর্থ সাহায্যও নেবে না জেদ ধরে বসল। তখন আমরা বন্ধুরা ঠিক করলাম আমরা যে যেমন পারি নিজদের অবসর সময়ে ওর গাড়ি গুলো চালাব। যা আসবে সেটাই ওকে দেবো, কেউ একটা পয়সা নেবো না। এইভাবেই চলছে।
এই কথা শুনে আমি বাকরুদ্ধ, শুধু জিজ্ঞেস করলাম আপনার বন্ধু কেমন আছে এখন? হেসে উত্তর দিল- শেষ ছয় মাস হোলো উঠে বসতে পারছে।
পুনের শুষ্ক গরমে ঘাম তো হয়না, গালের পাশে চোখের কাছে মনে হলো একটু ভিজে গেলো। মনের মধ্যে দেখতে পেলাম র‌্যাঞ্চো তীব্র বেগে বন্ধুত্ব কে পিঠে করে শহরময় ঘুরছে। ওরা সিক্স ইয়ার- এই যুগে এরকম ইয়ার দের হয়ত ইডিয়েটস বলে। গাড়ির মিউজিকে বেজে উঠল- যানে নেহি দেঙ্গে তুঝে..
পুনশ্চ: পুরো লেখাটায় "ড্রাইভার বন্ধু" বলেই সেই বন্ধু কে পরিচয় দিয়েছি। ছবিটিও দিলাম। এই গল্পের চরিত্রের সাথে দেখা হয়ত হবে না আর কখনো , তবুও অনেক দূর থেকে অনেক শুভেচ্ছা রইল এই বন্ধুত্বের প্রতি, বন্ধু ভালো হয়ে যাবে।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ১/০৪/২০২৪



##- পুনে ঝটিকা পর্ব - ১
রক্ষে করো ভগবান।
এভাবেও ক্ষণে ক্ষণে চমকিতো হয় প্রাণ।।

পুনে থেকে এসে প্রথম উপলব্ধি- আমার অঞ্চলের অটোভাই দের আর মাইকেল শুম্যখার ভাবব না! না একদম না!
পুনে তে অটো-"ওলা" তে চড়ে ঘুরতে গিয়ে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার উপলব্ধি হোলো। অটো করে বেড়িয়েছি। হঠাৎ দেখলাম, না দুঃখিত- অনুভব করলাম, অটো ভাই কেমন নির্লিপ্ত ভাবে একসারি বেগবান গাড়ির মধ্যে আড়াআড়ি ভাবে ঢুকে গেলেন! তো পিলে চমকে উঠল আমার!!
ভাবলাম এইবার ছবি বিশ্বাস হয়ে নিশ্চিত মাল্যদান পর্ব শুরু হবে!
- তারপরেই দেখছি অপূর্ব সেই জ্যোতি, মানে ঠিক জ্যোতি বসুর মতোন ড্রাইভার ভাই কিচ্ছু হয়নি মুখে পরের গাড়ি গুলো কেও ক্রশ করে গেলেন।
হঠাৎ অটো ঢুকে যাওয়ায় সামনের সেই এক রাশ গাড়ির মানুষ গুলোও দেখলাম মুখ থাকতে স্টিয়ারিং এর মাধ্যমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনল। মনে মনে ভাবলাম একি আত্মসংযম- একটিও "দুই"- "চার" অক্ষর অটোর উদ্দেশ্যে উড়ে এলো না! বুঝলাম উভয় পক্ষই মিথোজীবি পন্থী হয়ে গেছে।
মনে মনে নত মস্তকে অটো ড্রাইভার কে, পুনের সকল গাড়ি চালক দের প্রণাম করলাম। স্বগতোক্তির মতন বেরিয়ে এলো- আজ থেকে আপনারাই হলেন অটো কুলের শুম্যাখার! বাংলার পক্ষে রাগ করলেও এই মণিহার সত্যি বঙ্গ অটো কুলের নাহি সাজে।
গাড়ির লাইনে হঠাৎ অটো ঢুকলে সেই অটো "একটু কু ছোয়া লাগে" বলে ছোট্ট স্ক্র‌্যচ ফ্রিতে দিতো, সেই ধারনা পুনের অটো কুল সম্পূর্ণ বদলে দিল। কিছুই হয়নি, গাড়ির সারিতে অটো ঢুকেছে তাতে কি হয়েছে? দুর্ঘটনা যখন হয়নি তখন কিছুই হয়নি!!
পুনশ্চ: শুধু হার্টের অসুখ নিয়ে পুনের অটোতে উঠলে কে কাকে হৃদ মাঝারে রাখবে সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ মালের দায়িত্ব আরোহীর হবে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ। ২৯/০৩/২০২৪


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"