২৯ ঋ-ডবল!
অফিসের ব্যস্ত ল্যাপটপের এর পাশ থেকে আনমনে হঠাৎ নীরব মোবাইল টা কেপে-গেয়ে-বেজে বেঁচে উঠল। স্ক্রিনে একটা ছোট্ট নাম ভেসে উঠতেই শত ব্যস্ততা-বিরক্তির মধ্যেও মরূদ্যান এর সন্ধান পেল অর্ঘ এর কাজে নিমজ্জিত কর্পোরেট মন! ওর আট বছরের ছোট্ট ছেলে বুবাই বাড়ির থেকে ফোন করেছে তার আদরের বাবাকে। এই সব আদুরে ফোনে হাই-হ্যালোরা টাটা-বাইবাই করে সোজাসুজি কথায় বেঁচে ওঠে: আমার সোনা বুবাই, স্কুল থেকে এসে গেছিস? সব ঠিক আছেতো? ওপার থেকে এক নি:শ্বাসে এতো গুলো কথা শুনে বুবাই এক কথায় উত্তর দিলো -হ্যা । তারপর বাকি প্রশ্ন কে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রবল উত্সাহে বলে উঠল- জানো বাবা, আজ স্কুলে কি হয়েছে ? অর্ঘ উৎসুক মনে জিজ্ঞেস করল- কি হয়েছে রে?
-আজকে একটা মজার ঘটনা হয়েছে। আজ স্কুলে টিফিনের সময়ে আমরা বন্ধুরা মিলে একটা ফুটবলের দল তৈরী করেছি , আজকেই দলটার জন্মদিন হোলো। কিন্তু মজার ব্যপার কি জানো? মিস একটু পরে বললো পরের বছর ফুটবল দলের এই জন্মদিন টা আমরা আর পালন করতে পারব না! স্কুলে বাচ্চারা খেলার ছলে ফুটবল দল করেছে দেখে অর্ঘ বেশ খুশী হয়েছে, সেই খুশীর মেজাজে হঠাৎ পরবর্তী বছরে এই দল কেন জন্মদিন পালন করতে পারবে না, জানতে মন চাইল অর্ঘর। কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করল- কেন রে জন্মদিন কেনো হবে না? ও তোরা অন্য সেকশনে চলে যাবি তাই এই দল ভেঙ্গে যাবে, এই জন্য জন্মদিন হবে না? তবে দেখ টিফিন টাইমের ফুটবলের দল তো- সেটাতো সেকশন এর উপর নির্ভর করবে না। তাহলে কেন দলের জন্মদিন পালন করতে পারবি না? বাবার এত্ত কথা শুনে বুবাই ফিকফিক করে হেসে বলছে- বাবা তুমি তো কিছুই জানো না! আজকে কত তারিখ বলোতো? - আজকে লিপইয়ার ২০২৪ এ ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ তো।তাই পরের বছর কিভাবে হবে ফুটবল দলের জন্মদিন?ম্যাডাম বুঝিয়ে দিয়েছে আবার ৪ বছর পরে যখন আমরা ক্লাশ সিক্সে উঠব তখন হবে এই ফুটবল দলের জন্মদিন, মজার না?
অর্ঘ ছেলের কথা শুনে এবার ল্যাপটপ স্ক্রিনের নীচে ডানদিকের কোণে তাকিয়ে দেখে বলে উঠল- হ্যা রে বুবাই! ঠিক বলেছিস তো,আজকেই তো ২৯ ফেব্রুয়ারি -লিপইয়ার। আমি খেয়ালই করিনি। একটা মজার ব্যপার। যাক তুই এখন মোবাইল রাখ, আমি এইবার একটু কাজে বসি। আর হ্যা, বেশী মোবাইল দেখিস না কিন্তু, মা স্কুল থেকে ফিরলে বিকেলে খেলতে যাবি মাঠে। এখন রেস্ট নে একটু, টাটা- রাতে দেখা হবে। বুবাই মিটিমিটি হেসে "আচ্ছা" বলে ফোনটা কেটে রেখে দিলো!
মোবাইল টা রেখে অর্ঘ চেয়ারে হেলান দিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
তারপর দুই তিনবার মনে আউড়ে নিল আনমনে - উনত্রিশ- টুয়েন্টিনাইন; আজ স্পেশাল টুয়েন্টি নাইন। হঠাৎ ৪৪০ ভোল্টের স্মৃতির শক ছিটকে পড়ল ওর মনে-
কলেজ লাইফেই তো স্পেশাল ২৯ এর জন্ম জীবনে। সে ছিল এক নতুন খেলা, নতুন আবেগ। তাসের দেশে হরতন-রুইতন- ইস্কাপন-চিড়তন দের গোলাম দের নিয়ে নয়-ছয়ের লড়াই। আর যদি কখনো মন মতোন রাজা-রাণী গোলাম-নয়-এক কার্ড হাতে আসতো তখন বিশ ঋ ডবল ডাক পাড়ত। এইভাবে খেলতে-ডাকতে বিরল ভাবে উল্টো দিকের পার্টনাররা যদি কখনো বুঝিয়ে দিতো- "যদি তোর ডাক শুনে একলা চলতে হবে না" তখনই কালেভদ্রে বিশাল হাঁকডাকে আছড়ে পড়ত ২৮-২৯ ঋ-ডবল। মনে হোতো সব পেয়েছির দেশে পৌছে গেছে শেষে।
কিন্তু এখন? এখন কোথায় সেই স্পেশাল ২৯? সেই উত্তেজনা- সেই কার্ড বিন্যাস আজকের কাজের দিনে ইতিহাস হয়ে গেছে। সেই মনের পার্টনার গুলো দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ হয়ত হারিয়ে গিয়ে কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে, কোনো এক অচীনপুরে। এখন দেশ-বিদেশ থেকে আনা বিখ্যাত তাসের কার্ড গুলো অর্ঘর দিকে শোকেস থেকে উঁকিঝুঁকি দেয়, কিন্তু ইচ্ছে গুলো গুটিগুটি পায়ে এগোতে পারে না আর। তাইবোলে পুরোপুরি কি উনত্রিশ ঋ-ডবল মন থেকে হারিয়ে গেছে?
অর্ঘ জানালা দিয়ে অনেক দুরে আকাশের শেষ সীমানায় চেয়ে স্মিতহাসে। আজকের দিনে স্পেশাল ২৯ ঋডবলে র অস্তিত্ব খুঁজে পায় মনের কোণে। ইচ্ছে গুলো অলৌকিক ভাবে বেঁচে থাকে কার্ডের রাজা-রাণী-গোলাম বিন্যাসে। সেই খানে মন খুঁজে বেড়ায় কোনো এক দিন বুদ্ধ-মোদি-মমতা সিঙ্গুর এ টাটার কারখানা উদ্বোধন করছে, পুতিন আর জেলেনস্কি গুপি বাঘা দেখতে দেখতে দাবা খেলছে, প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল হাতেহাত মিলিয়ে সেচের জলে উত্তাপ কমাবার চেষ্টা করছে ,আর বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে আইসিসি বিসিসিআই চুর নয়, রোহিত শর্মা আউট ছিল- ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ শেষে রেফারেন্স এ রেফারি কে ডাকে না; যাইহোক, এই আবোল-তাবোল কার্ড গুলো যেহেতু হাতে এলো না, তাই ২৯ ঋডবলও হারিয়ে গেলো ধীরে ধীরে জানালা দিয়ে।
অর্ঘ আবার বাস্তবের ল্যাপটপের দুনিয়ায় ঢুকতে যাবে হঠাৎ একটা টুংটাং মিষ্টি বার্তা এলো মোবাইলে- স্ক্রিনে ভেসে উঠল "স্যালারি ক্রেডিটেড"। অর্ঘর মনের টুম্পা সোনা হাম্পি দিয়ে বলে উঠল- আমাদের বাস্তবের ২৯ এ ২৯ ঋ ডবল হয় না। তাই "বিশ" ঋ ডবল টাই একদিনের জ্ন্য আমাদের কাছে নাটোরের বনলতা সেন।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন