পাঠ প্রতিক্রিয়া: তৃতীয় পর্ব [লালি, ব্যূহ, নেতাজীর গুপ্তচর, কলিকাতার গুপ্তমঠ]

সদ্য সমাপ্ত বইমেলা থেকে সংগৃহীত আরো কিছু বই এর পরবর্তী পাঠ প্রতিক্রিয়া। এই পর্বে চারটি বিষয় ধরা দিয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। কিছু বিষয় হয়ত প্রবন্ধের মাধ্যমে গভীর গম্ভীর আলোকপাত করেছে অজানা অন্ধকারে, আবার কিছু বিষয় হয়তো গল্পের মোড়কে পরিবেশিত হয়েছে। এর আগে, শেষপাঠ প্রতিক্রিয়ার বিষয় ছিলো ৯০ এর দশকের কোচিং প্রেমের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার খোঁজ (রবে নীরবে) ও ৭০ এর দশকের উত্তাল অগ্নিগর্ভ সময়ের নিরিখে শহুরে ভালোবাসার কথা(রক্ত গোলাপ)। তারপর...

এইবার একটু এগিয়ে দেখা যাক সত্তরের সেই রক্ত আগুন পরবর্তী তে কিভাবে গ্রামে জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল জঙ্গল মহলের  "লালি" কাহিনীতে লাল রঙের ভালোবাসার রক্ত পলাশে।
ষষ্ঠ পাঠপ্রতিক্রিয়া:
সৃষ্টি : লালি
স্রষ্টা: চন্দন গরাই।
প্রকাশক : পঙ্কজকুমার বসাক।
জঙ্গল মহলে বঞ্চনা-অত্যাচার-বিদ্রোহ-মাওবাদ এর প্রেক্ষাপটে রচিত ভালোবাসার গল্প লালি; এখানে নিপীড়ন অত্যচার বঞ্চনা সংগ্রাম মিশেছে অসম বয়সী ভালোবাসায় - সাহসী জঙ্গলকন্যার জীবনীশক্তির মাধ্যমে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এটি "ভৈরব বাঁকির মেয়ের" পরবর্তী অংশ। লেখকের ভাবনার স্পর্শে জল-জঙ্গল-বন্যপ্রাণ সঞ্জিবনী মন্ত্রে জেগে উঠে কল্পনার বাস্তব রচনা করেছে, মানুষ এর সাথে প্রকৃতির সজীব বাস্তব বিবরণ এই লেখার প্রাণ ভ্রমরা। তবে দুই একটি অংশে মনে হয়েছে এই বিবরণ আরো যদি বিস্তৃত হতো তাহলে প্রাণভরে আরণ্যক রস আস্বাদন করা যেতো, আরেকটু বেশী। মানুষের সাথে প্রকৃতির মেলবন্ধন পড়ে ভালো লাগল, আশায় রইলাম ভবিষ্যতে আরো এই ধরনের প্রকৃতি-মানুষ মেলবন্ধনের সুরে বাস্তব ধর্মী লেখার সন্ধান দেবে লেখকের কলম। ধন্যবাদ।।...

লালি কাহিনীর অন্তিম লড়াই এর রেশ ধরেই পরবর্তী প্রবন্ধে পৌছে যাওয়া যাবে কিছু যুদ্ধ পদ্ধতি করায়াত্তের আশায়- যুদ্ধের পাঠশালায়। না, এই যুদ্ধপাঠ আজকের না, বরং পৌরাণিক মহাভারত কালের যুদ্ধ কৌশল: সপ্তরথীর ঘেরাটোপে গুরু দ্রোণের তৈরী অজেয় "ব্যূহ" পরিকল্পনা।
সপ্তম পাঠপ্রতিক্রিয়া:
সৃষ্টি : ব্যূহ
স্রষ্টা: নিখাদ বাঙালি
প্রকাশক : খোয়াই।
সত্যি কথা বলতে মহাভারতে অনেক জ্ঞান-জীবনবোধ রীতিনীতি র মাঝে একটি অংশ ছিল যা বোধগোম্যের সিলেবাসে নেই বলে সটান বাদ দিয়ে এসেছি, এযাবৎকাল। সেই অংশটিও এইবার একটু-আধটু বোঝার চেষ্টা করলাম নিখাদ বাঙালির একটি সুন্দর প্রয়াস "ব্যূহ" এর মাধ্যমে।লেখক দ্বিমাত্রিক জ্যামিতি র মাধ্যমে চক্রব্যূহ অব্ধি যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল বুঝিয়েছেন।
এতদিন যা পড়েছি এই যুদ্ধ স্ট্রাটেজি, ব্যূহ বা কোনটার বিরূদ্ধে কোন ব্যূহ বুঝতে পারতাম না। ব্যূহ এর কথা মনে পড়লেই অভিমুন্য আর চক্রব্যুহ; ব্যস এই দুটোই চোখের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে।
কিন্তু কি এই ব্যূহ? কতধরনের ব্যূহ? কখন কোন ব্যূহ এর ব্যবহার এবং সেই ব্যুহ কে অতিক্রম করতে কি তার প্রতিকার? চতুরঙ্গ বাহিনী তে গজ-রথ-ঘোড়া-পদাতিক কি ভাবে সজ্জিত হোতো যাতে পক্ষের সেনা কৌশলে বিপক্ষ কে মাত করতে পারে? একজন সেনাধ্যক্ষ মাথায় কোন বিষয় রেখে সমরসজ্জা করতেন? ১৮ অক্ষৌহিণী র ক্ষুদ্রতম দলসজ্জা কেমন ছিল এবং কিভাবে একে একে স্তর অতিক্রম করে তা অক্ষৌহিণী তে পৌছে যেত? এই সমস্ত প্রশ্ন গুলো উত্তর হয়ে প্রকাশ পেয়েছে "ব্যূহ" এর মাধ্যমে - প্রাচীন কালের যুদ্ধ কৌশলের একটি রূপরেখা অবশ্যই অঙ্কিত হবে মানসপটে। আর হ্যা, লেখক যেহেতু নিখাদ বাঙালি তাই সেই সুরে বলতেই পারি এই বইটি পড়লে পাঠকের দুটি উপকার হবে হয়ত-
১। "ভীষ্ম-অর্জুন-কর্ণ-দ্রোণ শুধু ইয়া ঠিসস- ঠূসস করে বিশাল তীর ছুড়ত" : বি আর চোপড়া- স্টার প্লাস ধারনা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবেন। হতাশ জীবনে হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো বাণের থেকে নজর ঘুরে সঠিক ব্যূহ রচনায় মনোনিবেশ করতে পারবে।
২। ব্যবহারিক জীবনে ব্যূহ এর প্রয়োগ:  এর প্রয়োগ কোথায় হবে ভাবছি, হঠাৎ মনে ঝলসে উঠল একটি সম্ভাবনা। একমাত্র উল্টোডাঙা স্টেশনে বনগা লোকাল এ ওঠার সময়ে হয়ত এই ব্যূহ রচনা কিছুটা কাজে লাগতে পারে। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে না ঢুকতেই যাত্রীসাধারণ মহাবেগে বুকে মহাভারত ভেবে ট্রেনের কামরায় ঝাপিয়ে পড়ে। যদি তারা এই বই পাঠ করে, সেই  অনুপ্রেরণায় ব্যূহ রচনা করে কামরার দিকে এগিয়ে যায় তাহলে হয়ত দেশের ও দশের মধ্যে কামড়া-কামড়ি ধস্তাধস্তি বন্ধ হতে পারে।।
পুনশ্চ: বেশ কিছু যায়গায় ছাপাখানার ভূত তার কেরামতি দেখিয়েছে,যাই হোক শেষ অব্ধি আমে দুধে মিশে গেছে আর আঁটি গুলো দুই একটা বানান নিয়ে দৌড় দিয়েছে, বুঝতে তেমন অসুবিধা হয়নি। নিখাদ বাঙালি কে অনেক ধন্যবাদ এতো সিরিয়াস এবং সিলেবাসে নেই বিষয় টি সুন্দর ভাবে বুঝিয়েছেন, অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।।

এইভাবে যুদ্ধ পরিকল্পনার পথ ধরে এগোলেই দেখা যাবে আরেকটি গোপনীয় এবং চিত্তাকর্ষক যুদ্ধের বিষয় সামনে উঠে এসেছে- গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য যুদ্ধ। এইবারে আরেকটি প্রবন্ধ তাঁর গুপ্তচর পরিকল্পনা ও বাহিনী নিয়ে: "নেতাজীর গুপ্তচর"।
অষ্টম পাঠপ্রতিক্রিয়া:
সৃষ্টি : নেতাজীর গুপ্তচর
স্রষ্টা: সৈকত নিয়োগী
প্রকাশক : পত্রলেখা
নেতাজীর গুপ্তচর বিস্ময়কর তথ্য সমৃদ্ধ বিস্ময়কর গবেষণা।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ভারতীয় রাজনৈতিক দল সমূহের নেতাজিকে অসহযোগিতার কথা শুনতে পাওয়া যায়। অনেকাংশেই মনে করা হয় নেতাজির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, হয়ত ঠিক!
তবে এই বইটি পড়ে সত্যি বলতে মনে হয়েছে এদের থেকেও আরো ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল অন্য এক জন, অন্য এক দল! যাকে-যাদের নেতাজি নিজের কবজ কুন্তল ভেবেছিলেন, গোপনে গুপ্তচরবৃত্তি করতে দেশে পাঠিয়েছিলেন আই এন এর দফতর থেকে, ট্রেনিং দিয়ে। ভাবতে পারছেন! আই এন এর ভিতর থেকেই এসেছিল এই বিশ্বাসঘাতকতার অন্তর্ঘাত!! সেই সময়ের সাপেক্ষে নেতাজির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এই ঘটনাটি ছিল অপ্রত্যাশিত। যদিও সেই বিশ্বাসঘাতক দের বিশ্বাসভঙ্গে নেতাজি রণে ভঙ্গ দেননি। এরূপ হতে পারে আগাম ভেবেই আরো কিছু পূর্ব পরিকল্পনা সেরে নিয়েছিলেন সেই মহামানবটি, ফলে বিশ্বাসঘাতকের বুদ্ধি কেও শেষ অব্ধি টেক্কা দিয়েছিলেন পরিকল্পনায়।
এই সমস্ত কিছুই লেখক তথ্য দিয়ে পরিবেশন করেছেন কে-কিভাবে সেদিন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।এর সাথে আছে নেতাজির গুপ্তচর দলের বিবরণ। সেই সব সত্য কাহিনী পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। এর মধ্যে একটি ঘটনা বই এর পাতা জানিয়ে দেয় এইভাবে - সেদিন বিশ্বাসঘাতকের পরিবার-পরিজনকে নেতাজি কোনো বিপদের মুখে ঠেলে ফেলে দেননি। বরং সসম্মানে পেনশন দিয়ে গেছেন আই এন এর শেষ দিন পর্যন্ত: সব কিছু জানার পরেও, কেন? আসলে বিশ্বাসঘাতক হলেও সেই কর্মী এক সময়ে তো আই এন এর কর্মী ছিল, আই এন এ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল তার কর্মী ও তাদের পরিবার বর্গ কে কখনো ত্যাগ করবে না ; তাদের পাশ থেকে সরে যাবে না! সুতরাং বিশ্বাসঘাতক বিশ্বাস ত্যাগ করলেও নেতাজি নিজের বিশ্বাস-প্রতিজ্ঞা রক্ষা ভুলে যাননি- তাই বিশ্বাসঘাতকের পরিবারও পেয়েছে সম্মান।
সত্যি যদি এই মানুষ টা দেশে সেদিন ফিরতে পারত  নি:সন্দেহে নি:শর্তে  সাধারণের পাশে থেকে যেতেন আজীবন! এই অংশটা পড়ে বুকের ভিতর মোচড় দিয়েছিল। অনেক গোপন লুক্কায়িত বিষয়ে আলোচনা ও ডিক্লাসিফাইড ফাইলের সমাহারে বেশ কিছু সত্য উন্মোচিত হোলো এই বইটির মাধ্যমে। ধন্যবাদ লেখক কে, এমন বিষয় সন্মুখে নিয়ে আসার জন্য।।

এই রহস্য আবহে মন যখন বিস্মিত ঠিক তখনই  আরেকটি ঐতিহাসিক হাইপোথেসিস নির্ভর কাহিনী ভেসে উঠবে: "কলকাতার গুপ্ত মঠ"- বৌদ্ধ মঠ সংক্রান্ত কলকাতার ইতিহাসে মিশ্রিত একটি গল্প।
নবম পাঠপ্রতিক্রিয়া:
সৃষ্টি : কলিকাতার গুপ্তমঠ
স্রষ্টা: বৈদূর্য্য সরকার
প্রকাশক : পত্রপাঠ
কলকাতার সাথে জড়িত বৌদ্ধ সম্পর্ক গুলোর উপর থেকে ধুলোমাখা আস্তরণ সরিয়ে কিছুটা ইতিহাস-কিছুটা জীবনবোধ- কিছুটা রসবোধ আর জ্ঞানগঞ্জের হাইপোথেসিসে একটি সুন্দর উপস্থাপন। গল্পের গতি কখনো কলকতা থেকে সুদূর উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি গ্রামে সাবলীল ভাবে বিচরণ করেছে আবার কখনো বৌদ্ধ ইতিহাসের স্পর্শ অনুভূত হয়েছে। শেষের দিকে একটি স্বপ্নিল অলৌকিক প্রেক্ষাপটের অবতারণা থাকলেও তা গল্পের বাস্তবিক প্রবাহ কে ক্ষুণ্ণ করেনি। মূল্যবোধ এবং পুরনো গল্পের মিশেলে পাঠক অবচেতনে উত্তর কলকাতার বাসিন্দা হয়ে যায় সহজেই।
লেখকের গল্পে যে বিষয়টা সব থেকে ভালো লাগল তা হলো হাইপোথেসিস কে লেখক সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন । তাইবলে সিনিয়র রায় মহাশয়ের ভাষায় "ছিল বেড়াল হয়ে গেল রুমাল" টাইপের লেখা একদমই লেখেন নি- জ্ঞানগঞ্জের হাইপোথেসিস নিয়ে! বরং হাইপোথেসিস কে বাঁচিয়ে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন । পাঠক হিসাবে শেষে মনে হয়- হয়ত এটাও একটা সম্ভাবনা হতে পারে।ধন্যবাদ।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"