খেলার মধ্যে লেখা। আগামীর বাংলা শেখা।।

ধুত্তোর, এই প্যাপ্যা আওয়াজ টা তুই বন্ধ করবি কিনা বল? তখন থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরামহীন ভাবে মোবাইল দেখেই চলেছিস। বইমেলা থেকে এতো সুন্দর সব গল্পের বই নিয়ে এলি, একটাও উল্টে দেখেছিস এর মধ্যে? না শুধু মোবাইল আর মোবাইল। রাগে বিরক্ত হয়ে মনার কথা গুলো আছড়ে পড়ল মোবাইলে মগ্ন সাত বছরের ছেলে বুবাইর কানে। তুমি আমার পানে চেয়ে থাকো মুডে মায়ের পানে না তাকিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ সেটে দিয়েছে। মা কিছু উত্তর আশা করছে বুঝে ঝড়ের বেগে দায়সারা উত্তর একটা দিলো- সব বই পড়া হয়ে গেছে মা, তাই মোবাইল দেখছি, গেম্স খেলছি। এই কথা বলার পরমুহূর্তেই আবার হঠাৎ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল- গোওওল, মেসি কে দিয়ে ফিফা গেমসে গোল দিলাম আমি, ইয়েস মেসি-ইয়েস মেসি। তারপর উত্তেজিত স্বরে গাইতে থাকলো- "বারা বারা বারা, বেরে বেরে বেরে - ওলালা মা লাই লা"।

এদিকে সব বই পড়ে নিয়েছি শুনে বিস্মিত মা যখন সবে অগ্নিশর্মা হয়ে কি কি বই পড়েছে জিজ্ঞেস করতে যাবে ঠিক তার আগেই, তার সামনেই  বিনা মেঘে "বারা বারা বারা, বেরে বেরে বেরে" বারি ধারা মুষলবেগে আছড়ে পড়েছে! ছেলের গানের লিরিক্স এর প্রভাবে ভূতের রাজার বরের ভরে থতমত খেয়ে একদম স্থির হয়ে গেছে ! এরই মধ্যে কোথা থেকে যেন একটা অট্টহাস্য ছিটকে পড়ল ; বুবাইর কাকা হাসতে হাসতে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলছে-  এ কিইই গাআআন শুনলাম বৌদি!বুবাই ব্র‌্যভো!!! হা হা হা হা, গান টা বেশ হয়েছে কিন্তু। 
দেওর এর ভাইপো বন্দনায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ক্ষোভের সাথে মনা ঝাঝিয়ে উঠল- এই সব বাজে গান:ভাষা গাইছে আর তুই হাসছিস? ধরে দুঘা দিতে পারছিস না। ছি: একদম মান সম্মান সব মাটিতে ধূলায় মিশিয়ে দিলো ছেলেটা। এই বুবাই, তুই কোথা থেকে এই সব আজেবাজে ভাষা শিখছিস বলতো? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। ওমা,ঐ দেখো কি কাণ্ড! তাইতো ভাবছি কি করে ছেলে বিগড়ে গেলো আমার! তোর বাবা তোর পাশে বসে মোবাইল টিপছে আর মুচকি হাসছে। আমি সব বুঝেছি এইবার, নির্ঘাত তোর বাবা-কাকা র মুখে শুনেই শিখেছিস এই সব ছাইপাশ ভাষার গান!
ওদিকে কাকার প্রশংশায় আহ্লাদিত বুবাই সবে একটু উচ্ছ্বসিত হতে না হতেই মায়ের অগ্নিশর্মা রূপ প্রকাশিত। সেই দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েছে। একটু আলতো করে পাংশু মুখে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টায় বলে উঠল -এই গানটা তো ব্রাজিলের টিম গায়, পর্তুগালের টিম এর লোকেরাও গায়। আমি ফুটবল রিল্স এ শুনেছিলাম। মেসি কে দিয়ে গোল করিয়ে আনন্দ হয়েছে তাই তো গেয়ে উঠলাম। আর তুমি আমাকে বকেই যাচ্ছ তখন থেকে। ছেলের প্রত্যুত্তরে মায়ের সব রাগ গিয়ে পড়ল এইবার বেচারা মোবাইল এর উপর। তেতে উঠে বলতে লাগল এই মোবাইল ই যত নষ্টের গোড়া, আজকের পরে আর মোবাইল ধরে দেখ তুই, তোর হাত ভেঙ্গে দেবো। এতো গল্পের বই সেইগুলো একটাও নিয়ে বসার নাম নেই আর বাজে গান করে চলেছিস, এখন থেকে বই নিয়ে সময় কাটাবি- এই বলে ছেলের হাত থেকে মোবাইল টা ছিনিয়ে নিল মা।
উউউউউউউ... হঠাৎ  ছেলের গলা থেকে আহত বাঘের ক্রুদ্ধস্বর ছড়িয়ে পড়ল চোখের জলে।না কিচ্ছু পড়ব না।  কি পড়ব, ঐ বই গুলো? ছবি গুলো দেখে বুঝতে পারি,কিন্তু লেখা গুলো পড়তে গেলে বোঝা যায়না: বাংলা লেখা গুলো! এই সেদিন বাঘের ছবি দেখে একটা বই খুলে বসলাম , দেখি কি সব গল্প "জোলা"। "জোলা" যে কি সেটাই তো বুঝলাম না, তাই আর ঐ বই পড়বই না। লেখা গুলোও পড়তে কষ্ট হয় মা।
কষ্ট হয় মানে? কি বলছিস তুই? এই যে দুই ক্লাশ ধরে তোকে বাংলা শিখিয়েছে স্কুলে তাও তুই বাংলা পড়তে পারিস না? ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দিয়েছি বলে ভেবে বসিস না বাংলা শিখবি না। বাংলা পড়তে বুঝতে পারিস না বলতে লজ্জা হয়না তোর?  কথা বলবি না তুই আজকে আমার সাথে। এতো কষ্ট করে পড়াই তোকে আর তুই কিনা শেষে সবার সামনে বলছিস বাংলা জানিস না। ছি:। সরে যা আমার সামনে থেকে। বলেই রাগে উদভ্রান্ত হয়ে মোবাইলটা নিয়ে মনা চলে গেলো।
বুবাই কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল এখন আমি কি করব? আজ ছুটির দিন, মা মোবাইল ও নিয়ে নিলো, বই পড়তে বলল কিন্তু আমি তো পারিনা পড়তে একেবারে। কি করব এখন?
এদিকে মাতাপুত্রের রাগ বিলাপ এর মাঝে বসে দুই ভাই ভাবছে এ কি হোলো? বেশ সুন্দর পরিবেশ ছিল নির্বিঘ্ন। হঠাত সেই আকাশে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা। কিছু একটা ভেবে নিয়ে বুবাইর বাবা বুবাই কে বলল - বুবাই মোবাইল নেই তো কি হয়েছে? আমার একটা মজার প্ল্যান আছে। বুবাই মুখ ভার করে বলল- কি প্ল্যান?
- চল ক্রিকেট খেলবি? আমি তুই আর কাকা তিনজনে মিলে উপরের বড় ঘরে ক্রিকেট খেলি চল। রুম ক্রিকেট এর নাম শুনে হঠাৎ সব রাগ-দু:খ-অভিমান গিলি গিলি ভ্যানিশ। বুবাই সানন্দে ঘরের মধ্যেই ক্রিকেট খেলতে ছুটল বাবা আর কাকা কে নিয়ে। বল ব্যট উইকেট এর ব্যবস্থা হতেই কাকা বলল - আমার মাথায় আরো একটা মজার আইডিয়া এসেছে। শোন বুবাই আজকের ম্যচ টা চল আসল ম্যচ এর মতন করি, টিভিতে যেমন দেখায়। বুবাই একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল- আসল ম্যাচ মানে? ঘরে কি ভাবে আসল ম্যচ হবে?
কাকা তখন হেসে বলল - দাড়া এই ম্যাচে আজকে মাঠে যেমন ক্রিকেট এর স্কোরবোর্ড থাকে ঠিক সেই ভাবে আমরাও স্কোর লিখব, তোর ছোট বোর্ড টা নিয়ে আয় দেখি। কাকার থেকে এই অভিনব পরিকল্পনা শুনে বুবাই উত্তেজিত হয়ে বলল- বা: এটা তো খুব মজার হবে। একদম আসল ম্যাচের মতন। আমি দৌড়ে নীচ থেকে বোর্ড-মার্কার নিয়ে আসছি দাড়াও, বলেই দৌড়ে নীচে চলে গেলো।
এদিকে দুই ভাই নিজদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা সেরে মিটিমিটি হাসছে। বুবাই বোর্ড নিয়ে উপরে আসতেই দেখা গেলো বাবা বোর্ডে নাম-ওভার রান এর খোপ কেটে দিল বাংলায়। বুবাই একটু অবাক হয়ে বললো-  বাবা একি তুমি বাংলায় লিখছ কেনো? আমি তো লিখতে বুঝতে পারব না কিছু। বাবা একটু হেসে বলল তোকে কিছু লিখতে হবে না এখন, তুই যখন ব্যট করবি আমি তখন লিখব। তুই দেখ কিভাবে কি লিখছি। এরপর কাকা যখন ব্যট করবে প্রথমে অর্ধেক আমি লিখব তারপর তুই লিখতে শুরু করবি, ভুল হলে আমরা তো আছি। আর লাস্টে আমি যখন ব্যট করব তুই একা তখন লিখবি, এই ভাবে আমরা লিখব আর খেলব।  নে এইবার শুরু করি খেলা-লেখা।
তারপর বুবাই একটা করে বল খেলছে বাবা আর কাকা এক এক করে রান লিখছে, বুবাই কিভাবে খেলছে ঘরের-মাঠে কি হচ্ছে সব লিখছে। এরপর এলো সেই সময় যখন বুবাই আউট হয়েগেলো আর কাকা ব্যট করতে নামল। বাবা বুবাই এর হাতে বল তুলে দিলো। কাকা প্রথম বলে একটা চার মারল। বাবা বুবাইর হাতে মার্কার ধরিয়ে দিয়ে বলল- নে এইবার লেখ। বুবাই ইতস্তত করে মার্কার টা ধরে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল- পরীক্ষার বাংলা খাতা আর স্কুলের খাতা ছাড়া তো বাংলা লিখিনি বাবা, আমি পারব না লিখতে- কি লিখব?
বাবা হেসে বলল তুই কি দেখলি এক্ষুনি সেইটা বল আমাকে?
এইতো দেখলাম "কাকা চার মেরেছে" । বাবা হাত তুলে বলল এই তো ঠিক ভেবেছিস, এইবার যা ভেবেছিস ঠিক সেইটা নিজের থেকে লেখ। বাবার কথা শুনে চুপচাপ মার্কার হাতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল বুবাই। চুপচাপ কিছু সময় বয়ে গেলো। -তুই স্কোর না লিখলে খেলা শুরু হবে না কিন্তু, তুই তো বোলার। যা পারিস তাই লেখ।
এইবার বাবা একটু তফাতে গিয়ে বললো তুই না লিখলে আমি কাকা কেউই কিন্তু খেলব না।
বুবাই একবার বোর্ড আর একবার বাবা-কাকার দিকে তাকিয়ে বুঝল খেলতে হলে লিখতে হবে।  আস্তে আস্তে বোর্ডে হাত দিল, মার্কার টা একটু রঙ ঢাললো।একটু সময় নিয়ে "কা" লেখার পরে বাবা-কাকার দিকে তাকিয়ে বলল আর তো লিখতে পারছি না। কি করব? এই শুনে কাকা হেসে বলল- আচ্ছা মনে কর তোকে প্রথম দিন যখন বাউন্সার দিয়েছিলাম কি করেছিলি? খেলতে পেরেছিলি? সেদিন মাথায় লেগেছিল। আর এখন কি করিস হয় মাথা সরিয়ে নিস না হলে ব্যট দিয়ে আড়াল করিস না হলে দুম করে ব্যট চালিয়ে দিস। আজকেও ভাব তোকে ঠিক নতুন বাউন্সার দিলাম আমরা: একটা লাইন লিখতে হবে বাংলায়। কি করবি ভেবে দেখ? তুই বর্ণমালা জানিস,কিভাবে বর্ণ লিখতে হয় জানিস, শুধু লেখার জোর টা হাতে নেই। নে, ভাবিস না অতো। একদম এক ঝটকায় লিখে ফেল হয়ে যাবে, লিখে দেতো দেখি কেমন পারিস। তোকে এইবার এই ওভারে উদম পিটুনি দেবো! বাবা হেসে বলল- বুবাই যতক্ষণ না লিখছে তুই কথা বল ভাই, ও লিখলেই তোকে পরের বলে আউট করে দেবে, দাড়া তোর মজা ও দেখাচ্ছে। বুবাই তুই জলদি লিখিস না , ধীরেই লেখ ততক্ষণ কাকা নটআউট থাকবে। তবে এই আর কি টেস্ট ম্যাচের মতন সময়ের হিসাবে কাকা আজকে ফার্স্ট  হয়ে যাবে, অনেক্ষণ নট আউট থাকবে। আজ সময়ের হিসাবে কাকা জিতে গেলো মনে হচ্ছে, বুঝলি। দেখ তুই কি করবি।
বুবাই এইবার কি একটা ভাবলো,
তারপর একটু গতিতে দ্বিতীয় "কা" টাও আগের থেকে তুলনামূলক ভাবে তাড়াতাড়ি  লিখল। এর পর আস্তে আস্তে একটা পুর্ণ বাক্য শেষ করল "কাকা ৪ মেরেছে"
তারপর?  কাকা একটা করে বল মারছে, ভাইপো দৌড়ে গিয়ে ফিল্ড করছে- বল করছে,আর নিজেই একটু-একটু করে উত্সাহ নিয়ে একটা করে নিজের মনে নিজের মতন করে যা দেখছে তাই নতুন লাইনে লিখছে।
"কাকা এই বল টা খেলতে পারল না"
"বাবা ক্যাচ মিস করল"
"আমি একটা চার বাচিয়ে দিলাম"-  সাথে রান আর ওভার আপডেটও চলছে বাংলায়। এইভাবে আরো অনেকটা সময় পার করে খেলার বলে লেখার ছলে সেদিনের মতো লীলা সাঙ্গহোলো।
দিনের শেষে রাত বিছানায় মাকে নিজের লেখা বাংলা স্কোর বোর্ড দেখিয়ে মোবাইল টার দখল নিয়েছে- ফুটবলের রিল্স গুলো তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর বুবাই হঠাৎ জিজ্ঞেস করল - মা , রিল্স এ কেনো মেসি-রোনাল্ডোর কথা বাংলায় লিখছে না?
মা বুবাইর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলল তুই তো ওদের কথা বাংলাতেই ভাবছিস, যে কথা গুলো রিল্স বাংলায় লিখল না তুই নিজের খাতায় লিখে রাখিস, তাহলেই হবে- কিরে লিখতে পারবি তো? আজকে তো দেখলাম কাকা-বাবা-তুই খেলার গল্প গুলো লিখ্লি বাংলায়। বুবাই মায়ের বুকে মাথা রেখে বলল- হ্যা মা পারবো, আজকে দেখলাম তো। প্রথমে ভয় হচ্ছিল। তারপর দেখলাম , ভাবতে গিয়ে কোনো কষ্ট হচ্ছে না, যা হচ্ছে সেটাই দেখছি- সেটাই ভাবছি-আর সেটাই তো বোর্ডে লিখলাম।খুব সোজা , অনেক মজা- বাংলা টা ঠিক তোমার মতন; মা।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"