বইমেলা ২০২৪ সংগ্রহ -ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছােট সে তরীআমারি সােনার ধানে গিয়েছে ভরি

বই মেলার আলো নিভে আসছে, একটু একটু করে নিষ্প্রভ হয়ে আসা শেষ দশ বারো দিনের স্মৃতির ধুলো মেখে বাড়ির পথ ধরল শহর। কিছুক্ষণ গিল্ড অফিসের দিকে চেয়ে সোনাই বলে উঠল  -সমবৎসরের ন্যায় বই এর উৎসব সম্পন্ন হোলো তাহলে, চল ফেরা যাক এইবার। দাদার কথা শুনে টুবলুর অন্তর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল- হ্যা ফেরা যাক। চল,বেরোই এবার। দুজনেই চুপচাপ মেলা প্রাঙ্গণ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, শেষ বেলায় বই এর স্টল গুলো নিজেদের লাভ ক্ষতির আলোকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে। কিছুদূর এগিয়ে সোনাই ভাই কে একটু বিষণ্ণ দেখে কথা বলতে চাইল। "এইবার কিন্তু বেশ ভালোই বই কেনা হয়েছে বুঝলি, শেষ করতে পারবি তো?" - টুবলু দাদার প্রশ্ন শুনে ঝুঁকে থাকা মাথা টা তুলে মুখে একগাল হাসির আভা ছিটিয়ে দিয়ে বলল- হ্যা সে সবই পড়া হয়ে যাবে। সব বই তো শুধু একা আমি পড়ব না। তুই পড়বি, বাড়িতে মা-বাবা-বৌদি পড়বে , ছোটুও তো পড়তে পারছে এখন। সবাই ঠিক ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে পেরিয়ে যাব সেই বই এর পাহাড়, শেষ হয়ে যাবে। এই দশ দিনে আমার নিজেরই তো প্রায় সাত টা বই-গল্প-উপন্যাস শেষ হয়ে গেলো। তুইও তো শুরু করেছিস?

এই কথা শুনে সোনাইও মাথা নেড়ে বলল হ্যা ঠিকই বলেছিস ভাই, হয়ে যাবে শেষ। আমিও গোটা পাঁচেক বই শেষ করেছি - বাবা মা আর মনাও তো এভরেজ এ এক থেকে দুটো শেষ করে ফেলেছে। আসলে, ভালোবেসে আবেগে এতো গুলো বই কিনলাম আমরা, কিন্তু যদি পড়া না হয়? তাই ভাবছিলাম! এইবার টুবলু দাদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল - ধুস! প্রতিবারই প্রায় এই সংখ্যক বই সংগ্রহ করি এবং বছরের শেষে প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ বই আমরা পড়েই ফেলি। ভুলে গেলি নাকি?হ্যা, তবে সেটা ঠিক- একই বই হয়ত দুইজন পড়ে না কিন্তু কেউ না কেউ অবশ্যই পড়ে নেয়। তারপর আলোচনাও হয় সেই বই নিয়ে খাবার টেবিলে। সুতরাং বই এর সদ্ব্যবহার হবেই। এই নিয়ে চিন্তা করিস না! এই কথা শুনে সোনাই হেসে বলল হ্যা সেটা ঠিকই বলেছিস, সেই ভাবেই তো বই সংগ্রহ করি আমরা, পরিবারের প্রত্যেকের চাহিদা অনুসারে। কেউ হয়ত কথা সাহিত্য ভালোবাসে আবার কারোর পছন্দ প্রবন্ধ-রাজনীতি-পুরাণ-ইতিহাস-বিজ্ঞান-ফিকশন-নন ফিকশন, সাথে এখন আবার শিশু সাহিত্যও যোগ হয়েছে।তাই শেষে একটা বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য দেখা যায় সংগ্রহের প্রাথমিক লিস্টে। টুবলু দাদার কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল : ও তোর সেই চিত্রগুপ্তের খাতা? রাত-বিরেত জেগে কি যে লিস্ট তৈরি করিস কে জানে? দোকানে যাবি এটা সেটা বই ধুলো ঝেড়ে দেখবি, এই ভাবেই পছন্দ করবি, তা না এক খাতা-পেন-লিস্ট নিয়ে দোকানে স্টলে ঢু দিস , পুরো এযুগের নতুন দা তুই।এই শুনে সোনাই এইবার একটু গলা ভারী করে বলল: ওহ, ওটা চিত্রগুপ্তের খাতা? "দেশ" এর বই সংখ্যা-বিভিন্ন বই এর গ্রুপ থেকে নতুন বই ভালো বই এর রিভিউ পড়ে রাত জেগে তৈরী করতে হয় বুঝলি ঐ লিস্ট টা। আর ঐ লিস্ট টা আছে বলেই বই সংগ্রহের কাজ টা সহজ তরো হয় প্রতিবার। ভেবে দেখতো এতো বই, এতো স্টল- সেটার সব কি দেখা সম্ভব? ঐ লিস্টে হয়ত অনেক ভালো বই এর নাম নেই। কিন্তু কিছু তো আছে। ঐ সূত্রধরেই  আমরা দোকানে গিয়ে দুই এক পাতা ভূমিকা সহ পড়ে বই সংগ্রহ করেছি। হ্যা মানছি, অনেক ভালো বই এই লিস্টে ছিলনা যা আমরা সংগ্রহ করেছি, তবুও এই লিস্ট টাই ছিল প্রাথমিক অবলম্বন। টুবলু হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল- হ্যা বুঝেছি, রাত জেগে তোর তৈরী এই তরণী বেয়ে আমরা মহাসমুদ্রে ভেসেছি। সোনাই হো হো করে হেসে বলল- হ্যা বই এর মহাসমুদ্রই বটে। কিন্তু আমরা কতোটাই বা আর সংগ্রহ করতে সক্ষম হলাম, ইচ্ছে ছিলো আরো কতো সৃষ্টি কে আপন করে নেবো কিন্তু সাধ আর সাধ্য বাধ সাধল!ওদিকে আমাদের প্রচুর খসলো কিন্তু এতো বই সংগ্রহ করতে! সোনাইর কথা শেষ হতে না হতেই টুবলু আবার হেসে বলল ছোটবেলায় সেই চার ভাই এর গল্প পড়েছিলি,মনে নেই? ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড- একতাই বল। ঠিকই বলেছিস দাদা অনেক বই সংগ্রহে অনেক খরচ ,কিন্তু সবে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ। এই খরচ যদি একা তুই আমি করতে যেতাম এই স্বপ্ন সংগ্রহ জীবনে বাস্তবায়নের পথ খুঁজেই পেতো না। পরিবারের সবার ইচ্ছে এবং ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের দরুন দারুণ সব বই এর সন্ধান পেলাম আমরা। তবে ডিসকাউন্ট টা আরেকটু বেশী পেলে ভালোই হোতো , পাওয়া গেলো না কি আর করা যাবে!
সোনাই এইবার মাথা নাড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিল- সে আর বলতে? আরো দশ শতাংশ ডিসকাউন্ট বেশী হলেই আমরা আরো কিছু ভালো বই এর সংস্পর্শে আসতাম। সব ঐ বড় প্রকাশক দের চক্রান্ত! সব গিল্ড এর জন্য, ভেবে দেখ।  উত্তেজিত হয়ে এই কথা বলার পরেই সোনাই দেখল টুবলু ওর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।
কি রে হাসছিস কেনো? আমি কি ভুল বললাম?
টুবলু এইবার একটু থেমে স্মিতহেসে বলল- না না ভুল বলিস নি তো, তবে তুই যা বলছিস তাই আমি একটু মিলিয়ে মিশিয়ে দেখছিলাম আর কি?
"কি মেলচ্ছিস টুবলু? বুঝলাম না তো, এতে আবার মেলাবার কি আছে?"
স্বল্প হাসির রেশ বজায় রেখে টুবলু উত্তর দিলো - আসলে আমি ভেবে দেখলাম অনেকটা ক্রিকেট পরিচালনার সাথে মিলমিশ আছে কিন্তু এইবার বইমেলার পরিচালনে।
সোনাই বিস্মিত! কি বলছে টুবলু? কথা হচ্ছিল বই মেলায় ডিসকাউন্ট নিয়ে আর সেইখানে ক্রিকেট এলো কিভাবে? কিছুই বোধগোম্য হচ্ছে না ওর। ওর বিস্মিত ভাব অনুধাবন করে টুবলু ধীরে বলল- দেখ দুই একটি শক্তিশালী প্রকাশনী  প্রভাবিত করল গিল্ড কে, ফলে গিল্ডও মেনে নিলো বেশী ডিসকাউন্ট দেওয়া যাবে না, ঠিক একইভাবে শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ডও কিন্তু ক্রিকেট এর সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা কে প্রভাবিত করে নিজের অনুকুলে সিদ্ধান্ত বদল করায়, আর ঠিক তখন অনেকেই ঠিক তোর মতন কেঁদে বলে "বি সি সি আই চুর, আই সি সি চুর" সেই মিলটাই পেলাম আর কি! যাই হোক যা হয়নি কি আর করা যাবে বল? আমরা বই পড়তে, বই নিয়ে আলোচনা করতে ভালোবাসি, সেটাই বেঁচে থাকুক মনে।শোন, আজ প্রচুর হেঁটেছি ,ফেরার আগে পেটে কিছু না দিলে আর পা দুটো এগোবে না বলে বিদ্রোহ করছে। চল শেষ বেলায় দুটো ব্যাটার ফ্রাই আর দুই গ্লাস কাশ্মীরি কাওয়া দিয়ে এইবারের মতন বই মেলা থেকে হাওয়া হই আমরা!
দুই ভাই স্বপ্ন-কল্পনার-বাস্তব ব্যাগ ভর্তি করে ধীরে ধীরে বিবেকানন্দ র কথা মতো খাবারের দোকানে ঢুকল, "খালি পেটে বিদ্যে হয় নাকি লেখা আছে"- একটি স্টলের বিজ্ঞাপনে!

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"