"পাঠপ্রতিক্রিয়া বইমেলা সিরিজ: ২০২৪" : দ্বিতীয় পর্ব- [ রবে নীরবে ??, রক্ত গোলাপ]

প্রথম পর্বের পাঠপ্রতিক্রিয়া ছিল হাস্যরস-নতুন সৃষ্টি- মানবিক আসুরিক কাহিনীর প্রেক্ষিতে। এইবার আবার কিছু নতুন লেখা-নতুন লেখকের সৃষ্টি সন্ধানে সচেষ্ট হলাম। যা বুঝলাম যেভাবে কল্পনায় ভাবলাম একদম সেই মননেই লেখার চেষ্টা করলাম। এইবারের বিষয় গুলোত একান্ত আপন কিছু ভালো লাগার যায়গা। প্রেম এর লেন্সে ৯০-২০০০ প্রজন্মের কোচিং এর সময় টা ঘুরে দেখা;  পরের পাঠপ্রতিক্রিয়া টি ৭০ এর দশকে রাজনীতির মোড়কে নকশাল বারুদে বেড়ে ওঠা ভালোবাসা এক অন্য মোড়কে।

চতুর্থ পাঠপ্রতিক্রিয়া: 
সৃষ্টি : রবে নীরবে ??
স্রষ্টা: প্রতীক দে সরকার। 
প্রকাশক : ইতিকথা পাবলিকেশন।  
অত্যন্ত কাজের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আপনি মনে মনে ভাবছেন ইশ্শ কেনো বড়ো হয়ে গেলাম? ছোট্ট বেলার সেই খেলার দিনে যদি ফিরতে পারতাম তাহলে কাজের দুনিয়া থেকে এক্ষুণি ভোকাট্টা হয়ে উড়ে মাঠে পড়ে যেতাম অথবা গাছের ডালে ঝুলতাম। কিন্তু আপনার তো ইচ্ছে পূরণবর প্রাপ্তি নেই, সুতরাং আপনি টেবিল থেকে আর মাঠে ফিরতে পারলেন না। অগত্যা চোখ রাখলেন "উইন্ডোজে"। আরে না, মশাই কাজ করতে করতে  উইন্ডোজ বললে ল্যাপটপএর স্ক্রিন টাই যে কেনো ভাবেন-বোঝেন কে জানে? আচ্ছা, ঐ যে ঐ দিকে- আপনি টেবিলের পাশে জানালার দিকে তাকান। দেখুন তো ছোট বেলা আর বড় বেলার মাঝে আরেকটা বেলা মনে পড়ছে কি? 
তখন হয়ত ক্লাস ইলেভেন বোধহয়.. হঠাৎ সময়ের বিপরীত ঘূর্ণন l পড়ে ফেরার সময়ে বন্ধুদের সাইকেল দঙ্গল থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া দুটি সাইকেল, চার জোড়া পা এর এলোমেলো ভ্রমণ - কোচিং সেন্টার, সরস্বতী পুজোয় প্রথমবার অন্য কারোর জন্য পাঞ্জাবি-শাড়ি তে সাজা। মনে পড়ছে? এই ভালোলাগার রেশ ধরেই এগিয়ে গিয়ে একটু ভেবে দেখলেন- সেই স্বপ্নের রঙ ধূসর হয়ে আজ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিশাল এক মাল গাড়ি হয়েছে। অভিযোগ অভিমান হয়ে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে আছে! টেলিফোন টা গোপনে আজও হয়ত বেজে ওঠে। ওহ, বাড়ির ল্যাণ্ডলাইন টা তো আর নেই। নম্বর টাই তাই হারিয়ে গেলো।  তারপর? এই কুড়ি বছর পরে হঠাৎ একদিন দেখা হলে? প্রেম হয়ত হারিয়ে গেছে -হয়ত বা সে এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে নিজের খাজনা নিতে ভুলে বিলুপ্ত! তবুও  একটা কিছু আছে যা সুপ্ত মনে বিরাজমান, সেটাই কি ভালোবাসা? প্রেম হারিয়ে ভালোবাসা হয়েছে? এই ভাবনা টির মোড়কে লেখক খুব সুন্দর ভাবে ৯০ এর দশক এর কোচিং প্রেম থেকে ঘটনা গুলি সারিবদ্ধ ভাবে সাজিয়েছেন। এখানে নব্বই ও তার পরবর্তী প্রজন্ম বেশ ভালোভাবে মিশে গেছে। তারপর হঠাত হারিয়ে যাওয়া মানুষের সাথে দেখা হলেও যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সম্ভব সেটাও বেশ সুন্দর ভাবে গেঁথেছেন, একবারও মনে হয় নি অবাস্তব । আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে লেখার মাঝে নিজের কবিতা গুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার। 
দুই একটি বিষয় হয়তো মনে হয়েছে একটু কম হলে ভালো হোতো: যেমন বেশ কিছু যায়গায় কথোপকথোন একটু দীর্ঘায়ত হয়েছে। তবে যে বয়স নিয়ে লেখা সেই বয়স তো কথা বলার-নিজেকে প্রকাশ করার সন্ধিক্ষণে কুঁড়ি ফুটছে। তাই গল্পের কাঠামোয় হয়ত ঠিকঠাক। 
বেশ ভালো লাগল পড়ে । বছর কুড়ি বাইশ আগের পরিবেশ মনে পড়ে গেলো, মনে পড়ে গেলো অনেক  বন্ধুর কথা, অনেক সফল-বিফল সম্পর্ক এর অতীত ও বর্তমান। অনেক অনেক ধন্যবাদ। প্রয়াস সই এর জীবনে উড়ো মেঘের বৃষ্টির অপেক্ষায় রইলাম.... 

পঞ্চম পাঠপ্রতিক্রিয়া: 
সৃষ্টি : রক্তগোলাপ 
স্রষ্টা: অভিষেক দেবরায়  
প্রকাশক : বিভা পাবলিকেশন

পূর্ববর্তী পাঠপ্রতিক্রিয়া গল্প ৯০ এর দশকের পটভূমি থেকে একেবারে অনেকটা লাফিয়ে চলে এলাম, ও হ্যা একেবারে হঠাৎ অনেকটা পট পরিবর্তন কে তো আবার বিপ্লব বলে। ঠিক ধরেছেন; এটা ৭০ এর দশক- বিপ্লবের দশক। আমরা এসে গেছি সেই সন্ধিক্ষণে যার অনিশ্চিৎ উত্তর পরবর্তী পঞ্চাশ বছর খুঁজবে..খুঁজেই যাবে,শুধু জিজ্ঞেস করবে কেনো?
আসলে উত্তর টা ঘুরছে একটাই শহরে- দুই ভাবে দুই মেরুতে। একদিকে যখন উৎসব এর আয়োজন চলে অপরদিকে সেই শহরেই চলে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। একই দিনে এক সময়ে উত্তেজক ক্রিকেট ম্যাচে পেস বোলার এর বল আর বিক্ষোভ সামলাতে বিদ্রোহের মুখে পুলিশের গুলি ছিটকে বেরোয়! চার্লস ডিকেন্স এর "A Tale of Two Cities" এর স্পর্শ খুঁজে পাওয়া যায় স্রষ্টার সৃষ্টিতে।
গল্পের পটভূমি খুব সুন্দরভাবে নির্মিত। মনে হবে আপনি টাইম ট্রাভেলে ৭০ এর দশকেই বিরাজ করছেন। 
আপনি নকশাল সময়ের অনেক কালজয়ী উপন্যাসই হয়তো পড়েছেন, কিন্তু ডান-বাম যে নীতিই হোক না সেই গুলো হয়ত একটু নীতি ঘেঁষেই আপনার সামনে এতদিন দাড়িয়েছে। এই যায়গায় এই উপন্যাসটি ব্যতিক্রমী মনে হোলো, নিরপক্ষে ভাবে সময় টা কে তুলে ধরেছে। সেখানে কে ঠিক, কোন নীতি ঠিক এর থেকেও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেই সময়ের বিভিন্ন চিন্তা-ভবনা গুলো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুব সুচারুভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে গল্পে। ডান-বাম-অতি বাম-পুলিশ-নকশাল - কংগ্রেস সবার দৃষ্টিতেই গল্প এগিয়েছে ,হ্যা সাথে অবশ্যই সুব্রত-মল্লিকার পাশে থাকার ভালোবাসার গল্প নতুন ভোরের স্বপ্ন প্রবাহিত হয়েছে । কিছু ঘটনা-চরিত্র গল্প কে বলিষ্ঠতা প্রদান করছে, বাবলু, মাস্টারমশাই, পুলিশ আধিকারিক তরুণ সেন এই চরিত্র গুলি খুব সুন্দর ভাবে গল্পে ব্যবহৃত। সাথে জনপ্রিয় কবিতার যথোপযুক্ত ব্যবহার বিষয় গুলির উপর পর্দা সরিয়েছে, স্বচ্ছতা এনেছে, বুঝতে সাহায্য করেছে। 
আর শেষে প্রশ্ন জাগে, সেই ৫০ বছরের প্রশ্ন? নকশাল রা কেমন ছিল?
আচ্ছা, তার আগে একটা কথা- আজকের দিনে কোনো নেতা দেশকে-মানুষকে ভুল পথে চালনা করল, তারপর হঠাৎ দেখলেন দল বদলে শুদ্ধ হয়ে প্রচার করল আগের দল-কাজ-সব ভুল ছিল! আমরা তখন কি করি? ঐ দুই চার অক্ষরে নিজেদের দায় নেতাদের উপর দেই, তারপর উদ্বাহু হয়ে আবার তাঁকে মেনে তার কথা শুনি।এদিকে দেখতে পাওয়া যায় সেদিন নকশাল দের হয়ত অনেক কিছুই ভুল ছিল,কিন্তু যখন ওরা দেখতো ওদের নেতা "ওদের বিপথে চালনা করেছি বলে"- দায়ভার ঝেড়ে বিপরীত রাজনীতি তে প্রবেশ করছে তখন ওই নকশালরা কি করত বলুন তো? ভুল করত? তাই না? হ্যা- মাথা নীচু করে ডেথ সেনটেন্স এর স্ক্রিনশট টা দেখে নিন! একটু কেঁপে উঠবেন হয়ত, আমিও কেঁপেই উঠলাম! 
ধন্যবাদ ,অভিষেক দেবরায় । 
ভালো লাগল পড়ে।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"