"পাঠপ্রতিক্রিয়া বইমেলা সিরিজ: ২০২৪" : প্রথম পর্ব- [ লসাগু গসাগু, ক্যালাইডোস্কোপ,আসুরী]

সারা বছরের রসদ সংগ্রহের মধ্যেই নতুন বই পড়া শুরু হলো। আমার একটা অত্ভুৎ বাতিক বা স্বভাব হোলো বইমেলায় সংগৃহীত নব্য লেখক দের সৃষ্টি একটু আগে পড়ে ফেলা। সানন্দে বলছি: এতো বছরে একবারও আমার সিদ্ধান্তের জন্য হা-হুতাশ করিনি । নতুন মানুষ-নতুন লেখা-নতুন স্রষ্টার সৃষ্টি আমাকে প্রতিবছর সেই বিশ্বাস যোগায়। আবার নতুন এর কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়- নতুন ভাবে নব্য জ্ঞানের সন্ধানে। যাই হোক একে একে তিনটি বই এর নাম উল্লেখ করব, না মানে একটু আধটু চেষ্টা করব ক্ষুদ্র স্পর্ধায়।সংক্ষেপে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি রহস্য স্পর্শ করার প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে।একে একে তিনটি বই শেষ করলাম।প্রতিটিই প্রায় একলপ্তে, একটি হাসে- একটি শেখায়- আরেকটি সে মন কে ভাবায়- চলুন শুরু করি তাহলে.........
প্রথম পাঠপ্রতিক্রিয়া: 
সৃষ্টি : লসাগু গসাগু 
স্রষ্টা: আর যে নীলাঞ্জন 
প্রকাশক : কচি পাতা প্রকাশন।
না  নিষেধ করছি, একদম রাতে-রণে-বনে-কালী পুজোর দিন এই বইটা পড়বেন না! কেনো? জিজ্ঞেস করছেন ভালো কথা, আমার উত্তর দেবার একদম দম নেই! কেনো বলুন তো? আচ্ছা লিখেই ফেলি তাহলে- ধরুন আপনি বনে লুকিয়ে আছেন হিংস্র পশুর ভয়ে অথবা উদম যুদ্ধ করছেন। ঠিক এই সময়ে এই বই এর ছোট্ট একটি অংশ মনে পড়ে রুবি রায়ের মতন ভেসে উঠল- ব্যস তৎক্ষনাৎ আপনার দেড়শ ডেসিবেল অট্টহাস্যে যুদ্ধরত শত্রুর হার্ট এটাকে মৃত্যু হতে পারে- আপনার বীরত্বের দফারফা! ডাক্তার এসে মৃত্যু বাণ না পেয়ে মৃত্যুর কারণ আপনি নন সার্টিফিকেট ইস্যু করলেই সব বীরত্ব হাওয়া শূণ্য এই বুকে ধাক্কা দিতে পারে। আবার এই বই পড়ার দরুণ এমন খ্যাকখ্যাক করে হেসে দিলেন যে কালী পুজোর হাউই উড়ে আপনার কছে ক্র্যশ কোর্স করতে চলে এলো শব্দ-শক্তি-বৃদ্ধি সার্টিফিকেশন জলদি হবে লিঙ্কডিনে আপডেশান। আর রাতে বইটা পড়লে অবশ্যই জীবন বিমা করিয়ে তারপর পড়বেন। অথবা, বাড়ির লোক যেদিন বাড়ি থাকবেনা সেইদিনও পড়তে পারেন - না হলে আপনার অনিয়ন্ত্রিত হাস্যরবে পরিবার বিনিদ্র রজনী যাপন করবে এবং এর শোধ তুলবে বারবার এই বই টা পাঠ করিয়ে হাসিয়ে দম বন্ধ হবার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত।
না আর বলবো না, এইবার মালের দায়িত্ব আরোহীর! এরকম হাসির বই পেলে সত্যিই বলার কিছুই থাকেনা। শব্দের জাগলারি তে লেখক জীবনের প্রাত্যহিক অধ্যায় গুলো পরিবেশন করেছেন হাস্যরসের চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে। আপনিও ডুব দেবেন নাকি? নিশ্চিতভাবে হার্টের অসুখ না থাকলে আর রাম গরুড় এর সাথে ডিএনএ ম্যাচ না হলে এই ম্যাচ খেলতে পারবেন। অসাধারণ আর জে নীলাঞ্জন। আরো চাই এরকম!ধন্যবাদ।।

দ্বিতীয় পাঠপ্রতিক্রিয়া: 
সৃষ্টি : ক্যালাইডোস্কোপ 
স্রষ্টা: বৈদূর্যমণি 
প্রকাশক : বৈ-চিত্র বাঁক
এটা কি পড়লাম বলুন তো? স্মৃতিচারণ ? হ্যাঁ সে তো পড়লাম কিন্তু স্মৃতিচারণে ছেলেবেলার নস্টালজিক গল্প-হারিয়ে যাওয়া সময় এর বাইরেও একটা অন্য আবেশ অনুভূত হোলো। কেনো বলুন তো? বুঝতে পারছেন না তো? দেখি চেষ্টা করে আমি যা অনুধাবন করলাম তা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে পারি কি না?
আচ্ছা ধরুন আপনি একটি বই পড়ছেন, শুরু করতে যাবেন- সেই মুহূর্তে দেখলেন আরে মেশিনে ছাপা লেখা-অক্ষর গুলো কোথায় গেলো? এ যে জলজ্যান্ত মনুষ্য হস্তাক্ষর ফুটে উঠেছে বই এর পাতায়! সুন্দর হস্তাক্ষরে মনোনিবেশ করে পাঠ করতে শুরু করেছেন ; আপনার বিস্ময়ের ঘোর অতিক্রম হবার আগেই আবার অনুভব করলেন যা পড়ছেন তা ছবির আকারে ছড়িয়ে পড়ছে পাতায় ছবির খাতার মতন। আপনার কল্পনার ছবিটা আপনি বই এর পাতায় দেখতে পাচ্ছেন সেই সুন্দর হস্তাক্ষরের পাশেই। এদিকে মনের মধ্যে নস্টালজিক সেই যে হলুদ পাখীর সুর তৈরী হচ্ছে। আবার চিন্তায় বাঁক - যে সুর-ছন্দ-মনের ভিতর ছিল তাই হঠাৎ করে ছবি-হস্তাক্ষরের পাশে অধিষ্ঠান করছে কবিতার লাইনে। হ্যা একদম ঠিক পড়ছেন, আমিও হতবাক! এক সাথে একত্রে স্মৃতি-মনুষ্য-হস্তাক্ষরে-ছবিতে-রঙে-পদ্যের কল্পনায় বাসা বেঁধেছে এই ক্যালাইডোস্কোপের প্রতিটি পাতায়। সৃষ্টি করেছে ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ -লেখনী মনের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে আবেশ। একই অঙ্গে এতোরূপ দেখে সৃষ্টিকর্তা বৈদূর্যমণি কে অন্তর হতে প্রণাম। এক সাথে একত্রে এক পত্রে এতো সৃষ্টি প্রথম বার অনুভব করানোর জন্য। ধন্যবাদ, খুব ভালো লাগল এই প্রয়াস। নব সৃষ্টির আশায় অপেক্ষমান রইলাম।। 

তৃতীয় পাঠপ্রতিক্রিয়া: 
সৃষ্টি : আসুরী 
স্রষ্টা: সুপর্ণা চ্যাটার্জি ঘোষাল
প্রকাশক : বেঙ্গল ট্রয়কা পাবলিকেশন 
আচ্ছা, ধরুন যদি আপনাকে একটি নারী চরিত্র কল্পনা করতে বলা হয় আপনি কার কথা ভাবেন।  সেই সময়ে আপনার কল্পনায় কোন চরিত্রের ছবি ফুটে ওঠে? মা-বোন - স্ত্রী- কন্যা বা এই সম্পর্কিত চরিত্র অথবা কোনো মহীয়সী নারীর কথা মনে উদয় হয়, হয়ত। এইবার একবার ভালো করে ভাবুনতো, সেই কল্পনায় এই চরিত্র গুলোর দেবী মাহাত্ম্যই কি ফুটে ওঠে বারংবার? ভাবুন-ভাবুন। আচ্ছা এই ভাবনার অবসরে আপনি নিজেই নিজের কল্পনার তুলিতে আপনার নিজ চরিত্র অঙ্কন করবার চেষ্টা করবেন নাকি একবার?- দয়া করে, একি ! আপনি সত্য বস্তব জীবনে পথে দেখছেন নিজেকে তো আপনি দেব জ্ঞানে উত্তীর্ণ করতে পারছেন না। একসাথে রাম এবং রাবণ দুই শক্তিই উঁকি দিচ্ছে আপনার স্মৃতিতে। তাহলে কেউ যদি শুধু দেবত্ব জ্ঞানে আপনাকে কল্পনা করে সেটা কি সত্যি আপনি? নাকি আধখানা আপনি! কেউ যদি শুধু ভালো-মহৎ বা ধনাত্মক গুণগান করে সেই মানুষ টা আসলে আপনাকে আধখানা ভাঙ্গা মানুষ হিসাবেই প্রকাশ করছে। আপনার জীবন পথে হয়ত ভুল-মিথ্যা-গোপনীয়তা থাকবে , অনেক বাধা এবং ঋণাত্মক পরিস্থিতিও থাকবে। এই দেখুন, এইবার আপনি হয়ত বুঝতে পারলেন সমাজের  মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা রাও হয়ত জীবনে কখনো সেই সেইসব কন্টকাকীর্ণ পথে বিচরণ করতে বাধ্য হয়েছে- সেই গোপন ব্যথার উপশম হয়তো দেবী মলমে ছিলোনা! নিজদের আসুরিক শক্তিতে সেই সব দু:খ ব্যথা লজ্জা জ্য় করে দেবী মাহাত্ম্যে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে তাঁদের- 
হ্যা এই ভাবটাই লেখিকা সম্পূর্ণ গল্পে বিভিন্ন নারী চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন সুচারুভাবে। চরিত্রের দেবত্বের পিছনে এক একটি আসুরিক শক্তির উদয় হয়েছে মানবিক সমাজে কঠিন বাস্তবের মোকাবিলায়। প্রাপ্তবয়স্ক এই সৃষ্টি টি হয়ত আপনাকে সত্যের দ্বার উদ্ঘাটন করবে অসুর-সুর দুইই মানব মনে বর্তমান,একে অপরের বিপরীতে থেকেও জীবন জয়ের পরিপূরক শক্তি।
লেখিকা কে আন্তরিক ধন্যবাদ: এরকম নতুন বিষয় আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। ভালো লাগল পড়ে। ধন্যবাদ।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"