"নেতার বাক্যবাণে আক্রান্ত বিভীষণ - বিভীষণ পেনে?"
পরীক্ষা হলে এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন কখনো ফেস করেছেন? মানে হতেও তো পারে এরকম বিস্ময়কর প্রশ্ন হয়ত অনেকেই পেয়েছেন। আমি কিন্তু প্রথম বার ফেস করলাম। তবে প্রথমেই প্রশ্ন পত্র দেখে মনে হলো তীব্র প্রতিবাদের ভাষায় লঙ্কাকান্ড ঘটাই। আহা না রামায়ণ না, লঙ্কা কাণ্ডই! এইতো মানে-মনে পক্ষে-বিপক্ষে ভেবে নিলেন আমি রামচন্দ্র কে এইবার আলোচনায় নিয়ে আসব! না, একদমই না। ৫০০ বছর ধরে ওনাকে নিয়ে অনেক টানাটানি হয়েছে, থাকুন উনি এখন একটু বিশ্রাম নিন। আমি বরং লঙ্কার প্রসঙ্গ ধরেই এগিয়ে যাই। আসলে প্রশ্নটাও ছিল আংশিক লঙ্কা কেন্দ্রিক ঝাঁঝালো, কিন্তু মনন টা বেশ আধুনিক। কি, জানতে ইচ্ছে করছে নাকি প্রশ্ন টা? আচ্ছা বলেই ফেলি বরং সেই প্রশ্ন এবং তার পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনা।
পরীক্ষা চলছে একটি আবদ্ধ ঘরে- সেখানে একটি মাত্র দরজা; তাও আবার বাইরে থেকে বন্ধ। শুধু যাওয়া-আসার অনুমতি আছে। বাইরে দেখার নিয়ম নেই, তাই জানালাও নেই সেই কক্ষে। সেই আবদ্ধ কক্ষে আরো আশ্চর্যজনক ব্যপার হলো যে সেখানে আমি একাই পরীক্ষার্থী। শুধু আমার জন্য আলাদা একটা ঘর দিলো কেন? নিজেকে দুষ্টু বাঁদর ভেবে "ভরা ভাদর শূন্য মন্দির মোর" একরাশ দুশ্চিন্তা কে পাথেয় করে প্রশ্নপত্রের জন্য পরীক্ষক এর জন্য অপেক্ষমান হলাম! ইতিমধ্যে দেখলাম প্রশ্নপত্রও এসে গেছে- কিন্তু আমাকে প্রশ্নপত্র দিয়েই পরীক্ষকও গিলি গিলি ভ্যানিশ। এমনিতে শূন্য হল দেখে একদিকে আমি যারপরনাই বিস্মিত, একটু হলেও ভিত নড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত; প্রশ্ন কমন না পড়লে "কে করিবে ত্রাণ হও আগুয়ান বলে" সাহায্য করার কেউ নেই তেপান্তরের ত্রিসীমানায়। যাইহোক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল কালের নিয়মে।
কিন্তু এ কি, প্রশ্নপত্র দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ আমার! বিস্ময়কর বিষয়ে প্রশ্ন এসেছে: "বিভীষণের প্রতি নেতাজি" -এর কাল্পনিক কথপোকথনের একটি সুন্দর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য গুলি সহজে বুঝিয়ে দাও"!
কি!!! বিভীষণ এর সাথে নেতাজীর তুলনা? মানে বিভীষণ মানে তো ঐ লোকটা- আরে যাকে সবাই ঘর শত্রু বলে, তাঁর সাথে কিনা সবার প্রিয় ভালোবাসার নায়ক নেতাজির তুলনা! কি দেখছি! রাম-না ,রাবণ-না : একেবারে বিশ্বাসঘাতক এর সাথে দেশপ্রেমিক এর তুলনা! ছি:! না এটা হতে পারেনা।মনে মনে ভাবলাম- উত্তর লিখলেও কাগজ আমি দেখাব না! তারপরেই মনে হলো "ছিল রুমাল হলো বেড়াল" এর অনুপ্রেরণায় এ নির্ঘাত ঐতিহাসিক ভুল- প্রিন্টিং মিসটেক! কিন্তু বলবই বা কাকে, প্রশ্নপত্রে এই তীব্র ভুলের আশু সংশোধন প্রয়োজন! কে জানে,অন্য ঘরের পরীক্ষার্থীরা নির্ঘাত সবাই সংশোধিত প্রশ্ন ডিএ উত্তর লিখছে; উফ্ফ মিসটেক! আবার বানান ভুল, সংশোধিত প্রশ্ন "দিয়ে" উত্তর লিখছে। আর আমি একা চুপচাপ "শূন্য" ঘরে আন্দোলন করে চলেছি : "চলছে না- চলবে না"।
সামনে পিছনে কেউই নেই যে সাহায্য করবে, "কেউউ আছো-রক্ষা করো" বলে চেঁচিয়ে প্রাণাতিপাত করলেও কেউ ঘরে ঢুকল না! এদিকে- "সময় বহিয়া যায় নদীর গতিতে প্রায়" : যাইহোক অগত্যা বাস্তবিক বর্তমানের চাহিদায় বোধোদয় হলো: ভাবতে বসলাম উত্তরটাই বরং লিখি। কিন্তু কি লিখি? ইতিহাস-পুরাণ-সাহিত্য মিলিয়ে ত্র্যহস্পর্শে পূর্ণ প্রশ্নটির কি অর্থ, সেটাই তো বোধগম্য হচ্ছে না।
মনে পড়ল এককালে "বিভীষণ এর প্রতি ইন্দ্রজিৎ" পড়েছি আর "নেতাজী" তো প্রিয় মনীষীদের বাংলা রচনার কমন চরিত্র। দেখি একটু মিলিয়ে-মিশিয়ে-মাখিয়ে কিছু লেখা বেরোয় কিনা মস্তিষ্ক থেকে? ভেবেই চললাম, কিন্তু কলম তো আর চলছে না- ঝুলি থেকে বোধমূলক উত্তর মুখ লুকিয়েছে! রক্ষে করো নেতাজি-বিভীষণ দাও কিছু ভিসন- তোমরা আমাকে পয়েন্ট দাও আমি তোমাদের মিল-অমিল লিপিবদ্ধ করছি। এরপরেই
হঠাৎ কি হলো বুঝলাম না, আমার ডান হাত দেখি চলতে শুরু করল। ওমা! সপ্তকাণ্ডের অনুপ্রেরণায় ঘটছে যত অবাক কাণ্ড আমার বাম হাতে! অবাক হয়ে দেখি বাম হাতও আরেকটি কলম তুলে নিলো। একি আজব ব্যপার ! আমি আবার সব্যসাচী হলাম কবে থেকে? আরে না চক্রবর্তী না! দুই হাতে কলম ব্যবহারের স্বত্ব তো আমার কস্মিন কালেও ছিল না! যাই হোক আমি অনুধাবন করলাম যা ঘটে চলেছে তার উপর আমি আমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি- এখন আমি নিমিত্ত কারকে-নিমিত্ত মাত্র। দুই প্রবল শক্তি দুই হস্তে ভক্তি ভরে ভর করেছে। তারা এখন মসি যুদ্ধে নেমেছে। আর আমার চোখ দুটো আমাকে এখন দর্শকে পরিণত করেছে-
প্রথমেই দেখলাম ডান হাত বাম হাতের সাথে করমর্দন করে লিখতে শুরু করল:
১। আমরা দুজনেই লৌকিক-পৌরাণিক অথবা ঐতিহাসিক আর্যপুত্রের কাছেই সাহায্য প্রার্থী হয়েছিলাম: নিজ দেশ-জাতির উদ্ধারে , মঙ্গল সাধনে।
২। দুজনেই দেশ কে ভালোবেসে চরম ঝুঁকি নিয়ে বিরোধী শিবিরে যোগদান করেছিলাম: আমাদের যাত্রাপথ ছিল চরম বিপদ সংকুল।
৩।আমরা দুজনেই শত্রু হিসাবে ত্রিভুবন বিজয়ী অহংকারীকে পেয়েছিলাম ।
৪। আমাদের দুজনকেই নিজদের লোক সব থেকে বেশী মানসিক আঘাত দিয়েছিল। তবুও অন্ত অব্ধি তাঁদের সম্মান জানিয়ে এসেছি, তাঁদের সাথে বিরোধ ছিল নীতির, কিন্তু মনের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না।
... আরে একি হচ্ছে! এই সাদৃশ্য লিখেই সংঘবদ্ধ দুই হাতের মুঠো আলগা হচ্ছে কেন? একি ! এইবার ডান- বাম দুই হাত দুজনের উদ্দেশ্যে তর্জনী উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে শুরু করল: না আমরা কোনোমতেই এক না! এক হতেই পারিনা:
১। একজন পুরাণের কল্পনায় আর একজন রক্ত মাংসের বাস্তবের ইতিহাসে: পুরাণ তো আর ইতিহাস নয়!
২। একজন জয়ী হয়েও নিজের লোকের কাছে ঘরশত্রু- বিশ্বাসঘাতক রূপে বিরাজমান, আরেক জন পরাজয়ের বিড়ম্বনাতেও দেশের কাছে মুকুট হীন নেতা, সবার বুকে বিরাজমান সম্রাট।
৩। এক্জন ভিনদেশী সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ যোগে নিজ কুলের সাথে বিবাদমান। আরেক জন নিজ দেশের সেনাবাহিনীর একাংশকে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় অবতীর্ণ। করেছে-লড়েছে-কিছু কিছু জিতেছে- নিজদের ক্ষমতায় জেতার বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছে; স্বাধীনতার লড়াই এর আত্মত্যাগে-প্রাণবলিদানের প্রত্যক্ষ অধিকার শুধু দেশবাসীর- সেইস্থানে বিদেশী যোগ সম্পূর্ণ রূপে পরিত্যাগ করেছে-দেশের যুদ্ধ দেশের জন্য করবে দেশেরই সন্তান।
৪। যুদ্ধ শেষে একজন চিরকালের জন্য মাথা নীচু করে ঘরে ফিরে রাজত্ব করেছে, আরেকজন "ওয়ার ক্রিমিনাল" এর তকমা পেয়ে হারিয়ে গেছে- সে ঘরে ফেরে নাই, কিন্তু তাঁকে ফিরে পাবার আশায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করে বসে আছে!
এরপর হঠাৎ দেখি দুই হাতই স্তব্ধ, আর একটিও লাইন আঁচড় কাটছে না খাতায়। কিন্তু আমি নিজে তখন লিখতে চাই, অসহায় অবশ হাত উঠছে না- আমি আশীর্বাদ চাইছি সেই জনগণমনের নায়ক প্রতিভূ হাতের কাছে: কিন্তু সেই হাতও আর উঠছে না! বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে কাতর আবেদন: "শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে,জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।" - বুকের মধ্যে প্রচন্ড মোচড়ের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু ঢোক গিলে শুকিয়ে যাওয়া গলায় শব্দ বেরচ্ছে না! এই আচ্ছন্নভাবের ঘোরে কিছুসময় পরে হঠাৎ এক বিষম ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম! এলোমেলো- টলমলো ভাবে উঠে-বসে ভাবলেশ হীন চক্ষে তাকিয়ে দেখি একটা ছোট হাত প্রচণ্ড ধাক্কা দিচ্ছে আমাকে।
"বাবা ওঠো, উঠবে না? আজকে ফ্ল্যাগ হোস্ট করতে হবে তো,সকাল হয়ে গেছে!"
সম্বিত ফিরে দেওয়ালে ঝুলন্ত ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করলাম বৃষ্টি-বাদল-শীত-কুয়াশা গেছে টুটে রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে ২২শে থেকে ২৩ শে জানুয়ারির শুভ সকালে!
ও হ্যাঁ, বিছানার এককোণে দেখলাম বইমেলা থেকে সদ্য কিনে আনা আধপড়া "মেঘনাদ বধ কাব্য" - "নায়কের অন্তর্ধান রহস্য" দাঁত বের করে হাসছে। বই দুটো বন্ধ করে শ্রদ্ধাভরে বলে উঠলাম- "প্রণাম নেতাজী, জ্য় হিন্দ"।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন