আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।। (পাঠ প্রতিক্রিয়া: দ্রোহকাল স্রষ্টা : ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়প্রকাশনী: #সৃসৃক্ষা পাবলিকেশন)

সেদিন দুটো গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাক্য বুঝিয়ে দিয়েছিল সেই মানুষটি নির্দিষ্ট বিশেষ কোনো একটি গোষ্ঠীর জন্য আসেননি, তিনি এসেছেন আরো বৃহ্ৎ- মহৎ কর্ম সাধনায়! তাই তো সহজেই জটিল সমস্যার দূরীকরণে ব্রতী হয়ে সেদিন বলেছিলেন - "সিজার এর যা প্রাপ্য তা সিজার কে ফিরিয়ে দাও, জিহোভার যা প্রাপ্য তা তাঁকে ফিরিয়ে দাও" । কিন্তু দুটো বাক্যই দুই ভাবে গৃহীত হয়েছিল সেদিন, শুধু দুই ভাবে বললে হয়ত সঠিক উপস্থাপন হয়না বরং বলা যেতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল।

প্রথমপক্ষ: ইহুদিরা ভেবে ছিল-  "ছি: , শেষে শাসক রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে ইহুদি জাতীয়তা বোধ এর বিনাশ করলেন উনি। সোজাসুজি বলেই দিলেন সিজার কে অর্থ-প্রাপ্য খাজনা দিয়ে দাও। এই কি আমাদের পুনরুজ্জীবন এর মসিহার মুখ নি:সৃত বাণী! এ আমাদের নেতা হতেই পারে না, এর মাধ্যমে মুক্তি নেই!নীরবে একেই আমরা মুক্ত করে দেই। এই বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু!
ওদিকে আবার দ্বিতীয়পক্ষ শাসক ও পুরোহিত শ্রেনী ভেবেছিল : তিনি আজ সরাসরি কর প্রদান থেকে বিরত করছেন ইহুদি সমাজকে! প্রকৃত সম্মান ইহুদি দের উপাস্য জিহোভাকে ফিরিয়ে দিতে চাইছেন। করদ-শাসিত এই ভূভাগ এর জনসমাজে বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করছেন! এঁর মাধ্যমে বিপ্লব-বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে অচিরেই, এঁকে আর বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব! শাসকের বিচারে এর শাস্তি মৃত্যু!
আর এসবের মাঝে তিনি স্বয়ং জেশুয়া- তিনি কি ভেবেছিলেন? তিনি অনুধাবন করেছিলেন ইহুদিরা তাঁকে কেন্দ্র করে বেঁচে উঠতে চাইছে। ফিরতে চাইছে ডেভিড-সলোমন এর প্রাচীন ঐতিহ্যে, অন্ধ্কারময় ভবিষ্যত কে আলোকিত করতে এবং হতাশময় বর্তমান-  একঘেয়ে রোমান নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে।  তাই জাতীয়তাবাদের মোড়কে, ধর্মীয় জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে এক আক্রমণাত্মক মসিহা কে প্রয়োজন ছিল ইহুদিদের।  "নজরিন জেশুয়া" জন্মসূত্রে ইহুদি- জ্ঞানী- স্পষ্টবাদী-সুসংগঠক- তাই তার মাধ্যমেই মুক্তি আসবে এটাই ছিল ইহুদি সমাজের যুক্তি। কিন্তু তিনি নিজে - জেশুয়া, একটু অন্য্ ভাবেই ভেবেছিলেন ব্যাপারটা।
তিনি মানুষের মনে অন্য মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠাকেই সর্বাগ্র প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই ইহুদি আক্রমণাত্মক জাতীয়তা বাদের সন্ধানে নেমে  খুঁজে পেলেন এক অন্য অমৃত: মানুষের আশা বাঁচা-ভালোবাসা-ক্ষমা-সহমর্মিতার এক মহাসাগর। তাই তিনি পাশে দাড়িয়েছিলেন বঞ্চিত মানুষের। পুরোহিত আর শাসকের মিলিত শাসন-শোষণ-নিপীড়নে ঋণে জর্জরিত ভূমিহীন কৃষক বাধ্য হয়ে জীবন যাপনের জন্য গ্রাম্য নির্ভরতার থেকে বেরিয়ে এসেছিল। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে ছুতোর-কামার-কুমোর দৈনিক শ্রমিক হিসাবে হাত পাতে নাগরিক জীবনের সামনে। সেই সুযোগে তখনই রাজনীতি-ধর্ম-অনুশাসন তাদের টুঁটি চেপে ধরে - এটা করতে পারবে না, সেটা নিয়ম না, ধর্মের নামে অর্থ দান লুণ্ঠন শুরু হয় পুরোদমে। বিক্ষুব্ধ মন অপেক্ষারত ছিল কবে আসবে সুদিন। কিন্তু না, সেই সুদিন এর আকাঙ্ক্ষা অন্ধকারে মুখ লুকিয়েছিল! যে নারী প্রাচীন ইহুদি সমাজে সম্মানের সাথে মুক্ত ধর্মাচরণ উপাসনা করতো ধর্মের ব্যবসায়ী রা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতায় তাঁকে নিপীড়নের মধ্যম তৈরী করল। ধর্ম সাধনের অধিকার কেড়ে নিলো। সাধারণ অপরাধে পাথর ছুড়ে জান্তব হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠত তারা। বাঁচার আশা-ভরসার কোনো সাকিন নেই সেই সমাজে। ঠিক সেই বিক্ষুব্ধ সময়েই মানুষের পাশে থাকার মানুষের কথা ভাবার কথা ভেসে এলো জেশুয়ার মাধ্যমে।
জেশুয়া এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে গর্জ্ন এর পরিবর্তে নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করলেন; একদিন নারীদের শাস্তি দিতে ব্যস্ত এক গোষ্ঠীকে স্মিত হেসে বললেন: "শাস্তি যখন দিচ্ছ হয়ত এই নারীদের দোষ আছে - আচ্ছা শাস্তি দাও। তবে সেই শাস্তি দেওয়ার একটি নিয়ম আছে। শুধু সেই মানুষেরাই প্রথম শাস্তি দানে সক্ষম যে কোনোদিন কোনো পাপ করেনি, এগিয়ে এসো কে প্রথম শাস্তি দেবে!" - অত্ভুৎ ভাবে কেউই আর শাস্তি দিতে অগ্রসর হোলো না, নতমুখে স্থান ত্যাগ করল। নারীরা  অশ্রু সজল নয়নে জেশুয়াকে আশীর্বাদ করল। জেশুয়া মুক্তকণ্ঠে প্রচার করল:
"শুধু আপন অন্তরে যুদ্ধ করে নিজেকে প্র্স্তুত করলেই হবেনা। নিজেকে মানব জ্ঞানে সম্পূর্ণ করে অন্য লড়াইতে নামতে হবে। আত্মচৈতন্য লাভের মাধ্যমে হবে নবজন্ম। যে প্রকৃত জ্ঞানের আলোকে পুনরাত্থিত তিনি কিভাবে মুক্ত হবেন? জ্ঞানী কক্ষনো মুক্তি লাভ করবেন না যতক্ষণ না সকল মানুষ মানবধর্মে পুনরাত্থিত হচ্ছে- জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত অন্য মানবকে জ্ঞানের পথে পুনরাত্থিত করতে দাস হিসাবে নিয়োজিত। পুনরাত্থিতের মৃত্যু নেই, সে অমর। আর যে সকল মানুষ মানুষের প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষমা র ভাষা বোঝেনি সেই মানুষরা কখনো জন্মায়নি, তারা সর্বদাই মৃত। এই চৈতন্য পুনরুজ্জীবনের পথে মানুষকে
পিতার বিরুদ্ধে পুত্রকে, ভাই এর বিরুদ্ধে ভাইকে যুদ্ধরত হতে হবে। সেই যুদ্ধ ভালবাসার যুদ্ধ, ক্ষমার যুদ্ধ মানুষ কে নিয়ে একসাথে পথ চলার মহাসংগ্রাম।"
কিন্তু এইভাবেই চলেনি, আসলে এইভাবে ভালো হয়ে সমাজ চলতে পারে না। এই মহৎ মানব নীতিই প্রবর্তিত হয়ে পরিবর্তিত হলো পরবর্তীতে!- সেই ধর্মের নামে ব্যবসা আর ক্ষমতার চাকায়। যে নীতি মানুষকে কাছে টানার, পাশে নিয়ে চলার জন্য তৈরী হয়েছিল সেই নীতিই ৪০০ বছর পরে আমূল রূপান্তরিত হয়ে পোপ-সম্রাট শাসক এর অস্ত্র হয়ে পড়ে, মানুষের সিলেবাস থেকেই বাদ পড়ে বড়মনের বড়দিন।

পুনশ্চ: এই বড়দিনে "দ্রোহকাল" নামক বইটি পড়ে অনেক অজানা বিষয়ে জ্ঞাত হলাম, সঙ্গে অনেক ভ্রান্ত বিষয়ে আলোকপাতে বিষয়গুলি সম্পর্কে ধারনাও পরিবর্তিত হোলো। ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সুন্দরভাবে গসপেল এর এক-একটি উদ্ধৃতিকে গল্পের আকারে প্রকাশ করেছেন ;মানব ধর্মের জয়গান করেছেন। যীশুখ্রিস্টের জীবনী রচনা না হয়ে এটি সেই সময়কালের পরিপূর্ণ প্রকাশ। সেই প্রকাশই জানিয়ে দেয় যখন যখন মানবধর্ম বিপদে পড়বে মসিহা মানুষের মধ্যে থেকেই আসবে। শেষ পর্বে যীশুর অন্তিম বিচার এবং হাইপোথ্টিকাল বেঁচে ওঠা কে যুক্তির আলোয় সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। এই বিষয়ে আমার নিজের একটি অভিজ্ঞ্তা এবং কিছু বিষয় কাশ্মীর কড়চায় লিখেছিলাম। সেই লিঙ্ক টাও এখানে আর কমেন্টে দিলাম।

https://avrasoura.blogspot.com/2023/06/blog-post.html

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"