তুমি দেখো নারী-পুরুষ?আমি দেখি শুধুই মানুষ।।
"তাঁকে দেখতে, তার অভিনয়ে মোহবিষ্ট হয়ে বার বার ছুটে আসা সম্ভব হলেও সেই সমাজই অভিনেত্রীর নামে থিয়েটার সংস্থার নামকরণ মেনে নিতে পারল না কেন?"। হয়ত, সমাজ তাঁকে সেদিন উত্তর দিয়েছিল এবং শরশয্যায় অসহায় শরবিদ্ধ করেছিল তার পেশা এবং নারীত্ব কে শিখণ্ডী বানিয়ে; সেই প্রচলিত ধারায়। সে নারী, সে প্রথম যুগের অভিনেত্রী; সে পর্দা সরিয়ে সর্বজনের সন্মুখে উন্মুক্ত, সেই জন্যে সে সমাজে চর্চিত হলেও তার নাম প্রতিষ্ঠান হবে চিরবর্জিত। এরপর সে কি করেছিল? সব ছেড়েছুড়ে কি চলে গিয়েছিল মঞ্চ ছেড়ে?
না, সেদিন সে মঞ্চ ছাড়েনি।এই অন্যায় আবেদন মেনে নিয়ে নীরবে নিজের কর্মকে প্রত্যুত্তরের হাতিয়ার বানিয়েছিল। একের পর এক অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে বঙ্গ থিয়েটারে সঞ্জীবনী সুধার সঞ্চারণে এক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল সমাজে। সমান্তরালে, নীরবে একটা দেওয়ালে ধাক্কাও দিয়েছিল! কি সেই দেওয়াল? পৌরাণিক-সামাজিক-ঐতিহাসিক সব নাটকের ক্ষেত্রে "নারী-পুরুষ" দুই রূপেই ধরা দিয়েছিল দর্শকের সন্মুখে! স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস তার শ্রীচৈতন্য রূপ দেখে বিমোহিত হয়েছেন। আসলে, সে "নারী-পুরুষ" দুই রূপে ধরা দিয়ে বুঝিয়েছিল তার কাজের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ নিয়ে ভেদাভেদ নেই, "সে শুধুই এক মানুষ"! সে প্রকৃত মনুষ্যপ্রবৃত্তিতেই নিজের কাজ-কে সর্বাগ্রে স্থাপন করেছে -তবুও নিরন্তর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে সে। তাঁর চরিত্র তার অজান্তেই অন্যত্র সরে গেছে, তাঁর প্রাণের মঞ্চের থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও হয়েছে। তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষক-সুহৃদ-বন্ধু-সহকর্মী রা নীরবে তার অপসারণে সায় দিয়েছে। তাই হয়ত মাত্র ২৩ বছর বয়সে সাফল্যের উত্তুঙ্গ শিখরে থাকাকালীন অবস্থায় একের পর এক অন্যায় কে মুখবুজে সহ্য করে নীরবে সে একদিন মঞ্চ ছেড়ে চলে গেছে চিরতরে। তারপর দীর্ঘদিন ধরাধামে থাকলেও আর ফেরেননি মঞ্চে। "মান" আর "হুশ" এই দুই এর মেলবন্ধনেই জীবন কাটিয়েছে বিনোদিনী দাসী- বিখ্যাত "নটী বিনোদিনী"। শুধু "বিনোদিনী" নামটি "বি থিয়েটার" এর যায়গায় "স্টার থিয়েটার" হিসেবেই পরিচিত হয়েছে সবার মঝে! কিন্তু নটী বিনোদিনী রয়েই গেছেন বঙ্গ থিয়েটারের হৃদয়ে। আজও দেখুন দেড়শ বছর পরেও তার নামে শো হাউসফুল।
পুনশ্চ: আজ নান্দীকারের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসে এই অসাধারণ নাট্য প্রয়াস টি অনুভব করলাম। নটী বিনোদিনীর ভূমিকায় সুদীপ্তা র অভিনয় অনবদ্য। নীল, পদ্মনাভ সহ সকল কলাকুশলীরা ও মন ভরিয়ে দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ঐতিহাসিক তথ্য অন্য্ সূত্র থেকে এই বিষয়ে আরেকটি তথ্য জ্ঞাত হয়েছে -
যদিও এই প্রশ্ন টি দিয়েই নাটক টি শেষ হয়, তবুও অনুসন্ধিৎসু মন খুঁজতে চায় জানতে চায় মঞ্চ পরবর্তী জীবনে নটী বিনোদিনীর কি হয়েছিল? ২৩ বছরের বিনোদিনীর মঞ্চ ত্যাগের পরবর্তী জীবনের একটি অধ্যায় "আখতার নামা" নামক বইতে পাই। কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এ লখ্নৌ এর নির্বাসিত রাজা ওয়াজেদ আলী চেয়েছিলেন নটী বিনোদিনী তার রাজসভায় মাসিক দেড় হাজার টাকায় নাট্য কর্মী হিসাবে থাকুক। নটী বিনোদিনী সবিনয়ে রাজা কে জানিয়েছিলেন তিনি স্টার এ মাসে একশ টাকা মাহিনার নাট্যকর্মী , সেইখানে রাজা তাঁকে দেড় হাজার দিচ্ছে মাসে! যা - সারা বছর আয় এর থেকেও বেশী একমাসেই, কিন্তু সে এই প্রস্তাব গ্রহণে অপরাগ। সে ,মনস্থির করেছে মঞ্চে আর কোনোদিন ফিরবে না। তবে রাজার প্রধান নাট্য কর্মী মলিকাজান এর কন্যা কে সঙ্গীতের তালিম দেবে নিজের থেকে, সেই শিশু কন্যাটি ছিল পরবর্তী তে বিখ্যাত শিল্পী "গওহর জান" । আবার "গওহর জান" ঘরানা আরো পরবর্তী তে দেখা যায় "বেগম আখতার" এর মাধ্যমে।
ও হ্যা আরেকটা তথ্য, নটী বিনোদিনীর শেষ অভিনয় কিন্তু এরকমই এক ডিসেম্বরে, ১৮৮৬ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর।
©️ অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন