পুত্রের স্কুল পিটিএম এ উৎকন্ঠা ভরপুর।সবশেষে মন ভরিয়ে দিলো স্যাম বাহাদুর।।

ঘড়িতে সকাল ৯ টা বেজে ৩৭ মিনিট! বহুযুগ পরে সিনেমার টিকিট এর লাইনে দাড়িয়ে আছি আর বারংবার ভাবছি , কোনটা দেখবো, কোনটা দেখবো? - "এনিম্যাল" না "স্যাম বাহাদুর" উবু-দশ-কুড়ি-ত্রিশ-চল্লিশ চলছে। এদিকে সিনেমার সময় নির্ঘণ্ট জানান দিচ্ছে দুটি সিনেমা সকাল ৯:৩০ থেকেই শুরু হয়ে গেছে! সামনের পরপর দুই তিনটি গ্রুপ নর্মাল ভাবে "এনিম্যাল" এর দিকেই এগিয়ে গেলো। যাই হোক, একজনের পরেই আমার নম্বর আসবে লাইনে। তখনো ভেবেই চলেছি কি দেখি, কি দেখব? সিনেমা হলে এসে জানিও না যে কোন সিনেমাটি দেখতে এসেছি!  বহু যুগের ওপার হতে এই অনলাইনের যুগে, প্রাগৈতিহাসিক ভাবে কাউন্টারে দাড়িয়েই বা  সিনেমার টিকিট সংগ্রহ করছি কেনো বলুন তো?
তাহলে খুলেই বলি! আসলে আজ, এই সাত-সকালে কোনোভাবেই তো ভাবিনি যে সিনেমা দেখব! দশ মিনিট আগেও ছেলের স্কুলে গার্জেন হিসাবে পিটিএম এ অংশ নিয়েছি। ভেবেছিলাম ক্লাস টিচার রোহিত শর্মা র প্রাথমিক প্রহারের মতন ধুয়ে দেবে : বিগত তিন-চারটি পিটিএম এ পুত্রের মা "২০০৩-২০২৩" ক্রিকেট ফাইনাল অভিজ্ঞ্তার মতন হতাশা নিয়ে ফিরেছে প্রতিবার। এদিকে আমি, প্রতিবারই "আইটি কর্ম মহাকর্ম- ছুটি নৈব নৈব চ" করে পাশ কাটিয়েছি। কথায় আছে না, "চোরের দশ দিন গৃহস্থের একদিন"- আজ শনিবার, "পৃথিবীর সব কাজ এক হও" বলে আমার দিকে দায়িত্ব দাগিয়ে দিয়েছে পরিবার!
পুত্রের মাতা, ছাত্রের পিতা কে তার সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে সকাল সকাল পাঠিয়েছে পিতৃধর্ম পালনে,দায়িত্ব নিয়ে হতাশ হতে। যাই হোক, স্কুলে পৌছে সেই মিটিং এর ফাইনালে রাউন্ডে ঢুকে দেখলাম কবি ঠিকই বলেছেন: "যেখানে দেখিবে ছাই,উড়াইয়া দেখো তাহাই"-   উদম ঝাড় খাবো ভেবে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ঢুকেছি : হঠাৎ শুনি স্তুতিবাক্য! "ছেলে নাকি শান্ত হয়ে গেছে , তাই পরের উইকে ওকে নাকি ক্লাস মনিটর বানাবে"! প্রথমে ভাবলাম নিশ্চিতভাবে স্কুলের দিদিমনি অন্য কোনো ছাত্রের সাথে গুলিয়েছে; "ছেলে শান্ত হয়ে গেছে" এটা জেলুসিল দিয়েও ঐ সকালে হজম হচ্ছে না, আমার ।তারপর, উপস্থিতি খাতায় দস্তখত করে দেখলাম আমার দেওয়া নাম আর আমার পিতৃদেবের দেওয়া নাম মিলে যাচ্ছে পিতা-পুত্রের সম্পর্কে ; নিশ্চিত হলাম যাক আমারই পুত্র তাহলে! মনের অলিন্দে স্মিত হাসিতে আবিষ্কার করলাম: "আরে আমি তো আচম্বিতে ২০২৩ ফাইনালের অস্ট্রেলিয়া হয়ে গেছি"! 
তারপরে আর কি, একটা ছোট্ট বার্তা পাঠালাম এক জনকে: "পিটিএম শেষ হোলো, সকাল সকাল,
আমাকে যে এত্ত কিছু শুনতে হবে ভাবিনি বুঝলে। যাই হোক, একটু বিরতি চাই,তাই মোবাইল সাইলেন্ট এ রইল" - এই বার্তা কবুতর যা যা করে উড়ে যাবার মিনিট খানেক পরে একের পর এক বার্তা আর মিস্ড কল: বার্তায় লেখা-"কেন? কি হয়েছে? কি বলল? জানতাম আমি এটাই হবে ইত্যাদি... দেখো প্রতিবার আমার কেমন লাগে" - এই সব বার্তা নিভৃতে পড়ে হো হো করে হেসে ভাবলাম "কি আর করি! এই ভাবে টেনশনে রয়েছে একজন, যাক আরেকটু সে না হয় এই সব ভাবুক নিজের স্কুলে-ক্লাসে বসে। সেই অবসরে যাই এইবার একটা সিনেমা দেখি! একদম একা "। 
বাসনা থেকেই ভোগের লালসা জেগে উঠল- 
কাউন্টারে হেসে বললাম: একটা "স্যাম বাহাদুর" দিন। সাতসকালে নিজের ঐতিহাসিক পিটিএম এর সাফল্য উদযাপন করতে দেশের ইতিহাসে ফিরে গেলাম: 
"স্যাম বাহাদুর" সিনেমাটি স্বাধীনতার সদ্যপূর্ব  কাল (১৯৩৫)থেকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) ঐতিহাসিক সময়ের প্রেক্ষাপটে সৈনিক আবহে-দৃষ্টিতে নির্মিত। সিনেমাটি দেখতে বসেছি , ওদিকে পাশের স্ক্রিনে দাপিয়ে এনিম্যল চলছে। মনের স্পিকার কানে-কানে বলে গেলো আমি একটি ধ্রুপদী টেস্ট ম্যচ দেখছি এবং পাশে আই পি এল এর ফাইনাল হচ্ছে।
হ্যা,স্যাম বাহাদুর সত্যি একটি ধ্রুপদী টেস্ট ম্যচ যা হয়ত সেই বিজয় রথ থামানো ঐতিহাসিক ইডেন টেস্ট এর মতন। একের পর এক রাজনৈতিক সত্য চমক গল্প বলার ছলে সুন্দর ভাবে এগিয়ে গেছে। তৎকালীন অনেক ঘটনাই এসেছে; তবু দুটি বিষয় মনে দাগ কেটেছে।
এক আর্মি চিফ তার প্রধানমন্ত্রী কে তোষামোদ না করে , তার প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধের নির্দেশ না মেনে মুখের উপর বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ভূল,রাজনীতির ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধের স্ট্রাটেজি করলে দেশ হারবে ডুববে! প্রধানমন্ত্রী ও মেনে নিলো, সে ভূল বলেছে। সেই ভুল স্বীকারের ফলে ৭১ এর বিশাল জয় হোলো দেশের। 
এরকম যদি, আমাদের লাইফেও হোতো! ডেটা  আরকিটেক্ট ম্যানেজার কে সরাসরি মুখের উপর বলত-"এই প্রস্তাব নাহি তোমার এখানে সাজে,
এ ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে সকলই ডোবে কাজে!
আরেকটা ঘটনা, ৯ টা সত্যি গুলি খেয়েও একজন সৈনিক নিজেকে নিয়ে হাস্যরসের উপমা দিচ্ছে- এই ভাবে জীবন কে হাসির মোড়কে উপস্থাপনও যে সম্ভবপর সেটা আজকে আরেক বার নিজের উপলব্ধির খাতায় নথিভুক্তহোলো।(বাড়িতে এসে ডকুমেন্ট এ দেখলাম স্যাম মনেকশহ ৯ টি গুলি খেয়ে লিভার-পাকস্থলি ক্ষত নিয়েও বেঁচে ফিরেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে)
এই সব সত্য ঘটনা গুলি বা সিনেমার এই অংশ ঢুকিয়ে দিক জীবনের আসল অনুপ্রেরণা রেফারেন্স হিসাবে! 
পুনশ্চ: আমি কিন্তু হাফ টাইমে একজনকে প্রথমে জানিয়েছি আমি একা সিনেমা দেখছি; তারপর বলেছি পিতার পিটিএম জয়ের কথা। মহামানব রা বলে গেছেন খারাপ খবর আগে দিয়ে ভালো খবর শেষে দাও; 
না.. কিছু না! আমি সেই মহামানব এর নাম টা একবার জানতে চাই! অপরপ্রান্তে কিন্তু সেই থেকে সাহারার নিস্তব্ধতা বিরাজমান! 

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"