প্রথম বছরের গিফ্ট অব ম্যজাই
তারপর,
ভূতেদের আশীর্বাদ নিয়ে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্য যাত্রা তো শুরু করল দুজনে মিলে ২৩ শে নভেম্বর ২০১২। একে একে দুজনেই অনেক গুলো নতুন-নতুন ডাক-সম্বোধন-সম্পর্ক খুঁজেও পেলো, বেশ নতুন আনন্দে এগিয়ে চলল সম্পর্কের তরী! এরপরেই,হ্যা ঠিক এক বছরের মাথায় হোলো সেই ঐতিহাসিক ভূল! ঠিক ধরেছেন, প্রথম বিবাহবার্ষিকী দিনটি তেই! একটি অত্যন্ত প্র্য়োজনীয় শিক্ষাও পেল ছেলেটি, জীবন পথের "সারপ্রাইজ" !
একবছরের মাথায় দুজনেই ভাবলো প্রথম বিবাহবার্ষিকী টা অন্য রকম ভাবে উদযাপন করা যাক! মেয়েটি ভেবেছিল হয়ত সবাই কে নিয়ে মিলেমিশে একটি দিন গল্প-খাওয়াদাওয়া এবং আনন্দ-আড্ডা এভাবেই চিরাচরিত পথে পালিত হোক। কিন্তু সেটা হোলো না, কারণ ছেলেটি ভেবেছিল একটু ইউনিক কিছু করলে কেমন হয়!সেই ক্লাস টুয়েলভ এ পড়া "গিফ্ট অব ম্যজাই"এর মতন "সারপ্রাইজ" দিলে কেমন হয়!
মেয়ে টাও যখন শুনল তার পতিদেব , পত্নীর মন বুঝে সারপ্রাইজ দিতে উদ্যত তখন সেও বেশ উত্তেজিত, তার মনের মতন সত্যি কিছু হতে চলেছে! কিন্তু সে নিজেও কল্পনা করেনি তার পতিদেবের কল্পনা শক্তি এতোটাই উর্বর!
যাই হোক, সেই বিশেষ দিনে অর্থাৎ ২৩ তারিখ সকাল-সকাল সারপ্রাইজের প্ল্যান অনুসারে বেশ দুজ্নে মিলে বাইরে বেরোল। পত্নী একটু চিন্তিত মনে বলল : "তা, এইবার তো বলো কি প্ল্যান, কি সারপ্রাইজ"?
পত্নীর উদ্বেল অবস্থা দেখে পতি অভয় বাক্য দিয়ে বলল :"আহা, কেমন লাগছে, খুব এক্সাইটেড কি!"
পত্নী মাথা নাড়িয়ে বলল: "তা, একটু তো বটেই। বলো না এইবার আজকের কি প্ল্যান-প্রগ্রাম?"
পতিদেব ব্যোমকেশ এর মতন স্মিত গম্ভীর হেসে বলল- "প্ল্যান ক্রমশ প্রকাশ্য!"
তাই শুনে পত্নী আর কথা না বাড়িয়ে, দুরুদুরু বুকে গাড়ির জানালা দিয়ে ভোরের কলকাতা দেখতে থাকল, মনে মনে ভাবল তাহলে বোধহয়, কাছেপিঠে কোথাও আউটিঙ এরই প্ল্যান হচ্ছে। ইশ্শ একটু বললে তো ভালো করে ব্যাগ গুছিয়ে আনা যেত- "কোথায় যে যাচ্ছি"!
যাই হোক এইভাবে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে ভিক্টোরিয়া-ময়দান-ইডেন পার করে যাওয়ার পরে উত্তেজিত হয়ে সে পতির উদ্দেশ্যে বলে উঠল : "তাহলে আমরা কি দীঘা যাচ্ছি! না রায়চক? একটু বললে কি হোতো,সেইভাবে ড্রেস গুছিয়ে নিতাম!"
পতি দেব তখনো মাথা দুলিয়ে হেসে হেসে বলছে: "আরেকটু সবুর করো, তোমার ফেভারিট যায়গা তেই নিয়ে যাচ্ছি!"এরপর কথা না বাড়িয়ে পত্নী ভ্রুকুটি কুঞ্চিত ললাটে অপেক্ষারত অবস্থায় হেমন্তের ধোয়াশার চাদরে ঘুম ভাঙ্গা শহর দেখতে থাকল।
তারপর কিছু সময়ের পরে সে দেখল গাড়িটা রেসকোর্স কে ডানদিকে রেখে আলিপুরের খালটি ক্রশ করে হোটেল তাজের এসে থামল।" তাহলে কি হোটেল তাজ!"
বউরাণী এইবার গদগদ চিত্তে গজরাতে থাকল: "সাতসকালে এই হোটেল তাজে কি করতে এলাম! এর থেকে তো বাড়িতে সবাই কে ডেকে আনন্দ করলেই হোতো"!
পত্নী কে উতেজিত-কপট রাগান্বিত হতে দেখে পতি মশাই বলল- "আহা, এত্ত রাগের কি আছে, আর আমি তোমার মন বুঝি, এক বছরে তো কম চিনি নি তোমায়! আমরা হোটেল তাজে মোটেই আসিনি!"
পত্নী বিস্মিত হয়ে বলল - "তাহলে কোথায় এলাম?"
পতি দেব এইবার যবনিকা পতনের পর্যায়ে গীতার বাণীর প্রসঙ্গ টেনে বলল:"আগে, তুমি নিজে কে চেনো, বোঝো। তাহলেই এই বিশ্বচরাচর কে বুঝতে পারবে। তোমার জন্য বদ্ধ তাজ হটেল একদমই উপযুক্ত নয়, তোমার মতন জীববিজ্ঞান প্রেমীর চাই মুক্ত প্রান্তর প্রাণী-উদ্ভিদ এর সমাহার। তুমি ভাবলে কি ভাবে যে জাগতিক ভোগের মধ্যে তোমাকে আমি আবদ্ধ রাখব!হে সখে, এসো। সামনে রাস্তা পার হলেই দেখো রয়েছে বিস্তীর্ণ "চিড়িয়াখানা", চলো আমরা প্রবেশ করি।
তারপর বর্ডার এর সেই পাকিস্তানি সৈন্যের মতন পতি দেব জানালো: "আজকের প্ল্যান- সকালের ভ্রমণ চিড়িয়াখানা -দুপুরের ভ্রমণ সাইন্স সিটি- সান্ধ্য ভ্রমণ- ইকো পার্ক!"
সেই বাক্য শুনে পত্নীর একটাই প্রত্যুত্তর ছিল: "আজ প্রথম বিবাহবার্ষিকী তে এটাই তোমার সারপ্রাইজ! আজ দিন টা তাহলে বাঘ-সিংহ-হাতি-গন্ডার-হনুমান-ডাইনোসোর-গাছপালার সাথেই কাটবো? "
যাই হোক সেদিন পত্নীর অবস্থা ক্রুদ্ধ সানি দেওল হয়েছিল কিনা পাঠকই বলবেন, তবে এই ঘটনার একটি পুনশ্চ আছে:
পরবর্তী এগারো বছরে সেই পতি দেব যখনই তার পত্নী কে বলেছে সারপ্রাইজ দেবো; পত্নী সাথে সাথে "রক্ষে করো রঘুবীর" বলে তা নাকচ করে দিয়েছে, কেন কে জানে! আপনারা কি জানেন কারণ টা?
পূর্ববর্তী লেখা:
https://avrasoura.blogspot.com/2022/11/blog-post.html
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন