"মধু কৈটভ মশারি বিধ্বংসী ।মহিষাসুর নিদ্রা গ্রাসী"।।
বীরেন্দ্র কৃষ্ণের মোহ মিশ্রিত উদাত্ত আহ্বানে মহামায়া প্রতি বছর নিশ্চিতভাবে জাগ্রত হন। হ্যা ঠিক এই ভাবেই কাউকে ঘুম থেকে ডেকে দিতে হয়, "তুমি জাগো জাগো" - বলে সুর করে, সুন্দর ভাবে।
কিন্তু সবার কপালে থুড়ি মানবিক এলার্মে কি এমন সমধুর ডাক এসে পৌছায়? হয়ত অনেকের ক্ষেত্রেই পৌছায় না! এবং সেই ক্ষেত্র গুলিতেই সৃষ্টি রসাতলে যাবার উপক্রম হয়। কিভাবে?
এই দেখুন একই মহিষাসুর বধের ক্ষেত্রে দেবী কে জাগিয়ে তুলছে কে? - বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। আর ওদিকে সুন্দর যোগনিদ্রাতুর বিষ্ণু কে ডেকে তোলার দায়িত্ব পড়ল কার উপর? না , দুই অশান্ত দুষ্টু মধু-কৈটভ এর উপর। আচ্ছা, ভেবে দেখুন তো এই অন্যায়-অবিচার কি শুধু দেব দেবীর মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ?
না, একদম না! আমার আপনার ঘরে-ঘরে পরিবারে সেম টু সেম দেখা যায়, পরিবারের সদস্য রা ভিন্ন রূপে ভিন্ন ভাবে মধু কৈটভ, বিষ্ণু-ব্রহ্মা রূপে অবতীর্ণ হয়ে নিদ্রাভঙ্গ করেন। কিভাবে? আচ্ছা, চলুন তাহলে দেখি এই ঘটনা গুলো কি ভাবে ঘটে!
এই ধরুন সারা রাত ধরে ফেসবুক করে-নেটফ্লিক্স ঘেঁটে, আরও কত কি জ্ঞানের বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে, বাড়ির কর্ম কুশলী যুবকটি ছুটির দিন সকাল বেলায় অকাতরে ঘুমোচ্ছে। অনেকটা যেন,"ভগবান বিষ্ণু অখিল শক্তির প্রভাব সংহত করে সেই কারণ-সমুদ্রে রচিত অনন্ত-শয্যা যোগনিদ্রায় হলেন অভিভূত"।
ওদিকে, পুত্র প্রতিদিন এত রাত জেগে পরিশ্রম করছে। "নিশ্চয়ই অফিসের জরুরি কাজই করছে রাত জেগে"- এই ভাবনার বশবর্তী হয়ে পিতা দয়াপরবশ ও অপত্য স্নেহের মায়ায় "ভাবী কল্পের সৃষ্টি-বিধাতা ব্রহ্মার মতন" ঘুমোতে যাবার আগে মশারি খাটিয়ে রেখে দেয়; বিষ্ণুর যোগনিদ্রায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে।
এইভাবে সকাল হলেই ঘড়িতে যখন আট কি সাড়ে আটটা বাজবে বাজবে করছে, ঠিক সেই সময়ে বিষ্ণুর কর্ণমলজাত মধুকৈটভ এর তারস্বর শব্দে মেদিনী কেঁপে উঠল।
মা চিত্কার করে নিদ্রিত ছেলেকে উদ্দেশ্য বলছে: "সারা রাত জেগে কি এমন রাজকার্য করেছে যে এখনো ঘুমোচ্ছে! ঘরের কোনো কাজে হাত লাগায় না। যা,জেগে উঠে বাজার যা আগে!"
ওদিকে, বিষ্ণুরূপী যুবক পরম নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। ছেলের ঘুম ভাঙ্গল না দেখে মা অন্য পন্থা গ্রহণ করল - একটি না, পরপর দুটি কাজ করে।
প্রথমেই ফ্যানটি বন্ধ করল এবং তারপর "ব্রহ্মার কর্ম, অস্তিত্ব বিনাশে উদ্যত হোলো", মশারির চতুর্বাহু ছিন্ন করে দিল মা।
গরমে এবং মশারির আবরণে মৎস অবতার রূপী অবস্থানে পুত্রের চক্ষু হতে যোগমায়া দেবী বিদায় নিলেন; বিষ্ণুর যোগনিদ্রা ভঙ্গ হল।
পুত্র ক্রোধ বাক্যের সুদর্শনচক্র চালনে মায়ের সঙ্গে উত্তাল বাকযুদ্ধ করলেন। এই দেখে পুনরায় ব্রহ্মারূপী পিতা ধ্যানমগ্ন হলেন, টুক করে নিজেই আবার পাশে শুয়ে পড়লেন।
এদিকে মা, বিষ্ণুর ভয়ংকর বাক্যবাণে অতিষ্ঠ হয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন। বিষ্ণু পুনরায় ফ্যান চালিয়ে যোগনিদ্রায় নিমজ্জিত হতেই ভেসে এল আরেকটি তীব্র আক্রমণ , হঠাৎ যোগনিদ্রা টুটে সেই যুবক দেখতে পেল তার দাদা রবিবার ছুটির দিন সকালে তার আগেই জেগে উঠেছে। ব্যস আর কি মায়ের সাপোর্ট এ বলীয়ান দাদা :
"এদিকে কালান্তরে দুর্ধর্ষ দৈত্যরাজ মহিষাসুরের পরাক্রমে দেবতারা স্বর্গের অধিকার হারালেন। অসুরপতির অত্যাচারে দেবলোক বিষাদব্যথায় পরিগ্রহণ হয়ে গেল।দেবগণ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন।"
বাবা তার ছোট পুত্র কে বলল: "নিজে বুঝে নে, দাদা এখন একের পর এক বাড়ির কাজ সারবে, সুতরাং মা এর সাপোর্ট ঐ দিকেই থাকবে। আমি তোকে আস্থা ভোট দেব, যাতে দুজনেই আরেকটু বেশী ঘুমোতে পারি, কিন্তু সরাসরি মহিষাসুর আর মধু-কৈটভের সামনে দাড়াব না! গেলেই কিছু না কিছু কাজ ধরিয়ে দেবে! আমি চোখ বুজে পড়ে রইলাম। তুই দেখ কি করবি"।
এদিকে, "মহিষাসুর ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে নানা কৌশল বিস্তার করলে"।
কখনো সে দুমদাম শব্দে দেওয়ালে হাতুড়ি ঠুকল , আবার কখনো সে থেকে গাঁক গাঁক করে হেড়ে গলায় গান ধরল।
তাই দেখে ছোট ভাই চেচিয়ে উঠল:
"আশ্বিনের শারদ প্রাতে জেগে উঠেছে রাবণের ধ্বনি"।
©️ছবি: ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন