"ঈশ্বরের দুই পংক্তির শক্তিশেল"।।
আচ্ছা সেদিন যদি তিনি পরাশর সংহিতার এই শ্লোকটি খুঁজে না পেতেন অথবা পরাশর মুনি লিখতেই ভূলে যেতেন, তাহলে কি হোতো বলুন তো? ঐ যে, ঐ লাইনটার কথা বলছিলাম
"নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে, ক্লীবে চ পতিতে পতৌ",
যার অর্থ: "স্বামী নিখোঁজ হলে বা তাঁর মৃত্যু হলে, নপুংসক আর পতিত হলে তাঁর স্ত্রী আবার বিয়ে করতে পারেন।" বিদ্যাসাগর মশাই এর যা অদম্য জেদ ছিলো তিনি নিশ্চিত ভাবে আরো গভীর অনুসন্ধানে ব্রতী হোতেন। হয়ত, আরো আরো দেরী হোতো, হয়ত আরো কিছু অভাগার ললাটে দুর্দশার মেঘ ছেয়ে যেতো!
তৎসত্ত্বেও বিদ্যাসাগর শাস্ত্র পুরাণ এর মধ্যে থেকেই উদাহরণ খুঁজতেন, কেন? তিনি তো চাইলেই সহজেই আইন প্রণেতা ইংরেজ এর সামনে সহজ সরল ভাবে বিদেশী উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারতেন।
তবুও, প্রশ্ন জাগে সত্যি বুঝত কি? না, মানে যাদের জন্য এই আইন এবং যে রক্ষণশীল গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এই আইন কেউই বিদেশি উপমায় বিশেষ কিছু হয়ত বুঝতই না। বিদ্যাসাগর বিদ্যার আধার ছিলেন, তিনি ব্যুত্পত্তিতে এই অমোঘ সত্য অনুধাবন করেছিলেন: তিনি প্রজ্ঞাদৃষ্টির আলোকে বুঝেছিলেন: শুধু প্রবল জ্ঞান ,নারী জাতির উত্থানের প্রচেষ্টা এবং অদম্য জেদ এর দ্বারা এই অন্ধ অচলায়তনের প্রাচীর ভাঙ্গবে না!
তার দরকার ছিল এমন এক তথ্য যা দেশের মানুষ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবে। আচ্ছা, সেদিন যদি তিনি সাদা দাড়ি ওয়ালা কোনো ইহুদির লেখা লাল বই এর থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করতেন তাহলে কি কেউ সেটা গ্রহণ করত?
হয়ত করত না, কারণ দেশের সকল মানুষ নিজদের বিশেষভাবে সংযুক্ত করতে পারত না বিদেশীর হাতে লেখা সেই অমোঘসত্য বাণীর সাথে। সেই গল্পকথা র বাঁচার ভাষাও দেশের লোক হয়ত শোনেনি!
কিন্ত; সেই একই বাণী, পরাশর সংহিতা থেকে নির্গত হয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ব্যুত্পত্তির যুক্তির মাধ্যমে কুঠার আঘাত হানল গোঁড়ামির বিষ বৃক্ষের একদম গোড়ায়। বিদ্যাসাগরের সৎ উদ্যম - অদম্য জেদ ,পরাশর সংহিতার সর্বজন বিশ্বাসযোগ্যতা : "শাস্ত্রে আছে এবং বিদ্যাসাগরের মতন জ্ঞানী মানুষ বলছেন, আমাদের ঘরের দুর্ভাগা মেয়েদের কল্যাণের জন্য, সুতরাং বিধবা বিবাহ আইন আবশ্যক" : ধীরে ধীরে মানুষ বিশ্বাস করলো বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টাকে, সমাজ কালকূট থেকে অমৃতের সন্ধানে উত্তীর্ণ হোলো।
তাই বলাই যায়, বিদেশী লেখার মূল্য- ব্যুত্পত্তি-সত্যবচন জ্ঞানীর চোখে অমূল্য সম্পদ; কিন্তু সর্বসাধারণ এর সেই মূল্যে হয়ত বিশেষ রুচি নেই - তাদের রুচি-বিশ্বাস নিজের চেনা জানা গল্পে-পুরাণে-কিংবদন্তীতে। তাই হয়ত রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ভগত সিং এর মতন নমস্যরা বিদেশী জ্ঞানের দুয়ার নিজদের উন্মুক্ত মননে স্থান দিলেও জনগণ কে বোঝাবার জন্য দেশীয় পন্থা অবলম্বন করেছেন। দেশীয় মাধ্যমে দেশের মানুষের চেনা-জানা-মান্যতা প্রাপ্ত উদাহরণে বিপক্ষের অচলায়তন ভেঙ্গেছেন অনেক প্রবল ভাবে।
সত্যিতো , দেশের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে অমুল্য রতন! তাই না?
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন