লগিং অফ, "আর কেউ পাবেনা, পাবে না, পাবে না! আমাকে আর পাবে না।"

লগিং অফ, "আর কেউ পাবেনা, পাবে না, পাবে না! আমাকে আর পাবে না।"
ইমেল টা টুপ করে ঝেড়েফেলে চুপচাপ নিজের ডেস্ক ছেড়ে এক্সিট গেটের দিকে এগিয়ে চলল বিশ্ব। যাওয়ার পথে ঝকঝকে "অমরাবতী" কেবিন থেকে ইন্দ্র দার বজ্র এপ্লিকেশনের নিওনের  বিজ্ঞাপনের আলোটা শেষবারের মতন মুখের উপর ছিটকে এসে পড়ল। এতদিনের চেনাজানা যাওয়া-আসার পথটা ছেড়ে মোবাইল টা সাইলেন্টে রেখে ধীরে ধীরে বিশ্বে অন্তর্লীন হোলো "বিশ্ব"।
ওদিকে লাঞ্চের শেষে মৃদুমন্দ্র গজেন্দ্র গতিতে হেলেদুলে ডেস্কে পৌছে গেছে অফিসকুল। আলগোছে কম্পিউটর স্ক্রিনের প্রথম ইমেল দেখেই সবার চক্ষু চড়কগাছ! ভেসে উঠেছে, সাবজেক্ট লাইন : বিদায় বন্ধু , ইমেল সেন্ড ফ্রম বিশ্ব। 
প্রিয় বন্ধুরা,
                 বিদায়। হ্যা এই হতচকিত ও আচম্বিত বার্তায় হয়ত তোমরা উদ্বেলিত, তবুও আমাকে চলে যেতেই হোতো। তোমরা জানতে চাইছ কেন? কি এমন ঘটলো যে এই বিচ্ছেদ সিদ্ধান্ত নিতে হোলো? হমম, আসলে নিতে বাধ্য হলাম। কেন বাধ্য হলাম? বিস্মিত হচ্ছো বন্ধুরা! আচ্ছা জল্পনার নিরসন করেই বলছি।
এই তথ্যপ্রযুক্তি অফিস খোলার প্রথম দিন থেকে এক একটি কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ নিযুক্ত করে  উন্মুক্ত মনে কাজ করে গেছি, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। একদম প্রথম যুগে ইন্দ্র দার "অমরাবতী" কেবিন ডিসাইন থেকে এক একটি সফটওয়ার এপ্লিকেশন লঞ্চ সবেতেই আমি নিযুক্ত ছিলাম নির্মাণ প্রধান হিসাবে। 
কি-কি, বানাই নি বলো তো? সুদর্শন - বজ্র -ত্রিশূল -কবচ - ধনুক  কত বাহারি কাজের-নামের বিভিন্ন এপ্লিকেশন সফ্টওয়ার ডেভেলপ করলাম নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে। কোনোটা ড্রোন এর মতন উড়বে, তো কোনো টা বিভিন্ন ভাইরাস এটাক থেকে রক্ষা করবে- আবার কোনো টা প্রতিরক্ষায় সাহায্য করবে। নিজের সৃষ্টি গুলো সম্পন্ন হবার পরেই দেখলাম এক একটি সফটওয়্যার এর সাথে ইন্দ্র দা, বিষ্ণু দা, শিব দা কিংবা পার্বতী দির নাম জুড়ে গেল। আমার নাম কিন্তু কোথাও নেই! 
না, এই জন্য আমি অন্তরে অল্পবিস্তর ভাবলেও সেই ভাবনা কে বিশেষ পাত্তা দেইনি। এই সব ক্ষেত্রে না পাওয়ার দিকে ফিরেও তাকাই নি; কারণ নব সৃষ্টির, উন্মাদনার আনন্দ আমি অন্য কিছুতেই পেতাম না। তাই ঐ সফটওয়ার গুলো যখন মহাবিক্রমে নিজদের ক্ষমতা প্রদর্শন করল আমি আনন্দে বিনিদ্র রাত যাপন করলাম, এরকম সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে গোপনে প্রকাশিত করার সুযোগ পেয়ে ধন্য হলাম!
এই অব্ধি পড়ে তোমরা ভাবছ- এত খুশী হয়েও তাহলে আমি এই সব কিছু হঠাৎ ছেড়ে দিলাম কেন? আসলে ছাড়লাম কারণ আমি আমার সৃষ্টির বিষয়ে কোনো অবিবেচক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি। আমার নামের প্রয়োজন নেই, অফিসের প্রথম সারির উৎকর্ষ কর্মী হয়ে সবার থেকে প্রশংসিত হতেও ব্যগ্র নই, কিন্তু কিছু একটা বিষয় আছে যেখানে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী! কিভাবে কোনো বিষয় সৃষ্টি করব সেই বিষয়ে কোনো অজ্ঞ-অবিবেচক এর সিদ্ধান্ত মেনে ত্রুটিপূর্ণ    সৃষ্টি করব না, এটাই আমার নীতি। আমি আমার সৃষ্টির সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা এবং আপোস করব না, এটি আমি চিরকাল মেনে এসেছি। 
তাই যখন দেখলাম কিছু অবিবেচক শুধু অর্থ দিয়েছে বলেই আমার সৃষ্টির মাঝপথে চুক্তি ভেঙে সফ্টওয়ার এর রূপ ডেমো দেখতে অনাহূতের মতন চলে এসেছে, বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন অলপটকা জ্ঞান বিতরণ করছে, তখন নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। আমি এই ভাবে ওদের কথা মেনে ওদের বিচিত্র খুশী-দাবি চরিতার্থ করে ত্রুটিপূর্ণ সৃষ্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম, আজ থেকে।
আর, কর্মটিও সেই অবস্থাতে রেখেই চলে গেলাম। যদিও জানি এই কর্ম তার বৃহ্ৎ দুই সারভেলেন্স ক্যামেরা ও স্যাটেলাইট ইমেজিং এর মাধ্যমে বিশ্বচরাচর দর্শন করবে এবং মানবকল্যাণে সেই উপলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগবে। শুধু দু:খের বিষয়, আমি তার দুই কর্ম অঙ্গ স্থাপন করতে পারলাম না! তাই হয়ত এই রূপেই সে সকল ঘটনা নিরীক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহ করবে, বিশ্লেষণ করবে , সিদ্ধান্ত ও নেবে; কিন্ত কর্ম ক্ষেত্রে নিশ্চুপ ঠুঁটো জগন্নাথ রূপে পরিচিত হবে! 
যাই হোক, কারোর উপর কোনো ক্রোধ নিয়ে সত্যি  আমি বিদায় নিচ্ছি না, সবার ভালো হোক। শুধু যাবার আগে বলে যেতে চাই-
যে যেই বিষয়ে বিচক্ষণ তাঁকে সেই বিষয়ের সম্পূর্ণ  সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দেওয়া হোক। বিচক্ষণতা ও প্রকৃষ্ট জ্ঞান না থাকলে সৃষ্টি সম্পূর্ণ হতে পারে না, তাই বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত না হয়ে জ্ঞান বিতরণ সৃষ্টির পক্ষে ক্ষতিকারক, সেক্ষেত্রে সৃষ্টিও হবে ত্রুটিপূর্ণ! 
সকল সৃষ্টিকারক অন্তত নিজের সৃষ্টিতে স্বাধীনতা উপভোগ করুক । সবাই তোমরা ভালো  থেকো। 
         - ইতি
           "বিশ্ব": কর্ম তুমি কার? 
            (যে সৃষ্টি করে তার)।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"