বহে নিরন্তর অনন্ত শিক্ষাধারা
যে সকল আদর্শ শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পাথেয় করে যুগে যুগে প্রণম্য শিক্ষককুল সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন নিরন্তর ;সেরকমই,কিছু আদর্শ পৌরাণিক শিক্ষক চরিত্র নিয়ে আজকের আলোচনার ক্ষেত্র। বিখ্যাত কিছু শিক্ষা গুরুদের শিক্ষাদানের নৈতিক অব্স্থান।
আমাদের দেশে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্থানে যদি কোনো চরিত্রকে সন্ধান করি প্রথমেই কোন নাম টা ভেসে ওঠে? আপনি ভাবছেন? ও, খুঁজেও পেয়েছেন। হ্যা, একদম ঠিক ভেবেছেন। সকল গুরুর শ্রেষ্ঠ গুরু হিসাবে অর্জুনের গুরু দ্রোণাচার্য্য ই আমাদের দেশে সর্বজন স্বীকৃত। দ্রোণ একজনকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসাবে বেছে নিয়েছেন, তাঁকেই সব ঢেলে দিয়েছেন; যেখানে একের পরিবর্তে "তিন" বিখ্যাত ছাত্রের গুরু হিসাবে পরিচিত হবার সম্ভাবনাও ছিল উজ্জ্বলঅরুণ ! তিনি কুরুকুল এর ভবিষ্যত রক্ষার যুক্তির ঢালে- অন্নঋণের দায়ে , বাকি দুই কৃতী সম্ভাবনাময় ছাত্র কে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তবুও তার বিশেষ কৃতিত্ব তিনি যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ তৈরী করবেন ভেবেছিলেন তাঁকেই শেষ ধাপে সসম্মানে উত্তীর্ণ করেছেন।
তাহলে একবার টি একটু ভেবে দেখুন এই ধারা কি শিক্ষা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সমাজে? - "গুরু যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই প্রতিষ্ঠানের থেকেই শ্রেষ্ঠ ছাত্র তৈরী হবে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এই গুরুর থেকে সর্বোত্তম শিক্ষা লাভ করতে পারবে না, বঞ্চিত হবেই!"
এই বার আরেকটি শিক্ষা ধরার দিকে ফিরে দেখি: এই ধারা আবার একের পরিবর্তে গুণগত সমষ্টি তে বিশ্বাসী। এই ধারার প্রতিভূ হলেন গুরু পরশুরাম।তিনি বহু বিখ্যাত শিষ্য নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। ভীষ্ম-দ্রোণ-কর্ণ এর মতন বিশ্ববিজয়ী শিষ্য এই প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত হয়েছে। যদিও এই ধারায় ছাত্রের ; থুড়ি ছাত্রের সামাজিক কৌলিন্য-পরম্পরা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। বিশেষ কিছু শর্ত পূরণ আবশ্যিক। এই ধারার লঙ্ঘন অথবা পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য গোপন দুইই পাপ ও অপরাধ হিসবে পরিগণিত হয়। এমনকি শিষ্য হিসাবে চির বহিষ্কারের শাস্তির বিধান ও বর্তমান; সে শিষ্য যতই প্রতিভাধর হোক না কেন! এই ধারায় গুরু কুল-বংশ নির্ধারণ করে ছাত্র কে সর্বোত্তম শিক্ষা দান করেন।
এই দুই ধরার বিপরীতে আরেকটি ধরাও পুরাণে রয়েছে। সেই ধারার উদাহরণটি একটু প্রাচীন। এক্ষেত্রে গুরু কোনো শিষ্যের গুণে-চরিত্রে প্রকৃত শিক্ষার আধারের সন্ধান পেলে,সে যে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই হোক না কেন - সে নির্বাচিত হবে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার ভবিষ্যত ধারক হিসাবে। সেই শিষ্য যদি প্রকৃত অনুগত আধার হয় তাহলে বিপরীত ভাবধারা-মতাদর্শের পথে চালিত হলেও শিক্ষক নির্দিধায় সকল শিক্ষা উজাড় করে দেবেন।এই ধারা যদিও আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল মনে হলেও এই পথে শিক্ষক সম্পূর্ণরূপে নিজ প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ভূলে কুল-কৌলিন্য-ভাবধারা দূরে সরিয়ে "শিক্ষার ভবিষ্যত বেঁচে থাকুক"- এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শিষ্যেকে শিক্ষা দান করবেন।
ঠিক যেমন করেছিলেন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য! তিনি নিজের প্রাণ বাজি রেখে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিক্ষা রূপে দান করেছিলেন বিপরীত শিবিরের দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র প্রতিভাবান কচ কে, ফল স্বরূপ দৈত্য শিবির এর প্রাণ ভোমরার হদিশ পায় দেব শিবির! গুরু শুধু চেয়েছিলেন শিক্ষার ধারা বজায় থাকুক পরবর্তি প্রজন্মে, সে অন্য শিবিরের হলেও গুরুর শিক্ষা তো রয়েই গেল ভবিষ্যত সমাজের কল্যাণে। হয়ত বিপরীত শিবিরের মাধ্যমেই সেই শিক্ষা বেঁচে রইল।
এই ধারা মেনে নিয়েছে: "শিক্ষার অধিকার সবার, কুল বংশ প্রতিষ্ঠান কে দূরে ঠেলে শিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে সকল সফল আধারে"।
একবার ভেবে দেখুন, এই ভিন্ন ভিন্ন ধারা গুলি সব কটিই কিন্তু সুফল প্রসব করে চলেছে যুগযুগান্তরে। বিখ্যাত সব ছাত্র-ব্যক্তিত্ব তৈরী হয়েছে এই তিনটি সূত্রে ধারাতেই।
এখন,বিষয়টি হোলো ছাত্র কেও কিঞ্চিত কালক্ষেপ করতে হবে গুরু নির্বাচনে- নিজেকে বুঝতে হবে ভবিষ্যতে সে কি হতে চায় এবং অনুসন্ধান করতে হবে কে তার উপযুক্ত গুরু হতে পারেন! ঐ একটা যায়গায় ছাত্র কে গুরু নির্বাচনে নরেন্দ্রনাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে ,রামকৃষ্ণের খোঁজ পেতে! কর্ণ-একলব্য যদি সেদিন শুক্রাচার্য্য এর মতন কোনো এক গুরু কে খুঁজে পেত তাহলে সময়ের সরণীতে হয়ত মহাভারতের যুদ্ধ হোতোই না! কারণ, দুই তরোয়াল বাধাহীন ভাবে লড়তে জনে কিন্তু ত্রিশূল এর ত্রিফলা নিজদের সমঝে বাঁচিয়ে চলে, ত্রিশক্তির ভারসাম্য স্থিতিশীল সমাজের সন্ধান দিতে পারে। ত্রিশিক্ষা ধারার প্রতিটিই সমানে-সমানে সমাজে সমাদৃত এবং বিরাজমান হোক যুগযুগান্তরে, সমাজের ভারসাম্য রক্ষার্থে।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
পূর্ববর্তী শিক্ষক সমাজ সংক্রান্ত লেখার লিঙ্ক:
https://avrasoura.blogspot.com/2022/07/blog-post_14.html
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন