এই শ্রাবণ ধুয়ে দিক যত মলিন কর্দম। মাতৃভাষার বর্ষণে মন আজ স্নিগ্ধ নরম।।
আজ ১৪৩০ বাইশে শ্রাবণ, বাইরে থেকে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। আর মনের মধ্যে চিন্তা গুলো কেমন এদিক সেদিক দৌড়চ্ছে। হঠাৎ দেখলাম সামনের বকুল গাছটার ভেজা ডালে তিনটে শালিখ ভিজছে- এই বৃষ্টিতে ওদের ঝগড়া আজকের মতন বন্ধ। চুপচাপ টুপটাপ শব্দ শুনছে,কেউ কিন্তু উড়ে যাচ্ছে না ভেজা বাসা ছেড়ে। আজ মনে হয় সকাল থেকে বৃষ্টি হবার দরুণ খাদ্যের সন্ধানেও এগোতে পারল না। তবুও কি ব্যাপার? আজ তিনটে শালিক ঝগড়া করল না কেন? কেন ওরা হারিয়ে গেল না এই বকুল ডালের থেকে? এই সব না হন্যতের কথা ভাবতে ভাবতেই অপুর সংসারে সৌমিত্রর সেই সংলাপ টা মনে পড়ছে: "সেটাই শেষ কথা না! তার অভাব মিটছে না , তার দারিদ্র্য যাচ্ছে না, তা সত্ত্বেও সে জীবন বিমুখ হচ্ছে না, সে বাঁচতে চাইছে সে বলছে বাঁচার মধ্যেই সার্থকতা- বাঁচার মধ্যেই আনন্দ ...
আচ্ছা,আপাত দৃষ্টিতে মনে হোলো এটি যুবক শ্রেণীর মনের চিরন্তন কথা। কিন্তু কথা গুলো কি শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি এটি একটি জাতির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা - আশার ভাষা- অশনি সংকেত থেকে উদ্ধারের নেশা ! এই আবেশ-অনুভূতি অবশ্য বাঙালীর চিরকালীন একান্ত আপন। চরম দুর্দিনেও জাতিটা কিভাবে এতটা আশাবাদী হতে পারে?
এই জাতিটা দিনের পর দিন কি দেখছে? সে শুধু পিছিয়ে পড়ছে ! তার ব্যবসায় বসতে অলক্ষ্মী র স্পর্শ, তার সরস্বতীর রন্ধ্রে দুর্নীতির দুর্গন্ধ! সে তো আজ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে- ভাই এর বিরুদ্ধে ভাই লড়ছে, মারছে ঝরে পড়ছে। সে চারদিকে শুধু দেখছে পিছিয়ে আসার কাহিনী!
তবুও কিন্তু সে জীবন বিমুখ হচ্ছে না।কারণ টা কিন্তু খুবই সরল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনের সহজ পাঠ- বাঁচার পাঠ প্রাপ্ত হয়েছে তার সত্ত্বার সূর্যোদয়ের কালে।প্রাথমিক শিক্ষার বুলিতে পড়েছে :
"চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই,তেপান্তরের পার বুঝি ঐ।
মনে ভাবি ঐখানেতেই আছে রাজার বাড়ি।।
থাকত যদি মেঘে-ওড়া, পক্ষিরাজের বাচ্ছা ঘোড়া।
তক্ষুনি যে যেতেম তারে লাগাম দিয়ে কষে। "
আসলে এই জাতি টার পিছনে বরাভয় মুদ্রায় তিনি আছেন। তিনি সেই ছোট্টবেলায় এই বিশ্বাস-আশা জাগ্রত করেছেন মনের গহীনে : প্রত্যেকের জন্য একটা "পক্ষিরাজের বাচ্ছা ঘোড়া" আছে। সে আসবেই , তাঁকে আসতেই হবে। তাই এই জাতি নেতিবাচক ঘটনার মধ্যেও আশায়-আশায় বাঁচার নেশায় বেঁচে থেকে বলতে চায় "দাদা, আমি বাঁচব"।
জাতি টা বিশ্বাস করে জীবনপথের খোঁজ আজ না থাক কাল পাওয়া যাবে, কালের ঘরে শনি হলেও তারপরে নবারুণের আলোক ছটায় সব অন্ধকার মিলিয়ে যাবে ;সম্ভাবনারা সব লুকিয়ে আছে।
তবুও এই জীবন বাণী গুলো ধীরে ধীরে হারিয়েছে কালের ফেরে। যে "ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাকনু মায়ে ‘মা, মা’ ব’লে " সেই ভাষাই হয়েছে বর্তমানের ভবিষ্যতে ব্রাত্য-অপাঙক্তেয়! শিশুরা আজ ঐ তিনটে শালিখ এর ঝগড়া দেখতে ভূলে গেছে চালের পরে - শালিখ গুলো তাই শান্ত মনে ভিজে চলেছে বৃষ্টিতে। এদিকে সেই শিশুর বিজ্ঞ অভিভাবক দের কাছে বাংলা-টাংলা "নেভার মাইন্ড, বেঙ্গলি টা না শিখলেও চলে"!
এদিকে শিশুকুল মনের ভাব কহিতে ব্যাকুল; কিন্তু বোঝাতে গিয়ে হয়ে গেল সোনার কেল্লার জাতিস্মর মুকুল : মা- বাবা কিছুদিন পরে বুঝতেই পারে না সন্তানরা কি বলতে চাইছে, কোন ভাষায় বোঝাতে চাইছে।-"এর থেকে হয় তর্ক শুরু চিত্কারে তার ভূত পালায়"।
তাই হয়ত ভাবী কালের দরজায় অসহিষ্ণুতর বাতাবরণ, হতাশার প্রলয়নাচন শুরু হয়েছে। এর থেকে সত্যি কি মুক্তির কোনো উপায় আছে ?
হয়ত আছে, হয়ত অনুপ্রেরণা ২৫ শে বৈশাখ- বীরসিংহ-কপোতাক্ষ-ধানসিঁড়ি হলে তবেই আছে। আসলে হারিয়ে যেতে যেতে মত্ত সমুদ্রতরঙ্গ মাঝে এই জাতির ভাগ্যাকাশে ভেসে বেড়ায় কিছু কূলবর্তী আলোকবাতি। মনন মাঝে ভেসে ওঠে -
"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে "।। কেন ? কারণ .....
একটু আগে ঘোষিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সকল মধ্যমের বিদ্যালয়ে "বাংলা" আজ থেকে বাধ্যতামূলক! এই ঘোষণা আশাতীত সম্ভবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
আজ হয়ত দস্যু রত্নাকর কে বিশ্বাস করেই বাল্মিকীর নবজন্ম হতে পারে। শুধু সেই বাল্মিকী কে "মড়া" শিক্ষা কে আমূল উল্টে-পাল্টে নিতে হবে। বাল্মিকী কি পারবে রত্নাকরকে দিয়ে গান গাওয়া তে-
বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান--
তুমি কি এমন শক্তিমান!
একদিন এই জাতিটার পরিচিতি ছিল জ্ঞান-স্বাতন্ত্র-সম্ভ্রম-শিক্ষায়-ব্যুত্পত্তিতে। সেই শিক্ষা আজ নতুন করে বেঁচে উঠতে চাইছে , সরল পথে সহজ-পাঠে ফিরতে চাইছে। আর সেই পুনর্জীবন-জাগরণে মাতৃভাষাই হোলো শিক্ষার প্রাথমিক অবলম্বন - প্রাথমিক ধারণা-উপলব্ধির ক্ষেত্র প্র্স্তুত কারক। এতদিন অবহেলিত মাতৃভাষার বিষবৃক্ষ তো সমাজ দেখল। আজ সব ভূলে নতুন ভাবে শুরু হোক -
সব খোকা বলে অ-আ , শিখেনিক সে মায়ের ভাষায় কথা কওয়া।
ও হ্যা , এদিকে আমি ভাবছি সেদিন ভোরে দেখব উঠে বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে- তিনটে শালিখ খেলবে এবার সকল ঝগড়া ভূলে।।
©️ছবি : ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
https://avrasoura.blogspot.com/2022/06/blog-post_13.html
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন