যাদুকরের ছড়ি। থেমে গেল, হল্লা রাজের মিথ্যা জারিজুরি।।
ভারত ২৪ গোল - আমেরিকা ১ গোল! এই স্কোর দেখে একটু অবাক হচ্ছেন! ভাবছেন কি ভাবে সম্ভব? ভারত এই ভাবে হেলায় হারিয়েছে আমেরিকাকে! হ্যা ঠিক হারিয়েছে, শুধু আমেরিকা না; ব্রিটেন, জার্মান, জাপান, হল্যান্ড সবাই কে ধরে-ধরে ৮-১০ গোল দিয়েছে ভারত, এককালে। আসলে, ইদানিং কালের আলোচনায় "জার্মানি-ব্রাজিলের ৭-১", "বায়ার্ন-বার্সা র ৮-২", অথবা নিদেনপক্ষে "ইস্ট-মোহন এর ৫-০" এর হিসাব নিয়ে স্মৃতি আপনাকে বুঝিয়ে এসেছে রাশিরাশি গোলের খেলা এইভাবেই হবে, শুধু একটা খেলাতেই হয়ত দেখা যাবে !
তবে, অগুন্তি গোলের হিসাবে আরেকটি খেলাও এককালে হয়েছে-হচ্ছে; যেখানে দেশ এক সময়ে ভয়ংকর অপ্রতিরোধ্য সম্মানে সম্মানিত হয়েছে একটানা দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে! যাক, এইবার মনে হয় আপনি ঠিক ধরেছেন! হ্যা,সেই খেলাটা হোলো হকি।
এই খেলায় এক সময়ে নিয়মিতক্রমে অসাধ্য সাধন করেছে ভারত; স্বাধীন কিংবা পরাধীন অবস্থায়। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে সেইসময়ের ঘটনাগুলি এক একটি মহাকাব্যিক আঙ্গিকে চিরবিরাজমান। কয়েকটি ঘটনা একটু ঘুরেই দেখা যাক তাহলে।
ভাবতে পারছেন! - একটা পরাধীন দেশ,যার ১৫ জনের সদস্য কে অলিম্পিক খেলতে ৫২ দিনের সফর করতে হয়েছে! যাত্রাপথে মাঝে কোথাও থেমেছে এবং প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছে; যাতে আমেরিকা অব্ধি পৌছতে পারে, কিছু অর্থ সংকুলান হয়। প্রদর্শনী ম্যাচ থেকে পারের পারানি যোগাড় হয়।
সেই পরাধীন ভারত আমেরিকা পৌছেই ২৪ গোল দিয়েছে - ও হ্যা বিপক্ষে আমেরিকাও কিন্তু সেদিন ১গোল দিয়েছে আমাদের!
উফ্ফ জানেন কি কাণ্ড, ঐ একটা গোলও আমরা হজম করতাম না সেদিন! ঐ একটা গোলও ভারত কেন খেলো বলুনতো? আসলে ২৪ গোল হয়ে যাওয়ার পরে ভারতীয় গোলকিপার আমেরিকার মাঠে প্রবাসে দৈবের বশে অকাতরে সই পাতাচ্ছিলেন সই দিয়ে। সেই সুযোগে সহসা অরক্ষিত গোলে মার্কিন হানায় বলটি টুক করে গেল-গলে। ঐ গোলটি চাঁদের ঔজ্জ্বল্যে একটা ছোট্ট কালো টিপ পড়িয়ে দিল, কেউ যেন নজর না দেয়;এক বিরামহীন জয়রথ শুরু হোলো ভারতীয় হকির!
আর, সেই সময়ের এই সকল কাব্যিক অবাস্তব স্কোরলাইন এর হোতা ছিলেন এক যাদুকর। সেই যাদুকরের কাঠির স্পর্শে নিদ্রিত পরাজিত মানুষ জেগে বিস্মিত হয়ে দেখেছিল; নিজের আস্থা কৃষ্টি কিভাবে প্রথম বিশ্ব কে উড়িয়ে দিতে পারে অবলীলাক্রমে!
আমেরিকার অলিম্পিকে জয়ের পরে ১৯৩৬ সালে জার্মান অলিম্পিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী হিটলারের চোখের সমানে, তার ঘরের মাটিতে তার প্রিয় দেশ জার্মানি কে ৮-১ গোলের গোলায় উড়িয়ে দিয়েছিল সেই যাদুকর। ভাবতে পারছেন, রণে-বনে-জঙ্গলে যে হিটলার নিজের উগ্র সর্বগ্রাসী দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসতে শিখেছে তাঁকে তার নিজের মাটিতে অসহায় বাস্তবের সম্মুখীন করেছেন সেই যাদুকর। তৎকালীন জার্মান সংবাদ পত্র পরাধীন ভারতের দ্বারা জার্মান নিপীড়নের খবর ফলাও করে ছাপায়, প্রশংসাসূচক বাক্যে উল্লেখ করে : "ভারতীয় খেলোয়াড় দের গতি দেখে মনে হচ্ছিল ঘাসের মাঠে আইস স্কেটিং করছে"।
১৯২৮ এ এই যাদুকর ইংল্যান্ড কে আমস্টারডমের মাটিতে অলিম্পিকে ৪-০ গোলে পর্যদুস্ত করে , সাথে বৃটিশ অহঙ্কারও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। নিজদের ঔপনিবেশিক দেশের কাছে লজ্জার হার সহ্য করতে না পেরে ব্রিটিশরা অপমানিত মনে ব্যথিত হৃদয়ে হকি দল পর্যন্ত তুলে নেয় গ্রুপ লিগ থেকে,পুরো অলিম্পিক থেকে!
ভাবতে পারছেন এই জাদুকর কি জাদু দেখিয়েছে।
এক পরাধীন দেশের কাছে সেই দিনটা ছিল এক আত্মশ্লাঘার পরিচয়।
কাউকে আঘাত না হেনে, শুধু হকি স্টিকের যাদুতে সেই যুগের সব অগ্রণী দেশ কে অবলিলীলায় পরাস্ত করেছেন।প্রতিপক্ষের চোখে সম্মানের স্থানে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন নিজ কর্মগুণে।
১৯২৮ - ১৯৩২ - ১৯৩৬ ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে সোনার ফসল ফলিয়েছেন সেই যাদুকর।
তিনি কি এমনি শক্তিমান!
আজ, সেই যাদুকরের শুভ জন্মদিনে, "জাতীয় ক্রীড়া দিবসের" আলোকে , বিনম্র চিত্তে সম্মান জানাই
- হকির জাদুকর ধ্যানচাঁদ কে প্রণাম।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
ছবি: ইন্টারনেট আনন্দবাজার
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন