কলকাতা, আপনি থাকছেন স্যর।

কলকাতার মধ্যে মিনি সিঙ্গাপুরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে দরবারী "দিল্লী"। দেরী না করে , মোটাশেঠ "মুম্বাই" কে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে সাতসকালে শহর "কলকতা" কিনতে চলে এসেছে সে। কিন্তু এইকাজ তো এক-দুইজনকে দিয়ে হবে না, এত্ত বড় একটা  শহর ক্রয় করা তো চারটিখানি কথা না। একসাথে লোকবল আর কর্মবল চাই প্রচুর। তাই কোমর বেধে সঙ্গে এসেছে - চুপচাপ নিজ কর্মবিশ্বাসী অফুরান কর্মশক্তির  বাহক "চেন্নাই" ; আর, স্যুটেড-ব্যুটেড নিমেষে কর্মসম্পন্নকারী -আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ- আধুনিক প্রযুক্তিবিদ "বেঙ্গালুরু"। পুরো কাজ টাই আজকের মধ্যে সেরেই ফিরে যেতে হবে সব্বাইকে।

ময়দানে নেমেই দিল্লী একটু ভারিক্কি চালে বলল: "বুঝলে মুম্বাই এ জমি-শহর হামি লহিব কিনিয়া। এই কলকাতা টা তো দিনদিন ডুবছে। এর সবকিছু পুরনো অকেজো হয়ে গেছে, সব ভেঙ্গে একেবারে নতুন ভাবে পূবের সিঙ্গিং সিঙ্গাপুর সাজাব।"  তাই শুনে মুম্বাই বিগলিত চিত্তে কৃতাঞ্জলিপুটে বলল: "আপনি যা বলহিবেন তাই হবে। প্যায়সার জন্য কিছু আটকাবে না, শুদধু দিখবেন মিনি সিঙ্গাপুরের মানির কারবার যেন হামার কন্ট্রোলে থাকে। হেই চেন্নাই, সব কাগজপত্র রেডি হ্যায় তো?" হঠাৎ চিত্কার শুনে চেন্নাই দুদিকে মাথা নেড়ে হেসে উঠল। দাড়িপাল্লার মতন মাথার নাচন আর হাসির ফোয়ারা দেখে মুম্বাই-দিল্লী অবাক হয়ে বলল :"আরে, আচ্ছা মুশকিল তো, এ যে দেখি দুইদিকেই মাথা নাড়ায়! এই পেন্ডুলামের মতন মাথা দোলন-হেলন এর অর্থ টা কি?কাজ কি সব রেডি? হ্যা কি না এই মাথার দুলুনিতে কিছুই তো বুঝলাম না। একটু খোলসা করে বলো , তুমহি হ্যা বলছ নাকি না বলছ?"
চেন্নাই হাসতে-হাসতেই মা কালীর মতন জিভ কেটে বলল "হ্যাইয়ো, সব পেপার ওয়ার্ক রেডি"; ব্যাঙ্গালুরু তো কাগজ গুলো প্রিন্ট ও করেছে আবার ডিজিট্যাল কপি করে রেখে দিয়েছে, কি তাইতো ব্যাঙ্গালুরু?"। ব্যাঙ্গালুরুও সম্মতিসূচক ভাবে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল: হ্যা সব ডিজিটাল পেপার ক্লৌডে উঠিয়ে দিয়েছি, শুধু কলকাতার তরফ থেকে দুটো দস্তখত হলেই কলকাতার নাম-ধাম সাকিন-ঠিকানা সব পরিবর্তিত হয়ে যাবে, আপনাদের আর চিন্তা থাকবেনা "। এই শুনে দিল্লী-মুম্বাই-চেন্নাই প্রফুল্ল চিত্তে কিছু বলতে উদ্যত ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে যেন বজ্র-বিদ্যুত গর্জ্ন আছড়ে পড়ল !
-"তোমরা এখানে সিঙ্গিং সিঙ্গাপুর বানাবে আর আমি কি আঙ্গুল চুষব? কে বলেছে এই সব হবে এখানে? সব বন্ধ!"
হঠাৎ হাঁকডাকে ভীত হয়ে দিল্লী থমকে গিয়ে দেখল  তিনজন বিশাল বপু তাদের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে রোষানল উগরে ভীমগতিতে অগ্রসর হচ্ছে ।  তাদের উদ্দেশ্যে শঙ্কিত গলায় দিল্লী বলল: "আপনারা কে আছেন দাদা, কি চাহি"?  তিনের মধ্যে সবথেকে স্বাস্থ্যবানটি তার সঙ্গে আগত দুই সঙ্গী কে উদ্দেশ্য করে বলল : "দেখেছিস, শিলিগুড়ি-দুর্গাপুর; আক্কেল টা দেখ এই দিল্লী বাবুর! এই বাবু নাকি কলকতা কিনতে এসেছে, হ্যা-হ্যা, কিন্তু সে চেনেই না "কলকতা" কে ? আরে ভাই আমি হলাম সেই কলকতা! বুঝলে।"
দিল্লী সেই কথা শুনে একটু হেসে নম্র ভাবে বলল: "ওহ, আগে বলিবেন তো দাদা, আপনি কলকতা আছেন। নাইস নেম।তা, শুনুন দাদা, আমি আপনাকে সুনায় মুড়ে দেব। আপনাকে সিঙ্গাপুরের ডিটো কোপি বানিয়ে দিব। আপনার নতুন রূপ দেখে দুই চোখ জুরাসিক পার্ক এর মতন জুড়াইয়া যাহিবে, আসুন দাদা দুটো দস্তখত করে দিন দয়া করে ,আসুন"।
দস্তখ্তের কথা শুনে ভুরুকুঁচকে কলকতা জিজ্ঞেস করল: "এইখানে সিঙ্গাপুর হবে মানে? আর,কিসের দস্তখত করব। এখানে সিঙ্গাপুরি কলা হোলে আমি, কলকতা তাহলে কোথায় যাব? "
দিল্লী সাথে সাথে বলল: "আপনাকে হামরা রাখব হামাদের দিলে। সব সুময় মনের ভিতর রিখে দিব।
আসুন আপনি, সহি করুন দাদা, এ এক মহান ব্যপার হতে চলেছে আপনি যোগদান করুন।" কলকতা লাফিয়ে উঠে চোখ রাঙিয়ে ঘুষি বাগিয়ে বলল :"চ্যাংড়ামো হচ্ছে? দিলে থাকব আমি! এই সব স্মৃতিটুকু থাক বন্ধ করে আগে বল আমি থাকব কোথায় ? উচ্ছেদ করতে এসেছ! জানোতো রুলিং অপোশিসন সব আমার পকেটে। বেশী বাড়াবাড়ি করলে ফুটিয়ে দেব ! আগে বলো কোথায় উঠব আমি?  "
কলকাতার তর্জ্ন গর্জ্ন শুনে ব্যাঙ্গালুরু একটু কেতাবি ধারায় বলে উঠল: "এই যে শুনুন কলকাতা, আপনি এইভাবে আমার ক্লায়েন্ট কে থ্রেট করতে পারেন না। " ব্যাঙ্গালুরুর মুখে এই কথা শুনে মুখ ঘুরিয়ে শীতল দৃষ্টিতে কলকতা জানতে চাইল: "তুই কে রে? পরিচয় কি তোর
"ব্যাঙ্গালুরু গর্বিত ভাবে উত্তর দিল: আমি সব তথ্য ভরে আধুনিক প্রযুক্তির আলোকে দেখি, ভবিষ্যত ও দেখতে বলতে পারি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে।" কলকতা এবার শীতল ভাবে উত্তর দিল: "ও বুঝেছি টিয়াপাখির মতন তুই প্রেডিক্ট করিস, তবে কি যে ভবিষ্যত দেখিস সে বুঝতেই পেরেছি! আর কি তথ্যই বা জড়ো করেছিস সেটাও বেশ সন্ধেহজনক।" ব্যাঙ্গালুরু থমকে গিয়ে বলল : "কি সব বলছ? আমি তোমার সব তথ্য জানি আর সেটা বিশ্লেষণ ও সঠিক ভাবেই করে থাকি, কোথায় কি মিস হয়েছে বাজে কথা না বলে উদাহরণ দাও,উত্তর দাও।"
এবার কলকতা একটু হেসে বলল : "তোর ডেটাবেসে তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখ আমি যদি একটা হাঁক পাড়ি , পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত জড়ো হয়ে থেমে কার্ফু লেগে যাবে রে"। পাশের থেকে চিকন নেকের শিলিগুড়িও নাক বাড়িয়ে ফুট কাটল :
"দাদা কিন্তু ন্যলখ্যাপা না, পুরো প্রতিবাদী ভাবমূর্তি!"
এইবার মুম্বাই উত্তপ্ত পরিস্থিতি লঘু করার চেষ্টা করল। একটু হেসে বলল: " কলকাতা দাদা, আপনাদের ক্যাতো দিতে হবে?কি চাই আপনাদের"
কলকাতা হালকা চালে বলল: " এইতো বুঝেছেন, আপনারা দেবেন আমরা নেবো। তালমিল হবে আর তা ন হলে অন্য বাগানে সিঙ্গাপুরি কলা হয়ে ফোটো। তা, বেশী কিছু লাগবে না।
ঐ শহর ভিত্তিক জিডিপি টা পুরো দেবেন।তাহলেই হবে, সাথে আরেকটা শহরও দেবেন আর তাতে বেশ কিছু অন্যান্য বিষয়ও থাকতে হবে। সেই লিস্ট টাও বলে দিচ্ছি"।
কলকাতার কথা শেষ হতে না হতেই, কেউ কিছু বলার আগেই চেন্নাই লাফিয়ে উঠে বলল: "স্যর, একটু কমসম নিলে হয় না!পুরো শহরের জিডিপির থেকে বরং রাজ্যের পার হেড জিডিপির অর্ধেক নিলে হয় না?"
এই শুনে কলকতা আবার একটু গম্ভীর হয়ে চেন্নাই এর দিকে তাকিয়ে বলল: "তুই কি আমাকে ভিখিরি পেয়েছিস? দেশের মধ্যে শহর হিসাবে আমার জিডিপি তৃতীয়, সেটাই দিবি। রাজ্য জিডিপি পার হেড জিডিপি এর মধ্যে আসবে না, সেই গুলো আলাদা হিসাব"।
এই শুনে ভিমরী খেয়ে দিল্লী বলে উঠল : "কলকতা দাদা, আপনি আরও কুছ চাইলেন। নতুন শহরে কি কি চাই বলছিলেন, একটু সেই লিস্ট টাও দয়া কোরে  বোলেন।"
কলকাতা এইবার খোশমেজাজে হেসে বলল: "এইতো মন কি বাত পেয়েছি। আসলে জিডিপি অর্থ এইগুলো কি আমি নেব, এই গুলো তো উন্নয়নের কাজে লাগবে। বরং আমার যে বিষয়ে ইন্টারেস্ট সেটা হোলো কালচার।আসলে, কালচারের বিষয়ে আমিও আছি। সেই আমার ছাত্রাবস্থা থেকে কালচার-শিল্প সব জড়িয়ে গেছে আমার নামের সাথে। তা যা বলছিলাম, নতুন যে শহর টা দেবেন তাতে এই বিষয় গুলো থাকতেই হবে - পাঁচটা নোবেল, একটা অস্কার, বেশ কিছু ভারতরত্ন-গ্র্যামি-বুকার , প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, অগ্রণী বিশ্ববিদ্যালয়, একটা জাতীয় ফুটবল ক্লাব, একটা বিদেশী ফুটবল খেতাব জেতা ক্লাব, দশ হাজারের উপর রান করা ক্রিকেট অধিনায়ক, একটা উন্নত সাহিত্য-চলচ্চিত্র-গান-নাটকের পরিবেশ, দূর্গাপূজোর সেলিব্রেশন, বড়দিনের আলো,আর ঈদের বিরিয়ানির সাথে রসগোল্লা-ছানার মিষ্টি-দই,স্ট্রিট ফুড রোল-চাউমিন, সাথে কিন্তু ইলিশ-চিংড়ি মাছের বাজার মাস্ট ।আর হ্যা, অবশ্যই বিকেল বেলায় তপ্ত দিনের শেষে মন ঠান্ডা করে দেওয়া একটা মিষ্টি হাওয়ার ছোয়া, ব্যাস এইগুলোই থাকলেই হবে, সেই শহরে।কি পারবেতো এগুলোর ব্যবস্থা করতে? "
লিস্ট পেষ করে কলকতা উপলব্ধি করল সন্ম্নুখে  এক অখন্ড নীরবতা বিরাজমান! দিল্লী-মুম্বাই-চেন্নাই-ব্যাঙ্গালুরু উদাস ভাবে তার পানেই চেয়ে রয়েছে। শেষে চারজনেই বিদ্যুত্স্পৃষ্ট স্বরে অস্ফুটে বলে উঠল: "মিসটেক, মিসটেক!"
তারপর, দিল্লী এগিয়ে এসে কলকাতার হাতে হাত রেখে বলল: "কলকাতা দাদা, তোমহার মূল্য নির্ধারণে হামরা অক্ষম, যা বুঝলাম তুমহি বেশ কিছু বিষয়ে বেস্ট। তুমহার কাছে এমন কিছু আছে যা এই মহাভারতেও অন্য কোথাও নেই, আর সেটা থাকা সম্ভবও না! আমরা তোমাকে- তোমার বর্তমানের বিচারে দাঁড়ি পাল্লায় তুলেছিলাম। হামাদের ভূল হয়েছিল, তোমহার ঐতিহ্য বৈশিষ্টগুলিকে সমঝ্তে পারিনি।ছোড়ো দাদা, ভালো থেকো, হামরা চললাম। " ওরা চারজন এগোতে উদ্যত হতেই ওদের পথরুদ্ধ করল কলকাতা। তারপর শান্তস্নিগ্ধ ভাবে চারজনের চোখে চোখ রেখে মুখের কোণে হাসির রেশ টেনে বলল ,"আরে সেসব কিচ্ছু মনে করিনি, তোমাদের নিয়ে। আসলে আমার কালচার টা এমন ভাবে রক্তে মিশে গেছে যে ও আমার কারোর উপর কোনো রাগ থাকেনা, আমি সবাইকে দুহাতে আপন করে নেই। ছাত্রজীবনে আমি একটা কবিতাও তো লিখেছিলাম বঙ্গের কালচার নিয়ে:
প্রথমার্ধে প্রবল কৃষ্টি-সৃষ্টি , মাঝে দশবিশবছর বিরতিতে চুপটি করে বসুন।
বিরতি শেষ, আবার নামব মাঠে, ভারতবাসী নবরূপে আগামীর কলকতাকে চিনুন।।
- যাইহোক খালি পেটে অতিথিকে ফিরতে দেইনা আমি, সে তোমরা যে পরিকল্পনাতেই এসে থাকো চলো ভরপেট মিষ্টি খাইয়ে তবে ছাড়ব। আর আমরা সবাই সবার "মিত্র" ছিলাম-আছি-থাকব, সকলের তরে সকলে আমরা। এই শুনে দিল্লী হাসতে হাসতে কলকতাকে জড়িয়ে ধরে বলল "দিল জিতে নিলে দাদা, চলো রসগুল্লা খাবো "। তারপর কলকতা দুইহাতে তালি দিয়ে একটা রসগোল্লার হাঁড়ি সবার মাঝে এনে রাখল । এবার সবাই সবার কাঁধে হাত রেখে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী রচনা করল, সাত শহর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে চলার অঙ্গিকার বদ্ধ হয়ে হাসতে হাসতে রসগোল্লার রসে বশে মিশে গেল।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

কলকাতা নিয়ে পূর্ববর্তী ব্লগ এই লিঙ্কে: 

https://avrasoura.blogspot.com/2022/08/blog-post_23.html


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"