নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।ভেলা দক্ষিণ দুয়ারে আশায় ভাসে।।
ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে একটি অতিবিরল দৃশ্য হয়ত দেখতে চলেছি, আমি একা না, সবাই দেখবো- একসাথে। চন্দ্রযান অবতরণের দৃশ্য তো দেখবোই, সেইটা বলে বোঝানোর মতন ভাষা হয়ত মস্তিষ্ক লিপিবদ্ধ করতে আবেগে অক্ষম হবে সেই বিরল মুহূর্তে। তবে, চন্দ্রযান অবতরণের দৃশ্য ব্যতিরেক আরেকটি দৃশ্য ভেবে হৃদয় পুলকিত-আশান্বিত। আগেও সেই আনন্দময় দৃশ্য মাত্র বার দুয়েকই হয়ত দেখেছি। তাই সেই দৃশ্যের কল্পনা করছি ভীষণরকম!
কিন্তু কি এমন দৃশ্য যা চন্দ্রযান এর সাথেসাথে দেখতে চাইছি, যার জন্য উতলা হয়ে অপেক্ষারত হয়েছি। আচ্ছা,আপনার কৌতূহলী মনও কি তা জানতে চাইছে? চলুনতো দেখি সেই দৃশ্য আপনিও দেখতে চাইছেন কিনা!
এখন, সারা দেশ অধীর আগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষারত।একটাই প্রশ্ন ঘুরছে: এইবার ঠিকঠাক অবতরণ হবে তো? ওদিকে খবর এসেছে একই লক্ষ্য নিশ্চিত করে ভীমবেগে ধাবমান রাশিয়ার চন্দ্রযান টি গতকাল আছড়ে পড়েছে চন্দ্রবক্ষে! এখন পরীক্ষা আমাদের চন্দ্রযানের।
আচ্ছা, আমেরিকা-রাশিয়া তো অনেক আগেই চন্দ্রাবতরণ করেছিল,এবং বারংবার করেছিল; অনেক বার বিফল হয়েও শেষ অব্ধি জিতেছিল। তারপর চীন ও নেমে পড়ল চাঁদে, বেশ কয়েকবারের প্রচেষ্টায়। এরপরেই এলো আমাদের ইসরোর অধ্যায়; ইসরো যখন চন্দ্র অভিযান পরিকল্পনা করছে তখন ইতোমধ্যে ঐ তিন দেশ নেমে পড়েছে চাঁদের ছাদে। ইসরো প্রথমেই বিশ্লেষণ করে দেখল আগের দেশ গুলো নেমেছে একটু সুবিধা জনক অবস্থানে : চাঁদের যে অঞ্চলে সূর্যালোক পৌছায় - সব কিছু দিনের গোচরে সুস্পষ্ট। এক্ষেত্রে ,আমাদের ইসরো প্রতিস্পর্ধী ভাবনায় চাঁদের ভেলা ভাসাতে চাইল। "ওরা দৃষ্টিতে জিতল, আমরা না হয় দূরদৃষ্টিতেই চন্দ্র বিজয়ের প্রচেষ্টা করি" এই মন্ত্র জপে ইসরো চিহ্নিত করল সব থেকে দূর্গম স্থানেই চন্দ্রবিজয় করবে ভারত। "চাঁদের দক্ষিণ প্রান্তে" - যে স্থান সম্পর্কে বিষদে কেউ কিছুই জানে না, ওখানে সূর্যও অনাহূত! আলো নেই। সেই অজানা কে জানতে, অচেনাকে চিনতে নেমে পড়ল ইসরো, সাথে সারা ভারত!
প্রথম চন্দ্র অভিযান কালে, ২০০৮ সালে পূর্ব পরিকল্পিত পথে ঠিক হয় চন্দ্রযান কে আছড়ে ফেলা হবে চাঁদের বুকে।প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের ১০০ কিলোমিটার কক্ষপথে আমরা প্রথম ধাপে পৌছতে পারলাম কিনা? সেই অভিযান সফল হবার সাথেসাথে পরিকল্পনায় এল দূর্গম-গিরি-গহ্বর-অচেনা- অসূর্যম্পশ্যা নিকষ আন্ধারেই এবার নামবে ভারতের বিক্রম। সেই আশায় অগ্রসর হয়েও শেষ মুহূর্তের যান্ত্রিক গোলোযোগে আশা ভঙ্গ হোলো দেশের-দশের! ২০১৯ এর গভীর রাতের শেষ লহমায় শেষ ল্যপে আছড়ে ছিটকে পড়ল আমাদের বিক্রম! সাথে আছাড় খেল আপামর দেশবাসীর আশা ভঙ্গের নীরব মনের ভাষা।তবে সেদিন কিন্তু কোথাও কোনো দোষারোপ নেই। একমন্ত্রে যন্ত্রের প্রতি ভগ্নহৃদয়ে নিশ্চুপ হয়েছিল দেশ!সেদিন ভারতের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল একমনে - জাতি-ধর্ম রাজ্নীতি নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে বিফল মনোরথে বলে উঠল: "ইশ্শ, একটুর জন্য হোলো না!" যদিও সেদিন বিক্রম সঠিক পথে নামতে পারেনি, কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্রযান দেখিয়ে দিয়ে গেল দেশ সংঘবদ্ধ একদেহ একপ্রাণ হয়ে উঠেছে এক যন্ত্রের কারণে। সবাই সেদিন এক সাথে রাত জেগেছিল দিনের ক্লান্তি ভূলে। ঐ মলিন ভাবনার মাঝেই স্মৃতি জানান দিলো , করুণ মুখে এইভাবেই দেশ আরো এক-দুবার কেঁদেছিল নিভৃতে।১৯৯৬-২০০৩ এর ক্রিকেটীয় সান্ধ্যবাসরে দেশ হতাশায় ডুবে গিয়েছিল; দেখেছিল তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ার করুণ দৃশ্য।সেদিন থেকেই নিশ্চুপ অপেক্ষা করেছিল দেশ, ২০০৭-২০১১ এর সেই স্বপ্নের রাতে দুটোর আশায়। একসাথে জয়ের আনন্দে বাধন ভেঙ্গে মেতে ওঠার জন্য!
একই ভাবে ২০১৯ এর বিক্রম বিফলেও দেশের মন হয়েছে নিভৃতে নিশ্চুপ। অপেক্ষা করছে সেই আনন্দ দৃশ্যের যখন আগামী ২৩ শে আগস্ট সারা দেশ আবার এক হয়ে যাবে, সব বিভেদ-বিতর্ক ভুলে হাত তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলবে
- "এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে পৌছে গেছি, ঐ চাঁদের বাড়ি। "
এই দৃশ্যটাই দেখতে চাইছি, মনে প্রাণে সবাই চাইছি যেন দক্ষিণ দুয়ারের কাঁটা অতিক্রম করে বীর বিক্রমে প্রজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক চাঁদের অন্ধ্কার কলঙ্ক রেখা। এই দৃশ্যটাই আসুক, তারপর দেশবাসী একসাথে মিলে মিশে মিলন দৃশ্য তৈরী করবে, সেটাই দুইচোখ ভরে দেখব।
কিন্তু, যদি হঠাৎ করে মেঘ তারা খসে পড়ে , কি হবে? কি আবার হবে , "যাত্রা করার উদ্যম টাই প্রধান ছিল, আবার আসব ফিরে সেই আশায় ভর করে- ঠিক পৌছে যাব একদিন।
একদিনে সব সফলতা না এলেও একদিন প্রচেষ্টা সফল হবেই।" আজ সেই সাফল্য মুহূর্তই হয়ত সমাগত। বুকের মাঝে স্বপ্নের মতন মায়ের বুলি আশায় ভেসে বেড়াচ্ছে:
আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা।
আমাদের চন্দ্রযান নামিয়ে নিয়ে যা।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন