নানা নাম নানা কারণ নানা অর্থ-অভিধান। এক মানুষের মাঝে ছদ্মনামে বন্ধুরা মেলান।।
আজ ভাবছি ছদ্মনামের অষ্টোত্তর শতনাম নিয়ে একটা আলোচনা করলে কেমন হয়?
অষ্টোত্তর-শতনাম বা ছদ্মনাম দেখেই মনেমনে ভাবছেন তো এইবার ঠাকুর দেবতা অথবা বিখ্যাত মনীষীদের নামের লিস্ট নিয়ে ক্যুইজ খেলব? না, সেরকম ইচ্ছে নেই। তবে ছদ্মনাম-শতনাম বললাম যখন, নিজদের জীবনেই পাওয়া নাম গুলো নিয়ে একটু ঘুরে ফিরে দেখলে কেমন হয় বলুনতো ?
চলুন, তাহলে একটু ঘুরে ফিরে দেখি- আমি-আপনি-আমরা সবাই একটু অন্য ধরনের নিজদের ভিন্ন নামের স্মৃতির খেলায় মাততে পারি কিনা ছদ্মনামের ছায়ায় : নানা নামের নকসায়।
আচ্ছা তাহলে শুরু করা যাক ,
প্রথমে একটু কল্পনা করুন- মানে ছদ্মনাম নিয়ে যেহেতু রংমিলান্তি খেলায় আপনি নামছেন তখন আপনি আজ মনের সুখে ভাবুন ; সেই ভাবনার গলি দিয়ে দেখতে পেলেন একটি প্রখর রৌদ্রের তাপদাহের মাঝে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় গভীর-গম্ভীর কোনোএক কর্মে ব্যস্ত আছেন। এমন সময় আপনার ভ্রাম্যমান দূরভাষে একটি টুংটাং শব্দ ভেসে উঠে জানান দিল আপনাকে কেউ স্মরণ করেছে - ট্রুকলার সমন্বিত কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম সৌরভ- কিন্তু নামের শেষে লেখা ১!
সৌরভ-১ ফোন করেছে। এইবারই শুরু হোলো সেই রহস্য- আপনার মাথা এখন প্রচন্ড গরমে সুপার কম্পুউটার এর মতন তেতে উঠে তেড়েফুঁড়ে স্মৃতির অতলে খুঁজতে থাকল কে এই সৌরভ-১? একি- প্রাইমারি স্কুলের কালো জলে কুচলা তুলে "কেল্টু" সৌরভ; নাকি- মাধ্যমিক এর জিগরি দোস্ত চটপটে "বেজি" সৌরভ? ওহ- নাকি কলেজের "ক্রিস গেইল" সম চেহারার "ল্যাটা" সৌরভ!
কে - জানে এ আবার আগের অফিসের বস "মোটা" সৌরভবাবু কিনা? এত বিন্যাস-সমবায়ে আপনি যখন চারটি সৌরভের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যস্ত হঠাৎ অনুভব করলেন সাধারণ প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় অল্রেডি মুখ দিয়ে শব্দবাণ বেরিয়ে গেছে- "হ্যালো!" আপনি ইতোমধ্যে ফোনটা গ্রহণ করেছেন।
অপর প্রান্ত থেকে ফোনের আড়াল থেকে একজন বলছেন: "আমি সৌরভ বলছি"।
এদিকে, আপনি মনে-মনে উত্তেজিত হয়ে ভাবছেন: "উফ্ফ সেকি আর জানিনা! তুমি সৌরভ বলছ, কিন্তু কোন সৌরভ সেটাই তো বলছ না, আর!-সেটাই তো ধরতে তো পারছি না এ কোন সৌরভ"। যাই হোক"ধরণী দ্বিধা হও" বলে; আপনি কিন্তু-পরন্তু করে, ইতস্তত স্বরে বলছেন -
"একটু দয়া করে বলবেন,মানে আপনি কোন সৌরভ?"এরপরেই আপনি অনুভব করলেন অপর প্রান্তে এক নীরব দীর্ঘশ্বাস, এক পলক সময় এর হঠাৎ হোঁচট খাওয়া!
আপনি অতি লজ্জিত, কিন্তু অপরাগ! তপ্ত দুপুরে গৈরিক তাপসের ত্যাগের মতন এক একটি মুহূর্ত-সময় অতিবাহিত হয়ে চলেছে একএকটি বছরের ন্যায়। আপনি আর চুপ থাকতে না পেরে পুনরায় আকূল স্বরে বলেই উঠলেন: "আমার সত্যি খুব খারাপ লাগছে,কিন্তু আপনা কে আমি সত্যি অনুধাবন করতে পারছি না আপনি কোন সৌরভ! দয়া করে বলবেন আপনি কোন সৌরভ?"
অপর প্রান্ত থেকে এবার এক বিস্ময়সূচক আর্তনাদ শুনতে পেলেন- "গলা শুনেও তুই আমাকে চিনতে পারলিনা ? এখন আবার আপনি-আজ্ঞে করছিস?"
ফোনের বিপরীত প্রান্তে তুই-তুকারি শুনে আপনি একদিকে একটু স্বস্তি পেলেন: "যাক হারাধনের চারটি সৌরভ থেকে একটি তো গেল বাদ, এ সৌরভ আগের অফিসের মোটা সৌরভ তো নয়; তুই তুকারি করে বলছে যখন। কিন্তু তাহলে এ কে? প্রাইমারি- স্কুল-কলেজ এর তিন সৌরভই তো তুই-তুকারি করত। এইবার কিভাবে চিহ্নিত করি এ কোন অবতার?
হঠাৎ আপনার মাথায় এইবার ক্যাপ্টেন স্পার্ক এর মতন বুদ্ধির স্পর্শক মাথার ধার দিয়ে আলতো করে ছুয়ে বেড়িয়ে গেল। আপনি স্থান-কাল-পাত্রের মধ্যে কালের হাতে কল টা দিলেন সঁপে। তারপর স্বরটা মোলায়েম করে হাসতে হাসতে বললেন: "আরে ধুর, বুঝলি না একটু মজা করছিলাম তোর সাথে। বুঝিসই তো, তা কত্তবছর পরে কথা হচ্ছে বলতো ভাই?" - আপনি এটা বলে মনে মনে নিজেকে শ্যেন ওয়ার্নএর মতন জাদুকর ভাবছেন : কি একটি গুগলিই না দিয়েছেন। এইবার ও সময়কাল বলে দিলেই ব্যস, ম্যচ ও ক্যাচ দুইই কটকট হবে। কিন্তু তারপরেই আপনি বুঝতে পারলেন: অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়।
স্পিনের বাক্যে বিঁধে আপনি তা-ধিন-তা-ধিন করে নৃত্য করছিলেন ,তা হোলো ক্ষণস্থায়ী! আসলে, আপনি যদি নিজেকে স্পিনের জাদুকর ভাবেন তো আপনার বিপরীতে এক্জ্ন বাঘা ব্যাটার দাড়িয়ে আছে, না ইনি মরুঝড়ের শচীন না; বরং আপনার বিড়ম্বনা বাড়িয়ে তুলেতে ব্যাট হাতে দাড়িয়ে আছেন যেন স্বয়ং মিস্টার নির্ভরযোগ্য! একদম রাহুল দ্রাভিড় এর স্টাইলে আপনার গুগলি-প্রশ্ন টি সুন্দর ভাবে বুঝে দুই হাত উপরে তুলে খেলার চেষ্টাই করলেন না আপনার বন্ধু। শুধু হিমশীতল কণ্ঠে বললেন: "তুইই বল, কতদিন পরে আমাদের কথা হচ্ছে"?
ব্যস আপনি এবার "ফাঁদে পড়িয়া বগা কাঁদে"- শ্যেন ওয়ার্ন থেকে সোজা হরলিক্স সোহম। রঘুপতির ন্যায় করুণ স্বরে মনেমনে বলছেন :
"সৌরভ ধ্যান, সৌরভ জ্ঞান, সৌরভ চিন্তামণি।
সৌরভ এর অন্বেষণে আমি যেন মণিহারা ফণী।।"
কৃত্তিবাসের করুণ ধারায়- কি এক মায়ায়-অনুপ্রেরণায় আপনার মধ্যে সত্যবোধ জাগ্রত হোলো। আর, আপনি সোহম থেকে এই তাপস তপ্ত দুপুরে সোজা কাট টু তাপস পাল- "শেষ জয়ে যেন হয় সে বিজয়ী , তোমারই কাছে তে হারিয়া!"- এইবার গদগদ স্বরে বলে উঠলেন: "সত্যি রে, কত্তদিন তোর মুখ থেকে নিজের ডাক নাম টাই শুনিনি ভাই -, ঐ মধুমাখা ডাক নাম একবার বলো রে"।
সাথে সাথে প্রবল প্রতাপান্বিত হিমশিখরে মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির ন্যায় বাক্যবাণ বর্ষিত হতে শুরু হোলো, অপর প্রান্ত থেকে। আপনার বন্ধু এক-এক করে যা আসছে উগরে দিচ্ছে আর আপনি শিকারী শার্দুল এর মতন অপেক্ষা করছেন। সঠিক শব্দটি: আপনার ছদ্মনামটি শোনার জন্য -"ও বন্ধু তুমি শুনতে কি পাও এ নাম আমার"!
এদিকে ভিতরে আবার আপনার এখন মন কি বাতের সময়।প্রত্যাশিত ছদ্মনামের সম্বোধন এর হিসাব কষে আপনার মগজাস্ত্রটি যুক্তি সাজিয়ে রেখেছে সুপার কম্পুটারে-
যদি আপনাকে "শুভ্র বরাহ" বলে তার মানে এই হোলো প্রাইমারির কেল্টু,
যদি আপনাকে শুধু "মোটা" বলে তারমানে এ হোলো মাধ্যমিক এর "চটপটে বেজি" আর যদি বলে "ঐরাবত" তার মানে এই হোল বিশাল বপু "লেটু গেইল"।
এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ,আপনার বন্ধু আপনাকে "ঐরবতের" সুরে -শুঁড় দুলিয়ে ডেকে উঠতেই আপনি জটায়ুর মতন শিশুভোলানাথ স্বরে খুশী মনে নেচে উঠে বলে উঠলেন- এই "নাম" টা আমার!
ব্যস এরপর আর কি? "ঐরাবতের" সাথে "লেটু গেইল" এর এক প্রস্থ আলাপ আলোচনা চলল বহু যুগের ওপার হতে। আর হ্যা, হঠাৎ কারেন্ট টাও এসে গেল।
.... প্রায় তিরিশ-চল্লিশ মিনিট কথা শেষ হবার পরে মোবাইল টা হাতে নিয়ে আপনি এইবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে বসলেন। আরে না, কর্মক্ষেত্রের কাজ আজকে আর নয়। আজ একটু আগেই আপনি নিজের মধ্যে অনেক গুলো রঙ্গমঞ্চের কলাকুশলীকে খুঁজে পেয়েছেন । সবকটি নাম-চরিত্রই আপনার ,শুধু পিছনে ফিরে দেখলেন চরিত্র গুলোর উপর একটু ধুলো জমেছিল স্মৃতির পাতায়। আপনার জীবনপথে বন্ধুরা যখন যে-যেনামে ডাকত আর আপনিও তাদের যেই নামে ডাকতেন আজ সেই ডাকেই নাহয় সাড়া দেবার দিন। একটু হারিয়ে যাওয়া, কিছুটা স্মৃতির পাতা উল্টে ধুলো গুলোকে মুছেফেলার দিন।
আপনি নিজেই হয়তো শতনাম ধারণ করে বসেআছেন। আর, সেই সব নামের নীরব উচ্চারণে-ভাবনায় হাসছেন; বক্ষস্থল মাঝে মাঝেই শূণ্যতা বোধ করে ঢোঁক গিলছেন, আবার কখনো বা রুমাল দিয়ে চোখের কোণের পাশটা ছুয়ে নিচ্ছেন, আর নাম নিয়ে ভাবছেন। এই নাম গুলো যেন জীবনপথে নিভৃতে বেড়ে ওঠা অপরাজিতা ফুল- খুব অল্প পরিচর্যায় প্রধান্য হীন ভাবে আমাদের কে অবলম্বন করে-জড়িয়ে বেড়ে উঠেছে। সুবাসও ছড়াতে পারেনি। তবুও,একঝাঁক সবুজ সতেজ নীল নীলিমায় মন টাকে টেনে নিয়ে গেছে ফেলে আসা অতীতে।
অতীতে, একদিন এই সব নামে ডাকলে হয়ত প্রচন্ড রেগেগিয়ে কখনো দিদিমণি-স্যর-অভিভাবক দের কাছে নালিশ করেছেন। আবার কখনো নিজেই দুই ঘা বসিয়েছেন; অভিমানে-দু:খে দুই-চারদিন কথাও হয়ত বন্ধ করেছেন এককালে।
কিন্তু, আজকে যখন এক-একটি ছোট ছদ্মনাম মনে পড়ছে, -স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে ;প্রত্যেক টা নামের পিছনে অবগুন্ঠনে থাকা ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান এর সাহিত্য উপন্যাস পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। সময়ের পথে মিলিয়ে দেখলেন এই নাম গুলো কেমন যেন অস্পষ্ট হতে হতে চাপা পড়ে গেল বড় হবার দৌড়ে। দুই দিন তো দূর; শেষ কুড়ি-তিরিশ বছরেও এই নাম গুলো উচ্চারিত হোলোনা। কে জানে, কিছু নাম আর কেউ উচ্চারণও করবে কিনা!
সেইসব বন্ধু , অনেকের সাথেই হয়ত যোগাযোগ আছে- আবার অনেকের সাথে যোগাযোগও হয়ত হারিয়ে গেছে চিরতরে। অনেকেই হয়ত আছে সেই ভাবে যেমন রাতের সকল তারা থাকে দিনের আকাশ মাঝে। যাইহোক শতনামের ছদ্মনামে ঘুরেফিরে আজকের মতন বিদায় নিলাম। এখন এই সময় টা শুধু আপনার; আপনার বন্ধুর; আর সেই সব ছদ্মনামের মোড়কে নিজেদের বন্ধুত্ব কে নিজেকে, আরো একবার ফিরে দেখার-স্পর্শ করার সময়।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন