হুইসেল বাজাও হান্স-আরুণি!
গতকাল টিভিতে হঠাৎ একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পেলাম। একটি শিশু ,তার বিদ্যালয়ের সামনে বেপরোয়া লরির গতিতে অকালে চলেগেল। শিশু হারানো মায়ের ক্রন্দনে যে কোনো মানুষের বক্ষ বিদীর্ণ - অসহনীয়!
মনটা সারাদিন ভারাক্রান্ত হয়েছিল!এরপরেই বিভিন্ন মাধ্যমে শুরু হোলো আলোচনা: কেন হোলো? কি গাফিলতি-কার গাফিলতি? - অনেক বিশ্লেষণ অনেক যুক্তি-প্রতিযুক্তি শেষে দেখা গেলো ঐ বিদ্যালয়ের ব্যস্ত সড়কের সামনে স্কুলটাইমে কোনো ট্রাফিক নিয়ামক ছিলেননা, যার ফলেই হয়ত এই নির্মম নিয়তি।
ব্যস, এর পরেই প্রশাসন অতিসত্ত্বর-মহাতৎপর। একএক করে পদক্ষেপ নিতে শুরু করল- আজ সেখানে ট্রাফিক এসে গেলো। প্রশাসনের তরফ থেকে লরির চলাচলেও দেখলাম একটি নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যাপারটাই দাড়াল আগে কিছু ঘটুক, না মানে ঘটনা না; - মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটুক! তারপর না হয় একটা প্রতিক্রিয়া ছিটকে বের হবে - তড়িঘড়ি নির্দেশিকা তৈরী হবে।
এখন একটা ছোট্ট প্রশ্ন সামনে এসে উঁকিঝুঁকি দিল - এই যে বাচ্চা টি চিরতরে চলে গেল এটা যে কোনো ব্যক্তিবিশেষ যেকোনো বাড়ির ক্ষেত্রেই হতে পারত; কাল হয়েছে, কালের ঘরে ঘড়ি! পরশুও তো হতে পারত, - হয়নি , -কাল না হয়ে আজও হতে পারত! তাহলে হয়ত আগামীকাল থেকে প্রতিব্যবস্থা চোখে পড়ত। আজকের ব্যবস্থা সমাধান সব ভালো উদ্যোগ, কিন্তু?
শুধু একটাই প্রশ্ন: কেন আগে থেকে নিলেন না এই ব্যবস্থাগুলো?
ও আচ্ছা,কি বললেন?: আগে তো ঘটেনি তাই কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি প্রশাসনের তরফ থেকে।
না, মানে আপনার আপনাদের বুদ্ধি যখন বলছে এইখানে একটি ঘটনাও ঘটেনি তাই এইখানে ব্যবস্থা করা মানে শুধু শুধু ব্যবস্থার অপপ্রয়োগ। সত্যি তো কিছুনা ঘটলে আপনারা কিছু করতে অপারগ! তা, কিছু ঘটতে পারে বা দুর্ঘটনা প্রবণ স্থান হিসাবে চিহ্নিতকরণ - ব্যবস্থা প্রয়োগ এই গুলো আগাম সতর্কতার ব্যুত্পত্তি হয়ত আপনাদের সিলেবাসে নেই!
কি বলছেন, পড়েছেন ?
ওহ-আচ্ছা আপনারা কি হান্স এর গল্প- আরুণি র কাহিনী পড়েছেন।?
পড়েছেন বলছেন। বেশ-বেশ, খুবই ভালো।
তবে, এখন মনে হচ্ছে হয়ত শুনেছেন-পড়েছেন বিশাল নম্বর ও তুলেছেন কিন্তু প্রয়োগ করতে ভুলে গেছেন।
ক্লাস ফাইভে মনে হয় বাংলা পাঠ্যপুস্তকেই হান্স এর গল্পটা ছিল। গল্প টা এরকম: হল্যান্ড দেশের এক ক্ষুদে শিক্ষার্থী সন্ধ্যা কালে বাড়ি ফিরছিল ,এবং ফিরতি পথে সে দেখে তাদের সমুদ্রবাঁধে একটি ক্ষুদ্র গহ্বর দেখা যাচ্ছে। সে বুঝতে পেরেছিল এই গহ্বর রাক্ষসের গ্রাস হয়ে তাদের গ্রামটি কে কিছুসময়েই গ্রাস করবে।হল্যান্ড দেশ টা যেহেতু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নীচে, তাই সমুদ্রকে রুখতে এরকম বাঁধ দিয়ে ঘিরে রাখতে হয় না হলে সলিল সমাধি নিশ্চিত। সেদিন কিন্তু বয়সে ছোট বলে পাশ কাটিয়ে সে চলে যায়নি। হয়ত চলে যেতেই পারত পাশ কাটিয়ে,- ঐ আজকাল আমরা যেমন সমাজিক সমস্যা দেখলে না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাই! ঐ ছোট্ট ছেলেটিও তো ভাবতেই পারত:" আমি কেন ভাবতে যাব? আগে ঘটুক কিছু- তারপর ব্যবস্থা যা নেবার নেবে বড়রা! আমি তো ছোটো মানুষ আমি কেন সন্ধ্যা টা কি হতে পারে ভেবে নষ্ট করব"।
সেদিন সারারাত ঐ ছোট্ট হাতে সমুদ্র ধাক্কা খেয়ে ফিরে গেছিল, ছোট গহ্বরে প্রবেশ করে গ্রাম ধুয়ে দিতে পারেনি।
ও আচ্ছা, হান্স এর গল্প পড়েননি, বিদেশী গল্প! যাই হোক একটু খুঁজলে দেশের পুরাণেও এরকমই আরেকটি চরিত্রের সন্ধান পাবেন। সে বয়সে হান্স এর থেকে একটু বড়ো, সদ্য কিশোর। সেই চরিত্রের নাম আরুণি। সেও একই ভাবে গুরুর ক্ষেতের মধ্যে যাতে জল প্রবেশ না করতে পারে সেই হেতু জমির আল বরাবর সারারাত শুয়ে জল আটকেছিল, ক্ষেত খাদ্য ভবিষ্যত রক্ষা করেছিল।
অনেক প্রশাসন এর মুণ্ডুপাত হোলো, এইবার পাঠক-লেখক আপনারা নিজের দিকে চারটে আঙ্গুল কোন দিকে দিক নির্দেশ করছে একটু দেখি চলুন।
একবার দয়া করে একটু ভাবুন তো সমাজ-প্রশাসন এগুলো কাদের নিয়ে গঠিত?আপনি-আমি-আমরাই তো এই সমাজ। আমরা নিজেরাই কি কোনোদিন কোনো ছাইচাপা সমস্যা কে দেখে একটু হলেও কথা বলেছি? না ঐ তো ভোটবাবু রা যা করার করবে বলে চুপচাপ টুকটুক করে পাশ কাটিয়ে চলে গেছি! হয়ত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা-অধিকার প্রত্যক্ষভাবে আমাদের নেই কিন্তু একটি সমস্যা উদ্গত হচ্ছে সেটা প্রত্যক্ষ করলে অঙ্কুরেই সেই সমস্যা সমাধান সর্বসমক্ষে প্রকাশ এর দায়িত্ব টাও আমরা গ্রহণ করতেই পারি। কি মনে হয়, আপনিই বিচার করুন।
হয়ত তখনই তাহলে ছোট্ট হান্স দের দুর্ঘটনায় হারিয়ে অন্যদের বাঁচার রাস্তার জ্ন্য আগামীর নির্দেশিকা তৈরী করতে হবে না!কারণ আরুণিরাও বাঁচাতে-বাঁচতেই চেয়েছিল ভবিষ্যত কে।
ও হ্যা, আরেকটা কথা মনে রাখবেন সব ঘরেই কিন্তু হান্স-আরুণিরা বড় হচ্ছে। হুইসেল টা কিভাবে বাজাতে হয় ওদের একবার একটু দেখিয়েই দিলেন না হয় সামনে থেকে, ঐ আর কি- পারলে দেখাবেন একটু, বেশী কিছু না হয়তো।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন