প্রতিদ্বন্দীর জয়

"তোদের আবার দিবস!নামের শেষে দৈত্য-দানব বসিয়ে কিভাবে যে তোরা মুখ নেড়ে কথা বলিস ভাবলেই হাসি পায়, এগারো নিয়ে বাগাড়ম্বর তোদের মুখে আর মানায় না।"- তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এই কথা গুলো রনি-টুবলু কে উদ্দেশ্য করে শুনিয়ে হরি দা কে চা দিতে বলল পল্টু।

হরি দার চায়ের দোকানে সকাল-সকাল তিন বন্ধু নিত্যদিনের মতন এসে উপস্থিত হয়েছে। এসে বসতে না বসতেই, রনি উত্থাপন করল মোহনবাগান এর সেই বিখ্যাত আইএফএ শিল্ড বিজয় এর গৌরবগাথা। টুবলু তখনই তাল মিলিয়ে বলল : "হ্যা তাইতো ঠিক বলেছিস রনি , আজ একদিকে উনত্রিশ জুলাই তাতে আবার শনিবার। ১৯১১ এর উনত্রিশ এ জুলাই শনিবারই তো আমাদের ক্লাব মোহনবাগান ২-১ গোলে ব্রিটিশ ক্লাব ইস্ট ইয়র্ক কে পর্যদুস্ত করে বৃটিশ দম্ভ কে পা দিয়ে পিষে দিয়েছিল। আজ সেই শুভদিন- গর্বের দিন !"
এদিকে, দুই বন্ধুর মুখে প্রতিদ্বন্দী ক্লাবের গৌরব গাঁথা শুনে বেশ বিরক্ত হয়েই দুজন কে এই খোঁচা দিল পল্টু। সাথেসাথে নিত্যদিনের অভ্যাস মতন আড্ডায়-তর্কে-বিতর্কে মজে উঠল তিন বন্ধুর প্রাতঃকালের চাচক্র।
পল্টুর কথা শুনে রনি প্রত্যুত্তরে বলল : "বেশী কথা বলে লাভ নেই পল্টু, এই ঐতিহ্য শুধু আমাদের ক্লাবেরই আছে। আমরাই প্রথম পরাধীন ভারতে ইংরেজ দের ক্লাব কে হারিয়ে শিল্ড জিতেছি। এই প্রেস্টিজ অমূল্য, তোরা এসব বুঝবি না! চেপে যা ভাই"। পল্টু তৎক্ষণাত জবাব দিল:
"তোদের যা প্রেস্টিজ ছিল সবই তো গঙ্গাপাড়ে বিসর্জন দিয়ে গলব্স্ত্র হয়ে একটা কর্পোরেট ক্লাব এর ছায়ায় কায়া গোপন করেছিস। এই নিয়ে ঐতিহ্য-দিবস বন্ধ কর এবার , অনেক লোক হাসিয়েছিস!"
দুই বন্ধু ক্রুদ্ধান্বিত হয়ে কিছু প্রত্যুত্তরের পূর্বেই হরি দা চা তৈরী কালে বলল "অগো কি বন্ধ করতে কইছিস পল্টু?"
পল্টু বিরক্তির লেশ মেখে বলল "দেখতে-শুনতে পাচ্ছনা নাকি তুমি? এরা দুজ্ন সকাল-সকাল ঐতিহ্য-প্রেস্টিজ নিয়ে এমন আদিখ্যেতা করছে আর নেওয়া যাচ্ছে না, আচ্ছা তুমিও তো ইস্টবেঙ্গল এর সাপোর্টার। তোমার কি ভালো লাগছে ওদের এই সব বকবকুনি শুনতে?"
হরি দা একটু হেসে বলল "পল্টু, তুই মিছেই রাগ করছিস, ওরা অগো দলের গর্ব লইয়া উল্লাস তো করবোই। ওদের কইতে দে"।
হরিদার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে পল্টু বলল: "হরি দা, তুমি না ইস্টবেঙ্গল সমর্থক? তুমি কি ভাবে ওদের গৌরব-অহঙ্কার শুনেও কিছু বলছ না!  প্রতিবাদ না করে , উল্টে সমর্থন করছ -কইতে দে; সত্যি অদ্ভুৎ"।

হরিদা পল্টুর কথা শুনে মুচকি হেসে বলল: "শন তাইলে , আমি কই কি যেদিন আমরা ঐ দ্যাশ থেকে ভিটামাটি ছাইর‌্যা পিতৃ-পুরুষ এর স্মৃতি উৎপাটন কইরা এই দ্যশে আইলাম তহন এই দ্যাশ এর মানুষ গুলান কিন্তু আমাগো তাড়াইয়া দ্যয় নাই। ওদেরও তো অনেক অসুবিধা হইছে। স্বল্প স্থানে এই এত্তো বাইরের লোক আইলেও ওরা বিরক্ত হইছে, মজা-টিপ্পনী ও করছে আমাগো লইয়া। কিন্তু গায়ে হাত দ্যয় নাই- মাইরাও ফ্যালায় নাই; বরং প্রতিবেশী বানাইয়া লইসে।

আর আজ দ্যাশে-বিদেশে চারদিকে দ্যাখস না এই সব ঘটনায় কি হইতাছে, এই সেইদিন তোরা মণিপুর নিয়ে এত কথা কইলি ওদের নিজদের মধ্যে লড়াই লইয়া ;এক বারো কি ভাবছস একদিন এই অবস্থা তো বাংলাতেও হইতে পারত । ঐপাড়ের লোক গুলান হেই পাড়ে আইলেও এই পারের মানুষ গুলান নিজদের রাগ-অভিমান রে আমাদের উপর দৈহিক নির্যাতনে পরিণত করে নাই।
রাগটারে টাইন্যা লইছে ময়দানের ঘাসে সমাজিক বাঙাল-ঘটির লড়াইয়ে। মোহনবাগান দিয়া ইস্টবেঙ্গল রে আক্রমণ করছে, মনের জ্বালা টারে মাঠের জ্বালায় পরিণত করছে। ওরা তো আমাগো প্রতিদ্বন্দী বানাইছে, শত্রু বানায় নাই ।
ওদের জয়ে আনন্দিত না হইলেও ওদের আনন্দে খামকা বাধা দিতে যাব ক্যান, ঐ আনন্দে আমার তো কোনো ক্ষতি হইতেসে না।"
হরি দার কথা শুনে পল্টু চমকে উঠে বলল তাহলে তুমি কিসের ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হলে? মুখে বলছ মোহনবাগান তোমার প্রতিদ্বন্দী। ওদের বিরোধিতা সবসময় তোমাকে করতেই হবে যদি তুমি সত্যিকারের ফ্যান হও।
হরি দা পল্টুর কথা শুনে হো হো করে হেসে বলল: "কথাডা ঠিক কইলি না রে পল্টু, প্রতিদ্বন্দী আর শত্রুর মধ্যে পার্থক্যডা বোঝ। ওদের ভালো হইলে সেইডা দেখে শিক্ষা নেওয়া যাইতে পারে, উন্নতি করা যাইতে পারে; তাই বলে ওগো আবেগ-ভালোবাসা রে অসম্মান করা ঠিক না। একদিন ওরা জেতে- একদিন আমরা, ওদের ঐতিহ্য আছে আমাগো আছে লড়াই।তাই আমি জানি আমরা একডা দায়িত্বশীল প্রতিদ্বন্দী পাইছি, এইডা দুই দলের কাছেই সৌভাগ্যের।
আজ সমাজে তাকাইয়া দ্যাখ , সবাই প্রতিদ্বন্দীর অর্থ না বুইঝ্যা তারে শত্রু বানাইয়া ফ্যলে, আর ঝগড়াঝাঁটি-মারামারি-কাটাকাটি করে কারণ ছাড়াই।
আরে, আমি জিগাই : প্রতিদ্বনদ্বী না থাকলে তুই আগাইবি কেমনে ? প্রতিযোগিতা না থাকলে উন্নতি বন্ধ হইয়া যায়। তাই কই, প্রতিদ্বন্দীরে প্রতিদ্বন্দী হিসাবেই দেখ তারে শত্রু বানাইস না। "- এই বলে হরি দা  তিন কাপ ধোয়া ওঠা চা তিন বন্ধুর হাতে পরিবেশন করল।
হরি দার কথা শুনে পল্টু হতবাক-নির্বাক! কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে তারপর বলল : "ঠিকই বলেছ হরি দা। হ্যা একটু বেশী রিয়াক্ট করে ফেলেছি ওদের আনন্দে! ওদের আনন্দে বিরোধিতা করা উচিৎ হয়নি, এই আনন্দে আমার তো সত্যি কিছু ক্ষতি হয়নি!"
তারপর রনি-টুবলুর দিকে ফিরে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলল-" অভিনন্দন তোদের , মোহনবাগান এর এই কীর্তি বাংলার ঐতিহ্য।"
এই দেখে হাসিমুখে টুবলু পল্টুর পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে স্নেহের স্বরে বলল: একদম ঠিক বলেছিস পল্টু, ঠিক বুঝেছিস। আজ হরি দা কিন্তু সঠিক কথাই বলেছে।
এটা যেকোন মানুষ বল আর জাতি-দেশ যাই বল: এক যোগ্য প্রতিদ্বন্দী র উপস্থিতি প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে। রাজনীতি-সমাজ-অর্থনীতি সবই তো একজন গঠনমূলক প্রতিদ্বন্দীর উপস্থিতি কামনা করে , যে বিপক্ষ কে সম্মান জানায় আবার  চ্যালেঞ্জ ও ছুড়ে দেয়। বিপক্ষের প্রতি অন্তরে মর্যাদা আর সম্মান না থাকলে বিপক্ষ শত্রু হিসাবে পরিগণিত হয় , আর সেই খানেই উন্নতি অবরুদ্ধ হয়ে ধ্বংসের ভিত স্থাপিত হয়। যোগ্য প্রতিদ্বন্দীর প্রয়োজন সর্ব ক্ষেত্রে, নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটায় সুস্থ প্রতিযোগিতা।
আজ দেখ, আমরা কর্পোরেট ধাঁচেই ভারত সেরা হচ্ছি, কিন্তু তোদের সাথে মাঠের আগুনে লড়াই টা  মিস করি। তোদের সাথে সমানে-সমানে সেয়ানে-সেয়ানে লড়াইটা  যতক্ষণ না ঠিকঠাক ভাবে হচ্ছে; এই ট্রফি শিরোপার স্বাদে মনে হয় লবণ কম পড়ছে।
তবে এইবার তোদেরও হয়ত চাকা ঘুরবে। পূর্ণশক্তির পুনরুজ্জীবিত লড়াকু ইস্টবেঙ্গল কে সামনে চাই।আমরা জানি, এরকম নিভু আচের দল নয় ইস্টবেঙ্গল! আশা করছি সেই গনগনে আগুনে আঁচের লড়াই টা সামনেই দেখব এইবার!
ঐতিহ্যের মোহনবাগান এর এক এবং একমাত্র প্রতিদ্বন্দী হতে পারে পিছিয়ে পড়া প্রতিকূল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো লড়াকু আগুনে ইস্টবেঙ্গল।
জয় কলকাতা ডার্বি।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।

পূর্ববর্তী: ময়দানের জার্মান 

https://avrasoura.blogspot.com/2022/08/blog-post.html

©️ছবি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান প্রতিদ্বন্দী সূত্র: গুগল -ফেসবুক আইএসএল বিজ্ঞাপন।।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"