তুমি অর্জুন, তুমি অর্জুন ।মণিপুরের দ্যূতসভায় তুমি নিশ্চুপ নিদারূণ।।
হিংস্র চিত্রক ব্যাঘ্র এর ন্যায় চিৎকার করে উঠল চিত্রাঙ্গদা: অসহ্য, অকথ্য এ কি বীভৎসতা মাঝে রয়েছে সন্তানকূল। আজ আমি আর নিশ্চুপ নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে পারছিনা। আমি এই মুহূর্তে ধরা ধামে মণিপুরে ফিরে যাচ্ছি পার্থ। তুমি দেখেছ, আমার মায়েরা- মেয়েরা কি নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছে। আমি আজ আবার যুদ্ধে নামব সেই হিংসার বিরুদ্ধে , স্বর্গের আনাচে কানাচে সেই রণহুঙ্কার প্রতিধ্বনিত হোলো।
চিত্রাঙ্গদার রণহুঙ্কার শুনে অর্জুন বিচলিত কণ্ঠে বলে উঠল: "আহা, প্রিয়ে এত উত্তেজিত হোচ্ছ কেন? আমরা কি এখন হুটহাট ফিরে যাব বললেই ফিরে যেতে পারি নাকি মর্ত্যলোকে?"
চিত্রাঙ্গদা বিস্ময়ে বলল:" কি বলছ তুমি, আমি যাবনা? আমার মনের মণিকোঠায় যে স্থান স্বপ্নে শয়নে বিদ্যমান সেই মণিপুর আজকে পুড়ছে! কি দরকার আমার এই স্বর্গের যেখানে জন্মভূমি আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায় দাড়িয়ে আছে, ভাই ভাই কে মারছে, বোনের সম্ভ্রম ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে! আমি যেতে পারব না! না পার্থ, আমি যাবই যা কিছু হোক যেতে আমাকে হবেই।"
অর্জুন চিত্রাঙ্গদার জেদ দেখে একটু ভেবে উত্তর দিল: "শোনো, এখন মর্ত্যলোকে অন্যরকম ব্যাপার। গণতন্ত্র নামক এক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। ঐ আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থের কাছেই তো একটা ভবন থেকে সব নির্দেশ যায়। আমরা সেই কবে মর্ত্যলোক ত্যাগ করেছি তবু দেখো সেই ইন্দ্রপ্রস্থ বা হস্তিনাপুর এর নিকটবর্তী অঞ্চলই দেশের কেন্দ্রে। আর, আমি তো আমার দেশ কে জানি? আমার দেশ আজকে নিশ্চয়ই তোমার দেশকে সাহায্য করবে। তবে তোমার একটা ভূল হচ্ছে, মণিপুর নামে দুটি স্থান বিদ্যমান। তুমি যেখানে মনুষ্যজন্মে ছিলে সেটা কিন্তু এই মণিপুর না। এটি ভারতভূমির উত্তর পূর্বের অংশ। ঐ প্রাগজ্যোতিষপুর এর সন্নিকটে , তুমি তো যে অংশের মণিপুরে ছিলে তা আজকে উড়িষ্যা ও অন্ধ্র অংশের মধ্যে অবস্থিত।চিন্তা কোরোনা , তোমার দেশ ঠিক আছে। এত উদ্বেলিত হওয়া ঠিক না, তুমি না নারী হয়েও সব বাধা অতিক্র্ম করে এক প্রকৃত যোদ্ধা হয়ে উঠেছিলে। এই আচরণ তোমার শোভা পায়না।"
চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের কথা শুনে আঁতকে উঠে বিষাদময় কণ্ঠে বলল: "তোমার দেশ রক্ষা করবে আমার দেশ কে? অর্জুন তোমার দেশ? তোমার দেশ কি আমার দেশ না? হয়ত ,মণিপুর যা আমার আবাসভূমি ছিল তা উপদ্রুত উত্তর পূর্বের মণিপুর এর থেকে ভিন্ন , কিন্তু সেই পর্বত সন্নিহিত উত্তর পূর্বের মণিপুর কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে আছে বলে কি সে দেশ এর থেকে আলাদা!
আর আমি নারী বা পুরুষ না, আমি মানুষ। আমি অস্ত্র বিদ্যা করেছি কি করিনি তার থেকেও প্রণিধানযোগ্য হোলো যে অন্যায় হয়েছে আমি তাতে আন্দোলিত হয়েছি। আজ আমি অস্ত্র বিদ্যা করেছি তাই অস্ত্র দিয়ে প্রতিকারের প্রচেষ্টা করতে চাইছি, যে শাস্ত্র বিদ্যা করেছে তার শাস্ত্র নিয়ে প্রতিকারে নামবে - আর যে হয়ত সেই ভাবে কোনো বিদ্যার সুযোগ পায়নি সে তার মনুষ্যত্ব-বিবেক কে সম্বল করে প্রতিবাদে অবতীর্ণ হবে।
শাস্ত্র-অস্ত্র এর থেকে অনেক বেশী মূল্যবান বিবেক-মনুষ্যত্ব, অসহায় নিপীড়ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
অনেক বার শুনেছি, কষ্ট পেয়েছি আজ শুধু জিজ্ঞেস করছি - আচ্ছা বলোতো, তোমার হৃদয়ে বা মস্তিষ্কে কি তোমার শরীরের কোনো অংশে ব্যথা হলে সেই ব্যথায় তৎক্ষণাত সাড়া দাও না? নাকি অপেক্ষা করো কোনো পারাবত উড়ে এসে কানে কানে বলে যাবে তোর কুন কুন যায়গায় ব্যথা!
অর্জুন আমার দেশ তোমার দেশ সবার দেশ এক, এই কথাটা আজকে আমি তোমাকে বললাম সরাসরি।
তোমার হাতে তো গাণ্ডীব আছে, তুমি কি এতদিনে পারতে না এই দুর্বিষহ অব্যবস্থা কে রুখে দিতে? অনেক যুগ আগে দ্যূত সভায় অন্যায়এর সামনে যেমন রুখে দাড়াও নি আজকেও তুমি উদ্বেলিত হলেনা! সেদিন ও নারীর অপমান হয়েছিল আজকেও হয়েছে, তুমি একবার সেটাও ভাবলেও না! সেদিন তো নিজের ঘরের সম্মান ভূলুন্ঠিত হয়েছিল বলে তীব্র আক্রোশে সব ধ্বংস করেছিলে কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে, আজ তুমি চুপ কেন? ওই মানুষ গুলো-ভাই-বোন- সন্তান গুলো অনেক দূরে থাকে তাই কি এই অবহেলা? শোনো ফাল্গুনী,
যতক্ষণ না মন থেকে তুমি আমাদের দেশ কে এক দেশ মানছ তুমি তোমার অন্তর থেকে কিন্তু কিছুই করতে উদ্যত হবে না, এটাই হতাশার এটাই দু:খের।"
এতকিছু বলে অশ্রুপূর্ণ চোখে অর্জুনের চোখের দিকে তাকাল চিত্রাঙ্গদা। ধনঞ্জয় আর ঋজু চোখে তাকিয়ে থাকতে পারল না, চোখ নামিয়ে নিল এক মানসিক গ্লানিতে। হতাশ হয়ে বলল: "হ্যা চিত্রাঙ্গদা আমি ভূল বলেছি। মণিপুরও আমার দেশ , আমি বুঝতে পেরেছি ভুল ছিল আমার মধ্যে। কিন্তু তবুও বলছি আমি বা তুমি আমরা কেউই এখন দৈবপ্রভাবে এই ভূল ঠিক করতে পারিনা, সখা কেশবও আজীবন সেই কথাই বলে গেছে ।
সে চাইলে যুদ্ধ হয়ত এক মুহূর্তে সমাপ্ত করতে পারত কিন্তু সে তা করেনি, মানুষ কে শিখিয়েছে মানুষ এর ভূল-ত্রুটি-সংশোধন মানুষ কেই করতে হবে। মানুষ এর থেকে থেকে বৃহ্ৎ কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না, ভগবানও না। মানুষই সব । তাই বলছি দেশের সব মানুষ কে এগিয়ে আসতে হবে, না হলে এই সমস্যা রয়েই যাবে।"
চিত্রাঙ্গদা কৌতূহলী হয়ে বলল: "এতদিনে কেউ তো এগিয়ে এলো না পার্থ? দেশের এক অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে বাকিদের ভ্রূক্ষেপ তো দূর, খবর ও কেউ নেয়নি । সবাই যে যার নিজের মতন আছে। কিভাবে এরা এগিয়ে আসবে?"
চিত্রাঙ্গদার কথা শুনে অর্জুন হেসে বলল - "আসবে, মানুষ এগিয়ে আসবে। একটা ঘটনা বলি; এই আজ থেকে ধরো শত বৎসর পূর্বের এই দেশে ঘটে যাওয়া এক সত্য ঘটনা বলি তোমাকে। ঐ যে ইন্দ্রপ্রস্থের নিকটস্থ একটি ভবনের কথা বললাম ওরকম স্থানেই আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এক জন দামাল তরুণ শিখ সশব্দে অগ্ন্যুতপাত করেছিল, আজকের দেশের ভাষায় প্রধান প্রশাসনিক ভবনে আগ্নেয় গোলক ছুড়েছিল, কিন্তু কেন ছুড়েছিল জানো?"
চিত্রাঙ্গদা জিজ্ঞেস করল: "কেন?"
অর্জুন বলে চলল: "সে কাউকে হত্যা করতে সেই ক্ষুদ্র অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়নি। বরং দেখে শুনেই আগ্নেয় গোলক টি ছুড়েছিল যাতে কেউ হত না হয়। তারপর স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে বলেছিল:
দেশের মানুষ আজ ঘুমিয়ে আছে, তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য বৃহ্ৎ শব্দের প্রয়োজন ছিল। ভয়ংকর বিপক্ষকে না মেরেও জানিয়ে দেওয়া হোলো সবাই জেগে ওঠো, হিংসা হয়ত প্রাথমিক উপায় না কোনো সমস্যা সমাধানের।দেশের লোক জেগে উঠলেই সব হিংসা সমস্যা দূরীকরণ সম্ভব।
যদিও শাসকএর অবিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়, কিন্তু সেই এক প্রাণ বলিদানে হাজার হাজার প্রাণ বলি প্রদত্ত হয়ে জাগরিত হয়েছিল। ধীরে ধীরে সমগ্র দেশ জেগে উঠে একত্রিত হয়েছিল। এইভাবেই জাগরণ সম্ভব চিত্রা।
চিত্রাঙ্গদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল: সে তো একশ বছর আগে মানুষ এই ভাবে জেগেছিল। আজকের মানুষ কি জাগবে?
অর্জুন একটু থেমে স্মিত হেসে বলে উঠল: জাগবে, জাগতেই হবে দেশের মানুষ কে। যে মানুষ আজ অজ মাংসে মজে আছে সে যখন দেখবে ধীরে ধীরে অজ এর বদলে মানুষের মাংসের কটূ গন্ধ দিন দিন ক্রমবর্ধমান সে জাগবে। যে মানুষ সব ভূলে নিজের কেন্দ্রে আবর্তন করছে সে যখন দেখবে তার আবর্তন গতি বাহ্যিক প্রভাবে প্রভাবিত সেও জাগবে, আর যদি সত্যি সে তারপরেও না যাগে তাহলে আজ যা মণিপুরে হচ্ছে কাল দেশের প্রতিটি মানুষের চক্ষের মণির ক্ষেত্রে তাইই হবে , তাদের সামনে তাদের ভবিষ্যত ধ্বংস হবে, তারা ধৃতরাষ্ট্র এর মতন ভবিষ্যত হীন রাষ্ট্র মাঝে অরণ্যে রোদন করবে ।
তাই জেগে উঠতেই হবে মানুষ কে, মানুষই একমাত্র পারবে সমস্যার সমাধান করতে। আমি দেখতে পাচ্ছি সেই জাগরণের সময় আগত। তুমিও দেখার চেষ্টা করো।
চিত্রাঙ্গদা চিত্রার্পিতের ন্যায় সেই জাগরণ কালের ছবি মানসপটে অঙ্কন করল- শান্তমনে মণির মতন পুরো বিচ্ছুরিত হয়ে উঠল জাগ্রত বিবেক-মনুষ্যত্ববোধ।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন