কাশ্মীরি কড়চা পর্ব চতুর্থ: "কে নিভৃতে নিদ্রিত রয় রে?" রহস্যময় রোজাবাল, শ্রীনগর।

কাশ্মীরি কড়চা পর্ব চতুর্থ: "কে নিভৃতে নিদ্রিত রয় রে?"রহস্যময় রোজাবাল, শ্রীনগর।

ভাবছি, "লালকুঠি" নামক রহস্যমণ্ডিত বাংলা চলচ্চিত্রের রহস্যময় গান গুনগুনিয়েই চতুর্থ কড়চা টা শুরু করি - "কে যায় রে"। সত্যি বলতে এর থেকে প্রকৃষ্টতম উদাহরণ এই মুহূর্তে মনে আসছে না। আসলে, কাশ্মীর ভ্রমণের অন্তিম পর্বে একটা রহস্যময় স্থান বেছে নিয়েছিলাম। না, কোনো ট্যুর অপারেটর এর লিস্টে এই যায়গাটির উল্লেখ দূর-দূরান্ত তেও নেই। এমনকি ডাল লেক সন্নিহিত লোকাল অটোচালক ভাই; যারা শ্রীনগরের ডাল-শাখা-মূল-ফল-ফুল-বাগিচা-মার্কেট সব ঘোরাতে প্রায় বায়না জুড়ে দেন -পারলে ফেভিকল এর মতন নাছোড় ভাবে অটোতে ওঠার জন্য প্রাণাতিপাত করেন, তাদের ক্ষেত্রেও দেখলাম একটি অত্ভুৎ অনীহা কাজ করছে রোজাবাল এর প্রসঙ্গ উঠলেই।
শঙ্করাচার্য্য ফিরতি পথে অটোচালক ভাই কে জিজ্ঞেস করলাম: "রোজাবাল নিয়ে যাবেন ভাই?"  বিস্ময়ের সাথে অটো চালক উত্তরদিল: "রোজাবাল যাবেন? ঐখানে তো কেউ যায় না! ঢুকতেও তো পরবেন না, কি করবেন ওখানে গিয়ে?" আমি আর ভাই দুজনেই একসাথে বললাম সব জানি, ঢুকতে দেয়না এবং কেন দেয়না। তবুও একবার যেতে চাই।
অটোওয়ালা বেশ গাইগুই করছিল প্রথমে নিয়ে যেতে , মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরত্ব যেতে একটু বেশী টাকার অঙ্ক চেয়ে বসল:  মনে-মনে মানে-মানে বোঝাতে চাইল যাতে আমরা না যাই; রোজাবালের পূর্ববর্তী স্টপ অব্ধি গেলে পনের টাকা করে নেবে, কিন্তু তার পরে গেলেই দশ-পনের গুণ জন প্রতি বেশী দিতে হবে !
এদিকে এতক্ষণ এই অব্ধি পড়ে আপনি ভাবছেন কি এমন জায়গা যা যাবার জন্য উদ্বেলিত হচ্ছিলাম? কিসের এত অভিলাশ!
আসলে, ঐ জায়গাটা আমাদের উইশ লিস্টে ছিল- শঙ্করাচার্য- হজরত বাল এর সাথে কাশ্মীরে এটাও দেখতে যাব: রোজাবাল। এইখানে একটি সত্যি মিথ হয়ত ঘুমিয়ে আছে! তাই আমরা দেখতে চেয়েছিলাম একটা হারিয়ে যাওয়া গল্প-ইতিহাস-মিথ-ধর্ম কে; খুঁজতে-জানতে-যাচাই করতে। "যিনি" এখানে শুয়ে আছেন তিনি যদি সত্যি সেই মানুষ টি হয়ে থাকেন তাহলে শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির মূল কিছু সূত্র হয়ত এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল বহু যুগের ওপার হতে। তাই মনের মধ্যে মিথ্যাভ্রম রুখে , মিথের সূত্র ধরে চলেই গেলাম রোজাবাল দরগায়।

রোজাবাল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা টি হোলো -
এই স্থানে ইউজা আসিফ বলে এক সন্তের সমাধি আছে। হ্যা, আরো কিছু তথ্য এই সন্ত সম্পর্কে অনুমান করাহয় -  ৩৩ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ তিনি কাশ্মীরে ছিলেন, এই অব্ধি ঐতিহাসিক সত্যতা স্বীকারে কারোর কোনো অসুবিধা নেই, এর পরের তথ্যই মিথ-বিতর্কিত হয়ত!
কেউ কেউ মনে করেন তিনি এসেছিলেন ইজরায়েল থেকে এবং তিনি মহাজ্ঞানী ছিলেন। তার দুই পায়ে ভয়ানক ক্ষত চিহ্ন ছিল, তার সমাধি টি অনুমান করা হয় ইজরায়েলি মতে সমাহিত এবং ব্যতিক্রমী! কারণ , সমগ্র অঞ্চল তথা কাশ্মীর এর বাকি সমাধি ইসলাম মতে সমাহিত। এর পরের আরেকটি তথ্য অনুমেয়:
ওনাকে আঞ্চলিক ভাবে ইউজা আসফ বলা হলেও ওনার মৃত্যুর পরবর্তী তে কুষাণ শাসন কালে ৭৮ খ্রিস্টাব্দের পরে কাশ্মীরে যখন বৌদ্ধ মহাসংঘের আয়োজন হয় এবং সেখানে ইউজা আসফ কে বুদ্ধের সমতুল্য সম্মানও প্রদান করা হয় - মহাসংঘের স্মারকে মাত্র দুজনেরই চিত্র ছিল অঙ্কিত:  বুদ্ধ ও ইউজা আসফ !
ইউজা আসফ যখন কাশ্মীরে আসেন তৎকালীন আঞ্চলিক হিন্দু রাজাও তার জ্ঞানে-প্রজ্ঞায় আকর্ষিত হয়েছিলেন -ভেবেছিলেন পশ্চিম থেকে তার রাজ্যে কৃষ্ণের মতন এক দিব্যপুরুষ এসেছেন।
আচ্ছা, এইবার বলুন তো মনের গহীণে-কোণে কি কোনো প্রশ্নের উদয় হচ্ছে?
-সেই ইউজা আসফ, আসলে কে ছিলেন যাকে এক হিন্দু রাজা কৃষ্ণের মতন ভাবতে পারল, বৌদ্ধ রা তাদের চরমতম উন্নতির শিখরে বুদ্ধের পাশেই তাঁকে স্থান দিল! কে এই মহামানব যিনি ইউজা আসফ এর নামে চির নিদ্রিত রোজাবাল এর প্রবেশ নিষিদ্ধ দরগায়। আসলে এই "কে" এর উত্তর জানে একজন ; তার নাম "হারিয়ে যাওয়া সময়"।  হয়ত ইতিহাসই একদিন সময়ের পাতা উন্মোচন করে উত্তর দেবে সেই ১৮০০ বছর পরের এক ফিরিঙ্গির সুরে : " কৃষ্টে আর খ্রিস্টে তফাত নাইরে ভাই-শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে"!

যাই হোক এই মিথ-গল্পের উপর নির্ভর করে
যখন প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ রোজাবাল এর নিভৃত গলিতে দাড়িয়ে আছি, একটু হলেও অস্বস্তি হচ্ছিল। আশেপাশে বেশ কিছু অত্ভুত চাহনি আমাদের সরজেমিনে দেখছিল! জানিনা তারা কি এইসব ভাবছিল: আমরা কেন এসেছি বা কি করতে এসেছি? তাই বেশী দেরী না করে অনাহূত মনে ফিরে আসা সমীচীন মনে করলাম। তারপর সেই মহামানব কে, যিনি নিভৃতে-নীরবে চির নিদ্রিত আছেন তাঁকে মনের শ্রদ্ধা-প্রণাম জানিয়ে মানুষে মানুষে প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষমার স্বপনে বিভোর হয়ে ফিরে এলাম অটোতে। অটো তে ওঠার পরে অটো চালক প্রায় বিদ্যুত গতিতে অটোকে দৌড় করাল , যেন ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমরা রোজাবাল থেকে।
ঐখান থেকে বেরিয়ে আসার পরেই অটোচালক বলল: "এইখানে খ্রিষ্টান রা অনেক বলে-কয়ে আসে, তোমরা হিন্দু হয়েও এসেছ, অত্ভুৎ লাগছে ব্যাপারটা। তোমরা তো একটু আগে শঙ্করাচার্যও দেখলে আমার সাথে অটোতে,সেখানে মাথায় তিলক ও কেটেছ। বুঝলাম না কেন এলে এখানে? এখানে তো কৌকে ঢুকতেও দেয় না ভেতরে।! "

তাকে হেসে বললাম: "আহা শুধু শঙ্করাচার্য্যই ও রোজাবাল ই না, এইবার কাশ্মীর ভ্রমণে আমরা হজরত মহম্মদ এর দাড়িও তো দেখে এসেছি  হজরত বালে। আসলে, রোজাবাল এর এই সমাধি সম্বন্ধে  অনেক কিংবদন্তী শুনেছিলাম, এই সমাধি কার সে বিষয়ে কেউই নিশ্চিত নয় । হয়ত এই সমাধিতে যিনি শুয়ে আছেন তিনি এক সময়ে মানুষ কে ভালবেসে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন। তাই সেই স্থান টাই একবার অনুভব করে এলাম"
অটোচালক ভাই উত্তর শুনে হেসে বলল,"সে হয়ত হবে, তবে  আমি এত দিন এইখানে শুধু ক্রিষ্টান বা ফরেনার দেরই বেশী আসতে দেখেছি। তোমাদের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগল, তোমাদের কে আমার ভালো লেগেছে , চলো- কাওয়া খাবে, আমি খাওয়াব।"
শ্রীনগরে শীতের শেষ বিকেলে ডাল লেকের তীরে গরম পানীয় কাওয়া পান শুরু করলাম, আর সাথে-সাথে সন্ধ্যারতি শুরু হোল শঙ্করাচার্য্য থেকে-একটু দূরের মসজিদে রাতের আলো প্রজ্বলিত হোল ।
আর, অনেক দূর থেকে মনে হোল কাশ্মীরের বহু যুগের হারিয়ে যাওয়া কোনো এক বৌদ্ধ মঠের থেকে ভেসে এল নীরব শান্তির বাণী। এই সব কিছুর মধ্যেই নিভৃতে চির নিদ্রায় নিদ্রিত তিনি।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
©️চিত্র: ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ



কাশ্মীরী কড়চা তৃতীয়: হজরতবাল মসজিদ
"এই কাশ্মীরের কত কথা শুনেছি!
কখনও শান্ত রূপে কখনও অশান্ত সে
আমি শুধু চেয়ে চেয়ে ভেবেছি।।"

"আপনারা কি ওদিকেও যাবেন নাকি? মসজিদে যাবার কোনো ইচ্ছেই কিন্তু আমার নেই, কি হবে বলুন তো ওদের ওখানে গিয়ে, তার থেকে চলুন হোটেলেই ফিরি, কি করবেন ওখানে গিয়ে?"  - হঠাৎ করে এই প্রশ্ন শুনে আমি প্রশ্নকর্তার দিকে হতচকিতে তাকালাম।
কি বলছেন এই মানুষটি? উনি আমাদের ট্রাভেল টিমেই সহ পর্যটক, বেশ উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চসরকারী পদে চাকুরীরত। আলাপ পর্বে জেনেছি উনি এক কালে ময়দানে ছোট টিমের হয়ে ফুটবলও খেলেছেন। যাইহোক, সেই মানুষটি যখন এই কথাটি বলল একটু আমি বিচলিতই হয়েছিলাম। ভাবলাম : "হতেই পারে উনি হয়ত মসজিদে যেতে চাইছেন না, ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু উনি কিভাবে আমাকে প্রভাবিত করছেন না যাওয়ার জন্য!" - যেখানে ট্রাভেল টিমের ঘোরার প্ল্যানেই আছে - "হজরত বাল মসজিদ , যদি কেউ যেতে চায় অবশ্যই ওরা নিয়ে যাবে"।
আর এই মসজিদটির একটি অন্যধরনের চিত্তাকর্ষক গল্পও আছে, এই মসজিদ টির পথচলা একজন মহিলার দ্বারা নির্মিত হয়ে সম্পূর্ণ পর্দানসীন যুগে, সেই আওরঙ্গজেবের সময়কালে। , এইসেই মসজিদ যেখানে ঐ যুগে-ঐ সমাজে এক নারীর হাতে এতবড় একটি ঘটনা ঘটেছিল! 
গল্পটা এরকম ছিল-
মসজিদ টি তে অনুমান করা হয় হজরত মহম্মদ এর একটি কেশ রক্ষিত আছে বর্তমানে। তবে সেই কেশ নিয়ে অওরঙ্গজেব এর সময়ে কিছু ঘটনাও ঘটে ; এই কেশটি হস্তগত করতে চেয়ে মুঘল বাদশাহ কেশ টি যার মালিকানায়  ছিল সেই কাশ্মীরি ব্যক্তি কে আটক করে। পরে কারাগারে সেই ধর্মপ্রাণ কাশ্মীরির মৃত্যু হলে নিজের ভূল বুঝে এই কেশ টি কাশ্মীরে সেই ব্যক্তির পরিবারেই কন্যার কাছে ফিরিয়ে দেয় অওরঙ্গজেব। পরবর্তীতে সেই কন্যার তত্ত্বাবধানেই "হজরত বাল" মসজিদ টি তৈরী হয়।
তা সে যাই হোক অলৌকিকতা- কিংবদন্তী র গল্প অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস এর বাইরেও এই মন্দির-মসজিদ-গির্জা-ধর্মস্থান গুলিতে আরেকটি মহামূল্যবান প্রমাণ ও নিদর্শন প্রত্যক্ষ হয় । সেই অঞ্চলের কৃষ্টি -শিল্প-সৌন্দর্য-সময়কালের এক সমাহার খুঁজে পাওয়া যায় এই ধর্মীয় স্থাপত্য গুলিতে। তাই মনে মনে ভাবলাম এই সৃষ্টি গুলো চাক্ষুষ করার সুযোগ এর সদ্ব্যবহার করাই শ্রেয়।

এদিকে আমি আমার সহ পর্যটক এর প্র্শ্নে ও ব্যক্তি স্বতন্ত্রের হস্তক্ষেপে যখন বিচলিত-চিন্তিত-বিরক্ত তখন আমার ভাই আর মা প্রত্যুত্তর করল: "হ্যা অবশ্যই যাব, এসেছি যখন ঘুরেই আসি, মন্দির-মসজিদ নিয়ে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। আমরা যাব।"
আমাদের উত্তরটি ও পরিকল্পনা সহ যাত্রী ভদ্রলোকের হয়ত পছন্দ হোল না, তিনি গাড়িতেই বসে রইলেন। আমরা ধীরেধীরে বেড়িয়ে পড়লাম হজরত বালের উদ্দেশ্যে।
যাই হোক, সেই স্থানে হজরত মহম্মদ এর কেশ আছে কি-না ,বা থাকলেও কোথায় আছে তা সঠিক বুঝতে পারিনি। বরং ঘুরতে-ঘুরতে হঠাৎ দেখেছি একটি সুন্দর পাঠাগার।সেখানে সবই হয়ত ধর্মীয় গ্রন্থ, কাশ্মীরী ও আরবি তে লেখা। তবে একটি অন্য অনুভূতিও কিন্তু হয়েছে! এর আগেও তো অনেক মন্দিরে-মসজিদে-গির্জার পরিদর্শনে গিয়েছি, পশুপতি-পুরী-আজমেঢ় শরীফ- সেন্ট পলস-দিলওয়ারা মন্দির থেকে আরো বহু ধর্ম স্থানে ভ্রমণ করেছি। হয়ত মূর্তি- মূর্তি সদৃশ পূজার উপকরণ- সমাধি দেখেছি,কিন্তু ধর্মস্থানে পাঠাগার দেখার সৌভগ্য তো আমার উপর কোনো ঐশ্বরিক দয়া-মায়াতেই এতদিনেও বর্ষিত হয়নি। ধর্মস্থানে পাঠাগার হয়ত অনেক যায়গাতেই আছে-ছিলো, কিন্তু আমি তো এতদিন অব্ধি সেগুলোর দেখা পেলাম না -জানতেও পারলাম না।

যাই হোক, ধীর স্থির ভাবে পদচারণা কালে আরেকটি বিষয়ও ভেসে উঠল অনুভবে।
কাশ্মীর আসার আগে থেকেই মনের ভিতর একটা  আশঙ্কার ডঙ্কা বেজেছে, ভারতের যে যায়গা গুলি চির অশান্ত বলে অবহিত তার অন্যতম হোলো কাশ্মীর, আর সপরিবারে সেখানেই বেড়াতে যাচ্ছি !  
কিন্তু সেদিন মন্দির-মসজিদে ভ্রমণ কালে  কি দেখলাম?  যা দেখলাম তার প্রভাবে মনের আয়নায় পট পরিবর্তন হতে কিন্তু বেশী সময় লাগল না ,পরিবর্তন শুরু হোলো নিজের ভিতের-ভিতরে।
সেদিন প্রত্যক্ষ করলাম  মানুষজন এসে হজরত বালে নীরবে নামাজ পড়ছে-প্রার্থনা করছে, অন্যদিকে শান্ত ভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষও ঘুরছে মসজিদের যে কোন অংশে। ঠিক একই রকম শান্ত ভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষ দের ও আমাদের সাথে ঘুরতে দেখেছি শঙ্করাচার্য্য মন্দিরে । উপলব্ধির আলোতে দেখলাম- দরজা সবার জন্য খোলা থাকে, মনটাই মনে হয় বন্ধ থাকে, তাই দরজা গুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায়না।
এই শান্ত-শান্তির ছবি তো কাশ্মীরে না এলে আমি ভাবতেই পারতাম না: এরা এইভাবে একসাথে বিরাজমান ; এখানে মানুষ গুলো এত টাও শান্ত হতে পারে !
পরে ভেবে দেখলাম, আমার কাছে তো একটা অন্য কাশ্মীর পরিবেশিত হয়েছে এতদিন ধরে। সেই পরিবেশনায় কখনো বুকের ডান দিক ডাক দিয়েছে পরিশোধনের আবার বাম দিক ডাক দিয়েছে  স্বাধীনতার। আমি তো এই ডান এবং বাম চোখ দিয়েই এতদিন এদের দেখে এসেছি- তবে আজ মনে হয় মর্মদৃষ্টি তে দেখলাম মানুষের কাশ্মীর কে, ওদের মধ্যেও শান্তি আছ ঠিক যেমন শান্ত ভাবে নিরুপদ্রব ঝিলম বয়ে চলেছে উপত্যকার মাঝে। হয়ত এই ঝিলম ও কোনোদিন অশান্ত হয়েছে, কিন্তু আমার মানসপটে তো এক শান্ত স্থির নদীর ধীরে বয়ে চলার ছবিই অঙ্কিত হয়ে রইল।

©️ অভ্রজ্যোতি ঘোষ
©️ ছবি : ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ


কাশ্মীরি কড়চা দ্বিতীয় পর্ব : "প্রশ্নের উত্তর কই : তীর্থে কি প্রশ্ন করতে নেই?" : প্রথম পর্ব: শঙ্করাচার্য্য মন্দির, শ্রীনগর।
কাশ্মীর ভ্রমণ কালে কিছু-কিছু প্রশ্ন হঠাৎ মনে এসেছে,  ভাবিয়েছে, কেন? কেন এরকম দেখছি?
এই সব প্রশ্নের কিছু উত্তর কি আছে? হয়ত হ্যা আবার হয়ত না, কিছু উত্তর হয়ত জেনেও জানা যায়না। কি এমন সেই প্রশ্ন- যার উত্তর এই ক্ষুদ্র মানব মন-মস্তিষ্ক খুঁজেই পেল না? দেখি একটু চেষ্টা করে - প্রশ্ন গুলো আপনাদের কাছে নেটযোগে পৌছতে পারি কিনা! চলুন তাহলে একটু ঘুরেই দেখি প্রশ্ন গুলোর গলিতে।ভ্রমণের শেষ পর্বে, আমরা এইবার বৈষ্ণবদেবী দর্শনে যাইনি ! যেখানে আমাদের ট্যুরিস্ট দলের শেষ দিনের পরিকল্পনাই ছিল বৈষ্ণব দেবী দর্শন সেইখানে এই দর্শন রহিত হবার কারণে অনেকেই অবাক হয়েছে, কেন যে দর্শনে অংশগ্রহণ করলাম না? দলের সবাই প্রায় কাটরা চলে গেল কিন্তু আমরা রইলাম পেছনে পড়ে - একটু তফাতে। ঠিক, বৈষ্ণব দেবী অদর্শনে হয়ত আমরা বেশ কিছু সুন্দর মুহূর্ত হারলাম, কিছু অভিজ্ঞতা সেই যাত্রার স্থান-কাল-পাত্রে ঠাই পেল না, কিন্তু অন্য কিছু কি স্থান পেল?

আসলে জীবনের ধারায় কিছু হারালে হয়ত অন্য কিছু মেলে। তাই নিজের মতন করে আমরা একটু পরিকল্পনা টা পরিবর্তন করেছিলাম শেষ পর্বে। যাক একএক করে শুরু করি শেষ দিনের ভিন্নভিন্ন ধর্মের-ঐতিহ্যের-ইতিহাসের কাশ্মীর ভ্রমণ : আমাদের অজানা কৌতূহল পর্ব।

প্রথম পর্ব: শঙ্করাচার্য্য মন্দির, শ্রীনগর
পবর্ত শীর্ষে একা দেবাদিদেব। একাকী কেন?
কেদারনাথ এর মন্দির এর মতোই এখানেও

আদি শঙ্করাচার্য্য দ্বারা পুনঃপূজিত-প্রতিষ্ঠিত হন মহাদেব, সুতরাং এমন একটি প্রাচীন ঐতিহ্য মন্দির। কিন্তু, এত পর্যটক নীচের শহর শ্রীনগরে ঘুরছে, কিন্তু এই মন্দিরটি রয়ে গিয়েছে পর্যটক-জনসমাগম এর অন্তরালে - ডালের বিপরীতে পর্বত শীর্ষে। সাড়ে চার কিলোমিটার পাহাড় ভেঙ্গে ওঠার পরে এই মন্দিরটির শেষ ধাপে পৌছতে ২৪০ টি অতি-উচ্চ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হয়। সেই কারণেই কি পর্যটক কূল এইদিকে আসেনা? না, সেটা তো কারণ হতে পারে না! পর্যটক ভক্তকূল তো কয়েক কিলোমিটার হেঁটে কাটরার পথে বৈষ্ণবদেবী দর্শনে সোৎসাহে গমন করে - অনন্তনাগ পথে ভারতের সর্বপ্রাচীন মন্দির মার্তণ্ডেয় সূর্য মন্দিরও যায়  - অথবা আরো কঠিন-দূর্গম পথ উপেক্ষা করে হেঁটে চলেন অমরনাথের পথে!তাহলে এই শঙ্করাচার্য্য মন্দির কিছুটা উপেক্ষিৎ-অবহেলিত কেন?  এইখানে এসে মনের মধ্যে আরো দুটো প্রশ্ন উদ্ভাসিত হয়েছে।

প্রথমত: অন্যান্য তীর্থ স্থানের মূল মন্দিরের আশেপাশের অঞ্চলে অন্য ছোট-মন্দির প্রচুর দেখা যায়; যা এই অঞ্চলে দেখতে পাইনি। কেন? আগে কি ছোট মন্দির ছিল কখনো? যদি থেকেই থাকে কিন্তু এখন সেইগুলি কি হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে?  নাকি পূজো করার মানুষ গুলোই হারিয়ে যাওয়ায় মন্দির গুলোও হারিয়ে গেল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন : পরের প্রশ্ন; যদি বাহ্যিক প্রভাবে-বলপ্রয়োগে সেই ক্ষুদ্র মন্দির হারিয়েও যায় তাহলে মূল মন্দির একাকী কিভাবে নিজের খ্যাতি-প্রভাব-মাহাত্ম্য ধরে বিরাজমান যুগ-যুগান্তরে। এটা কিভাবে সম্ভব হোল? প্রবল ঝড়ে সবার আগে তো বৃহ্ৎ বৃক্ষ উৎপাটিত হয় ।

তাহলে কি এমন ঝড়-আঘাত এসেছিল যে তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ক্ষুদ্র তৃণ সদৃশ নিরীহ দুর্বল এর ধ্বংস সাধন? নাকি সেই ঝড় ও থমকে গেছিল এই মন্দিরের সামনে! একক মন্দির সহস্ত্র ধ্বংস মাঝেও অটুট ছিল অবিচল ছিল, শুধু অসংখ্য মানুষের হাহাকার মাঝে অঘোরে নিদ্রামগ্ন হয়েছিলেন অঘোরনাথ!!

©️ অভ্রজ্যোতি ঘোষ
©️ছবি : ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ


পর্ব ১: "চেয়ে চেয়ে চে": -

প্রথমে ভেবেছিলাম একটু গুছিয়ে ধারাপাতের নিয়মেই লেখাটা শুরু করব। সেই এক-এক্কে বাড়ি থেকে বেরহলাম, দুই এক্কে যাত্রাশুরুর পথে উফ্ফ কফি না হলে চলে! - এই ভাবেই লিখে যাব ভাবছিলাম।

কিন্তু হঠাৎ মনে হোল আচ্ছা- যে যায়গাটাকে নিয়ে লিখব সেই যায়গা তো নিজেই অনিশ্চিত এর প্রহরায় নিমজ্জিত থাকে বর্তমানে। আবার সেই শাসনের অবগুন্ঠন সরিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত এক-একটি পাহাড়ি বাঁক এর ঝুলি থেকে কাল্পনিক স্বপ্ন-বাস্তব কে প্রতিনিয়ত উন্মুক্ত করে চলেছে; জাদুকরের ভঙ্গিতে। তার সম্পর্কে তার মতন করেই লিখি না কেন! অপ্রত্যাশিত মোড়কে কাশ্মীরের অনন্য ছবি।সেইরকম একটি অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার মোড়কে চলুন আপনাদের প্রথম গল্পটি বলে ফেলি-

সেদিন আমরা শোনমার্গের পথে, নিজেদের ট্রাভেল এজেন্সি ডলফিনের ট্রাভেলর গাড়ী একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত এসে আমাদের নামিয়ে দিল। এর পরের গন্তব্য- গ্লেসিয়ার ভ্রমণ করতে হবে ওখানকার সিন্ডিকেটএর গাড়িতে,এটাই নিয়ম। বাইরের গাড়ি এগোতে পারবে না গ্লেসিয়ার পয়েন্ট এ। যাই হোক, নামার কিছু সময়ের মধ্যেই সিন্ডিকেট এর সাথে দরদামে ঐ যায়গাটা আমাদের চেনা এসপ্লানেড এর রূপ নিল। সিন্ডিকেট ভারিক্কি চালে শুরু করল:" জনপ্রতি ৮০০ এর দরে দিতে হবে, না হলে একটা গাড়িও বেরোবে না।" হাবে ভাবে কথায় বুঝিয়ে দিল সিন্ডিকেট না বললে এইখানে একটা গাড়িও ছুটবে না!
ব্যস বাঙালীর ডিএনএ তে আঘাত, সোজা চ্যালেঞ্জ এর আহ্বান! গাড়ি বেরোবে না শুনেই ম্ঞ্জুলিকার ভাষ্যে সকলেরই মন বলে উঠল :  "আমায় যেতে দেবে না! দেবে না যেতে?"
- আচ্ছা, যে বাঙালী মাছের বাজারে এক ঘন্টা দরদাম করে ৫০ টাকা কমিয়ে বিজয় দর্পে অফিসে লাল দাগের মোহ ভূলে যায় সেই বাঙালী কে একত্রিত সংঘবদ্ধ করতে এর থেকে বড় অস্ত্র প্রতিপক্ষ বালখিল্য ভাবে তুলে দিল হাতে !
- "কি বললে গাড়ী বেরোবে না! ঠিক আছে, জন প্রতি 500 করে না নিলে আমরাও 34 জনের কেউই যাব না, এই বৃষ্টির দিনে কাস্টমার লষ্ট করে  তোমরা বসে লষ্ট ওয়ার্ল্ড দেখ! কাশ্মীর এর চারদিকেই সৌন্দর্য, এইখানে দাড়িয়ে ঘুরে যতটা সম্ভবপর তাই দেখব। তাই বলে অন্যায় আব্দারে সাড়া দেব না আমরা কেউ।"- বলেই সাথেসাথে উল্টোদিকে গজেন্দ্রগমনে সবাই হাটতে উদ্যত হোল। মিনিট দুই পরেও যখন বিশাল দলের ভ্রূক্ষেপ নেই দেখে, হয়ত সিন্ডিকেট এর পান্ডা একটু চিন্তিত হোলো। "সত্যি তো চৌত্রিশ টা সওয়ারি যদি বেঁকে বসে না যায় তাহলে তো অতি লোভে তাঁতি নষ্ট!"
যাই হোক একটু এগিয়ে এসে এইবার গলা নামিয়ে বলল : এক কাজ করুন 600 তেই চলুন আপনারা । এই শুনে  আমাদের দলের সদস্যরা গড়পাড় নিবাসী জটায়ুর মতন সুন্দর হিন্দিতে বলে উঠল: "তাঙ্গ মাত করো, বহুত হো গায়া, যাদা হো গায়া - গেলে আমরা ৫০০ তেই যাব, ওটাই রেট।  "। সিন্ডিকেট এর লোকজন বুঝল ওদের উল্টোদিকে আজ সবাই মাঙ্কিটুপি পড়ে বজরঙ্গ ভাইজান সলমান খান হয়ে দাড়িয়ে আছে: একবার কমিট করে দিলে এরা নিজেরাও আর নিজেদের কথা শুনবে না! যাই হোক রফা হোল ৫০০ তেই।
এইবার যেই ৫০০ তে রফা হোল বাঙালী ডিভাইডেড উই মিস আন্ডারস্ট্যান্ড মোড চলে এল : "কে বলেছিল ৫০০ বলতে, দেখলেন তো মেনে নিল। কেন ৩০০ বললেন না!" ব্যস ৩৪ জনের মধ্যে সদ্যমাত্র ঐতিহাসিক ভূল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ এর মূহূর্ত সমাগত।
ইতোমধ্যে আমদের জন্য  সিন্ডিকেটের গাড়ী চলে আসায়  পরিবারের ৮ জন উঠে পড়লাম সাদা টাটা সুমোতে।
লোকাল টাটা সুমোর সামনের আসনে বাবা বসল, মাঝের তিন আসনে তিন মা বসল, মানে:  আমার মা- শাশুড়ি মা- আর হ্যা, আমার পুত্রের মা। পিছনে পুত্র ও তার দাদু উঠে বসল, আমি আর ভাই উঠতে যাব- হঠাৎ তাঁকে দেখলাম, বিস্মিত হলাম!

বরফশৃঙ্গের মাঝ থেকে প্রবল উচ্ছ্বাসে বিপ্লব স্পন্দিত খরস্রোত নদীর মতন তার উদয় হোল- গাড়ির পিছনের স্টিকারে চে এর ছবি!
এতদিন ধরে জি-টুয়েন্টির আবহে শ্রীনগরে-শহরে প্রধানমন্ত্রীর ছবি অথবা একটু ভিতরে গ্রাম্য অঞ্চলে ইরানের নেতা খোমানির ছবি দেখে চোখ সয়ে গেছে। সেখানে চোখটাই কেমন উল্কাপাতের বিপ্লবের মতন ঝলসে উঠল হঠাৎ জনৈক চে এর ছবি দেখে। আমি ভাই এর দিকে তাকিয়ে আছি, ভাই ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে; দুজনেই হতবাক! দেশের শেষ গ্রামের সীমানায় দাড়িয়ে এক কাশ্মীরী ড্রাইভার রাজহমান ওরফে রাজুর গড়িতে আমরা দেখতে পেলাম বিপ্লবের রাজা কে।
দুই ভাই গড়িতে উঠে বেশ আলোচনা শুরু করলাম, 
"স্বদেশে পুজ্যতে রাজা 
বিপ্লব সর্বত্র পুজ্যতে।। -  কি উচ্চ বিচার দেখেছিস আমাদের ড্রাইভার ভাইটির !" আমি ঠিক করলাম চে-এর ব্যপারে, ছবির ব্যপারে ড্রাইভার ভাইটির সাথে একটু আধটু আলাপচারিতা করব ।
যাইহোক, এরপর গ্লেসিয়ার ঘুরে ফেরার পরে বিদায়বেলায় রাজুকে চা চক্রে আমন্ত্রণ জানালাম পুলকিত চিত্তে। হাজার হোক এই মানুষ টা আমাদের ঘুরিয়েছে ভালো । তার সাথে ওর মধ্যে একটা বিপ্লব এর চেতনা নিশ্চয়ই আছে, না হলে ব্যতিক্রমীর মতন কেউ চে এর ছবি নিজের গড়িতে লাগায় সসম্মানে।
চে -এর ছবির সামনে দাড়িয়েই শুরু হোল কথপোকথনের পালা। সম্মান সূচক ভঙ্গিতে চা পান কালে রাজু কে সম্বোধিত করলাম: "এই ছবিটা দেখে বেশ ভালো লাগল ভাই"।
রাজু একটু অবাক হয়ে বলল: "কোন ছবি "?
আমি একটু থেমে ধীরে বললাম: "কেন এই যে, চে- এর ছবি, তোমার গাড়ির পিছনের ছবি টা।"
রাজু কেমন ভাবলেশহীন ভাবে বলল: "এ কে?"।
রাজুর উত্তর শুনে নিজেকে বেলাশেষের বিশেষ পানীয় গ্রহণরত খরাজ এর স্থানে বসিয়ে দিলাম, আর রাজু কে বসালাম সেই গৃহভৃত্য বৃদ্ধের স্থানে: "বাবুর কাছে কে আসে" স্টাইলেই রাজু কে একটু উত্তেজিত স্বরেই বলে উঠলাম -" চে এর ছবি লাগিয়ে জানতে চাইছ কে-এ"?
রাজু আমার প্রশ্ন শুনে আমাকে আরো বিস্মিত করে উত্তর দিল : "ও এই দাড়ি ওয়ালা, শ্রীনগরের এক দোকানে দেখেছিলাম এই স্টিকার টা। বেশ স্টাইলিশ লেগেছিল। তাই লাগিয়ে দিলাম, বেশ দেখতে কিন্তু একে । এ কে? "
এদিকে, রাজুর উত্তর শুনে আমার মনের ভিতর দ্রোহকাল শুরু হয়ে গেছে । ব্যাটা, এই প্রতিদান দিল, ওকে কি না কি ভাবলাম , ক্যাপ্টেন হ্যাডক এর স্টাইলে বলতে গিয়েও আটকে গেলাম আরেক দৃশ্যে-
আমার ভাই আমাকে দেখে হো-হো করে হেসে বলছে "বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক"।
আমার এরূপ ভাবান্তর আর ভাই এর উৎফুল্ল আচরণ দেখে রাজুও অনুধাবন করেছে ও দায়িত্ব নিয়ে কিছু গন্ডগোল পাকিয়েছে।
আমাকে ধীরে জিজ্ঞেস করল: "আমি না জেনেই লাগিয়েছি ,কিন্তু সত্যি জানিনা ও কে, কিন্তু ওকে দেখতে খুব ভালো লাগে । আমাকে বলবে ও কে? "
অকস্মাৎ পর্বতে বজ্রপাত সম অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল থরথর করে! কি বলছে রাজু?আমি এর কি উত্তর দেব?
আমাদের  ট্রাভেলর গাড়ি শহরের পথে ফিরে যেতে উদ্যত ,দলের বাকি সদস্যরা সবাই প্রায় উঠে বসেছে গড়িতে- এই শেষ মুহূর্তক্ষণে আমি কি ভাবে ওকে বোঝাব চে: কে? আমার কি এত ক্ষমতা আছে যে এক কথায় বোঝাই কে সেই: চে?

তবুও চোখ বন্ধকরে মূহূর্তক্ষণ ভাবলাম, তারপর সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম: আজকে তোমাদের গাড়িতে উঠবার আগে একটি ঘটনা ঘটে খেয়াল করেছ নিশ্চয়ই । সিন্ডিকেটের  অন্যায্য মূল্যের সামনে- দাবির সামনে আমরা তো সবাই অসহায় পর্যটক ছিলাম, এতদিন তোমরা হয়ত দেখেছ তোমরা যা দাম চাইবে সেটাই পর্যটকদের দিতে হবে। কিন্ত আজকে আমরা একত্রিত হয়ে এই অন্যায় এর বিরুদ্ধে সমবেত সিদ্ধান্ত নিলাম: আমরাও যাবনা। তোমরা কিন্তু তৎক্ষণাত অনুধাবন করলে তোমরা ভূল করেছ, আর আমরা দল বেঁধে সঠিক দিকে আছি। এই যে দলবেধে অন্যায় এর বিরুদ্ধে কথা বলা সেটাই সারা বিশ্বকে চে শিখিয়ে গেছেন, এর থেকে আজ আর বেশী কিছু বলার সময় নেই বন্ধু, হয়ত আবার একদিন দেখা হবে। যদি কোনোদিন কোনো অন্যায় এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পার তখন তুমিই এই গিরিখাতের প্রান্তে দাড়িয়ে বলবে: "এই বিপ্লব স্পন্দিত বুকে আমিও চে" সমগ্র পাহাড়ে-পর্বতে প্রতিফলিত হয়ে সেই শব্দব্রহ্ম পৌছে যাবে আমার কাছে সুদূরে - আবার দেখা হবে রাজু, একদিন ফিরে আসব। তত দিন তুমি যে চিত্র তোমার বাহনে লাগিয়েছ সেই চিত্র মনের ভিতর প্রস্ফুটিত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাও। অন্যায় এর প্রতিবাদ কোরো  -
রাজু স্থিরপ্রজ্ঞ ভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোলো।
আমাদের ট্রাভেলর শহরের উদ্দ্যেশে যাত্রারম্ভ করল।।


©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

চিত্র অঙ্কন ও স্থিরচিত্র: ©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"