অপত্য প্রত্যয়
"যাই বলো ভাই মিনু, আপন-আপন-ই হয়, নিজের ঔরসজাত কেউ না থাকলে এই সব আদিখ্যেতার কোনো মানেই হয়না, বুঝলে। তোদের হয়নি, ব্যস মেনে নিলেই তো হয়। এত আহ্লাদ করে আবার অন্যের বাচ্চা বাড়ি তে তোলার কি দরকার ছিল? কার না কার ঘরের থেকে কি জাত-বংশের ধারা নিয়ে এলি; কে জানে!" - বলেই থালার থেকে টুপ করে কবোষ্ণ ফিসফ্রাই টা গলাধ:করণ করলেন বোস গিন্নী।
পাড়ার মহিলা মহলের মাথা মিতু বোসের কথা শুনে আরেক প্রতিবেশী মিনু থালার দ্বিতীয় মাছটির অবশেষাংশ মৌজ করে মুখে চালান করে মাথা দুলিয়ে বলল :"যা বলেছ মিতু দি। কথায় আছেনা রক্ত; সেইটাই তো আসল গো। শেষ অব্ধি ওটাই থাকবে আর আবদ্ধ রাখবে সম্পর্কের বন্ধনে! রক্তের টান না থাকলে সব ফুস করে উড়ে চলে যাবে বলে দিলাম!
আরে,এই ক্যটারার ভাই তুমি হা করে কি দেখ্ছ-শুনছ বলোতো? ঐ মাছের পিস টা দাও তো- পেটির টা দাও। আগের টা লেজার দিক থেকে দিয়েছিলে, দাড়িয়ে আর মাছ বাছতে পারব না। তবে বুঝলে সবাই, রুমি দি আয়োজন মন্দ করেনি পাতানো মেয়ের প্রথম জন্মদিনে।" - বলেই ব্যঙ্গের হাসি হেসে আবার তৃতীয় মাছে মনোনিবেশ করল মিনু, পাড়ার বাকি গিন্নি বাহিনীও একসাথে খেতে খেতে গল্পের মতন আলোচনা-সমালোচনায় মেতে উঠল।
ইতিমধ্যে আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক রুমি কে দেখা গেল অনুষ্ঠান গৃহে। হাসিহাসি মুখে এগিয়ে এসেছে প্রতিবেশী বন্ধুদের আপ্যায়ন করতে।আজ খুব সুন্দর ভাবে সেজেছে রুমি; সেই সাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে নিভৃতে থাকা এক মুক্তির স্বাদ। রুমির কোলজুড়ে লাল টুকটুকে পোষাকে পরীর মতন সেজেগুজে খুদে-আদুরে চোখে সবাইকে অবাক হয়ে ঘুরে-ঘুরে দেখছে একটি ছোট্ট-মিষ্টি মুখ । তাকে সামনে দেখে সবাই হেসে আদুরে স্বরে বলল: "এই তো আমাদের পাড়ার নতুন অতিথি চলে এসেছে। রুমি আমরা কিন্তু তোমার রাজকন্যা কে নিয়ে অনেকটা করে সময় কাটাব সামনের দিন গুলোতে।"- এই শুনে রুমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল: "নিশ্চয়ই এত গুলো জ্যঠি-কাকি-মাসি-পিসি পাড়ায় থাকতে আমার আবার চিন্তা কিসের।" সবাই হাসতে হাসতে বলল : "নিশ্চয়ই ,তাই হবে।"
এরকম টুকটাক কথাবার্তা চলছে এমতাবস্থায় মিতু খাবার মুখে চিবিয়ে চিবিয়ে রুমি কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল: "তা রুমি , আমি ভাবছি একটা কথা বলব তোমায়। কিছু মনে কোরোনা ভাই" ।
মিতুর মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে একটু বিস্মিত হোল রুমি; দুরুদুরু বুকে, ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করল: "মিতুদি , কি হয়েছে গো? খাবার ঠিক আছে? কোনো অসুবিধা হয়েছে কোনো আইটেমে? এই তো ক্যাটারিং এর ভাই রা আছে, এই কি অসুবিধা হচ্ছে, একটু দেখো না ভাই। ওরা আমার পাড়া প্রতিবেশী ওদের যেন অমর্যাদা না হয় " - খাদ্য পরিবেশনকারী ছেলেটি কিছু বলতে উদ্যত হতেই মিতু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল: "আরে না-না,সব খাবার অসাধারণ হয়েছে। রান্না-আয়োজন-পরিবেশন নিয়ে কোনো অসুবিধাই নেই। খুব সুন্দর ভাবে সব হচ্ছে , তোমাদের পরিবারের মানানসই ব্যবস্থা হয়েছে। এইতো আমি তিনটে ফ্রিসফাই উড়িয়ে দিলাম, আহ কি নরম-গরম; খুব উপাদেয় হয়েছে।"
এই শুনে রুমি একটু জোরে শ্বাস ছেড়ে বলল: যাক বাঁচালে, খাবার তাহলে ঠিক আছে। তাহলে অন্য কি বলবে বলো, আমি সত্যিই একটু দুশ্চিন্তাগ্র্স্ত হয়ে পড়েছিলাম । "
রুমির কথা শুনে ফিসফ্রাই চর্বনের তাল বজায় রেখেই মিতু বলল: "রুমি, এই পাড়ায় এই ঘটনা প্রথম ঘটল। এতদিন-এতপুরুষ এর বাস, আমরা কিন্তু এই জিনিষ শুনিনি-দেখিনি। তা তোমরা এই দু:সাহসিক সিদ্ধান্ত নিলে কিভাবে? বাড়ির-পরিবারের গুরুজন আত্মীয় স্বজন কেউ আপত্তি বা বারন করল না; অন্যের বাচ্চা কে ঘরে তুলতে? কোন জাত-বংশ কিছুই তো জানলে না। এই টা কি ঠিক করলে?" -
মিতুদির মুখে হঠাৎ এইরকম এক অপ্রত্যাশিত কথা শুনে রুমি তড়িতাহত!চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। এ কি শুনছে ও?
ঘোরের মধ্যেই বিস্ময়ে বলল: "এসব কি বলছে মিতু দি? ও আমার মেয়ে ! আমার কাছে ঐ সব, পুরো পৃথীবি! আমার যা পরিচয় সেটাই ওর পরিচয়! এর বাইরে আর কিছুই নেই।"
মিতু রুমির দিকে তাকিয়ে বলল: "দেখো রুমি, আজ তোমার এমন মনে হচ্ছে আবেগের বশে কিন্তু ভালো করে ভেবে কাজ করো, কাকের বাসায় কোকিল না বেড়ে ওঠে সেটা ভেবেই বললাম ভাই তোমায়। এতো আর তোমার নিজের রক্ত মাংস নিয়ে বেড়ে ওঠেনি ,আমার কি, তখন তুমিই ভুগবে।" - বলেই আবার মাংসের পাত্রের দিকে ধীর গতিতে এঁকেবেঁকে সরীসৃপ এর মতন শিকার এর খোঁজে এগিয়ে গেল মিতু।
এদিকে মিতুদির শেষ বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে রুমি ম্লানমুখে নীরবে ভাবতে থাকল : এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে?- ভেবে কূল পাচ্ছে না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে চিন্তাভাবনা গুলো! দুইচোখ দিয়ে জল ছলছল করে উপচে পড়তে গিয়ে কোনোক্রমে আটকে রয়েছে বন্যা প্লাবিত বাঁধের শেষ সীমায়।
এমতাবস্থায় হঠাৎ রুমি অনুধাবন করল দুটি ছোট্ট হাতের আলতো আধো স্পর্শ আদর-স্নেহে ভরিয়ে দিল রুমির ললাট। এই স্পর্শ এর ধাক্কা রুমিকে অবচেতন থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। আদরে সিক্ত হয়ে ছোট্ট মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধীরস্থির ভাবে মনেমনে রুমি ভাবল:
আজকে আমি প্রত্যুত্তর করতে পারলাম নারে, হয়ত বলতে পারতাম অনেক কিছু, কিন্তু ওরা বুঝত না-বুঝতে চাইত না। ওদের যদি বলতাম আমার নিরাশার গহীনে তলিয়ে যাবার শেষ কিনারে তোর অমৃত আগমন আমার জীবনে; যেদিন আমি আর তোর বাবা অনাথ আশ্রম থেকে তোকে কোলে তুলে নিলাম সেদিনটা কি করে ভূলব? জৈবিক স্রষ্টা না হয়েও যখন তোকে স্পর্শ করলাম মনে হোল আমি আমার মতন আজ পরিপূর্ণ হলাম; সেই অনুভূতি কি অলীক? না, তাতো নয়! সেতো আমার পরম বাস্তব সুখপ্রাপ্তিক্ষণ।
তুই এত দিনের মনের হাহাকার-অন্ধকার সরিয়ে এক নতুন আলোর দিশায় মাতিয়ে তুলেছিস আমাদের; তোর জন্যে আমি-আমার পরিবার সবাই আবার হাসছি - পুনরুজ্জীবিত হয়েছি। এই সুখের মুহূর্ত টা তুইই আমাকে এনে দিয়েছিস, তোর তো একটাই জাত: তুই শিশু ভগবান-সন্তান।
দেখিস, তোর মধ্যেই আমি নিজেকে জাগিয়ে রাখব; আমার শরীর তোকে তৈরী না করলেও আমার অন্তরাত্মা তোকে তৈরী করবে; তোর-আমার রক্তের গ্রুপ হয়ত আলাদা কিন্তু তোর রক্তে যে চেতনার বীজ বপন হবে সেটা তোর মায়ের থেকেই শুরু হবে।
আজ আমি নিরুত্তর রইলাম সমাজের কাছে,ওদের প্রত্যুত্তর সময়ের হাতেই ছেড়ে দিলাম আমি - একদিন সব উত্তর ওরা পাবে। সব প্রশ্নের উত্তর তো তাৎক্ষণিক হয়না, কিছু উত্তর আসে সময় সরণী বেয়ে। উত্তরটা তুই দিবি আমার হয়ে এরকম কোনো এক নিদ্রিত সমাজকে: ততদিন যে যা ভাবছে ভাবুক, আমরা দুই মা-মেয়ে নিজেরাই নিজেদের এই উত্তরের জন্য প্রস্তুত করব। তুই হবি আমার পৃথা-শান্তা-শকুন্তলা ; সমাজকে মনে করিয়ে দিস নতুন আদর্শ কিন্তু শুধু ঔরস থেকেই জন্ম নেয়নি ; একচরিত্র দাতা আর এক চরিত্র গোদহনকারী-গোবর্ধনধারীর জীবন জুড়ে আছে তাদের পালক মা।
এখন চল, আজকের বাকি অভ্যাগত সবাইকে স্বাগত জানাই দুজনে, হাসিমুখে"- মা আর মেয়ে হাসিমুখে সবার কাছে সভার মাঝে এগিয়ে গেল। ব্যাকগ্রাউন্ডে কিশোর কণ্ঠে ভেসে এল : কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন