"জাতের শাপ, ভাতে মোচন"
"এই মে মাস টা কিন্তু যাই বলিস আমাদের দেশের-দশের একটা মনে রাখার মতন মাস, কি বলিস টুটু?" - রবিবার সকালে চায়ের টেবিলে সোনাই আলগোছে প্রশ্ন টা করল ভাই কে উদ্দেশ্য করে । প্রশ্ন শুনে টুটু অবাক হয়ে বলল :"কেন বলত? ও বুঝেছি, মে মাসে আইপিএল এর আসর বসে,তাই মে মাস টা সবাই মনে রাখে"। উত্তর শুনে সোনাই চোখ পাকিয়ে হাসতে-হাসতে বলল : "জানি, তোর ভাবনার দৌড় ঐ অব্ধিই সীমাবদ্ধ। আরে আইপিএল তো হাল আমলের বিষয়, এটা একটু পুরনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। "
টুটু ভুরুকুঁচকে বলল: "পুরনো বিষয়?, হমম, ঠিক বুঝতে পারছি না তুইই বলতো, সকাল সকাল হেয়ালি করছিস কেন?"
সোনাই হেসে বলল: "আরে এই মাসে সব বিখ্যাত মানুষদের জন্মদিন , সত্যজিৎ রায়-রবি ঠাকুর-রাজা রাম মোহন রায়, আরো অনেকে আছেন।"
টুটু শুনে একটু গম্ভীর হয়ে বলল: "জন্ম হোক যথা তথা , কর্ম হোক ভালো;
জন্মের দিন জেনে, কি হবে এই যে রাজা রামমোহন রায় এর জন্মদিন কে মনে রাখে? বরং উনি মা-য়ের জাত কে বাঁচাতে রুখে দাড়িয়েছিলেন সেইটাই প্রধান। ওনাদের কাজ টাই আসল। এই ধর, রবি ঠাকুর যে পিরালী ব্রাহ্মণ ছিলেন সেইটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ নাকি তিনি তার সৃষ্টির মাধ্যমে মানববোধ জাগ্রত করেছেন সেটাই প্রধান?" সোনাই একটু থমকে উঠে বলল: "সেতো সৃষ্টি- সমাজসংস্কার-নারীকল্যাণ এইগুলোই প্রধান কিন্তু রবি ঠাকুরের ব্যপারে কি বললি , মানে পিরালী ব্রাহ্মণ, কি সেটা? "
টুটু এইবার একটু গম্ভীরভাবে বলল: রবি ঠাকুরের পূর্বপুরুষ দের এক বন্ধু ছিল পীর আলী, সেই বন্ধুত্বের কারণে তার পূর্বপুরুষ রা জাত ভ্রষ্ট হয়ে নিন্মবর্তী ব্রাহ্মণে পরিণত হয় বা সেই যুগের ভাষায় জাত খোয়ায়, কিন্তু সেই উচ্চ-নীচ জাতপাত যে কোনো বিশেষ বিষয়ই না সেইটা তো রবি ঠাকুর ও তার পরিবার কে দেখেই বোঝা যায়। তাই বলি দাদা,তুই শুধু মাস-তারিখ গুণেই মশগুল থাকলি, এই সব আর জনবি কবে?
সোনাই প্রত্যুত্তরে বলে: হ্যা এটা নতুন তথ্য বললি বটে, রবি ঠাকুরের পূর্ব পুরুষও জাতপাতের গুঁতো খেয়েছিল এইটা জানা ছিল না।
দুজ্নের বাক্যালাপ শুনতে শুনতে রান্নাঘর থেকে সোনাই-টুটু র মা হেসে বলে উঠলেন:" আরে রবি ঠাকুর তো অনেক বিশাল ব্যাপার রে, তোদের নিজেদের পরিবারেই জাতপাত নিয়ে একটা ঘটনা আছে জানিস? বলেছি তোদের কখনো? "
হঠাৎ মায়ের গলায় গল্পের গন্ধে দুই ভাইই পুলকিত, ছুটির দিন সকাল টা জমে যাবে আজকে।
দুজনেই একসাথে জানাল : "না , সেতো জানিনা মা! আমাদের পরিবারেও কি জাত পাতের খপ্পরে পড়ে ছিল নাকি? বলো না মা, প্লিজ বলো, শুনতে জানতে ইচ্ছে করছে খুউব। "
মা উত্তর দিলেন: "হ্যা, তাই তো রবিবারের রান্না-বান্না বন্ধ করে আমি এখন তোদের গল্প শোনাই আর কি?" দুজ্নেই নাছোড় আবদার জুড়ে দিল: "কিচ্ছু হবে না মা, বলো না শুনি। রান্না না হয় একটু পরেই করলে, অল্পস্বল্প কিছু একটু বানিয়ে খেয়ে নিলেই হবে, তবে গল্প মিস করা চলবে না, তুমি শুরু করো মা।"
অগত্যা দুই ভাই এর বারংবার আবেদন-নিবেদনে মা বলতে শুরু করল : "দেখ তোরা যা গল্প হিসাবে শুনতে চাইছিস সেই ঘটনাটা অনেক দিন আগে আমাদের পরিবারেই ঘটেছিল; আমার ঠাকুমার বিয়ের সময়ে। আমি ঠাকুমার মুখেই শুনেছি সেদিন ঠাকুরমার শ্বশুর মশাই মানে আমার ঠাকুর্দার বাবার এক কীর্তি: এই জাতপাত নিয়েই।"
টুটু চোখ বড়বড় করে বলল: "তার মানে কত পুরুষ- কত দিন আগের ঘটনা মা?"
মা বলল: "কত বছর আগে তা তো জানিনা সঠিক, তবে আমার ঠাকুর্দার বাবা মানে প্রায় তোদের পাঁচ পুরুষ আগের ঘটনা।"
সোনাই সাথেসাথে বলল: তাহলে ঐ একশ থেকে একশ কুড়ি-পঁচিশ বছর আগের কথা।
মা ও প্রত্যুত্তরে বলল: "সে হতে পারে রে, তবে আমি যা শুনেছি আমার ঠাকুমার থেকে সেইটাই গল্প হিসাবে তোদের বলে যাচ্ছি,
মাঝে যেন আর কোনো বাধা না আসে।তাহলে গল্প বন্ধ করে সোজা রান্না করতে চলে যাব কিন্তু"।
সোনাই টুটু দুজ্নেই মুখে আঙ্গুল দিয়ে মাথা নেড়ে শান্ত শিশুর মতন বসে -হেসে বলল: যথা আজ্ঞা মাতে, আমরা আর কিচ্ছু জিজ্ঞেস করছি না শুধু শুনব,তুমি এইবার শুরু করো ।"
মা একটু ভেবে নিয়ে শুরু করল: "আমার গল্প আবর্তিত হবে একটি দ্বাদশবর্ষীয়া মেয়ে কে কেন্দ্র করে, সে কে,কি ভাবে আমার পরিবার এই গল্পের মধ্যে জড়িয়ে আছে এক এক করে উন্মচিত করব, শুরু করছি-
""দাদু, আমি কি নিমন্ত্রণ খেতে ঐ বাড়িতে যাব আজকে? নাকি, আজকেও আমি অনাহূত থাকব? " - ছলছল চোখে হরিহর কে উদ্দেশ্য করে বলল দ্বাদশবর্ষীয়া অন্নদা। - "না, একদম ও মুখো হবি না তুই।": হরিহর উত্তেজিত হয়ে এই কথা বলার সাথেসাথে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল অন্নদা।
হরিহর আচম্বিতে শিরাঘাত করে অপ্রস্তুত হয়ে মনে মনে বলে উঠল :"হায় ভগবান আমি এ কি বললাম ওকে! এই নরক যন্ত্রণা আর কতদিন সইব! " তারপর একটু কোমল হয়ে অন্নদার কাছে গিয়ে নাতনির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বললেন,:" তুই তো দিদি সব জানিস; তবুও কেন জিজ্ঞেস করে আমায় বিড়ম্বনায় ফেলিস? তোকে বারবার না বলতে আমার বুকটা ফেটে যায় রে, আমার খুব ইচ্ছে করে তোকে আমার বাড়ির শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে দেই, কিন্তু পারিনা রে, পারিনা! আমার হাত-পা বাঁধা,আমি নিরূপায়-অসহায়। তুই দয়া করে আসিস না বাড়িতে।
তোর আজকের খাবার আমি গোপনে গভীর রাতে শিবু কে দিয়ে পাঠিয়ে দেব,কেউ জানতে পারবে না। আচ্ছা, আমি এখন চলি রে- বিয়ের মেলা কাজ পড়ে আছে । তুই ডেকেছিস তাই সবাই কে এড়িয়ে অন্তরালে দেখা করে গেলাম। ভালো থাকিস।"
বলেই হনহন করে হরিহর বাড়ির সদর দরজার দিকে হাঁটা লাগাল।
অনাথ সহায়-সম্বলহীন অন্নদা সজল চোক্ষে প্রত্যক্ষ করল সান্ধ্য বিয়ে বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে। বিমু মাসীর বিয়েতে বাড়িতে আলোর রোশনাই এর সাথে সুর তুলেছে সানাই, আনন্দ করছে পরিবারের সবাই, এসবের মাঝে ঐ শুধু ব্রাত্য-অবহেলিত। দুঃখে অপমানে কাঁদতে কাঁদতে আস্তে আস্তে দুচোখ লেগে এসেছিল ;
হঠাৎ বিয়ে বাড়ির থেকে বিষম গোলোযোগ শুনে তন্দ্রা টুটল অন্নদার! সাথে কানে এল হরিহরের উচ্চস্বরে ক্রন্দন। শুনে এক লাফে বাড়ির পিছনের দিকে দৌড়ল; কিন্তু খিড়কি দিয়ে প্রবেশ করতে গিয়েও থমকে দাড়াল : মনে পড়ল এই বাড়িতে ওর প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু কি হয়েছে, না জেনে নিজের কৌতূহলী মনকেও নিবৃত্ত করতে পারছে না, শেষে ভাঙ্গা পাঁচিল এর পাশে উবু হয়ে বসে নিজেকে আড়ালে রেখে উঁকি দিয়ে দেখতে পেল এক অতুভুৎ চিত্রনাট্য:
বর সমেত বর কর্তারা বসে আছে, কি সুন্দর দেখতে মানুষগুলো কে। এত সুন্দর ভাবে মানুষ সাজে! আর, বর কে তো ঠাকুরের মতন লাগছে। অন্নদা এমনিতে তো কোনো বিয়ে-আনন্দে উৎসবে ডাক পায়না তাই এই স্বপ্ন দৃশ্যে মুগ্ধ হয়ে হা-করে গিলছে।
কিন্তু, এই সবের মাঝেই হঠাৎ তাল কাটল আবার হরিহরের তারস্বর ক্রন্দনে, বিলাপ করতে করতে পাত্রের পিতা কে উদ্দেশ্য করে বলল :" কি যে মুশকিলে পড়লাম জগবন্ধু বাবু, আমি আপনার মান রাখতে পারলাম না। আমাকে মার্জনা করুন" , বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। পাত্রের পিতা জগবন্ধু ঘোষ তিন গ্রাম দূরে মহারাজপুর গ্রামের অব্স্থাপন্ন শিক্ষিত মানুষ , পিতৃপুরুষের ব্যবসার হাল একদিকে যেমন ধরে রেখেছেন তেমনি উত্তর পুরুষ দের শিক্ষার প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন ; একান্নবর্তী পরিবারের পরের প্রজন্ম কেউ ডাক্তার কেউ উকিল কেউ বা সদরে আধিকারিক অথবা শিক্ষক । এরকম একটি পরিবারের মাথা হিসেবে আশেপাশের গ্রামের সবাই জগবন্ধু বাবু কে মান্যিগণ্যি করে। সেই তিনিই আজ পুত্রের বিবাহ দিতে হরিহর এর ঘরে উপস্থিত হয়ে দেখছেন এক বিড়ম্বনা, হরিহর অপ্রাকৃতের মতন আচরণ করছে।
জগবন্ধু হরিহরের হাতটা ধরে একটু দূরে নিভৃতে নিয়ে গেলেন। তারপর ধীরস্থির গলায় শুধালেন : "হরিহর বাবু, কি হয়েছে বলুন তো। আপনার মেয়ের কি আমার ছেলে বিহারীলাল কে দেখে পছন্দ হয়নি।"
হরিহর দুই হাত জোড় করে ডুকরে উঠে বলল : "একি বলছেন জগবন্ধু বাবু, আপনার শ্রীমান তো রূপেগুণে সাক্ষাত নারায়ণ, এমন মানুষকে স্বামী হিসেবে পাবে সেতো আমার মেয়ের ভাগ্যি। মেয়ের সুখের কথা ভেবেই আমি আপনাদের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটি বিষয় আমার আপনাদের জ্ঞাত করা উচিৎ ছিল, সেই বিষয়টিই আমাদের পরিবারে আবার বিষফোড়া র মতন জেগে উঠেছে। সেই বিশেষ কারণেই আজ আমার পাড়া প্রতিবেশী কেউ এই আনন্দ অনুষ্ঠানে আসেনি, সবাই আমাকে ত্যাগ করেছে।
জগবন্ধু বাবু বিস্মিত হয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন : "কি বলছেন ,হরিহর বাবু? কি বিষয় যা আপনি গোপন করেছেন। শীঘ্র বলুন। আমি ক্রুদ্ধ হলে কিন্তু কারো নিস্তার নেই।"
হরিহর কেঁপে উঠে ভীত সন্ত্রস্ত গলায় বলল: "হ্যা বলছি, আজ আমার দ্বিতীয় কন্যার শুভ পরিণয় প্রস্তুতি চলছে আপনার পুত্রের সাথে; কিন্তু আজ থেকে প্রায় চোদ্দ বছর আগে আমার বড় কন্যার বিবাহ হয়েছিল। সেই বিবাহের সূত্র ধরেই আমাদের পরিবারে এক বিষাদময় অধ্যায় নেমে আসে"- এই বলে একটু থেমে জগবন্ধু র দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রইলেন হরিহর।
জগবন্ধু কিছু বুঝতে না পেরে ঝাঝিয়ে উঠে বললেন: "আহা ' তা সেই বিষাদময় ব্যাপার টা কি সেইটাই তো বললেন না আপনি"।
হরিহর একটু থেমে ধীরে বলল: "বলছি , আসলে আমি বড় জামাতার এর রূপ ও তার পরিবারের জমিজমা সম্পত্তি দেখে এত বিভোর হয়েছিলাম যে তাদের বংশ পরিচয় নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাই নি, ঘটক এর কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
কিন্তু অদৃষ্টের করুণ পরিহাসে বিবাহের রাতেই জানাজানি হয় আমার পাল্টি ঘর; বড় জামাতা আমদের থেকে নীচু জাত, ওদের সাথে আমাদের জলচল নেই। সাথে সাথেই আমার প্রতিবেশী আত্মীয় রা আমাকে ত্যাগ করে , এবং বিবাহ বাসরে আমার সাথে সাথে পাত্রপক্ষ কেও হেনস্থা করে। জামাতার পিতা সেই দেখে বেঁকে বসেন; ঘোষণা করেন : "তিনি আমার মেয়ে কে ঘরে তুলবেন না ", তাদের নীচু জাত বলায় তাদের ঘোরতর অপমান হয়েছে।
হঠাৎ আমার পরিবার- আমার কন্যার উপর যেন দুর্ভাগ্যের করাল ছায়া নেমে আসে।
বিবাহিত কন্যা কে তার শ্বশুর কূল ঠাই দিতে রাজি না হলেও আমার বড় জামাতাও তার সদ্যবিবাহিত পত্নী কে ত্যাগ করতে নিমরাজি হয় । ফলস্বরূপ জামাতার পিতা তার অবাধ্য সদ্য বিবাহিত পুত্রকে ত্যজ্য করে সেই রাতেই ফিরে যায়, আজীবন এর মতন পুত্র কে অস্বীকার করেন ।
এদিকে আমরা পরিবারেও এরপর শুরু হয় আরেক বিড়ম্বনা, আমার জামাতা র নীচু জাত হবার দরুণ আমাকেও পাড়া-প্রতিবেশী-গ্রামবাসী সবাই একঘরে করে ; ধোপা-নাপিত বন্ধ করে সমাজচ্যূত করেন । আমি নিরূপায় হয়ে গ্রামের প্রধান এর শরণাপন্ন হলে তিনি ও গ্রামের বাকি মানুষরা একটি নিদারূণ শর্ত পালন এর মাধ্যমে আমাকে সমাজে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়" ।- বলে হরিহর একটু থামে।
জগন্নাথ এতক্ষণ বিস্মিত হয়ে শুনে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে ওঠে : "কি সেই শর্ত? বলুন থামলেন কেন হরিহর বাবু? আমি সম্পূর্ণ শুনতে চাই।
হরিহর উত্তর দেয় : "ওরা আমার বড় জামাতা ও কন্যা কে ত্যাগ করতে বলে, ওদের আমার ঘরে রাখা যবেনা এবং ওদের সাথে আমার ও পরিবারের কোনো সম্পর্ক রক্ষা করা চলবে না! সব সংযোগ চুকিয়ে দিতে হবে।
এদিকে জামাতা -কন্যা সম্পূর্ন রূপে আমার পরিবারের উপর নির্ভরশীল ছিল ; ত্যাজ্য হওয়ার দরুণ পৈতৃক সম্পত্তির আধিকার সে হারিয়েছে আর অন্য কাজেও বিশেষ পারদর্শী নয় । তাই আমি আবার অকূল পাথারে নিক্ষেপিত হলাম। শেষে পরিবারের কথা চিন্তা করে বড়ির বাইরে একটা ছোট ঘর আর একটু জমির ব্যবস্থা করে দিলাম, সেইখানেই ঠাই জুটল ওদের, সাথে শুরু হল এক অসহ্য সংগ্রাম। যারা জীবনে মাঠে নামেনি চাষের কাজে নামল, বিফল হোল বার বার। অনিন্দ্যকান্তি চেহারায় সহসাই ফুটে উঠল কঙ্কালসার অস্থি-চর্ম । দূর থেকে দেখে বক্ষ বিদীর্ণ হলেও আমি সাহায্য করতে পারতাম না ওদের, নিষেধ ছিল গ্রামের।
এর মধ্যে দুই বছর পরে ওদের ঘরে আমার ফুটফুটে এক নাতনি এল, কিন্তু ক্ষীণ শরীরে সূতিকাগৃহ থেকে আমার কন্যা আর ফিরল না! সেই থেকে মাতৃহীন নাতনি আর তার পিতার সংগ্রামে কিছু বছর পরে সে তার বাবা কেও হারিয়ে বিশ্ব সংসারে একা হয়ে গেল। আমি বারবার ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছি; কিন্তু গ্রামবাসী আমাকে প্রতিবার প্রতিহত করেছে জাতপাতের কারণ দেখিয়ে, শেষে আমি হার মেনেছি। মা-বাপ হারা মেয়েটা একাই ঘরে থাকে , আমার যাবার আনুমতিও নেই ঐ ঘরে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে একটু খাবার, একটা কাপড় পাঠাই আমার ভৃত্য কে দিয়ে সন্তর্পণে।
জগবন্ধু বাবু, আমি আমার দ্বিতীয় কন্যার বিয়ে ঠিক করার আগে গলায় গামছা দিয়ে আমার সকল প্রতিবেশী দের কাছে গিয়ে আনুমতি নিয়েছিলাম । তারা একটি শর্তেই রাজি হয়েছিল : আমার নাতনি যেন এই বিয়েতে অংশ গ্রহণ না করে বা আমার পরিবারের সাথে যেন ওর মিলন না হয়, তাহলেই এই বিয়ে সম্ভব হবে, গ্রামবাসী অংশ গ্রহণ করবে। এই অজপাড়াগায়ে র অনুষ্ঠানে পাড়াপ্রতিবেশী রাই তো লোকবল, তারা সব ব্যবস্থা সহ রাজিও হয়েছিলেন অনুষ্ঠানে যোগদিতে। কিন্তু এখন সবাই পুরনো প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কেউ সাহায্য করতে অগ্রসর হচ্ছেন না।
আমি আজ বিকেলে আমার অবুঝ ক্রন্দন রত নাতনির সাথে দেখা করে তাকে বোঝাতে গিয়েছিলাম সে এই বিয়েতে অনাহূত । সেই সময়েই হয়ত পাড়ার কেউ দেখে ফেলেছে আর তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা কেউ এই বিবাহে অংশ গ্রহণ করবে না। পুরোহিত-নাপিত কেউ আসেনি। ওনারা আগে না বলে দিলে আমি এই বিবাহের জন্য অগ্রসরই হতাম না জগবন্ধু বাবু, সে আমার মেয়ে যতদিন খুশী অনূঢ়া থাকত- থাকত! আমি আপনাদেরও অপমান করলাম, হা ভগবান আমার নরকেও ঠাই হবে না।"-
এতকিছু বলে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল হরিহর।
স্তম্ভিত জগবন্ধু কিছুক্ষণ মৌন রইলেন। তারপর হরিহর কে ধীরেধীরে তুলে ধরে বললেন "আপনাদের গ্রামপ্রধান কে ডাকুন, আমার দরকার আছে। "
হরিহর জগবন্ধুর পা ধরতে উদ্যত হয়ে বলল: "জগবন্ধু বাবু, আমাকে আর ওদের সামনে অপমান করবেন না, আপনি আমায় যা বলবেন বলুন, প্রহার করলে করুন কিন্তু সর্বসমক্ষে বারংবার অপমান আমি আর সইতে পারছি না। দয়া করুন "।
জগবন্ধু দ্রুত সরে গিয়ে বলে উঠল: আহা করেন কি আপনি? দেখুন অন্যায় হয়েছে যখন এর বিহিতও দরকার। আর আমি সেই বিহিত সর্বসমক্ষেই করব। আর কথা না বাড়িয়ে ডাকুন প্রধানকে।
অগত্যা প্রায় মৃতবত চিত্তে অবসন্ন হরিহর বেরিয়ে গেল, কিছু সময় পরে কাতর অনুনয় করে সঙ্গে নিয়ে এল গ্রামপ্রধান কে। সাথে সাথে পুরো গ্রাম এর মানুষজন ভেঙ্গে পড়ল জগবন্ধুর হাতে অন্যায় বিধান বিহিত দেখতে।
সবাই উপস্থিত হলে, জগবন্ধু উঠে দাড়িয়ে গ্রামবাসীর দিকে একবার তাকিয়ে নিল। হরিহর চোখ বন্ধ করে যূপবদ্ধ প্রাণীর ন্যায় বলির প্রহর গুনতে শুরু করল: "হায় ভগবান আর কি কি আছে কপালে! "
জগবন্ধু বজ্রকঠিন গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল: "আমি এই মহারাজপুরের জগবন্ধু ঘোষ আজকে বলছি হরিহর ঘোষ আজ থেকে আমার বেয়াই, এই বিয়ে হবেই। আর তাতে যদি তোমরা, গ্রামবাসীরা ওকে ত্যাগ করো আমাকেও ত্যাগ করবে।
শুধু মনে রেখো- এই অঞ্চলের একমাত্র ডাক্তার আমার পুত্র তোমাদের চিকিৎসা করবে না, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র এই অঞ্চলের একমাত্র উকিল তোমাদের কোন মামলা হাতে নেবে না- তোমাদের পরিবারের কেউ আমার অবৈতনিক বিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না।
এইবার ঠিক করো: তোমরা কি আজকের বিয়ে মানবে কিনা? " - এই কথা বলে জগবন্ধু স্থির হোল।
হরিহর ভাবলেশহীন ভাবে ভাবছে ও কি ঠিক শুনল? কোনোদিন নিজে দৈববাণী শোনেনি, ভাবেওনি যে দৈববাণী বাস্তব! কিন্তু আজ জগবন্ধুর কথা গুলো সেই কল্পনাকে বাস্তবে নিয়ে এল। চারদিকে কোলাহল-ফিসফিস-ত্রাহিমাং রব চলতে লাগল বেশ কিছুক্ষণ, তারপর গ্রামপ্রধান সবার সাথে কথা বলে জোড় হাতে নমস্কারান্তে জানিয়ে দিল : "হ্যা, আমরা সবাই আছি জগবন্ধু বাবুর পুত্রের বিয়েতে। সবাই হরিহর বাবুর কন্যার বিবাহে অংশগ্রহণ করছি নি:শর্তে। এই কে কোথায় আছিস লেগে পড় তোরা, গ্রামের মান-সম্মান এর ব্যাপার। গ্রামের মেয়ের বিয়ে এত বড় ঘরে হচ্ছে দেখিস যেন কোনো অমর্যাদা না হয় ,
জগবন্ধু বাবু আজ থেকে হরিহর বাবুর উপর আর কোনো বিধি নিষেধ রইল না। ঠিক আছে তো? "
জগবন্ধু গ্রাম প্রধান এর দিকে মুচকি হেসে বলল: "না, আরেকটা বিষয়ও ঠিক করতে হবে, আরেক জন কেও মেনে নিতে হবে। হরিহর বাবু, আপনার নাতনি কে নিয়ে আসুন, ও আজকে থেকে পরিবারের সদস্যা।"
হরিহর যেন বজ্রাহত, "কি শুনছেন তিনি? তার নাতনি কে জগবন্ধু নিয়ে আসতে বলছে। "ছলছল চক্ষে কৃতজ্ঞ চিত্তে বলল: "আমি আনছি, ওকে এক্ষুণি নিয়ে আসছি। দিদি, আমার অন্নদা , আয় আয় কোথায় তুই? আজ তোর শাপমোচন এর দিন। বুকে আয় "।
"দাদু, আমি এইখানে,এই ভাঙ্গা পাঁচিলের পাশে"-
ভাঙ্গা পাঁচিল এর অন্তরাল থেকে বেড়িয়ে এলো অন্নদা, এসেই হরিহর কে জড়িয়ে ধরল। হরিহর হাউহাউ করে কেঁদে বড়বড় শ্বাস নিয়ে আনন্দাশ্রু সহযোগে বলল: "ওনাকে প্রণাম কর অন্নদা, উনি মানুষ না- সাক্ষাত ঈশ্বর।"
অন্নদা, এগিয়ে এসে দাদুর কথামত প্রণাম করতে উদ্যত হতেই জগবন্ধু বলে উঠল : "থাক মা থাক, প্রণাম করতে হবে না, শুধু তোমাকে একটা কাজ করতে হবে মা,তুমি করতে পারবে?"
অন্নদা অবাক হয়ে বলল:- "কি কাজ ? "
জগবন্ধু হেসে মাথায় আশীর্বাদ করে বলল : "মা, আজ তোমার মাসীর বিবাহে এসে থেকে অনেক ঝক্কি গেছে। এখন পর্যন্ত একটুও কিছু খাওয়া হয়নি। এখন কিছু খাওয়া দাওয়া না করলে শরীর যে আর চলছে না যে।
তুমি আমাকে এক হাতা অন্ন দেবে মা? আর আজকে তুমি যদি সকল নিমন্ত্রিত কে প্রথম-হাতা অন্নটা পরিবেশন করো এই বুড়ো মানুষ টা একটু তৃপ্ত হয়, আমার পুত্রের বিবাহ এক পুণ্যস্পর্শ পায় ।" কথা শেষ হবার আগেই এক ঝিলিক হেসে উঠল অন্নদা।
তারপর বিদ্যুৎ গতিতে হরিহরের পরিবারের হেঁসেলে ঢুকল, মূহূর্ত ক্ষণ পরেই দেখা গেল সবার বেআব্রু উন্মুক্ত হ্স্তে একমুঠো করে অন্ন তুলে দিচ্ছে অন্নদা। সমাজের শাপমোচন হল তৃপ্ত অন্ন স্পর্শে - অনতিবিলম্বেই শুভবিবাহ আরম্ভ হোল পুণ্য মন্ত্রোচ্চারণে।""
- এই বলে টুটু-সোনাই এর মা গল্পে ইতি টানলেন, দুই ছেলের দিকে ফিরে চাইলেন। কিন্তু একি! তিনি বিস্ময়ে অনুধাবন করলেন: দুই পুত্রই ঘোরের মধ্যে আবিষ্ট হয়ে সুদূরে কি যেন খুঁজছে-ভাবছে,
-"কি দেখছে কি খুঁজছে কি ভাবছে ওরা? ধীরে ধীরে ভালো ভাবে তাদের মুখপানে চেয়ে মায়ের মন সহজেই অনুধাবন করল পুত্ররা সজল তৃপ্ত চক্ষে নিজদের শিকড় এর সাথে নিজেদের সত্ত্বার সংযোগ স্থাপন করছে ।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন