হুরর হ্যাট,হটে গেল - হেরে গেল হেট হৃদয়।

আচ্ছা, একটি দৃশ্য কল্পনা করলে কেমন হয় :  বৈশাখী পূর্ণিমার সান্ধ্য শুভ্রালোকে প্রকৃতি সবে অবগাহন করে উঠছে , ঠিক তখনই আপনার মনে কোনো বিশেষ চিন্তা ভাবনার উদ্রেক হোলো।  আহ্হ- এই দেখ কাণ্ড, একটু ভাবতেই তো বলেছি! তাই বলে কি আপনি সত্যি ভাববেন নাকি, ধূর হয় নাকি?

কত্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আপনার।
কোথাকার কে পূর্ণিমা দেখে বিগলিত-গদগদ হয়ে কি-না-কি ভাবতে বলল আর আপনি মনে গুণগুণ রবে ভাবতে বসলেন "পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনী গন্ধায়" , অসম্ভব !
তার বদলে যদি একটু অন্য ধরনের কথা বলি ভাববেন নাকি?  ওহ জানতে চাইছেন সে কি এমন কথা যা ভাবতে বললেই আপনি আহ্লাদিত হয়ে একটু ভাবতে বসবেন!  আহা, সবুর করুন ধীরে চলছি, ধরে-ধরে  বলছি।
কি বলেন?  তাহলে শুরু করাই যাক : 

২০২৩ এর ২রা মে এক ভদ্রলোক সিনেমা রিলিজ এর কথা ভাবলেন:  তিনি একই দিনে একটা না দুটো না তিন তিনটে নতুন সিনেমা রিলিজ করবেন! ব্যস আধুনিক ট্রেন্ডে তিনি তার সামাজিক মাধ্যমে লিখলেন:-  ভাবছি, নতুন চলচ্চিত্র "সোনার রাজার দেশ"  নন্দনকাননে  প্রকাশ করব; "জন গণের শত্রু" দেশের রাজধানী তে আর "পূজার দেবী" সবার মাঝে ইন্টারনেট-ওটিটি তে সম্প্রচার করব।

ব্যস, পরিচালক ভেবে লিখেছেন;  এইবার আপনার ভাবনা প্র্যাক্টিস এর পালা।  এইবার আপনাকে একটু ভাবতে বলছি , ভাববেন প্লিজ? চলুন সময় অপচয় না করে একটু ভেবেই দেখাই : তাহলে আপনার ভাবার সময় শুরু হোল এখন!

ওহ,এইবার তো আপনার ভাবনার সূত্রপাত। কি ভাবছেন ? ঐ বিশেষ কিছুনা - একটু রেগে ভেবেই নিলেন : "নন্দন কাননে" সোনার রাজার দেশ রিলিজ করবে! কি এত বড় আস্পর্ধা! তৎক্ষণাৎ তর্জ্নীর পেশী ফুলিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি হেলিয়ে লিখে দিলেন : "রাজার শাসন নিয়ে আমরা কোনো কিচ্ছু শুনব না, কিছু দেখব না, কিছু বলব না- কিছুই ভাবব না। আমাদের রাজা মহান, সবে মিলে গাও তারই জয়গান। "

এই বার্তা আছড়ে পড়তে না পড়তেই বহু সুচিন্তক - বিবেচক মাথা হেলিয়ে ঘাড় ঝাঁকিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আপনাকে বাহবা জানিয়ে বলে উঠল "ঠিক, ঠিক"।
এদিকে আরেক কাণ্ড- সবাই তো সহমত পোষণ নাও করতে পারে সেই ভাবনা টাই আপনি ভুলে গেছেন। তাই কেউ ভিন্ন মতে কিছুমিছু বলতে এলেই ব্যস আপনি-আপনারা এইবার বিষ উগড়ে প্রতিপক্ষের বিষ দাঁত ভাঙ্গতে নেমে পড়বেন। এই তো সুযোগ!
ওমা, একি!  আপনি যে আরো ভাবছেন, ভেবেই চলেছেন!
"দেশের রাজধানী তে "জন গণের শত্রু"- এই সব উটকো বিষয় উচ্চারণ করা যায় নাকি? মানা যায় নাকি! না এটাও রিজেক্টেড।"
ওদিকে পূর্ণিমার মুক্ত হাওয়ার সুপ্ত মনে আপনি ভেবে বসলেন:  অন্তর্জালের মায়ায় যদি "পূজার দেবী" প্রকাশ পায় সেটাতো বিদেশের লোকজনও দেখবে, ইশশ কি না কি ভাববে!
না-না এই সব বার্তা বিদেশে দিলে বিদেশী রা অন্য চক্ষে দেখবে, তার দরুণ আপনার মুক্তমন-মুক্তভাষ্য যে সশব্দে ভূলুন্ঠিত হবে। না! এটা একদম মেনে নেওয়া যায়না "- তাই এর বিরোধিতা করে  আপনি একটি সুন্দর প্রবন্ধ লিখবেন - "এই যেমন একটি রচনা এখন পড়ছেন ঠিক তেমন !"
যাইহোক কিছুক্ষণ পরে আপনি দেখলেন তিনটি সিনেমা নিয়ে সবার মধ্যেই তুমুল উত্তেজনা! তবে , সেই উত্তেজনা বিপরীত খাতেই বইছে: ঘৃণা-ক্রোধ এর আবহে চারদিকে শুধু অগ্নিবর্ষণ-ভাষণ বার্তা ঘুরছে সমাজ মাধ্যমে।

এদিকে এত কিছু দেখেও কিন্তু সেই ক্ষণজন্মা চিত্র পরিচালক মানুষটি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না! মানুষের মনন পাঠে সিদ্ধহস্ত মানুষটি মনেমনে বললেন : শো মাস্ট বি অন।
কিন্তু একটু পরিবর্তন করে পরিস্থিতি অনুসারে ব্যবস্থা নিলেন: নন্দনকাননে প্রত্যাখ্যাত "সোনার রাজার দেশ" চলে গেল আন্তর্জাতিক অন্তর্জালে- ওটিটি প্ল্যাটফর্মে - "পূজার দেবী" রিলিজ হোল রাজধানী তে আর "জন গণের শক্তি" মাটির টানে মানুষের কাছে নন্দনকাননে পারিজাত হয়ে পরিস্ফুট হোল। সাথে সাথে চারদিকে "সাধু সাধু" রবে বিদেশ-দেশ-রাজ্য থেকে সবাই অভিবাদন জানাল। ও হ্যা ,ভূলেই গেছিলাম আপনার কথা! আপনিও উদ্বাহু হয়ে স্তুতি জানালেন!

ওদিকে মানুষটি কিন্তু আনচান মনে উদাসস্বরে বলে উঠবেন: - " মিসটেক - মিসটেক,
ত্রিশ বছরেই এই মানুষ গুলোর প্রাণের পাঁচালী নিভে গেছে! ভিন্নতর মতের উপর এত রাগ- ঘৃণা- অবজ্ঞা- উপহাস নিয়ে যেভাবে মেতে উঠেছে মৌষল পর্বের ভয়ানক অশনী সংকেতও এরা অনুধাবন করতে পারছে না!
মানুষগুলো আজকে শতরঞ্জ এর মৃত পেয়াদার থেকেও মানসিক ভাবে হীন ! স্বয়ং কাল যেন স্বয়ংক্রিয় অ্যানাইহিলিন পিস্তল নিয়ে এদের নিশ্চিহ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে, কোন বটিকা সেবনে এদের হেট স্পীচ দূর হবে? কি করে এই বিষ এদের মন থেকে বের করব কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কিছুক্ষণ বরং ভাবি, ভাবতেই হবে! হয় আমি উপায় ভেবে বের করব না হলে চিরকালের মতন ভাবা বন্ধ করে দেব!" 
আপনমনে এই কথাগুলো  বলে সেই মানুষটি কিছুক্ষণ চোখ বুঝে নিমগ্ন হলেন গভীর চিন্তায়। সময় বয়ে গেল, তারপর তিনি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন - হঠাৎ সোল্লাসে হাততালি দিয়ে বললেন:" আছে চিন্তা-ভাবনার জোর আছে, টেলিপ্যথির জোর আছে! আজকের দিনেই যা হবার ঠিক সেইটাই হবে, হতেই হবে"।
এরপর তিনি ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে নিজের একাগ্র দৃষ্টি তে সামনের দিকে অবলোকন করলেন। তারপরেই হঠাৎ দুই হাত তুলে  নির্দেশ দিলেন : লাইট - সাউন্ড- ক্যামেরা - একশান : "শান্তি পর্ব"

পর্দায় ফুটে উঠল এক লোহিত আগুন পরিবেশ। চারদিকে "হিংসা-ঘৃণা-দ্বেষ-দ্বন্দ্ব- ক্রোধ" নৃত্য করছে উন্মাদের মতন ! পৃথিবী মেতে উঠেছে বিনাশ যজ্ঞে। এক অস্থির অব্স্থায় নাভিশ্বাস উঠেছে বিশ্বের, কর্দমাক্ত চোরাবালি থেকে মুক্ত হতে গিয়ে যত উত্তেজিত হচ্ছে বাঁচার চেষ্টা করছে ততই গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে মানব জীবন।
এরই মাঝে চারদিকে হঠাৎ এক শুভ্র জ্যোত্স্না র আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। একটু দূরে বৈশাখী পূর্ণিমার ফুটফুটে জোছনায় পদ্মের বিছানায় সদ্যজাত এক শিশুর মুখ আলোকিত-কেন্দ্রীভূত হোল পর্দায়; দেখা গেল সেই শিশু হাসছে। সেই নিষ্পাপ মুখ নিসৃত ভুবন মোহিনী হাসির মাধ্যমে দিকে দিকে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়ল ক্রমান্বয়ে - পৃথিবীতে করুণা- শান্তি - দয়া- ক্ষমা - ভালোবাসা- ত্যাগ - কর্ম - আত্মনিয়ন্ত্রণ এর আটটি পথের উপড় জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ নিমেষে অবলুপ্ত হোল। জীবনযাত্রা সুন্দরভাবে পরিপূর্ণ করার আশায় মানুষ পুনরায় জেগে-বেঁচে উঠল, বৈশাখী পূর্ণিমার পুর্ণচন্দ্র সমহিমায় বিরাজমান রইল যুগযুগান্তরে। আবহ সঙ্গীতে শ্রবণ গোচর হোল কবির সৃষ্টি -

"বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে
বাজিল কাহার বীণা
আমার নিভৃত নব জীবন-'পরে
বাজিল কাহার বীণা
প্রভাতকমলসম ফুটিল হৃদয় মম
কার দুটি নিরুপম চরণ-তরে॥
বাজিল কাহার বীণা"

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

©️স্থিরচিত্র : নবারুণ মজুমদার 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"