রিসেশন এর মাটিতে ডেভিড ও গোলিয়াথ
২০২৩ এর পড়ন্ত বিকেলে তথ্যপ্রযুক্তি অফিসের টপ ফ্লোরের স্বচ্ছ জানালা দিয়ে সূর্য টা টুপ করে ডুবে গেল। একটা দীর্ঘ মিটিং শেষে কফির মগে চুমুক দিয়ে মুঠোফোনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল সায়ন মুখার্জি। ফেসবুকে ভেসে আসা অনেক খবরের মধ্যে একটি খবরে চোখ আটকে গেল, অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল: "আবার শুরু হয়েছে?"
সাথে সাথে সন্ধ্যের আবছায়ায় চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি পুরনো চিত্রনাট্য।
২০০৮ সালের নভেম্বর মাস:
কুয়াশার চাদরে ঢাকা মফস্বলের এক বিয়েবাড়িতে তুমুল হট্টগোলের মধ্যে মুঠোফোন টা কেঁপে উঠল থরথর করে - একটা বার্তা ঢুকল। স্ক্রিনেভেসে উঠল :
"সায়ন, ইমেল টা চেক কর , আমি যা দেখছি তা বিশ্বাস করতে পারছি না! তুই ইমেল টা দেখে আমাকে ফোন করিস। " - মুঠোফোন এর মাধ্যমে সৌরভ এর বার্তা দেখে সায়ন বিস্মিত ! বিয়ে বাড়িতে সবে নেমন্তন্ন খেতে বসেছে হঠাৎ এই বার্তা। পাতের কচি পাঁঠার থেকে মন এখন পুরো অন্যদিকে ঘুরে গেছে: - "ধূর কিসের ইমেল, সেটা লিখতে কি দোষ ছিল সৌরভের, তাহলে কি সেই বহু প্রতিক্ষিত বার্তা এসে গেছে! জ্য়েনিং কি দিয়েই দিল অবশেষে?"
কলেজ পাশ করেছে ছয় মাস হয়ে গেল সায়ন এর ; কলেজে থাকাকালীনই ও চাকরী পেয়েছিল তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক বহুজাতিক দৈত্যাকৃতি সংস্থায়, । কিন্তু পাশ করে বেরিয়ে আসার পরেও সেই সংস্থা আজ-কাল করে যোগদানের বার্তা আর পাঠাচ্ছিল না! এর মধ্যে আবার বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে মন্দা-রিসেশন।
যাইহোক, তাহলে সেই বার্তাই এসেছে তার মানে ; তাইতো একসাথে-একসংস্থায় চাকরীপ্রাপ্ত কলেজফ্রেন্ড সৌরভ সেটাই হয়ত বার্তার মাধ্যমে বলতে চেয়েছে সায়নকে।
"এখন ইমেল টাই বা কি ভাবে চেক করি?"- সেটাই ভেবে পাচ্ছে না সায়ন! মোবাইলে ইন্টারনেট পরিষেবা চালু থাকলে তবুও হয়ত বা চেক করা সম্ভবপর ছিল, কিন্তু ওর এই পুরনো মুঠোফোন এ শুধু কথা আর বার্তাই চলে। অন্তর্জাল এর স্পর্শ-রহিতই রয়ে গেছে ফোন টা।
তাই যতক্ষণ না, বাড়ি ফিরে সেই ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে ক্ম্পুটারএ ইন্টারনেটের সংযোগ স্থাপন হচ্ছে ও কিচ্ছু জানতে পারছে না। যাই হোক পাঁঠার মাংসের মায়া ত্যাগ করে অর্ধেক খেয়েই প্রবল উত্তেজনায় দৌড়তে-দৌড়তে বাড়ি চলে এল সায়ন। এসেই ক্ম্পুটার স্টার্ট করে নেট কানেক্ট করে ইমেল এ লগইন করে বিস্মিত হয়ে দেখল সংস্থার থেকে বার্তা ঢুকেছে।
কিন্তু এ কি বার্তা! : ওর নতুন সংস্থা ওকে জানিয়েছে-
প্রিয় সায়ন ,
তারপরের কথা গুলো পড়ে সায়ন বাকরুদ্ধ! কি লিখেছে এই সব!বার্তা টা একবার-দুইবার-বারবার পড়ল সায়ন, ও কি ঠিক দেখছে? ইংরেজি কি পড়তে কিছু ভূল হচ্ছে।
এখন রিসেশন এর মার্কেট, তাই সংস্থার হাতে কাজ ঢুকছে না - বিজনেস রিক্যয়ারমেন্ট নেই । তাই তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে সংস্থার কাছে সায়ন এর সেরকম কোনো মূল্য এই মুহূর্তে নেই। তাই ওদের যোগ্যতা অনুসারে এই মুহূর্তে ওদের কে সংস্থায় নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না!
তবে ,যদি সায়ন চায় টেলিকলার হিসেবে ফোন এ বার্তালাপ এর পরীক্ষায় বসে উত্তীর্ণ হয়ে বিপিও তে প্রবেশ করতেই পারে।
নচেৎ ওর আগের তথ্যপ্রযুক্তির অফার আর গ্রাহ্য হবেনা। রিজেক্টেড। দুঃখিত।।
সায়ন কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে টেবিলে ভাবলেশশূন্য ভাবে বসে রইল। মাথা কাজ করছে না একদম। কি ভেবেছিল কি হয়ে গেল, কল্পনার এভারেস্ট থেকে চিন্তা-ভাবনা-পরিকল্পনা মারিয়ানা খাতের বাস্তবে সশব্দে আছড়ে পড়ল।
তরপর, ধীর পদক্ষেপে ঘোরের মধ্যে পরিবারের কাছে এই নিদারুণ তথ্য পেশ করল। সহসাই বিনা মেঘের বজ্রপাতে আবিষ্ট হোল পরিবারের সদস্যরা। এক সাথে অনেক আশা - একটু ভালো থাকার স্বপ্নে হঠাৎ একটা অশনি ছেদ পড়ল- প্রতিটি ক্ষণ এক একটি যুগের মতন অতিবাহিত হতে লাগল, সময়ের প্রতিধ্বনি ধাক্কা খেল ঘরের সিলিং এ।
কিছু পরে উদাস ভাবে বাবা গলা ঝাকিয়ে বললেন: "দেখ সায়ন, সংস্থা আগের অফার তোকে না দিতে পারলেও অন্য সুযোগ তো দিচ্ছে। বিপিও র পরীক্ষা তে যদি পাশ করে যাস তাহলে তো নতুন অফার পাবি, ভেবে দেখ এটা সুযোগ।" বাবার কথা শুনে মা ও পাশ থেকে বলল- "হ্যা ভেবে দেখ বাবা,ঠিক হয়ে যাবে দেখিস, আমি ঠাকুরকে প্রাণপণ ডাকব যেন হয়ে যায়"।
এত কিছুর মধ্যে ছোট্ট ভাই হতবাক হয়ে দাদা-বাবা-মা কে দেখছে , বাবা হতাশ গলায় আশ্বাস দিচ্ছে, মা হতভম্ব ভাবে ঠাকুরকে ডাকছে।দেখছে দাদার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা পাগল স্রোতের মতন বেরিয়ে আসতে চাইছে, প্রাণপণ চেপে রাখার চেষ্টা করেও পারছে না ।
হঠাৎ সায়নের ফোন টা আবার সুর করে বেজে উঠল , দেখল সৌরভ ফোন করেছে ।
সৌরভ এবার জানাল ওদের ব্যাচের যারাযারা সংস্থায় ঢোকার স্বপ্নে বিভোর ছিল সবাই এক বার্তাই পেয়েছে, সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরেছে, কারোর বোধ-মাথা কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না সামনে কি করবে।
সায়ন হঠাৎ কি ভেবে বলল : একটা কথা বলতো সৌরভ, এই বার্তা কি শুধু আমাদের কলেজ এর ছাত্রছাত্রী দের কাছেই এসেছে না অন্য কলেজের ছাত্রছাত্রী রাও পেয়েছে?
সৌরভ একটু ভেবে বলল: "হ্যা সামাজিক মাধ্যমে-গুগলটক-অর্কুট-ইয়াহু মেসেঞ্জার এর মাধ্যমে যা জেনেছি রাজ্যের প্রতিটি কলেজই প্রায় ঐ সংস্থা থেকে এক বার্তা পেয়েছে"।
এই শুনে, সায়ন খুব শান্ত স্বরে বলল: "একটা কাজ করতে পারবি সৌরভ? তুই তো অর্কুটে খুব এক্টিভ তুই বাকি দের মানে আমাদের কলেজ, বাকি যেইযেই কলেজ এর যারা এই বার্তাটা পেয়েছে তাদের সবাই কে আগামীকাল সেক্টর ফাইভ আসতে বলতে পারবি ? সবাই যাতে আসে একটু দেখিস। সবাই কে চাই"।
সৌরভ বিস্মিত হয়ে বলল, "সে না হয় আমি ব্যবস্থা করছি কিন্তু সবাই এসে করবেটা কি ?"
সায়ন চোয়াল শক্ত করে বলল: "দেখা যাক কি করে , কিছু না পরুক হাতের মুঠো টা তো শক্ত করতে পারবে"।
পরেরদিন ভরদুপুরে সেক্টর ফাইভে সেই সংস্থার সামনে প্রায় দেড়শ-দুশো সদ্য রিজেক্ট ইমেল প্রাপ্ত হতাশ যুবক-যুবতী র মাঝে দাড়িয়ে সায়ন স্থির দৃঢ়কণ্ঠে বলতে শুরু করল:
"আচ্ছা বন্ধুরা, কালকে যে ভয়ংকর বার্তা পেয়ে আমরা সবাই এখানে সমবেত হয়েছি তাতে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা এইখানে কি করতে এসেছি? তাইতো?"
সবাই মোটামুটি মাথা নাড়িয়ে বলল: "হ্যা ,কেন জড়ো হয়েছি এইখানে ? ঐ ইমেল এর পরে আমাদের কি আর করার কিছু আছে?, সব শেষ হয়ে গেল! "
সায়ন একটু থেমে সবার দিকে একবার তাকিয়ে বলল: "হ্যা করার তো অবশ্যই আছে, অনেক অনেক কিছু করার আছে।"
সবাই : "কি করব? ঐ বিপিও পরীক্ষায় বসব? পারব নাকি আমরা? এটাতো কৌশলে আমাদের বাদ দেবার উপায়।"
সায়ন একটু স্মিতহেসে উত্তর দিল: "আছে , বন্ধুরা উপায় আছে, বলছি শোনো:
নতুন বিপিও পরীক্ষার ক্ষেত্রে বলার- ওটা আমাদের দক্ষতার বিষয়ই না, সুতরাং আমরা অনেকেই বিপিও র জন্য তৈরীই হইনি। আজকে যদি জলে সাতার কেটে বেড়ানো মাছ কে ডেকে কেউ বলে আজ থেকে ডাঙায় হেঁটে বেড়াও এই বিপিও পরীক্ষাও ঠিক সেই বিষয় হবে আমাদের ক্ষেত্রে। কিছু অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র যুক্ত মাছ মাটিতে বেঁচে গেলেও অধিকাংশই পারবে না।
বিপিও র জন্য আলাদা কুশলী ক্ষমতা লাগে যা তথ্যপ্রযুক্তি র কুশলী ক্ষমতার থেকে ভিন্নতর। তাই বলব বিপিও পরীক্ষা যদি কেউ দিতে বা নিতে চায় সেইটার ক্ষেত্র ভিন্ন।
বিপিওর জন্য আমাদের বর্তমানে যে অফার আছে তা প্রত্যাখান করা চলবে না। জ্য়েনিং এর জন্য অপেক্ষমান থাকব। এটাই বলার ছিল। আমরা সংস্থার সাথে কথা বলব, আমাদের দাবি জানাব"।
সবাই সায়নের কথা শুনে একটু ভেবে চিন্তিত মনে বলে উঠল: এইটা আমরা বললে সংস্থা মেনে নেবে বলে মনে হয় ? ওরা কি শুনবে আমাদের কথা?
সায়ন তৎক্ষণাৎ প্র্ত্তুত্তরে বলল : "একদম ঠিক, আমি একা তুমি একা এইভাবে বললে হয়ত শুনবেও না। কিন্তু আমার বিশ্বাস আমরা একসাথে থাকলে সঠিক উপায়ে সংঘবদ্ধ ভাবে অগ্রসর হলে নিশ্চয়ই শুনবে-মানবে । প্রথমে না শুনলেও অন্য উপায়ে শোনাতে হবে: ভগত সিং এর ভাষায় বললে একটু শব্দ প্রাবল্য বৃদ্ধি করে সেই শব্দ যাতে ঠুলি পরা কানে প্রবেশ করে সেই ব্যবস্থাই করতে হবে আমাদের । জোটবদ্ধ হয়ে একসাথে হাঁটতে হবে আমাদের;
প্রয়োজন হলে আমরা যে রাজ্যে আছি সেই রাজ্যে প্রধান এর কাছেও যাব- ওনার মধ্যস্থতাও চাইব দরকারে। রাজ্যের সন্তান-সন্ততি দের হয়ত বঞ্চিত হতে দেবেন না সেই শুভ্রকেশ উদ্যমী মানুষটি। কি বলো তোমরা? আমরা কি একসাথে আমাদের ন্যায্য অধিকার এর জন্য এক হয়ে লড়ব? "এই বলে সায়ন সবার দিকে একবার ফিরে তাকাল ।
সবার চোখে মুখে ফুটে উঠল এক দৃঢ়তা, এক সংঘবদ্ধ সংকল্প, হাত মুঠো করে বলে উঠল : "আমরা সবাই এক হবো , পাশে থেকে নিজেদের অধিকার এর লড়াই লড়ব আমরা "।
এর পর শুরু হোল সেই আধুনিক যুগের দ্বন্দ্বমূলক লড়াই- একদিকে বিশাল পুঁজিপতি আরেকদিকে সেই কয়েকশ দৃঢ় সংকল্প সদ্য শ্রমের বাজারে প্রস্ফুটিত হাতের মুঠো । স্বাভাবিক ভাবেই প্রথমে পাত্তাও দেয়নি পুঁজির দল: ভেবেছিল এদের মতন ক্ষুদ্রতম বিন্দুদের পাত্তা দিয়ে কি হবে, যা বলেছি মানতেই হবে।
কিন্তু পুঁজি বোঝেনি এই বয়স টাই আগুনের বয়স ; কোনোদিনও ইউনিয়ন-শ্রমিক-পুঁজি না বোঝা - অচেনা অজানা এক দল ঠাসবুনোট এক হয়ে রুখে দাড়াল। যারা ছিল একান্ত তথ্যপ্রযুক্তি কলেজের নিতান্ত সাতে-পাঁচে না থাকা কয়েকশ যুবক যুবতী তারাই এখন পরিস্থিতির নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে নিজের থেকেই অজান্তে হাতের মুঠো শক্ত করল, হাতে হাত মেলাল, গলা চড়াল আমাদের দাবি শুনতে হবে - ভাবতে হবে- মানতে হবে।
সেই মুঠোর পাশে এসে দাড়াল সরকার -মন্ত্রী - সরকারের প্রধান এবং সংবাদ মাধ্যম।
শেষে প্রবল চাপে পুঁজি মেনে নিল নব শ্রমিক এর দাবি , বহাল রইল পূর্ববর্তী অফার; আর সাথে কেউ যদি অগ্রিম আগ্রহী হয় জ্য়েনীং এ - তার জন্য বিপিও তে যোগদানেরও সুযোগও বহাল রইল।
পর্যায়ক্রমে এক বছরের মধ্যে সবার কাছেই ইমেল এল : স্বাগত,এই সংস্থায় যোগদান করো । ধীরে ধীরে সবাই সংস্থায় নিযুক্ত হোল পূর্বতন অফারের মান্যতাতেই।
ব্যাক টু ২০২৩:
২০০৮ এর সেই ছেলেমেয়ে গুলো আজ নিজের তথ্যপ্রযুক্তির কেরিয়ারে অভিজ্ঞতার চেয়ারে গা এলিয়ে মুঠোফোন এর স্ক্রিনে ফেসবুকে একটা বার্তা পেল! - নতুন কর্মী দের কৌশলে জয়েনিং দিচ্ছে না কিছু কম্পানি! শর্তসাপেক্ষ চোখ রাঙাচ্ছে।
হঠাৎ সেই পুরনো চোখ গুলো অবাক হয়ে দেখল এতদিন তাদের পুঁজিপেষাই আঙ্গুল গুলো সোচ্চারে বলে উঠল পুঁজি কে উদ্দেশ্য করে - ফেসবুকের ফিডে ফুটে উঠল :
"সঙ্গঘবদ্ধ হাতের মুঠো ।
আমরা ঝড়, তোরা খড়কূটো" ।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
©️ছবি: ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন