সব পদ এসে মিশে গেল শেষে।।
দুম!ধপাস! হঠাৎ করে একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে আছড়ে পড়ল একটি বাদামি কোট পরিহিত ছেলে। আচম্বিতে মেঝেতে পড়ায় বেশ কিছুক্ষণ স্থিরবত নিশ্চল হয়ে ভাবলেশহীন ভাবে পড়ে রইল সে।
কেমন একটি অদ্ভূৎ বিসদৃশ ঘ্রাণে তার মন প্রাণ ঘুলিয়ে উঠল। কিছু সময় পরে যখন আশেপাশের অন্ধ্কার পরিবেশ এর সাথে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে তখন ছেলেটি বুঝতে পারল ও একটি প্যাচপ্যচে স্যাতস্যাতে ঘরের ভিতর পড়ে রয়েছে, ঘরের চারদিকে একটি লালচে পিচ্ছিল প্রাকার এর অস্তিত্বও অনুধাবন করল।
উফ্ফ, কি থেকে যে কি হয়ে গেল? প্রচন্ড গরম লাগছে, এ কোন যায়গায় এলাম রে বাবা! একটু আগেই তো সেজে-গুজে সভার মাঝে মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করছিলাম। সবাই আমার কত্ত প্রশংশাই না করছিল।
তারপর হঠাৎ ই দেখলাম এক কাঁটায় বিধে এক লকলকে গহ্বরে কেউ আমাকে নিক্ষেপ করল! উফ্ফ কি পিচ্ছিল গহ্বর ধরে এই ঘরে এসে উঠলাম! কি যে হচ্ছে কিছুই বুঝলাম না।
এই সব ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ আরেকটা আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেল ছেলেটি। একটু কষ্ট করে অন্ধ্কারে খুঁজে দেখল ওর মতন আরেকটা ছেলেও আছড়ে পড়েছে মেঝেতে। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখল সেই ছেলেটিও অজ্ঞান হয়েই পড়ে আছে, একটু ভালো ভাবে ঝুঁকে দেখে একসাথে পুলকিত ও বিস্মিত দুইই হোল! আরে ওতো সেই ঘন হলুদ জামা পড়া ছেলেটা যার সাথে একটু আগেই দেখা হয়েছিল! ওকে দেখেও সবাই সুখ্যাত করছিল! তখন তো ওকে দেখে গা জ্বলে যাচ্ছিল, উফ্ফ ঐ না চেহারা হলদে-সবুজ ওরাং-ওটাং এর মতন, ও নাকি এক সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছে সভাময় ! সবাই আহ্লাদিত হয়ে ওর নাম নিচ্ছে। কি আদিখ্যতা সবার। অসহ্য! তখন তো ওর মুখ দেখতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না।
কিন্তু এখন এইখানে তো ওকে ছাড়া আর কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না! দেখি, জ্ঞান ফেরাতে পারি কিনা! একটু জল থাকলে ছিটিয়ে দিতাম, যদিও মেঝেটা পিচ্ছিল তবুও জল হলে ভালো হোত।
এই সব ভাবতেভাবতে হঠাৎই এক বালতি জল যেন উপর থেকে কেউ ঢেলে দিল; দুজ্নেই পুরোপুরি ভিজে গেল! হঠাৎ জলের স্পর্শে মাটিতে পড়ে থাকা হলুদ জামার ছেলেটা জ্ঞান ফিরে এসেছে, সে চেঁচিয়ে উঠল! ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল : এ কি আমি কোথায় এলাম? কি অন্ধকার। আরে তুমিও এইখানে, কি হচ্ছে বলো তো ?
বাদামি কোট পড়া ছেলেটাও ওর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে বলল আমিও একটু আগেই এসেছি ভাই,কিছুই বুঝতে পারছি না এ কোথায় এলাম?
দুজনেই যখন এই ভাবে বিস্ময়ে হতবাক হঠাৎ শুনতে পেল কেউজন হিম-শীতল কণ্ঠে ওদের সম্ভাষণ করল: ভয় পেওনা এদিকে চলে এসো, এইযে এই দিকে।
"কে-কেআমাদের ডাকে? কোনদিকে যাব আমরা?"
- "এই দিকে এসো": বলেই হঠাৎ আবছা লালচে ছায়াময় পরিবেশ থেকে এক হলুদ-কমলা পোষাকের মানুষ প্রায় টেনে হিচড়ে মেঝের থেকে উঠে আসবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না- টলমল করতে করতে আবার মেঝেতেই বসে পড়ল।
ছেলে দুটোও অবাক হয়ে বলল: আপনিও এখানে? আপনাকেও তো একটু আগে দেখলাম সেই বর্ণময় সভায় । কি সুন্দর পোষাকেই না সেজেছিলেন! আপনি উঠে দাড়াতে পারছেন না কেন? কি হয়েছে? আপনি কি জানেন এ কোথায় এসেছি আমরা, একটু বুঝিয়ে বলবেন? আমরা কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
সেই সুন্দর রঙ্গীন পোশাক পরিহিত ভদ্রলোক ধীরশান্ত ভাবে বললেন : "সব বলছি, আমি বেশ কিছু সময় আগেই এসেছি। ধীরে ধীরে এই স্থানকে অনুধাবন করেছি। তবে তার আগে তোমাদের কিছু বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই!
আচ্ছা, একবার বলতো আমরা যখন নিজের নিজের প্রতিভায় সবার মাঝে সভাস্থলে প্রশংশিত হচ্ছিলাম, তখন কেমন লাগছিল তোমাদের? "
দুজনেই মাথা হেলিয়ে উত্তর দিল: "খুউব ভালো লাগছিল। আসলে এত প্রশংশা পেয়ে আমরা তো খুব আহ্লাদিত হয়ে উঠেছিলাম, তবে নিজের প্রশংসা ব্যতিরেক অন্য কারোর প্রশংসা শ্রবণগোচর হলেই এক সুতীব্র দহনে মন জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিল! তা এই সব ভাবতে ভাবতেই অকস্মাৎ এই বিস্ময় গহ্বরে কেন যে নিক্ষেপিত হলাম সেইটা বুঝলাম না! তা আপনি যখন জানেন তাহলে বলুন না এটা কোন স্থান, আর যদি জানেন দয়া করে একটু বলুন কিভাবে এই স্থান থেকে আমরা আবার ফিরে যাব সেই আনন্দ সভায়?
উত্তরে সেই মানুষটি স্মিত হেসে বললেন: আচ্ছা, তা না হয় আমি বলব কিন্ত তার আগে বলোতো ঐ সভায় তোমাদের নাম গুলো কি ছিল? তোমাদের কি নামে সবাই ডাকছিল?
দুজনেই মাথা নেড়ে জিভ কেটে বলল বলল না: এমা, প্রশংসার চোটে সেটা তো খেয়াল করিনি! আপনি জানেন? আর এই অন্ধকূপে নিক্ষেপের সাথে আমাদের নামের কি সম্পর্ক আছে নাকি, কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না!
প্রত্যুত্তরে সেই স্মিত হাসির স্পর্শ ধরে রেখেই তিনি বললেন:
সম্পর্ক অবশ্যই আছে, সব বুঝিয়ে বলছি।
আহ্হ আরে, ভালো ভাবে চারিপাশ চেয়ে দেখো!আমরা কোথায় আছি জানো?
দুই জনেই অতিবিস্ময়ে বলল : কোথায়?
তিনি বললেন: আমরা এখন মানুষের উদরের ভিতরে বসে আছি !
এই উদরের বাইরে আমাদের মধ্যে কত বৈরীভাব- কত প্রতিযোগিতা - কত দ্বেষ ! কাকে বেশী সুন্দর লাগছে- কে কত বেশী প্রশংসা পেল - কার জীবনে কত বেশী লাইক এল তাই নিয়ে নিজেরা অহেতুক উত্তেজিত হয়েছি, একে অপরকে হিংসাও হয়ত করেছি, মনে-মনে নিপাত যাক ধ্বংস হোক বলে গালি-অভিশম্পাত ও দিয়েছি।
কিন্ত উদরে এসে দেখো- আমি-তুমি-তোমরা সব বৈচিত্রই-বৈপরীত্যই এক যায়গায় মিলে গেছে। আমি আইসক্রিম- তুমি বাদামি কাবাব - আর তুমি হলে বিরিয়ানির মাংস!
আমরা এখন নিজদের কীর্তির চাদরে নিজদের প্রাথমিক পরিচয় পার হয়ে যেই মুখগহ্বরে প্রবেশ করেছি সেই থেকে আর আমাদের বাইরের কোনো পরিচয় নেই বিভেদ নেই,ভিতরের পরিচয় শুধু পাচ্য হয়ে উপভোক্তার শক্তি-পুষ্টি তে নিয়োজিত দেহ-মন! আমরা আর কিছু সময়ের মধ্যেই একসাথে মিশে যাব, এক হয়ে যাব।
কিন্তু আমাদের জীবত কালে কখনোই বুঝতে পারলাম না এত বৈচিত্রের মধ্যে আমরা সবাই এক সূত্রে আবদ্ধ ছিলাম সেইটাই আমাদের চরম সত্য।
এত কিছু বলে আইসক্রিম যখন ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়ে পাচক রসে মিশে যাচ্ছে সেই মুহূর্তে দুই বন্ধু বিরিয়ানি-কাবাব বলে উঠল: আপনি যে চলে যাচ্ছেন, মিশে যাচ্ছেন হারিয়ে যাচ্ছেন। আর কিছু সময় কি আমরা আপনাকে কাছে পেতে পারিনা? আপনার সহচর্য এবং সত্য অনুসন্ধান আমাদের সমৃদ্ধ করছে। দয়া করে আরো কিছু বলুন।
আইসক্রিম স্নিগ্ধ হেসে শেষবারের মতন বলে গেল: কিছু শুরু হলে যেমন শেষ হবে সেটাও যেমন সত্য
তেমন আরেকটি সত্য এই অন্তিম মুহূর্তে অনুধাবন করলাম। ভিন্নভিন্ন খাদ্যই হোল পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম; আর উদর হোল সর্ব ধর্ম সমন্বয় স্থল। এই বার সব খাদ্যই যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে সাম্য রক্ষা করে পরিপুরক ভাবে অব্স্থান করে তাহলে পুষ্টির মাধ্যমে দেহ হবে সুস্থ-সবল পরিপূর্ণ।
আর কোন একটি বিশেষ খ্দ্যের মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণে ও বাকিদের অভাবে দেহ হয়ে পড়বে রুগ্ন-ভঙ্গুর। আমার সময় শেষ, এই বার্তা তোমরা পরবর্তী খাদ্য দের মধ্যে ছড়িয়ে দিও, চললাম আমি। বলেই সম্পূর্ণ বিগলিত হয়ে গেল আইসক্রিম।
বিরিয়ানি-কাবাব দুজনেই অবাক ঘোরের মধ্যে বাস্তবে ফিরল আরেকটি ধপাস শব্দে, ওরা পিছনে ফিরে দেখল শেতবর্ণ পায়েস-সিমুই অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিরিয়ানি-কাবাব হাসিমুখে অভ্যর্থ্না জানাবার জন্য উদ্যত হোল নতুন প্রতিবেশী দের।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন