শ্রেষ্ঠ বোকার একদিন
সারা বছর ধরে বোকামি করে এক বোকা ভাবল, না আজকের দিনে ভিন্ন স্বাদের বোকাদের গল্পই না হয় হয়ে যাক। না না, আপনাদের বোকাবোকা বকবকে বিরক্ত করব না, বরং এই একটু ভিন্নভিন্ন বোকার চরিত্রচর্বনে চালাক চালকের চরিত্র টাও অনুধাবনের প্রচেষ্টা চলবে, চলুন তাহলে শুরু করি।
এপ্রিল এর এক তারিখ, পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে বোকাপল্লী তে একটি বোকাচক্র আলোচনায় বসেছে। মঞ্চের সভাপতি হাসিহাসি মুখে ঘোষণা করল সারা দেশ জুড়ে এই কয়েক জন মনোনীত হয়েছেন এই বছরের শ্রেষ্ঠ বোকা সম্মানের প্রতিযোগিতায়। আপনারা নিজেরাই ঠিক করুন কোন জন শ্রেষ্ঠ, হ্যা অবশ্যই এনাদের মুখ থেকে আপনারা শুনতে পাবেন এদের ভিন্ন বোকাকাহিনী। আসুন শুরু করা যাক:
একএক করে সব প্রতিযোগী কে ডেকে নেই কিছু বলার জ্ন্য, আসুন শুরু করুন , দয়া করে করে বলুন আপনাদের বোকামির কাহানী:-
প্রথম প্রতিযোগী সভার সবাই কে জোড় হাতে প্রণাম জানিয়ে শুরু করল :
নমস্কার, আমি পেশায় মুদি, নাম বোকামুদি। বাবুরা ভাবছেন এ আবার কেমন নাম? অবাক হবেন না, বলছি কেন এমন নাম। প্রথমেই বলি, এলাকায় আমার দোকানটা তেমন চলেনা, না বাবুরা আমি জিনিষ খারাপ বেচি না আসলে আমার জিনিষ এর দাম টাতো ন্যূনতম করলেও দেখি বাকি দোকানিরা তার থেকেও কমিয়ে দেয়। ওদের দোকান ভিড়েভিড়াক্কার আর আমার দোকানে কদাচিৎ কেউ আসে। আমি অনেক ভেবেও যখন কূলকিনারা করতে পারছিনা তখন একদিন আমার স্ত্রী এসে খবর দিল ও খবর পেয়েছে বাকি সব দোকানেই অনেক স্বল্প দামে জিনিষ বেচতে পারে কারণ ওরা কিছুটা ভেজাল মেশায় যা ক্রেতা সহজে বুঝতে পারেনা! আমিও ওদের মতন করলেই নাকি সাক্ষাত মা লক্ষী ঘরে আসবেন।
শুনে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললাম : আমি পারব না! যমের দোসর হয়ে মানুষ কে ভেজাল খাইয়ে লক্ষী কে বাধতে। সেই দিন থেকেই আমার পরিবার আমার নাম দিল:- বোকামুদি।
তবে কি জানেন এই সেদিনও দেখলাম এক নতুন ক্রেতা এলেন। ভেজাল মেশান স্বল্প মূল্যের লাভের মুড়ি খেতে গিয়ে নাকি তার দুটি দাঁত ই গেছে; এখন অন্য খাবার চিবুতেও অসুবিধা । যাই হোক সে এখন আমার থেকেই মুড়ি নেওয়া শুরু করেছেন, এরকম কিছু ক্রেতার মাধ্যমেই এখনো টিকে আছি।যে একবার আসে সে পুনরায় ফিরে আসে, ঘুরে ফিরে আসে। তাদের দৃষ্টিতেই আমি এক বিশ্বাস এর ভরসা পাই। বলে মুদিবোকা প্রতিযোগী মঞ্চে স্থান গ্রহণ করলেন।
এইবার উঠে এলেন দ্বিতীয় প্রতিযোগী। একটি সদ্য কিশোর। সেও সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলে উঠল: কাকু-কাকি জ্যঠু-জ্যঠি দাদা-দিদি আমি হলাম আপনাদের বোকাছাত্র। আসলে আমার গল্প তেমন কিছুনা , আমি উচ্চমাধ্যমিকে অনেক টেনে টুনে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার শ্রেনীর সবাই আশি শতাংশের বেশী নম্বর পেয়েছে বোর্ডে আর আমার জুটেছে ষাট শতাংশ। এই রেজাল্ট এর পরে আমাদের স্যর রা আমাকে ডেকে বললেন ক্লাসে সবাই যেভাবে ভালো ফল করল আমি কেন পারলাম না, আমি উত্তরে শুধু বলেছিলাম আমি তো ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা দিতে যাইনি। শুনে অবাক হয়ে বন্ধুরা - পরিবারের মানুষ রা- স্যর রা বলে উঠল তুই একটা বোকাছাত্র ।
কি আর করব বোকাই রয়ে গেলাম, তবে সর্ব ভারতীয় এক পরীক্ষায কিভাবে যেন প্রথম একশ এর মধ্যেই নাম তুলে ফেললাম বোকামি করে - প্রশ্ন ফাঁস এর উপর নির্ভর না করেই!
হ্যা এখন আমি আমার পরের ব্যাচ এর উচ্চমাধ্যমিক এর ছাত্র দের প্রাণপণ সাহায্য করছি ওরা যাতে বোকার মতন নিজেরাই নিজদের মেধার ভিত্তিতে নাম তোলে।
বোকাছাত্র চলে যেতেই মঞ্চে উঠে এল এক মধ্যবয়সী যুবক। বলল আমি বোকাছাত্রের লাইনেই আছি, তবে ও যেমন নিজের থেকে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখেনি আমিও বোকার মতন চাকরী ক্ষেত্রে উত্কোচ না দিয়ে আমার হারিয়ে যাওয়া প্রাণের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছিলাম এক বোকাআদর্শ বাদীর তকমা। সেও সেদিন চলে গেছিল কারণ আমদের মতন মানুষরা নাকি সমাজে টিকবে না। কি আর করব, মনের অনেক কষ্ট চেপে লড়াইটা চালিয়ে গেছি সেদিন, উত্কোচ দিয়ে নিজের হৃদয় এর এক পাশকে সুখী করতে গিয়ে পুরো হৃদয় কেই গ্লানিতে নিমজ্জিত করিনি। না ,সরকারী চাকরী আর পাইনি তারপরে। শেষে এখন একটা বেসরকারী ক্ষেত্রে নিজের রুজি-রুটি যোগাড় করে নিয়েছি।এখন হয়ত সবই ঠিক ঠাক চলে যাচ্ছে কিন্তু নামের পিছনে বোকা আদর্শ ট্যাগ টা আর সরেনি, সমাজ থেকে হারিয়েও যাইনি।
এর পরেই মঞ্চে এলেন চোখ ঢাকা প্রতিযোগিনী । সাথে একটি বিশাল কাঠামো ;সেটিও ঢাকা। এসে জোড় হ্স্তে সবাই কে প্রণাম করে চক্ষের অবগুণ্ঠন না সরিয়েই বলে উঠলেন : শুধু এই বছর না, বছর বছর যুগ-যুগ আমিই হয়ত সব থেকে বেশী বোকা হই। এই দেখুন, আমি প্রভাবিত না হবার জন্য চোখ ঢেকে দাড়িপাল্লায় সত্য-যুক্তি কে মেপে মানুষ এর বিধান দেবার চেষ্টা করি, কিন্তু দিনের শেষে দেখি অনেক ক্ষেত্রেই আমার চোখের সাথে হাত টাও যেন বাধা পড়ে গেছে! আমি দোষী-দোষ-প্রতারণা কে উপলব্ধি করেও কিছু সময়ে প্রমাণ এর অভাবে কিংবা নিয়ম এর জালে নিজেই নিজের কাছে বোকা হয়ে যাই। শাস্তিও দিতে পারিনা।
তখন মনে হয় আসল বোকা কি আমি না অন্য কেউ। ধীরস্থির ভাবে ভেবেচিন্তে আমি সেই বোকাগুলোকে খুঁজে পাই।
জানতে চান, আমার বোকামি বা যুক্তিহীনতার কারণ কারা ? আসল বোকা কে জানেন?
সমগ্র সভাবৃন্দ সমস্বরে বিস্ময়ে চিত্কার করে বলল : কে?
রহস্যময়ী কাঠামো থেকে অবগুণ্ঠন সরানোর সাথে সাথে প্রত্যেক সভাবৃন্দের মুখ দর্পণের কাঠামোয় প্রতিফলিত হোল,
শ্রেষ্ঠ বোকা র সম্মানে সম্মানিত হোল সমাজ নিজেই।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন