বিন্দু র পাশে বাঁকা চাঁদের রাত। মুক্তচিন্তা বিশ্বাস ভালোবাসার হাতেহাত।।

"মা, তাড়াতাড়ি ছাদে এসো! দেখো কি এক অপূর্ব দৃশ্য" :  মনা ছাদ থেকে চেচিয়ে মা কে ডাকল। নীচে মা তখন সারা দিনের কাজকর্ম সেরে সবে মাত্র সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়েছে। ছাদের থেকে মেয়ের চিত্কারে বিস্মিত হয়ে উঠল মা! "উফ! কি হয়েছে ? সন্ধ্যা দিচ্ছিতো।" মনা তার থেকেও জোরে উত্তর দিল: তুমি আগে ছাদে এসো, বাকি সব পরে। মা কি আর করে , অগত্যা সন্ধ্যা প্রদীপ নিয়ে পড়িমরি করে হাঁটুর ব্যথা ভুলে সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে এসে দাড়াল। "কি হয়েছে টা কি? "

মনা প্রত্যুত্তর না করে হাত দিয়ে মায়ের মুখ টা পশ্চিম আকাশ পানে নির্দেশিত করল।
এ-একী!! এতো একফালি বাঁক চাঁদ আর তার নীচে একটা টিপ। বিস্ময়ে মা নিশ্চুপ, দুই চক্ষু বড়বড় করে সেই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখছে।
"মা কেমন দেখ্ছ?"- মনা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল মা কে। হাতের সন্ধ্যা প্রদীপ হঠাৎ কেঁপে উঠল চৈত্রের দক্ষিণা  হাওয়ায়। মা বিহ্বলতা র সাথে বলল :প্রদীপ টা একটু ধরবি মনা? মনা চুপচাপ প্রদীপ টা হাতে নিয়ে দেখল মা দুই হাত কপালে তুলে প্রণাম করছে চাঁদ আর বিন্দু তারা কে।
মা! একি, প্রণাম করছ কেন?  মা ধীরস্থির ভাবে উত্তর দিল: ভালো ভাবে দেখ মনা, অর্ধচন্দ্র নীচে বিন্দু এ আমাদের ঠাকুর এর ললাট দর্শন হচ্ছে, আমি তুই আমরা সবাই ভাগ্যবান। প্রনাম কর তুইও, খুব ভালো করেছিস আমাকে ডাক দিয়েছিস ছাদে।
:- মা! চুপ করো, কি সব বলে যাচ্ছ এটা অমাব্স্যার দুদিন পরে একফালি চাঁদ আর শুক্র গ্রহ ছাড়া আর কিছুই না। এটা একটা বৈজ্ঞানিক নিয়মে গ্রহ উপগ্রহের ঘূর্ণন মাত্র। এটাতেও ঐশ্বরিক ব্যাপার খুজে পেলে তুমি?
মা কিছু না বলে আবার কপালে হাত ঠেকিয়ে মনার হাত থেকে প্রদীপ নিয়ে নীচে  নেমে গেল।
মনা ভাবতে থাকল, "আমার মা বিজ্ঞানের ছাত্রী বিজ্ঞানে স্নাতক তবুও এই মহাজাগতিক বিষয়কে এক ঐশ্বরিক বিষয়ে পরিণত করল! আশ্চর্য।" এইসব ভাবতে ভাবতে কিছু সময় পরে নীচ থেকে সুন্দর গোবিন্দ ভোগ আত্প এর সুবাসও অনুভব করল:-  "দেখেছ কাণ্ড : মা এইবার এই রাত বিরেতে আবার পরমান্ন ভোগ রাঁধতে বসল ঠাকুর এর জন্য, উফ্ফ খুব-খুব ভূল হয়েছে এই চাঁদ তারা দেখান। যা পারে করুক গিয়ে, এখন নীচে গেলেই আমার সাথে ঝামেলা হবে তার থেকে বরং ছাদেই থাকি। "
বেশ কিছু সময় পরে চন্দ্র, শুক্র অস্তমিত,পূব  আকাশে তখন সিংহ রাশি এসে গেছে উত্তর আকাশে সপ্তর্ষিমন্ডলও স্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত। এই সময় নীচ থেকে কলিংবেল এর শব্দ শোনা গেল। "তারমানে বাবা এসে গেছে অফিস থেকে , বাবা কে বলতে হবে সব, সাথে মায়ের এই অত্ভুৎ কাণ্ড গুলোও বলব "- এক দৌড়ে নীচে এসে দরজা খুলল মনা । না বাবা তো আসেনি। আমিনা এসেছে,আমিনা ওর স্কুল এর বন্ধু এক ক্লাসেই পড়ে , এক সাথেই যাতায়ত করে ।

"ওহ তুই, আমিনা, আয় আয় ভিতরে আয়। ও কাকিমা আপনিও এসেছেন আসুন আসুন। " আমিনা হাসতে হাসতে ভিতরে ঢুকে ব্যাগ এর থেকে একটা বিশাল টিফিন বাক্স বের করে মনা র হাতে দিয়ে বলল এই নে মা বানিয়েছে, সিমুই এর পায়েস।
বা: অসাধারণ ব্যাপার তো রে, ধন্যবাদ কাকিমা।
আমিনা একটু মুখ ভেংচে বলল:  আর ধন্যবাদ দিতে হবে না, সারাদিন রমজান মাসে রোজার উপোস করে সবে বসেছে, সেই সময়ে সন্ধ্যার দিকে তোর হয়াট্সএপ এর মেসেজ পেয়ে চাঁদ তারার ঐ দৃশ্য যেই দেখিয়েছি আবার এই সব তৈরী করল। বার বার বললাম এইটা দৃশ্য হিসেবে উপভোগ করো , না এর মধ্যে খুঁজে পেল পবিত্রতা। আর তুই এই বার্তা আমাকে দিয়েছিস তাই নিজে হাতে তোকে খাওয়াতে চলে এল। বোঝ কাণ্ড!
"কাকিমা আপনিও, সব মায়েরাই কি এরকম ? " : মনা বিস্মিত হয়ে বলে উঠল। আমিনা ভুরুকুঁচকে বলল : সব মায় রাই এরকম হয় মানে? মনা হেসে বলল না আমার মা ও চাঁদ তারা দেখে ভোগ পায়েস রাধছে। এদের নিয়ে কি যে করি!

"কিচ্ছু করতে-ভাবতে হবে না আমাদের নিয়ে, আমিনা এই নে দেখত কেমন হয়েছে পায়েস টা; ও তো মুখ গোঁজ করেছে তাই তুই আগে টেস্ট করে বল । এক বাটি পায়েস আমিনার হাতে তুলে দিল মনার মা।
তারপর দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ ভাবে বলল : তোদের কি মনে হয় আমরা মা-য়েরা কি জানিনা- ঐটা চাঁদ আর ঐ টা একটা তারা, না মানে শুক্র গ্রহ। সেইটা আমাদের মস্তিষ্কে আছে এরা গ্রহ-উপগ্রহ। কিন্তু এদের যুগল দৃশ্য দেখে মনের মধ্যে এক পবিত্রতা-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা র উদ্রেক হয়েছে আমাদের দুই মায়ের বুকে।
ঠাকুর-দেবতা-সর্বশক্তিমান-আল্লা এরা হয়েছেন সেই পুণ্য প্রকাশ এর মাধ্যম আর এই পায়েস-সিমাই সেই ভালোবাসার নিদর্শন। আর তোরা দুটি হলি সেই ভালোবাসার উপভোক্তা। এইবার তুই বল বিজ্ঞান এর বিশ্বাস আর ধর্মের ভালোবাসা র মধ্যে কি বিরোধ হয়েছে আমাদের মনে? বিরোধ হলে কি ভালোবাসার সৃষ্টি সম্ভব?
যতক্ষণ বিজ্ঞান ই হোক ধর্ম ই হোক মুক্ত-চিন্তা-সম্মান আর ভালোবাসার সৃষ্টি তে নিয়োজিত ততক্ষণ দুজ্নেই সর্বশক্তিমান দুজ্নেই সমান। বিজ্ঞান ধ্রুব সত্য যে তোকে আরো-আরো চিন্তা করতে ভাবতে শেখাবে আর ধর্ম ভালোবাসার মুহূর্ত টি সৃষ্টি করবে,  সত্য-ভাবনা-ভালোবাসা একত্রিত হলেই জীবন সার্থক।
এই বলে মনার মা আমিনার মায়ের হাতে-হাত রাখল, মনা-আমিনা হাতে সিমুই-পায়েস এর বাটি  নিয়ে অবাক হয়ে দুই মায়েদের দেখ্ছে। মায়েরা এগিয়ে এসে হাসিমুখে মুখে তুলে দিল অমৃত । উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা দিকনির্দেশ করল উজ্জ্বল ভাবে।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"