দলছুটের অভিভাবক

"না রে, এইবার আর পারলাম না। হঠাৎ দপ্তরের ডাকে রানার হয়ে ছুটতে হচ্ছে, খুব মিস করব তোদের" - কথাগুলোর সাথে দীর্ঘশ্বাস এর প্রত্যাঘাত প্রত্যাবর্তন করল ফোনের অপর প্রান্তের নীরবতায়। দুই মুহূর্ত নীরবতা যেন সময়ের দুই হস্তী স্তম্ভের মতন চেপে বসল শুভ্রর কাঁধে।

কিছুপরে, অপর প্রান্তের  হতাশ কাতর স্বরে আবেদন : "একটু চেষ্টা করে দেখ, যদি ম্যানেজ হয়ে যায়। অনেকে অনেক চেষ্টা করে এই দিনটায় আবার দেখা করতে আসছে, সেই স্কুলের দিন আবার ফিরছে। তুই না এলে সেটা হয়ত বন্ধ হবে না কিন্তু অসম্পূর্ণ রয়েই যাবে, চলে আয়।"
"দেখছি, চেষ্টা করছিরে। যদি কিছু আপডেট হয় জানাচ্ছি" - বলে শুভ্র আর কথা না বাড়িয়ে ফোন টা কেটে দিয়ে রাতের ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে, ভাত রইল ভাতেরই যায়গায় পড়ে।
কিছু পরে পাশে উপবিষ্ট শুভ্রর মা ছেলের পাতের নিশ্চলতা দেখে অনুসন্ধিৎসুর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন: "ভাতের থালা নড়ছে না কেন রে তোর ? ফোন টা আসার পর থেকে আনমনে কি এত ভেবে চলেছিস? কে ফোন করেছিল?"

শুভ্র মায়ের দিকে তাকিয়ে ম্লানস্বরে বলল : "স্কুলের এক পুরনো বন্ধু ফোন করেছিল মা। পরশুদিন আমাদের ব্যচের স্কুলের সব বন্ধুরা একত্রিত হবে। সেই ব্যপারেই ফোন।"
মা বেশ উৎফুল্লু হয়ে  বলল : "বা: , এ তো খুব ভালো খবর। সেই ছোট্ট ছোট্ট ছেলে গুলোকে দেখতাম ২০ বছর আগে, এখন কত বড় হয়ে গেছে নিজেরা আবার পুনর্মিলিত হচ্ছে খুব ভালো খবর।
তা এতে তোর মুখ ভার করার কি হোল?"

শুভ্র নির্জীব ভাবে উত্তর দিল: "অফিসের কাজে কালকে শহরের বাইরে যেতে বলছে মা। সোমবার সকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমাকে অন্য শহরে থাকতেই হবে। তাই শনিবারের মধ্যেই আমাকে চলে যেতে বলছে।
কিন্তু বন্ধুরা চাইছে আমি পুনর্মিলনে যাই, অনেকের সাথে সেই ২০ বছর আগে দেখা করেছি। কিন্তু অফিসের ফাঁসে আটকে গেলাম এইবার।"
বলে মুখ কালো করে বসে রইল শুভ্র।
ছেলের উত্তর শুনে একটু থেমে, ভেবে নিয়ে মা বললেন:
"দেখ, অফিসের গুরুত্ব অবশ্যই মানতে হবে। কিন্তু তোর নিজের মন কি চাইছে - কি ভাবছে সেটারও  একটা গুরুত্ব আছে। তুই কি ভাবছিস?
শুভ্র তৎখ্নাৎ উত্তর দিল:
আমার মন একদম মানছে না মা, ছোটবয়সের স্কুল  ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা করতে খুব ইচ্ছে করছে।
মা হেসে বলল : তাহলে তো উত্তর তোর কাছেই আছে, তোর মনের গুরুত্ব কাকে বেশী নম্বর দিয়েছে।
এখন একবার  ভেবে দেখ, তুই যদি রবিবার ওদের সাথে দেখা করে তারপরে অফিসের জন্য বেরিয়ে যাস তাহলে কি এই সমস্যার সমাধান হতে পারে?
যদি সেটা সম্ভবপর হয় তাহলে হয়ত একটু খাটনি হবে, হয়ত বা শরীরের উপর বেশ ধকলও যাবে।
অফিসের কাজে নতুন শহরে যাবার পরিকল্পনা একদিন পিছিয়ে শারীরিক ধকল সইতে পারলে , সোমবার সকালে নতুন শহরের অফিসে যখন ঢুকবি তখন হয়ত এক রাতের নিদ্রাতুর চোখে স্বপ্নপূরণ এর আনন্দ দেখতে পাবি।"
মা এর কথা শুনে শুভ্রর মনে এক আনন্দের স্পর্শ প্রবাহিত হোল। সাথে সাথে দুটো ফোন করল,  একটা  বন্ধুকে আরেকটা অফিসে। খেয়েদেয়ে একটু পরে হৃষ্ট চিত্তে গেয়ে উঠল : বন্ধু চল বল টা দে।

দুইদিন পরে  রবিবারের সন্ধ্যায় নতুন শহরের উদ্দেশ্যে শুভ্র যাত্রা শুরু করল ,  মা এর নম্বর শুভ্রর স্ক্রিনে ভেসে উঠল , মা ফোন করেছে।
মা :" কিরে কখন উঠলি বাসে? সারাদিন সব ঠিক ছিল তো?"
শুভ্র: "হ্যা মা, এই একটু আগেই উঠলাম। পুনর্মিলন উৎসব থেকে সোজা বাস স্ট্যান্ড চলে এলাম।
সারাদিন সব ঠিক ছিল, না শুধু ঠিক বললে ভূল হবে, খুব আনন্দে ছিলাম। কিভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।"
মা: "বা: খুব ভালো। তা, কে কে এসেছিল?"
শুভ্র: "কে আসেনি বলো? সেই সাত-সাগর পার করে যেমন বন্ধুরা এই দিনটা মনে রেখেই পরিকল্পনা করে দেশে এসেছে তেমন সারারাত জেগে একবেলার জন্য এসেছে কয়েকজন, পুনর্মিলন শেষ হতে না হতেই আবার কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছে।
অনেকে অনেক কাজ পিছিয়ে, কর্মক্ষেত্রের দাবি দাওয়া সামলে, বাড়ীর অনেক দায়িত্ব সামলে - এক মুহূর্তের জ্ন্য এসেছে। কেউ কেউ তো পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের কিছু সময়ের জন্য ছেড়ে শুধু মাত্র ২০ বছর আগের কিছু মুহূর্তে ফিরে পেতেই চলে এসেছে।
তবে জানো মা - অনেকে অনেকে চেষ্টা করেও আজকে শেষ অব্ধি আসতে পারল না, সত্যি তাদের আজকের নিদারূণ মনো:কষ্ট অবর্ণনীয়!
আসলে আসতে সবাই চেয়েছে, হয়ত এই যোগদান কে সম্ভব করার পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে যাদের ছিল তারাই আজ  অংশগ্রহণ করতে পারল। আর, কয়েকজন বন্ধু নিজেরা সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এই বিশাল মিলন যজ্ঞ সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্পন্ন করল । ওদের উদ্যোগ না থাকলে এই সুন্দর মূহূর্ত গুলি বাস্তবায়নের কোনো উপায়ই ছিল না।"

ছেলের কথা শুনে মা হেসে বলল : "আজকে তোর যোগদানে জানিস আমিও খুব খুশী হয়েছি। তবে জানিসতো একটু স্বার্থও কাজ করেছে আমার, আমি মনেমনে চেয়েছিলাম তুই যোগদান কর আজকে।"
মায়ের কথা শুনে শুভ্র চোখ বড়বড় করে  বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল: "কি বলছ মা? স্বার্থ কাজ করেছে তোমার? আমার পুনর্মিলনে তোমার কিসের স্বার্থ? কিছুই তো বুঝলাম না ।"

মা ছেলের কথা শুনে স্মিতহেসে উত্তর দিল:
"দেখ আজ থেকে ২০ বছর আগে তুই তোর ছেড়ে আসা বন্ধুদের যেমন মনের স্মৃতিকোঠায় স্থান দিয়েছিস সেই ভাবে সেই বন্ধু দের মা-বাবা-অভিভাবক রাও কিন্তু তোদের সূত্রেই একদা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবিষ্ট ছিল দীর্ঘ দশ-বারো বছর। তারপর তাদের অনেকের সাথেই আর যোগযোগ হয়ে ওঠেনি সুদীর্ঘকাল। আজ তুই যখন পুনর্মিলন উৎসবে যোগ দিলি আমিও আমার ছেলের বন্ধুদের ও তাদের অভিভাবক বন্ধুদের বিষয়ে হয়ত কিছু তথ্য পাব সেই আশায় উৎসাহিত হলাম। এক সময়ে এদের সাথে প্রতিদিন দেখা হোত, এখন শুধু সুখ স্মৃতি হয়ে বিরাজ করে , অনেকের নাম ভুলে গেলেও হয়ত মনে পড়ে ছেলের বন্ধুর নামে তার মা-বাবা কে।
তাই তোর যোগদান  তোর বন্ধুদের নিজদের মিলিয়ে দিল ঠিক সেই ভাবে আমাদের মতন কিছু অভিভাবক কেও ফিরিয়ে দিল কিছু পুরনো সময়, কিছু স্মৃতিচারণ ।
বলতে পারিস এটাই ছিল আমার স্বার্থ। একটু খবর পাবার প্রত্যাশা, তারা সব কেমন আছে?"

শুভ্র সজল চোখে হাসতে হাসতে বলল:   "বলছি মা।  তবে তুমি পারোও বটে , আচ্ছা শোনো তবে এক-এক করে  এক-এক জনের বিশেষণে সবিশেষ  বর্তমান পরিচয় দেই। ঐ যে সেই ছেলেটা মা, যে ক্লাসে সব থেকে দুষ্টু ছিল, যার মা কাকিমা খুব ভালো আবৃত্তি করতেন..এখন ওরা..

হাইরোডে বাসের গতি বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মাতা পুত্রের গল্পের গতিও গতি পেল। মা কখনো উৎফুল্ল হোল, কখনো হৃদয় বিদারক সংবাদে কষ্ট পেল: তবুও গল্প চলল এগিয়ে.....


©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।


প্রথম পর্ব: 

https://avrasoura.blogspot.com/2022/06/blog-post_26.html

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"