পাঠ প্রতিক্রিয়া
পাঠপ্রতিক্রিয়া ::
আজকের পাঠ প্রতিক্রিয়া :৫।পুস্তক : কৃষ্ণ বাসুদেব ।।
স্রষ্টা : বাণী বসু।।
প্রকাশক: দেজ পাবলিশিং
এযাবত পাঠ প্রতিক্রিয়া:
১। মোহনলালের সেনাপতি
২। পুরাণ ও সেদিনের কথা
৩। সুভাষ ও নেহেরু বিরোধ
৪। গোলামের বিবি
সাহেবের টেক্কা
৫। কৃষ্ণ বাসুদেব
।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ৫ : কৃষ্ণ বাসুদেব ।।
মানব কৃষ্ণ তাঁকেই আমি বলি...
বাণী বসু রচিত "কৃষ্ণ বাসুদেব" উপন্যাস টি সম্পন্ন করে একটাই কথা মনে হচ্ছে: এক অন্য-অনন্য মানব কৃষ্ণের সাথে আজ পরিচিত হলাম।
কৃষ্ণের জীবনধারা বিশ্লেষণ করতে বসলেই পরিলক্ষিত হয় সেই বৈচিত্রময় চরিত্রের মধ্যে প্রেমিক-বন্ধু-আদুরেশিশু- দুষ্ট এর দমন শিষ্টের পালক শাসক- অথবা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি গণ রাজ্যের ভাবনায় রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপক রাজ্নীতিবিদ ও কূটনীতিবিদ একত্রে বাস করছে। তিনি বহুধা রূপেই আমাদের প্রত্যেকের কাছে ধরা দিয়েছেন; কর্মের মাধ্যমে চরিত্রের উদাহরণ স্থাপন করেছেন। বহুরূপ এর মাধ্যমে তিনি যুগপুরুষ এর মতন বিশ্বরূপ ধারণ করে আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর হয়ে বিরাজমন যুগযুগ ধরে। কিন্তু এর বাইরেও তিনি নিজেও যে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন সেই চিন্তা কি খুব সহজে ,প্রাথমিক ভাবনায় ধরা পরে ? তিনি যা করেছেন একজন মানুষ হিসাবেই করেছেন এই যুক্তিবোধ এর প্রাবল্য অনেক সময়েই অলৌকিক কিংবদন্তীর আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
এই খানেই লেখিকা দক্ষতার সাথে এক মানুষের যুগপুরুষ হয়ে ওঠার কথা সর্বসাধারণ এর ভাষায় প্রকাশ করেছেন। যেই বিষয় গুলির পিছনে একটি ঐশ্বরিক মায়ার অবগুণ্ঠন ছিল তার প্রতিটি ক্ষেত্র ও চরিত্রের বিশ্লেষণ সত্য বাস্তবায়নের পথে মানব কৃষ্ণের পরিচয় উন্মোচিত : কৃষ্ণ এক্ষেত্রে একজন মানুষ রূপে সম্পূর্ণ উপন্যাসে বিদ্যমান। এই বাস্তবায়ন এর চিত্রটি আরো সুস্পষ্ট হয় যখন একই সম্পর্কের দুইটি ক্ষেত্র উন্মচিত হয় সমগ্র উপন্যাস এর মাধ্যমে : পূর্ব ও পরবর্তী পর্ব! ভালোবাসা-ক্ষোভহিংসার পর্ব: উদাহরণ স্বরূপ বড় ভাই বলরাম এর চরিত্র টি জীবনের দুই পর্বে দুই বিপরীতমুখী প্রবাহে আবর্তিত হয়েছে কৃষ্ণ কে কেন্দ্র করে।
প্রথম পর্বে বলরামের প্রাণপ্রিয় কনিষ্ঠভ্রাতা কিন্তু পরবর্তি তে "সিবলিং রাইভালরি" র মতন একান্ত মানবিক চরিত্রের নাগপাশে আবদ্ধ! একই রকম ভাবে রাধা র সাথে প্রেমের সম্পর্কেও প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির একটি প্রচ্ছন্ন মোহে পাঠক কে শেষ অব্ধি বেঁধে রেখেছেন। সেই একই মানবিক সম্পরর্কের গোলক ধাঁধায় জীবনের দুই পর্বে আবর্তিত হয়েছে কৃষ্ণ ;পত্নী-পুত্র-পরিবার-বন্ধু- যদুকূল সমাজ প্রত্যেক টি সম্পর্ক এই দুই অধ্যায়ে দুই ভাবে ধরা দিয়েছে পাঠকের মননে।
এই মানবিক গুণ - দোষ - দ্বেষ - ভালোবাসা - হিংসা - দয়া - করুণা - যোগবিয়োগের আবর্তে কৃষ্ণের মানব জীবন কিভাবে আবর্তিত হয়েছে সেই বিষয়টি উঠে এসেছে এই উপন্যাসের প্রতি পাতায়, রচিত হয়েছে মানব কৃষ্ণের মানবিক জীবনধারা:
এমন মানব জনম আর কি হবে।
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।।
পুস্তক : কৃষ্ণ বাসুদেব ।।
স্রষ্টা : বাণী বসু।।
প্রকাশক: দেজ পাবলিশিং
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ৩-৪ ।।
এইবার একটু অন্য ধরনের বিষয়। যে বিষয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল, গড্ডালিকা প্রবাহে প্রচলিত মিথ কে সম্বল করে চলতে গিয়ে যুক্তির অভাবে মনে হোত এই খানে একটি মিসিং লিঙ্ক আছে, সেই জীবন্ত নিদ্রিত ফসিলের খোঁজ পেলাম বইমেলায় বিভিন্ন স্টলে বই সন্ধান এর সময়ে! পাশাপাশি এই দুটি বই পড়লাম।
৩।
পুস্তক : সুভাষ নেহেরু বিরোধ
স্রষ্টা : নন্দ মুখোপাধ্যায়।
প্রকাশক : পত্রলেখা
ছোট থেকে স্থূল সরলীকরণ এর মাধ্যমে শুনেছি নেহেরু নেতাজী বন্ধু ছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় নেতাজী কে সহ্য করেননি নেহেরু। কিন্তু কেন? এই কেনর উত্তর যখনই শুনেছি তার ঐতিহাসিক ব্যখ্যার বা যুক্তির থেকে আবেগের প্রাধান্যই থাকত বেশী।
এই বই টি পড়ে অনেক আবেগ যুক্তির স্পর্শে আলোকিত হোল। সুভাষ চন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহেরু এক সময়ের দুই সহযোদ্ধা যাদের দুই বলিষ্ঠ কাঁধে পূর্ণ স্বরাজ প্রস্ফুটনের সম্ভবনা ছিল, কি ভাবে এঁদের মধ্যে বিরোধ এর একটি প্রাচীর ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হোল ? কিভাবে পূর্ণ স্বরাজ এর স্বপক্ষে থাকা এবং সমাজতন্ত্রী মতে বিশ্বাসী নেহেরু ধীরে ধীরে কংগ্রেসের দক্ষিণ পন্থী বলয়ে ঢুকে পড়লেন? কিভাবে নেতাজীর চিন্তা র থেকে নেহেরু চিন্তা আলাদা হয়ে গিয়েছিল,)? নেতাজি ও বামপন্থী দের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?
গান্ধীজি প্রথমে নেতাজীর মতের বিপরীতে থেকেও কেন অনুধাবন করলেন নেতাজীর অহিংস মতে সহিংস আন্দলন এর যুক্তি সঠিক, (৪২ এর এই আন্দোলন যা নেতাজী ৩৯ এই করতে চেয়েছিলেন: যা অনেক দেরীতে উপলব্ধিতে আসে)
।
এই বই এর সব থেকে বড় বিষয় যা প্রতিটি চিঠি, তথ্যে এবং লেখকের বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে তা হোল নেহেরু ভারত কে দেখেছিলেন বিশ্বের প্রয়োজনে নেতাজী বিশ্ব কে দেখেছিলেন ভারতের প্রয়োজনে । আর এটি সুস্পষ্ট নেতাজী ও নেহেরু রাজনৈতিক বন্ধুই ছিলেন, কিন্তু গলায়-গলায় বন্ধু বলে যে মিথ টি প্রচলিত তা কখনোই ছিলেননা। কিন্তু নিজদের মধ্যে এক অন্য পর্যায়ের সম্ভ্রম সম্মান ছিল যা সত্যি অনুকরনীয়।
( আমার এত দিনের ধারনা ছিল এদের মধ্যে বন্ধুত্ব একসময়ে হয়ত জয়-বিরু র মতন ছিল, সেই ভ্রম থেকে তথ্যের মাধ্যমে নিজেকে জারিত করলাম এই বই টির মাধ্যমে)
৪।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
পুস্তক : গোলামের বিবি
সাহেবের টেক্কা।
(রাজনীতির অরাজনৈতিক আখ্যান)
স্রষ্টা : অভীক মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক: বেঙ্গল ট্রয়কা পাবলিকেশন
এই বইটি একটি মিসিং লিঙ্ক, হারিয়ে যাওয়া পর্দার আড়ালে চলে যাওয়া ভারতের কিছু বিখ্যাত চরিত্র যারা রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ না হলে ইতিহাসের ধারাই হয়ত অন্য রকম হোত। এরকম তিন- চার চরিত্র নিয়েই লেখক অসামান্য ভাবে রাজনৈতিক সময়ের এক একটি অবগুণ্ঠন উন্মোচন করেছেন সুচারুভাবে।
নেতাজি পরবর্তীতে যখন ৪২ এর ডাকে সমগ্র নেতৃবৃন্দ কারাগারে, তখন কিভাবে সেই আন্দলন একটি অহিংসার মোড়কে প্রতিবাদী সহিংস স্পর্শ পেল, কে ছিল এর পিছনে। গান্ধীজি সব জেনেও কেন আর নেতাজি বিতাড়নের মতন ভূল করলেন না! তিনি জে পি নারায়ণ! অনেক তথ্য এবং ঘটনা যা জেনে শিহরিত হবার মতন।পণ্ডিতজির ক্যাবিনেট এর হাতছানি নিমেষে উড়িয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন যখন ডাকবেন চলে আসব , তবে কংগ্রেসের জন্য না, দেশের জন্য আসব ।
এর পরের চরিত্র দক্ষিণ ভারতীয়, যাকে এখন অব্ধি ভারতের শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে অনেকেই পরিগনিত করেন । এমন সময়ে এনার আবির্ভাব যেসময়ে দক্ষিণ ভারত অশান্ত হয়েছে, এক এক করে এমন সব শক্তিশালী বিরোধি ও দলের মনুষকে সাথে নিয়ে এগিয়েছেন যা দৃষ্টান্তমূলক।
হিন্দি- ইংরেজি না জেনেও সামনে এল দেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের আহ্বান। নিজের সাধ্য বুঝে নাকচ করলেন - কামরাজ,
দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষা কে ছড়িয়ে দিতে সেই যুগের যুগান্তকারী সব পরিকল্পনা ও তার সফল প্রয়োগ। সাথে এমন সব চরিত্র আলোচিত হয়েছে যেমন বিধ্বংসী ( দেব দেবীর মূর্তি ভেঙ্গে এমনকি জাতীয় পতাকা র অবমাননা র মতন পরিকল্পনা কারী, বা অভিনেতা রামচন্দ্রন, ও লেখক করুণানিধির রাজনৈতিক উত্থান সব এক সাথে লেখক খুব নিষ্ঠার সাথে প্রকাশ করেছেন।
এর পরের ম্যাডাম্জী দ্বিতীয় ও লোকপাল নিয়েও সুন্দর ভাবে তথ্য উপস্থাপন করেছেন লেখক। সত্যি ৪৭ এর কিছু আগে থেকে ঠিক আজকে অব্ধি তথাকথিত রাজা-রানী-গোলমের টেক্কার খোঁজ এই বইয়ে পাওয়া যাবে।
(সদ্য পূর্ববর্তী পাঠপ্রতিক্রিয়া)
২।
পাঠ প্রতিক্রিয়া ২ : "পুরাণ ও সেদিনের কথা"
স্রষ্টা : নিখাদ বাঙালি
প্রকাশক : ফ্রিডম বুক।
(শুধু "রাম" "গরু"-ড়ের ছানারা এই বই টি এড়িয়ে যাবেন,
না মানে হঠাৎ যদি হেসে দেন তাহলে কিন্তু পাঠ প্রতিক্রিয়ক দায়ী নয় )।
প্রথমে ভাবলাম পাঠ প্রতিক্রিয়া বেশ গুছিয়ে দেব, কিন্তু লিখতে বসে দেখলাম এই বই এর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দিতে যাওয়া একটি দৈনন্দিন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতন হয়ে যাবে, হয়ত প্রতিদিনই পাঠ প্রতিক্রিয়া দিতে হবে।
শুধু বলি শেষ সাত দিনে এই বই টি "রণে বনে টিম্স মিটিং এ যখন ই কাজের চাপে ফ্রাস্টু খেয়েছি, এক ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত হাসির মরূদ্যানে পৌছে দিয়েছে।
লেখকের বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসে পৌরাণিক কাহিনীর পরিবেশন প্রচুর হাসিয়েছে, বেশ ভাবিয়েছে আর হ্যা ল্যাপটপের পাশে আগের বারের "ফাজিলের মহাভারত" এর সাথে সমহিমায় আমার কাজের টেবিলে একটা জায়গা করে নিয়েছে, মাঝে মাঝেই একটু একটু আবার পড়েছি আর হাসতে হাসতে পুনরুজ্জীবন লাভ করছি।
ধন্যবাদ নিখাদ বাঙালী , এরকম আরেকটি সম্পদ উপহার দেওয়ার জন্য। এইবার গ্রিক দেশের ঠাকুর-দেবতাদের দের দিকেও নজর দিতে হচ্ছে।
১।
পুস্তক পাঠ প্রতিক্রিয়া : ১
মোহনলালের সেনাপতি
স্রষ্টা : বৈদূর্য্য সরকার
প্রকাশক : পত্রপাঠ প্রকাশনী
প্রতি বছর এই সময়টা বই পড়ার আঙ্গিকে বর্ষশেষের সংক্রান্তি ও নতুন বই এর আগমনে শুরু করি নতুন বই পড়ার নববর্ষ উদযাপন। আগের বছরের সংগৃহীত বই এর সাথে সময় কাটানোর একটা হিসেব নিকেশ ও করে ফেলি। মোটামুটি ৮০-৮৫ শতাংশ সংগৃহীত বই এর আত্তীকরণ হয়েই যায়।
এই বছর হালখাতা করলাম, মানে পড়া শুরু করলাম একটি বিস্মৃত অধ্যায়ের সঙ্গে।
এই বছর বই মেলার প্রথম বই পড়া বৈদূর্য্য সরকার এর লেখা পত্রপাঠ প্রকাশনী র "মোহনলালের সেনাপতি"।
হঠকারী সিরাজ ,সমর কুশলী ক্লাইভ, বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর ,অর্থকুবের জগতশেঠ এর গল্প অনেক শুনলেও মোহনলাল দের মতন শেষ অব্ধি পাশে থেকে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া চরিত্র গুলোর পরিণতি নিয়ে ইতিহাস-সমাজ সবাই নিশ্চুপ। যে ছিল ক্ষমতার অলিন্দের ডান হাত সে হঠাৎ নেই, না ইতিহাসে না বিবরণে।
কিন্তু না রয়ে গেছে, গ্রামীন আড্ডায়, পরিচয় লুক্কায়িত বংশের আচারে। লেখক সেই সূত্র গুলি খুঁজে বের করে সামনে আনার প্রচেষ্টা করেছেন।
গল্পটি আধুনিক মননে এগিয়েছে এক বর্তমান চরিত্রের বয়ানে।
গল্পে ও সমাজের একটি অনুকল্প (যার প্রমাণ হয়ত নেই) ভবানী ঠাকুর কে সিরাজ সেনাপতির সাথে জুড়ে দেবী চৌধুরাণীর মধ্যমে পলাশীর প্রান্তের প্রতিশোধ ও প্রতিস্পর্ধা র একটি সুদক্ষ প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন লেখক।
একলপ্তে সম্পন্ন করে মনেও হয়েছে এই হাইপথেসিস এর যুক্তি হয়ত আছে, যুক্তি গুলো সরস ভাবে গ্রন্থিত। ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন