তোমরা আমাকে ভূলে যাও।আমি তোমাদের ভূলতে দেব না।।
এ আবার কি কথা, কেউ যদি কাউকে সত্যি ভূলতে চায় বলুনতো হাজার সাধ্য করলেও কি সে মনের ভিতর থাকতে পারে? আহা কথাটা আমার না! আরেক বোস, মানে মন্দার বোস নিজেই তো বলে দিয়েছে মন থেকে চাইলে তিন মাসেই মাতৃভাষাই তো ভূলে যেতে পারি আমরা। আর এ গল্প তো এক পাড়া-গ্রামের পরিবারের। সেই গল্প কি আমরা আর মনে রাখব?
এই গল্পটা ছিল এক একান্নবর্তী পরিবারের বেশ কিছু শরিকের এক সাথে মিলে মিশে থাকার। পরিবারটির এক কালে অনেক জমি-জমা ছিল স্বচ্ছল-অবস্থাপন্ন ছিল। কিন্তু ভিন অঞ্চলের এক ধূর্ত ব্যবসয়ী বাণিজ্যের অছিলায় সেই সব জমি ছলেবলে কৌশলে অধিকার করেছে পরিবারের থেকে। নিজের জমিতেই সেই পরিবার হয়েছে আশ্রিত, এখন সেই ব্যবসায়ীর ইচ্ছাতেই কর্ম।
এই ভাবেই চলছিল, বেশ কিছু বছর নিশ্চুপতার পরে পরিবারের পিতা পরিবারের শরিক দের বোঝাতে পেরেছে ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই মিসআন্ডারস্ট্যান্ড!
পরিবারের চার পুত্রই এখন জমি কিভাবে ফেরত পাওয়া যায় , সেই দাবীর সাথে জড়িত- পিতাকে যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছে, এর ফলে পরিবারের সবাই আস্তে আস্তে সেই বেপাড়ার ব্যবসয়ী র বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন বিষয়ের দাবি-দাওয়া করছে পিতার নেতৃত্বেই শান্তিপুর্ণ ভাবে।
বড় ভাই আর সেজ ভাই এর মধ্যে মিল একটু বেশী, দুজ্নেই সমাজতান্ত্রিক চেতনায় নিজদের জারিত করেছে। কিন্তু বড় ভাই সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পিতার মুখাপেক্ষী, পিতার অনুমোদন ছাড়া নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্ধিহান।
মেজ ভাই একটু রক্ষণশীল প্রকৃতির - লৌহ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী।
সেজ ভাই একদিকে স্বাধীন মতপ্রকাশে অকুতোভয়, নির্ভীক ভাবে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচ্ল ভাবে একলা চলতে অসুবিধা নেই।
আর, কনিষ্ঠটি অন্য ভাইদের থেকে একটু নিন্মপ্রভাবশালী, মাঝে মাঝে পরিবারে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নিজেই সন্ধিগ্ধ। এই প্রেক্ষিতেই পরিবারের মধ্যে শুরু হল এক অদ্ভুৎ পরিস্থিতি।
একদিন বড় ভাই, সেজ ভাই বলে বসল: অনেক হয়েছে ,এইবার নিজেদের জমি নিজেরাই সম্পূর্ণভাবে বুঝে নেব, বাইরের ব্যবসায়ীর প্রভাব মানব না। মেজ ভাই ভিন্নমত পোষণ করে বলল: পুরোপুরি এই মুহূর্তে ব্যবসায়ী কে সরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, আমরা মিলেমিশে জমির ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেব। পিতা পড়ল অতান্তরে: জমির পূর্ণ মালিকানার দিকেই পরিবারের সদস্যদের পাখির চোখ।
এরই মধ্যে ঐ জমির উপর ব্যবসায়ীর পাড়ার আরেক নব্য ব্যবসায়ীর নজর পড়ল,
বুঝিলে হে পুরাতন ব্যবসায়ী এই জমি আমি লইব কাড়িয়া। ব্যস ভিন্ন অঞ্চলের দুই ব্যবসায়ী নিজদের মধ্যে লেঠেল-মস্তান-মাসেল পাওয়ার নিয়ে লাফিয়ে পড়ল মার মার কাট কাট একেবারে।
এই যুদ্ধের পরিবেশে সেজ ভাই বলল : এই সুযোগ, ঐ দুই ধনতান্ত্রিক শক্তি লড়াই এ মেতেছে, আমরা ওদের মধ্যের লড়াই তে জড়াব না কিন্তু নিজেদের জমি ঐ পুরাতন ব্যবসায়ীর থেকে কেড়ে নেব বাহুবলে। আক্রমণ করব পুরাতন ব্যবসায়ী কে।
পিতা বলে উঠল : এই সময়ে পুরাতন ব্যবসায়ী কে সাহায্যই করা উচিৎ, এমনকি যুদ্ধে অংশগ্রহণও করতেই হবে। তাহলে আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই পুরাতন ব্যবসায়ী আমাদের জমি আমাদের দিয়ে দেবে।
বড়ভাই যদিও সেজ ভাই এর প্রথম সূত্র সমর্থন করে বলল: এটা ঠিক ওদের লড়াই তে নাক গলাব না আমরা, কিন্তু এই সময়ে পুরাতন ব্যবসয়ী কে বিপাকে ফেলে জমির দখলও নেবনা ।
সেজ ভাই নিমরাজি হল পিতা ও বড়দার প্রস্তাবে। সে মনে করল এটাই শেষ সুযোগ জমি ফেরত পাবার।
পিতা তাকে বলে দিল: তুমি তোমার মতন চেষ্টা করে দেখো আর আমি চেষ্টা করব আমার মতন, দুজনের পথ হয়ত আলাদা কিন্তু উদ্দেশ্য একটিই; জমির পুর্ণ অধিকার। তুমি যদি সফল হও আমিই তোমাকে জড়িয়ে ধরতে যাব সবার আগে।
পিতাকে প্রণাম করে সেজপুত্র সেই রাতেই গৃহত্যাগী হল।
পুরাতন ব্যবসায়ীর চোখ এড়িয়ে পাড়ি জমাল নতুন জ্গতে। সাহায্য চাইল নতুন ব্যবসায়ীর কাছে, শর্ত দিল তার অনুগামী পরিবার বর্গকেই সে লড়তে শুধু দেবে পুরাতন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, নতুন ব্যবসায়ীর থেকে চাই তার শুধু রসদ । বাকি কাজ তার নিজের।
তৈরী হল বাড়ির বাইরে থেকে বাড়ির উদ্ধারের জ্ন্য সংগ্রামী দল। সেই সব দলের নামকরণও হোল পরিবারের পিতা, বড়দা কে সম্মান জানিয়েই। লড়াইও শুরু হল জোর কদমে - পুরাতন ব্যবসায়ীর থেকে দখল হোল জমির প্রান্তিক অংশ। কিন্তু হঠাৎ করে নতুন ব্যবসায়ীর পরাজয়ের ফলে রসদের অভাব ঘটল সেজপুত্রের সংগ্রামে। এক দিন গভীররাতে ভয়ংকর বজ্র-বৃষ্টি দুর্যোগের কবলে দলের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ল। সেজপুত্র উপলব্ধি করল এই মুহূর্তে আর অগ্র্সর হওয়া অসম্ভব। নিজের দল দিল ভেঙ্গে।
নিজের দল ভেঙ্গে চলে যাবার সময়ে চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল গাড়ি দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে সেজ পুত্রের।
সেই খবরে পরিবার শোকস্তব্ধ হয়ে স্মরণ অনুষ্ঠান এর আয়োজন এ ব্রতী হলে পিতা সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিনিবন্ধে জানিয়ে দিল, সেজ পুত্রের যেন স্মরণ সভা না হয় । সে , অমর ! চিরঞ্জীবি।
শুধু মা চোখের কোণে জল ফেলে দেখল সেজপুত্র ঘরে ফেরে নি!
কিন্ত সেজ্পুত্র যেভাবে পুরাতন ব্যবসায়ী কে ভয় দেখিয়েছে তাতে সেই ব্যবসয়ীও শেষ অব্ধি জমি ফিরিয়ে দিতে বাধ্যই হোল, কিন্তু ফিরিয়ে দেবার আগে অখণ্ড জমি তে কাঁটাতার দিয়ে ভাগ করে দিয়ে গেল পরিবারের দুই শরিক এর মধ্যে। বড়পুত্র বিনা বাক্যব্যয়ে মেজপুত্রের সমর্থনে মেনে নিল জমির বাটোয়ারা। ছোটপুত্র পরিবারের নিয়ম কানুন লিপিবদ্ধ করে দিল - নীরবে জানিয়ে দিল নতুন পরিবারের কেউ ছোট কেউ বড় না, সবাই সমান, সবাই সমান ভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু বিভেদ রয়ে গেল প্রথম দিন থেকেই জমির ভিতরে , কাঁটাতারের দুদিকে - পরিবারের বিভেদ- মনুষ্যত্বের বিভেদ।
যে এই বিভেদ আটকাতে পাড়ত সেই সেজপুত্রের অভাব অনুভব করল পরিবারের দুই পাড়ের পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম,তারা নিজেদের মনে বলে উঠল:
তুমি কি আমদের ভূলে গেছ? কেন ফিরলে না আর?
আমরা তোমাকে কোনোদিন ভূলতে পারব না ।
তুমি থাকলে জমিতে কাঁটাতার এর যায়গায় একই সুরের সেতার বেজে উঠত দুইপারের- একই পরিবারে।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন