গার্হস্থ্য বিবেক ।।
গার্হস্থ্য বিবেক ।।
নরেন ছাদের মধ্যে পদচারণ কালে ভাবল আজকের দিনটা ওর জীবনে এরকম এক বিস্ময়কর দিন হয়ে উঠল কিভাবে? ওতো আজকের দিন টা ভেবেছিল মহামানব এরবাণী নিজের প্রিয়জনের কাছে নিবিষ্ট চিত্তে বলেযাবে শুধু। কিন্তু সেই বাণীই কিভাবে ফণী হয়ে উঠল আজকের দিনে!
শীতেরসকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই ভাবল , একি সারা বাড়ি ঘুমিয়ে আছে। মনে পড়ল নরেন এর বাবা রাত্রি বেলায় খাবার টেবিলে বলছিল: আমি এই বয়সে এসে বুঝেছি সমাজকল্যাণে আমাকে এইবার পথে নামতেই হবে। সেই, বাবা এই শীতসকালে এখনো বিছানা ছাড়েনি! কিভাবে হবে সমাজ কল্যাণ? ব্যস, সোজা বাবার ঘরে ঢুকে লেপ সরিয়ে বলে উঠল:
জাগো, লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে থামবে না।
বাবা প্রথমে ভূত দেখার মতন চমকে উঠল আচম্কা নিদ্রা ভঙ্গে। তারপর তারস্বরে চিত্কার করে বলল এই শীতের ভোরে তুই আমাকে এই বয়সে লেপ টেনে ঘুম থেকে তুলে জ্ঞান দিচ্ছিস, দূর হ দুচোক্ষের সামনে থেকে! পুরো ঘুমটা দিলি নষ্ট করে : কি সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখছিলাম! সব গেল।
নরেন কাচুমাচু করে এসে টেবিলে বসল । একটু পরে দেখল মা আর স্ত্রী দুজ্নেই উঠে পড়েছে চেঁচামেচি শুনে । মা এসে অভিযোগ এর সুরে বলল কি করিস তুই, বুড়ো মানুষ টা কে এই ভাবে কেউ তুলে দেয় সাতসকালে! বলে মা স্নান সেরে পুজোর ঘরে গেল।
ওদিকে স্ত্রী এককাপ চা ঠকাস করে টেবিলে রেখে বলল খেয়ে উদ্ধার করো আমায়, একদিন সবার আগে উঠেছ যখন একটু চা করে খাওয়াতে পারো তো, সেই সব কেন করবে? আমাকেই কেন এই সাতসকালে চা করতে হবে বলতে পারো? নরেন চা এর কাপ তুলে একটু আলতো হেসে বলে উঠল:
জীবে সেবা করে যেই জন , সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
স্ত্রী, এইকথা শুনে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল: আচ্ছা, ঠিক আছে। আজকে আমি আর রান্না করতে পারব না! শিব হয়ে নিজের আর সবার জিভের সেবা র ব্যবস্থা করো। আমি ছেলেকে স্কুলের জন্য রেডি করে বেরোচ্ছি।
নরেন ভাবল এ কি সমস্যা হোল, ওহ আবার এখন রান্না করতে হবে! উফ্ফ। এদিকে দেখল দুই ভাই ভূপেন ও বীরেন ও এসে দাড়িয়েছে টেবিলের পাশে। নরেন এর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল: সব শুনেছি দাদা; কুছ পরোয়া নেই, আজ আমরা বাইরের থেকে খাবার আনিয়ে নেব! বিরিয়ানি, চিকেন চাপ আর ভেটকি ফ্রাই। সাথে নলেন গুড়ের জলভরা। কি ঠিক আছে তো?
এই শুনে নরেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যাক ভাই দুটো বাঁচিয়ে দিল, ওরা এই অনলাইন ব্যাপার টা বেশ ভালো বোঝে। ভাইদের প্রতি আনন্দে বিগলিত হয়ে বলে উঠল:
দরিদ্র ভারত বাসী আমার ভাই; চন্ডাল ভারত বাসী আমার ভাই।
ব্যস, মুহূর্ত মধ্যে জয় বিজয় কেমন শুম্ভ-নিশুম্ভ হয়ে বলল: বাবা-বৌদি একদম ঠিকই বলেছে। তোর অর্ডার ক্যনসেল।
নরেন এই শুনে ঘরে এসে বিরস বদনে খাটে বসেছে। ছেলে এসে সকালে স্কুল বেরোবার আগে আদর করতে করতে বলল বাবা কি হয়েছে, তুমি এরকম নিশ্চুপ কেন? নরেন আদর করে বলল: শোন, একটা জিনিষ জেনে রাখবি। কেউ যদি তোকে মারতে আসে যদি, কখ্নো কামড়াতে না পারিস অন্তত ফোঁস ফোঁস করবি।
বছর ছয়েক এর ছেলে কিছু একটা বুঝে বলল: সাপের মতন?
বাবা বলল: হ্যা একদম।
এরপর ছেলে স্কুলে বেড়িয়ে গেল মায়ের সাথে।
দুপুর বেলা, হঠাৎ ছেলের স্কুল থেকে ফোন এল নরেনের কাছে। নরেন শুনল ওর ছেলে নাকি কি এক কাণ্ড করেছে! এই মাত্র স্কুলে যেতে হবে নরেন কে। নরেন ভয়ে-চিন্তায়- দিশেহারা হয়ে ছেলের স্কুলে ঢুকতেই স্কুলের দরোয়ান ওক প্রিন্সিপালের ঘরে নিয়ে যেতে উদ্যত হোল,কিন্তু দারোয়ানের মুখের কোণে হাসি। করিডর দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল: দরোয়ান ভাই কি হয়েছে গো? দরোয়ান হেসে উত্তর দিল যা হয়েছে তা স্কুলে এত বছরে কোনোদিন হয়নি দাদা। আপনার ছেলে উফ্ফ গুরুদেব। নিন ঢুকুন,প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এর ঘরে।
নরেন কে দেখেই প্রিন্সিপাল বলল : ও আপনি এসে গেছেন, আসুন। নরেন ঘরে ঢুকে ধুকপুক বুকে জিজ্ঞেস করল ম্যডাম কি হয়েছে?
প্রিন্সিপাল চশমার ফাঁক দিয়ে বলল: কি হয়েছে এই যে আমাদের পিটি শিক্ষক আছেন উনিই বলবেন। বলুন অরুণ বাবু।
পিটি শিক্ষক অরুণ বাবু দুই চোখ বড় করে হাতের বেত টেবিলে পিটিয়ে বলল: এরকম অপমান আমার জীবনে হয়নি নরেন বাবু।
নরেন আঁতকে উঠে বলল: কেন স্যর কি হয়েছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল:কেন রে তুই কি করেছিস?
ছেলে নরেন এর দিকে তাকিয়ে বলল: পিটি স্যর প্রতিদিন আমাদের আদর করে বেত দিয়ে এমনি-এমনি মারে, কালকে অব্ধিও মার খেয়ে এসেছি। কিন্তু আজকে আর মারতে পারেনি স্যর।
নরেন অবাক হয়ে বলল: কেন, স্যর এমনি এমনি মারে কেন? আর আজ কি এমন করলি যে মারল না?
পিটি স্যর: বলল, আমিই বলছি। বলতে পারেন ওটা আমার একটা স্বভাব, ছেলেদের দেখলেই এক ঘা বেতের বাড়ি লাগিয়ে দেই। তা আজকে আপনার ছেলে কে মারতে গেছি ওমা! ও হঠাৎ সরে গিয়ে দুই হাত মাথায় তুলে সাপের মতন ভঙ্গি করে মুখে "ফোঁস ফোঁস" আওয়াজ করছে। এই দেখে আমিও ওকে আবার মারতে যাই। সেই দেখে ও মাথায় হাত তুলে ঐ ভঙ্গিতে দৌড়তে থাকে ফোঁস ফোঁস করতে করতে, আমিও দৌড় দেই পিছনে পিছনে।
এই দেখে সারা স্কুল-ছাত্রছাত্রী সবাই আমাকে নিয়ে হাসছে। আমার কর্মী শিক্ষক রা আমার সাথে কথা বলতে গেলেই ফোঁস-ফোঁস আওয়াজ করছে, মোবাইল এ নাগিন ড্যান্স এর গান বাজিয়ে দিচ্ছে। সব হয়েছে আপনার ছেলের জন্য। ওক জিজ্ঞেস করতে বলেছে আপনি নাকি ওক ফোঁস ফোঁস করতে বলেছেন? ছি: একজন শিক্ষক এর বিরুদ্ধে এই সব শিখিয়েছেন ছেলেকে?
নরেন একটু থেমে বলল: বুঝেছি,স্কুল জুড়ে ওমরেশ পুরী-শ্রীদেবীর নাগিন হয়েছে , তবে আমি কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে ফোঁস করতে শেখাইনি স্যর। না, আমি শুধু শিখিয়েছি কেউ মারতে এলে ফোঁস করতে, দু:খিত সেইটা আমকেও উনিই বলেছেন, ঐ যে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এর মাথার উপর গেরুয়া বসনে সোজা শিরদাঁড়ায় যিনি ছবিতে দাড়িয়ে আছেন, জাগ্রত বিবেক।
নরেন ছাদে পদচারণা করতে করতে বলল: সত্যিই আমরা বিবেক বাণী কিছুই বুঝতে পারিনি।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন