রাণী কাহিনী।

চারদিকে দু:খ-দু:খ রব , দু:খ-স্তুতি-বিদ্বেষ এর মাঝে প্রচারিত-পোস্টিত হচ্ছে ইংল্যন্ডের রাণী আর নেই। এই ভাবে ভাবতে-ভাবতে একজন মানুষের মনে হল আচ্ছা এখন অব্ধি এই জীবনে এই "রাণী" শব্দ টার অবদান কি? না না, কোনো এক রাণী কে নিয়ে এই কাহিনী নয় , বরং টুকরো টুকরো ঘটনায় রাণীর প্রভাব রয়েছে জীবনে। আসুন দেখি একবার ঘুরে ফিরে সেই রাণী কাহিনী।

একদম ছোট্ট অব্স্থায় দুই-তিন রকমের রাণী মা এলো সেই শিশুর জীবনে। সুয়োরাণী- দুয়োরাণী আর লাল কমল নীল কমলের রাক্ষসী রাণী! এদের তিন জন তিন রকমের ছবি ধরা পড়ল শিশু মনে।
সুয়োরাণী সুখে থাকে, না চাইতেই সব কিছু পেয়ে যায় আর সুযোগ পেলেই দুয়োরাণী কে সারপ্রাইজ টেস্ট এর সামনে ফেলে দেয়।
ওদিকে দুয়ো রাণী দায়িত্ব নিয়ে ভালো ভাবে জেনে-বুঝে সেই সারপ্রাইজ টেস্টে ভূল উত্তর খাতায় লিখে আসে আর তারপরে কেঁদে কেটে বেড়ায়, শেষে দুই তিন বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে নির্বাসিত হয়। এরপর দুম করে তার সন্তান-সন্ততি রা এসে যায় (ছোটরা জীববিজ্ঞান বুঝবে না তাই আপেল-মিষ্টি-পায়েস খেলেই ছোট্ট সোনার চাঁদ এসে যায়)। যাইহোক ছোট্ট ছেলে মেয়েরা অনেক কষ্টে বড় হয়ে মায়ের দু:খ ঘোচায়, আবার রাজপ্রাসাদে ফিরে যায়।
এর সাথে সাথে শিশুমন পুরাণ এর কাহিনী তেও রাণী দের খুঁজে পায়,কিন্তু সেখানে এতই যুদ্ধবাজ চরিত্রের ঘনঘটা যে সীতা-দ্রৌপদী শিশু মনে পার্শচরিত্র হয়ে ঘুরে বেড়ায়, বড় না হওয়া পর্যন্ত- পরিণত মনস্ক না হওয়া অব্ধি এই রাণীদের তেজোময় উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যুত্পত্তিতেই আসেনা , তবে  কৈকেয়ী এক দুষ্টু রাণী হিসেবে মনেমনে স্থান পায় শিশু বেলা থেকেই।
 
এইবার সেই শিশুমন একটু বড় হয় , সে তার পাঠ্যপুস্তকের রাণী দের সাথে পরিচিত হতে থাকে।
প্রথমেই আসে এক অন্য রকম রাণী-প্রাণী! সে একা একটা ঘর দখল করে থাকে,কোনো কাজ করবে না- শ্রমিক শ্রেণী তার ফাইফরমাস খাটবে, সন্তান-সন্ততি জন্ম দেওয়া তার প্রধান কাজ- সে সমাজবদ্ধ জীবের উপরতলার রাণী মৌমাছি! কিশোর মন ভাবে আচ্ছা তাহলে রাণী মানেই সুখের জীবন!
বিজ্ঞানের পাতা থেকে কিশোরমন এই বার পরিচিত হয় কিছু অন্য রকম রাণীদের সাথে। ইতিহাসের পাতায় বেশ অনেক রাণীর আবির্ভাব হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন এর নাম বেশ মনে থেকে যায় , তাদের নাম বিখ্যাত বা কুখ্যাত; সুকর্মে-দুষ্কর্মে স্বদেশে-বিদেশে!
মারি আঁতোয়ানেত এর মুখ থেকে ক্ষুধিত-নিপীড়িত মানুষের প্রতি রুটির বদলে কেক খাওয়ার পরামর্শের বাণী তখন সেই কিশোর মনে রাণী জাতির প্রতি এক তীব্র ঘৃণাবোধ এর জন্ম দেয়। আবার পরবর্তীতে যখন দেখে এক রাণী মাথা উঁচু করে ভয়ংকর বিপক্ষকে প্রতিস্পর্ধা র সুরে বলে "আমি আমার ঝাঁসী প্রাণ থাকতে দেবনা" তখন সেই বীরাঙ্গনা র প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়।

কিশোরমন ধীরে ধীরে বড় হয় , বই পুস্তকের সাথে সাথে সে চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয় । এই সময় রাণীর বৈভব সে প্রত্যক্ষ করে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের মধ্যমে। পদ্মাবাঈ এর মতন কোনো রাণী তাকে শিক্ষা দেয় প্রাণের থেকে মান বড় তো যোধাবাঈ  এর থেকে শেখে প্রেম-ভালোবসা নীরবে হলেও তা অত্যন্ত শক্তিশালী। নাটকে দেখে নূরজাহান এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, রাণী ভবানীর তেজ। তার মনে প্রশ্ন জাগে তাহলে সে এতদিন ধরে যে রাণী দের কথা পড়েছিল জেনেছিল সেই রাণীরা কোথায় আছে? নিজেই অনুধাবন করে এই রাণী কাহিনী তার মনের তথ্যচিত্র! সেইখানে নিভৃতে আছেন রাণীরা, কাহিনী রূপে, সযত্নে।

সেই শিশু রুপী পরিণত মন এখন আজকের দিনে দেখে আরেক রাণীর ৯৬ বছর ত্রিকাল দর্শনের সমাপ্তি। এক জনের মৃত্যু দু:খ-বেদনার , যিনি ইহলোকে নেই তিনি শান্তি পান অমৃতলোকে , কিন্তু তার জীবন প্রবাহে অনেক দেশের পরাধীনতার শৃংখল দেখা যায়। এই রাণী ১৫ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ৭ জন পোপএর পরিবর্তন দেখেছে, আবার ভারতবর্ষকে নি:স্ব অব্স্থায় স্বাধীন হতেও দেখেছে। আজ সেই রাণী যখন পরলোকে যাচ্ছেন স্বাধীন ভারত শূণ্য থেকে শুরু করে ব্রিটিশ কে সরিয়ে বিশ্বের পঞ্চম অর্থনীতি হিসেবে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, নিদ্রিত ভারত জাগছে। সত্যি, এই রাণীর বিদায় কেমন একটা জলসাঘর এর জমিদার এর ছবি এঁকে দিয়ে যায় মনে।

©️অভ্র‌জ্যোতি ঘোষ।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"