বাজলো টেলিফোনের রিংক্রিং !

সুনীল বাড়িতে ঢুকেই সামনের টেবিল থেকে জলের বোতল টা তুলে নিল। নিমিষে ঢকঢক করে বোতলের পুরো জল অগস্ত্যপান এর মতন উদরে পুরে দিল, সত্যি আজকে খুব দৌড়ঝাঁপ গেছে মা কে নিয়ে। চেয়ার টা টেনে নিয়ে মাথায় দুই হাত ধরে  ভাবতে লাগল কি দিনটাই না গেল আজকে: মা ছেলের সংসারে !

প্রতিদিনের মতন সকালসকাল সুনীল কর্মক্ষেত্রে বেরোবে বলে তৈরী হচ্ছিল। সুনীলের মা নয়না দেবী; দুদিন ধরেই একটু দুর্বল বোধ করেছিলেন। সেই অব্স্থায় সুনীল এর জন্য খাবার বাড়তে গিয়ে হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে গেল: চারদিক অন্ধকার করে মেঝেতে পড়ে গেলেন অবচেতনে। সুনীল হঠাৎ ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ পেয়ে পাশের ঘর থেকে ছুটে এসে দেখে মা মেঝেতে পড়ে আছে, হুঁশ নেই কোনো।সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অব্স্থা। মুহূর্ত কাল পরেই জোরে চিত্কার করে পাশের বাড়ির বন্ধু, সোনাই কে ডাক দেয়। ওর আর্তচীত্কার শুনে পাড়া প্রতিবেশী রা দৌড়ে আসে, সবাই সিদ্ধান্ত এসে নয়না দেবী কে শীঘ্র সামনের হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেখানে গিয়ে সুনীলের মা কে পরীক্ষা করে ডাক্তার রা জানায় তেমন ভয়ের কিছু নেই। রক্তচাপ কমে গিয়েই হয়ত কিছু হয়েছে, কিছুদিন নিরীক্ষণ এর মধ্যে রাখলে এবং কিছু পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে কি হয়েছে। তাই মা কে ওরা ভর্তি রেখেছে দুই-তিন দিনের জন্য।ওদিকে মা এর জ্ঞান ফিরে আসতেই বায়না ধরেছে: সুনীল শুনলি তো কিছু হয়নি বাবা, আমাকে বাড়ি নিয়ে চল আমি এখানে থাকবো না।

সুনীল মা কে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রেখে সারাদিন পর বাড়িতে ঢুকেছে। আসার সময় খেয়াল ছিল না রাতে কি খাবে, তাই কিছু কিনেও আনা হয়নি , ভুলেই গেছে। ঘরে যা আছে কিছু একটা খুঁজে খেয়ে নিতে হবে। এই বলে দেহটা তুলে সবে ভিতরের ঘরে ঢুকতে যাবে কেমন একটা শূন্যতা গ্রাস করছে মনে: মা নেই বাড়িতে! একা আমি শুধু একা আজকে। 5 বছর আগে বাবা চলে যাবার পর থেকে কোনোদিন এরকম হয়নি! মা তো অন্তত ছিল। খুব মায়ের কথা শুনতে মন চাইল সুনীলের।
অনেক কষ্টে ঢোঁক গিলে একবার মোবাইল টা হাতে নিয়ে আবার হসপিটালে ফোন করল সুনীল, কিন্তু মা এর সাথে কথা হোল না, ওরা জানিয়ে দিল মা ঠিক আছে।
সুনীল মনে মনে ভাবল : হমম, এরা শরীর ভালো বোঝে কিন্তু মন বোঝে না।  মা আমার সাথে কথা না বলে ঠিক থাকতে পারে নাকি!
কথা না বাড়িয়ে ফোন টা কেটে দিয়ে স্নান ঘরের দিকে গেল। শাওয়ার এর ঠান্ডা জলের ধারা মাথা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ল চোখের উপর - দুই জলের উৎস তারতম্য অনুধাবন করল সুনীল।

সুনীল স্নান ঘর থেকে সবে বেড়িয়েছে। হঠাৎ ক্রিং ক্রিং , ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের শব্দ বেজে উঠল! সুনীল মনে মনে ভাবল: ঠিক শুনছি তো আমি! টেলিফোন বাজছে! শেষ এক-দুবছরে 2-3 বারও বেজেছে কিনা সন্দেহ। ঐ মাঝে মাঝে টেলিফোন এর লোকেরা ঝড়ের পরে লাইন ঠিক করে দিয়ে যায় আর ফোন করে টেস্টিং করে , তাছাড়া এতে তো আর ফোন আসেই না। মা কে বার বার বলেছে এইটা এইবার ছেড়ে দেই মা; কারোর বাড়িতে এই যুগে ল্যান্ডলাইন নেই এটা মোবাইল- হয়াট্সএপ- ভিডিও কলিং এর যুগ। মাসে মাসে টাকা গুনতে হচ্ছে এর পিছনে।
কিন্তু, প্রতিবার মার নাছোড় দাবির কাছে ওকে হার মানতে হয়েছে। এইসব কথা যখন ই সুনীল বলে, মা তখন উত্তর দেয় : এই টেলিফোন অনেক স্মৃতি অনেক আবেগ বয়ে নিয়ে এসেছে আমার জীবনে! তোর বাবার পদোন্নতি, তোর প্রথম চাকরীর খবর কত হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতিদিনের আলাপ লুকিয়ে আছে এই ফোনে।
আমি যতদিন আছি এই টেলিফোন টা একটু কষ্ট করে রেখে দে সুনীল।" - মায়ের এই দাবির সামনে আর কিছু বলেনি সুনীল।  যখনই ফোন টা বেজে উঠত তখন মা এর মুখমণ্ডলে এক অনাবিল শিশুসুলভ আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ত।

সেই মা এখন হসপিটালে ভর্তি আর বহুযুগ পরে টেলিফোন বেজে উঠেছে আবার। কে এই রাতে টেলিফোনে রিং করছে?
কৌতূহলী মন নিয়ে সুনীল ফোন টা ধরল : হ্যালো। ফোনের ও প্রান্ত থেকে একজন জিজ্ঞাসা করল: আপনি সুনীল বাবু তো? সুনীল উত্তর দিল: হ্যা বলছি। কি ব্যাপার বলুন। ঐ প্রান্ত থেকে উত্তর এল: নিন ধরুন কথা বলুন।

সুনীল আবার অবাক, কে ওর সাথে কথা বলতে চায়? এমন কে আছে যার কাছে ওর ল্যান্ড নম্বর আছে কিন্তু মোবাইল নম্বর নেই।
অক্স্মাৎ ঐ প্রান্ত থেকে একটা গলা শুনতে পেল যা শোনার জন্য এই ফাকা ঘরে ওর মন আকুলিবিকুলিতে ভরে গেছিল; মা কথা বলছে!

মা বলল: আরে এই নার্স মেয়ে টা ভালো,আমি কতক্ষণ বলছি একটু ছেলের সাথে কথা বলব, কিন্তু সাথে তো আর আমার মোবাইল রাখতে দেয়নি নেই তাই পারছিলাম না। এই মেয়েটা আমাকে বলল তোর নম্বর বলতে। তা, মোবাইল নম্বর তো মনে নেই এই ল্যান্ড নম্বর টাই একমাত্র মনেরয়ে গেছে। যাক বাবা তোর কথা তো শুনতে পেলাম! খেয়েছিস বাবা?

সুনীল এর গলা ভিজে আসছে ; টেলিফোন টা কে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে ভাবছে এই ফোন টা এমন কিছু আমাকে আমার একলা-কষ্ট-নির্জনতার দিনে ফিরিয়ে দিল যা অনেক বহুমূল্যবান আদরে থাকা মুঠোফোন দিতে পারল না! পৃথিবীতে সবার প্রয়োজন আছে সময়ের চক্রে সবাই অপরিহার্য।

ফোন এ উত্তর দিল: হ্যা মা আমি ঠিক আছি, ভালো লাগছে এখন , তোমার শরীর ঠিক আছে তো?..মাতাপুত্রের কথা শুরু হল টেলিফোনে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"