জঙ্গলের দুদিন ছুটি 🐆
মধ্যদেশের গভীর জঙ্গল। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভিতরে এরকম গহীণ অরণ্য রয়েছে। হঠাৎ দ্রুমদলের ভিতর থেকে দ্রিমদ্রিম আওয়াজ ছিটকে বেড়িয়ে আসছে। আওয়াজ টা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
ছোট্ট নীল গাইটা সেই শব্দ শুনে মায়ের পাশে দাড়িয়ে ভাবছে এ কি ভয়ানক জন্তু ডাকছে! আগেতো এই গর্জ্ন শুনিনি! খুব ভয় করছে।
কিন্তু মা কি আওয়াজ টা শোনেনি? মা তো সানন্দে কচিকচি ঘাস পাতা চিবুচ্ছে। "আহ, মাকে সতর্ক করতে হবে!
বলেই মার লেজ ধরে হ্যচ্কা টান দিল, সাথে সাথে মা চমকে উঠে বলল : উফ্ফ কি হল, লেজ ছাড় কি সমস্যা তোর? ছোট্ট নীলগাই ভয়ে ভয়ে বলল মা একটা শব্দ হচ্ছে শুনতে পাচ্ছ না ? আমার মনে হচ্ছে নতুন কোন ভয়ানক জন্তু এসেছে বনে, এটা তার ই গর্জ্ন, চলো এখান থেকে চলে যাই।
মা ঘাস খেতে খেতে বলল ,আজ ভয় পাসনা নিশ্চিন্তে ঘাস খা, কিচ্ছু ভয় নেই। ছোট্ট নীলগাই অবাক, একদিকে বিষম আওয়াজ হচ্ছে আবার মা বলছে নিশ্চিন্ত মনে ঘাস খা! আজ কোনো ভয় নেই কেন?
কিছুই না বুঝে সে জিজ্ঞেস করল- আজ কোনো ভয় নেই কেনো মা? কিছু বুঝতে পারছি নাতো।
মা এইবার মুখ তুলে বলল, তোর অনেক প্রশ্ন। এত উত্তর দেওয়ার থেকে চল একযায়গায় নিয়ে যাই তোকে। সব বুঝে যাবি। চল আমার সাথে। একথা বলেই যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেই দিকেই দুলেদুলে নিশ্চিন্তে এগোতে লাগল মা।
মা-র লেজ ধরে কৌতূহলী আশঙ্কিত মনে সেই নীলগাই ছানাও এগিয়ে চলল।
আস্তে আস্তে সেই দ্রিমদ্রিম শব্দ টা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল। জঙ্গলের একটা বাঁক ঘুরতেই নজরে এল এক হট্টমেলার হট্টগোল। বনের সব জীবজন্তু এসে উপস্থিত হয়েছে একত্রে। বানররা গাছের ডাল দিয়ে চামড়ার বাজনায় বাড়ি দিচ্ছে- চারদিকে দ্রিমদ্রিম শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে।ছোট্ট নীলগাই দেখল ওর খরগোশ বন্ধুও মায়ের সাথে এসেছে।
কিন্তুএকি! ও তো ছোট্ট হায়নার সাথে খেলছে! আর খরগোশ মাসী হেসে-হেসে গল্প করছে দুষ্টু মা হায়নার সাথে। কালকেই তো ও দূর থেকে দেখল হয়না তাড়া করেছে খরগোশ কে, উফফ কি যে হচ্ছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না!
এই সব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ উঁচু ঘাস জমি কাঁপিয়ে বাঘ মহারাজের তর্জন-গর্জন শোনাগেল , সবাই সেদিক পানে চেয়ে দেখল বাঘ এসে গেছে! আজ কিন্তু বাঘের চোখে মুখে হিংসার লেশমাত্র নেই; বেশ একটা গৃহকর্তা-গৃহকর্তা ভাব।
হাসি মুখেই প্রথমে বাঘ বলল : সবাই কে আজ স্বাগতম। আপনারা জানেন আমাদের বনে আজ এক আনন্দের দিন । আমাদের সাথে থাকবে বলে এক নতুন বাসিন্দা এসেছে সেই সুদূর আফ্রিকা থেকে, বিখ্যাত দৌড়বিদ চিতু বাবু। সেই সম্মানে আজ আমাদের মধ্যে দুদিন কোনো হিংসার পরিবেশ থাকবে না। তাই এই সময়ে দুদিন সব তৃণভোজী ও মাংশাসী ভাই ও বোনেরা একত্রিত হয়ে উপভোগ করুন, বিদেশী বন্ধুকে আপন করে নিন।
উনি আসায় আমাদের দৌড় বিদ্যা আরো মহান্বিত হবে সেই আশাই করছি। আমি নিজে আর কিছু বলছি না । উনি নিজেই নিজের গুণকীর্তন করবেন। আসুন চিতু বাবু , কিছু বলুন। বাঘ মহারাজ সরে আসতেই সবার মধ্যে এক উন্মাদনার সৃষ্টি হল। মহাসাগর পারের এক বাসিন্দা এসেছে ওদের মাঝে, বিশ্বাসই হচ্ছে না ছোট্ট নীলগাই এর।
ও দেখল : সবাই থাবাতালি দিয়ে, লেজ-শুঁড় দুলিয়ে, পাখনা মেলে অভিবাদন জানাল। চিতু বাবু সবাই কে নমস্কার জানিয়ে বলল যে অভ্যর্থনা আপনারা আমাকে জানালেন আমি সত্যি অভিভূত, অন্তর থেকে গ্রহণ করলাম আপনাদের । প্রথমেই বলুন, আপনারা কি শুনতে চান আমি তাই বলব। দৌড়এর বিষয়ে আমি পরে দৌড়ে দেখাব- একদম প্র্যাকটিকাল লার্নিং; তখন বলে দেব কি ভাবে দৌড়তে হয়। আগে বাচ্চারা বলুক কি জানতে চায়। বলো ছোট্টসোনারা তোমরা কি জানতে চাও?
ছোট্ট খরগোশ লাফিয়ে উঠে বলে উঠল : চিতু কাকু তুমি আমাদের "লায়ন কিং" এর গল্পটা শোনাও না, আমরা ছোট বেলা থেকে মংলী শুনেএসেছি শুধু , কেউ ভালো ভাবে "লায়ন কিং" এর গল্পটা আমাদের শোনায় না।
এই কথাবলার সাথে সাথে বাঘ মহারাজ আবার গর্জ্ন করে বলে উঠল: হ্যা ও ঠিক বলেছে, নতুন গল্প শোনান তো বাচ্চাদের । ছোট্ট থেকে এরা মংলী শুনে শুনে আমার মান ইজ্জত শেষ করে দিয়েছে। রাস্তা দিয়ে হাটলেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেজে ওঠে "নায়ক নেহি খলনায়ক হ্যয় তু", নতুন কোনো খলনায়ক আসুক।
সব শিশুপশু রাই সমস্বরে চিত্কার করে নতুন গল্প শোনার দাবি জানাল। চিতু বাবু সেই দাবি মেনে গল্প বলল; সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনল। গল্প শেষ হতেই সবাই আনন্দে ডেকে উঠল একত্রে।
এরপরই গাধা এসে বলল: আপনি দয়াকরে দুটো গান শোনাবেন, আমি একা গানের বিষয় সামলাই বনে। যদি আপনি সেখানে কিছু সাহায্য করেন খুব ভালো হয়।
চিতু চোখ কচলে বলল: আমি বেশী গান জানিনা। তবে জাহাজে আসার সময়ে আপনাদের দেশের এক ছেলে দুটো গান সারাদিন শুনত , ঐ দুটো গান শুনে নাকি বাড়ি র লোকের কথা মনে করত ও, আবার কতদূর দেশ ঘুরছে সেই সব বুঝিয়ে দিত গানের মাধ্যমেই।
গাধা হেসে বলল : আচ্ছা আপনি দুটি গানই তাহলে শোনান।
চিতু বাবু চোখ বুজে পাশবিক ভাষায় শুরু করল প্রথম গান: "কত যে সাগর নদী পেরিয়ে এলাম আমি , কত পথ হলাম যে পার ...."
গান শেষে সবাই উদ্বেলিত। কি সুন্দর ভাষা ,আহা খাসা! আবার শেষ গানটি করতে অনুরোধ করল।
এদিকে দুদিন পশুহত্যা বন্ধ দেখে দেখে বনবিড়াল কিছু খাবার গাছের কোটরে লুকিয়ে রেখেছিল, লেপার্ড সেটা দেখে ফেলেছে। বনবিড়াল ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে লেপার্ড কে ডেকে বলছে : আরে পাগলা দাড়া , পশু তাড়া করলে - পশু চলে গেলেও অন্য পশু শিকার করা যায়রে পাগলা,
খিদের চোটে প্রাণ চলে গেলে প্রাণ পাওয়া যায়না রে - তাই খাবার লুকিয়ে রেখেছি; এখন খাব, বিষম খিদে পেয়েছে।
লেপার্ড বলে: না আমি থাকতে এই লুকিয়ে খাওয়ার অপরাধ করতে পারবি না। দুদিন আমরা মাংস খাব না এটাই নিয়ম।
বনবিড়াল দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল: "খেতে দিবি না, তুই আমায় খেতে দিবিনা" ।
দুজনেই লেজ ফুলিয়ে কান উঠিয়ে লড়াই শুরু করবে-করবে হঠাৎ ভেসে এল চিতু বাবুর গান : "বাসব ভালো রাখব ভরে - এই জীবন হাসি গানে,তাই মনে হয়,আজকে বুঝি নেমে এলো স্বর্গ এখানে ....."
গান শুনে লেপার্ড থেকে বনবিড়াল দুজনেই ফ্ল্যাট। দুজ্নেই দূরে চিতু বাবুর দিকে প্যাটপ্যাট করে দেখছে। এরপর দুজ্নেই টিপটিপ পায়ে এসে হাজির হয়েছে গানের মঞ্চ উঁচু ঘাসজমির পাশে।
লেপার্ড ব্যাঘ্র নিজের ভিতরের ব্যগ্রতা জাগ্রত করে উচ্চকণ্ঠে অন্তর থেকে গেয়ে উঠল -
"যদি হারাই কোনোদিন কালের স্রোতে- আমাদেরই গান পারবে দেখ,- আমাদের মিলিয়ে দিতে"।
সেই শুনে চিতু মঞ্চ থেকে এক লাফে বিখ্যাত দৌড় শুরু করল : চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে শেষ লাইন গেয়ে উঠল:
"যদি চলে যাই আসব ফিরে - একদিন প্রাণেরই টানে।" লেপার্ড-চিতা কোলাকুলি করছে একটু দূরে বনবিড়াল ও হাউহাউ করে কাঁদছে। পুরো সভা মঞ্চ অশ্রুবিসর্জন করছে । ওদিকে ভল্লুক বাঘের কাছে গিয়ে বলছে কিরে , তুইও যা ওদের মাঝে। তুই ও তো বিড়াল শ্রেণী তেই আছিস।
বাঘ একটা গাম্ভীর্য বজায় রেখে গোঁফ নাচিয়ে বলে: বাঘ আর বিড়াল এক শ্রেনীর হলেও এক নয় । তবে আমিও অচিরেই গলা ধরে কাঁদব যেদিন জাগুয়ার ভাই আর সিংহবাবু আসবে এই বনে।
দূর আসন থেকে এতকিছু দেখে ছোট্ট নীলগাই মা কে বলে : মা এক বাঘ, লেপার্ড- হয়না তে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত ছিল এখন আবার চিতাও এল। এরপরে শুনছি জাগুয়ার-সিংহ ও আসবে। আমরা এসে এদের আনন্দ যজ্ঞতে কি নিজেরা বলি হব বলে বসে আছি?
মা ছোট্ট নীল গাই এর বুকে মাথা ঘষে আদর করতে করতে সজল চোখে বলে ওঠে:
"দুইদিন কেউ আমাকে তোকে খাবে না- ছোবে না। এই দুদিনের স্বাধীনতা যে জীবদ্দশায় পাচ্ছি সেটা আমার কোনো পূর্ব-পুরুষ পায়নি রে। অন্তত দুদিনের জন্য সকাল হলে নিশ্চিন্তে উঠব, উত্কণ্ঠা বর্জিত হয়ে বিচরণ করব, তোকে দুদিন বেশী দেখতে পাব নিশ্চিন্তে! এটুকুই তো স্বপ্ন আমার!" নীলগাই ছানা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না মা! আমরা একসাথে থাকব।
ছোট্ট নীলগাই মায়ের কোলে দুদিনের নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেল।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন