ঘরের ভিতর স্কুলের লড়াই।।

"আমাদের স্কুলের সামনে তোদের স্কুল ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না" কথাটা ছোটপুত্র অনিল এর উদ্দেশ্যে বলেই অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী সুবিমল বাবু একটা ব্যঙ্গমিশ্রিত হালকা হাসির রেশ মুখের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন। অনিল নিজের ল্যাপটপে মুখগুজে কাজ করতে-করতে কথাটা শুনল; তারপরেই সশব্দে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে এন্টার টিপে বাবার  দিকে ঘুরে বসল, বেশ রাগত-স্বরে গম্ভীরভাবে বলে উঠল: "কি বললে, আমার স্কুল ধর্তব্যের মধ্যেই আসেনা, বলছি নিজে হিসেব পত্তর এর কাজ করেও এই হিসেব মেলাতে পারোনা কেন? "

সুবিমল বাবু ভুরুকুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন : স্কুলে আবার কিসের হিসেব মেলবন্ধন করব? বুঝলাম না-রে।

আনিল মুচকি হেসে বলল:  হ্যা, স্কুলের হিসেব বললে তখন আর তুমি কিছুই বোঝোনা। প্রতিবার আসো বানর রাজ সুগ্রীবএর মতন আমাকে বালির মতন উত্যক্ত করতে, আর আমি যেই স্কুলের রেজাল্ট এর হিসেব তুলে ধরি তখন পালাই-পালাই করো।  সুবিমল বাবু এই শুনে হোহো করে হেসে উঠে বলল : আরে রেজাল্ট নিয়ে কথা বলিস না তুই, আমাদের স্কুল অঞ্চলের মধ্যে প্রতিবার মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে-জয়েন্ট এ নিয়মিত প্রথম হয়, সর্বোচ্চ নম্বরটা - সেরা র‌্যাঙ্ক আমাদের স্কুলের থেকেই এই অঞ্চলে আসে, বুঝলি!
প্রত্যুত্তরে অনিল মিটিমিটি হেসে বলল : হ্যা জানিতো-  শুরুতেই শেষ তোমার স্কুলের কেরামতি!
সুবিমল বাবু একটু হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: শুরুতেই শেষ মানে? সেই শুনে, অনিল ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ এনে বলল: এই অঞ্চলে আমাদের স্কুলে সব থেকে বেশী স্টার, প্রথম বিভাগ পায়, জয়েন্ট এও আমাদের স্কুল থেকেই বেশী সংখ্যক নাম ওঠে। আমাদের গড় ফল এই অঞ্চলের মধ্যে সেরা। বলেই হোহো করে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল অনিল।


সুবিমল বাবু আমতা আমতা করছেন হঠাৎ পাশের ঘর থেকে বড় ছেলে সুনীল এর আগমন : হচ্ছে টা কি এখানে? আমি অফিসের একটা মিটিং এ ঢুকেছি আর তোমরা এইখানে রাম-রাবণের যুদ্ধ করছ স্কুল নিয়ে! আর অনিল তুই এরকম মহালয়ার অসুরের মতন দন্ত বের করে বাড়ি মাথায় করছিস কেন?
সুবিমল বাবু কিছু বলার আগেই অনিল উত্তর দেয়: দেখ না বাবা এসে খোঁচা দিয়ে বলছে বাবার স্কুল নাকি অঞ্চলে সেরা! তুই ভাব আমাদের স্কুল এই অঞ্চলে সেরা ফল করে গড় হিসেবে সেই খানে এই দাবি মানব কেন? আমরাই সেরা।
এই কথা শুনে সুনীল হোহো করে নিজেই হেসে ওঠে! অনিল বিস্মিত হয়ে বলে হাসছিস কেন দাদা?
সুনীল হাসতে হাসতে বলে : হ্যা ঠিক আছে অঞ্চল হিসাবে মেনে নিচ্ছি কিন্তু অঞ্চল তো জেলার মধ্যেই পড়ে তাই বলছিলাম- মানে আমার জিলা স্কুল তো সেরা ফল-ও করে , সর্বোচ্চ নম্বর-ও পায়, গড় ফল-ও ভালো । আবার মাঝেমাঝে বোর্ডে নাম-ও ওঠে প্রথম দিকে, তাই ভাবছিলাম আর কি; তোর আর বাবার স্কুলের লড়াই টা আঞ্চলিক হিসেবে ভালোই লাগে, আমার স্কুল তো এই সবের থেকে অনেক এগিয়ে!  জিলা স্কুল বলে কথা, সরকারী স্কুলের আলাদাই ঐতিহ্য। ১৬০-১৭০ বছরের স্কুলের গরিমাই আলাদা। এই গুলো তোরা বুঝবি না ছাড়, যা কাজ কর - বাবা তুমিও যাও নেট সার্ফ করো !

সুবিমল বিস্ফোরিত চক্ষে বলে ওঠে একদম চুপ কর সুনীল। তোর স্কুলের বয়স ১৭০ হলে আমার স্কুলের বয়সও ১৪০, গরিমা আমাদেরও আছে। অনেক মহান মানুষের পদধুলিতে ধন্য মোদের স্কুল।
এই শুনে আবার অনিল ঘর কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করে - হাসতে হাসতে দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বলে:  এই দেখেছোতো তাই ভাবি এই দুজ্নের এরকম কথায় কথায় স্কুল নিয়ে অন্যকে খোঁচা দেয় কেন?  এই দুটোই ব্রিটিশ আমলের স্কুল, একদম পুরনো-ভবনা পুরোনো চিন্তা আমিই সেরা!  এই ভবনা নিয়েই বসে থাকে।আর, আমাদের স্কুল এর আবির্ভাব দেশ স্বাধীন হবার পরে, আমরা সেই জন্য গড় রেজাল্ট এর দিকে মন দেই বেশী, মানুষের সাথেই আছি ,তোমরা দুই বুর্জোয়া মানসিকতার প্রতিনিধি!
এই শুনে সুবিমল বাবুর ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে,  সুনীল রেগে উঠে উদ্যম গতিতে অনিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত - হঠাৎ কলিংবেল এর শব্দ।  সুনীল এর মা নয়না দেবী এতক্ষণ রান্নাঘর থেকে সব দেখছিলেন, গিয়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে দিলেন।
সুনীল এর ছেলে রাতুল স্কুল থেকে ফিরেছে, সাথে সুনীলের স্ত্রী রিয়া। ওরা ঘরে ঢুকে হতবাক - কুরুক্ষেত্র নেমে এসেছে ঘরে - হতে চলেছে দক্ষযজ্ঞ!রিয়া বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করছে:  কি হয়েছে , সব কাজকর্ম ফেলে এইভাবে মারমুখী মনোভাব কেন সবার ? কিরে অনিল দাদা তোকে মারতে যাচ্ছে কেন, বাবা তুমি এত রেগে বসে আছ কেন? সুনীল কি করছ এইসব!

সবাই চুপ দেখে সুনীলের মা নয়না দেবি স্মিত হেসে বলছে:
ওরা আর কি বলবে রিয়া! বুড়োবয়সে তোদের বাবা, আর তার ছেলেদের মধ্যে লড়াই হচ্ছে কার স্কুল ভালো । আমি দেখছি এরা কতটা বাড়তে পারে,
আজকে আমি কিচ্ছু বলিনি। শুধু চুপচাপ দেখে গেছি- শুনে গেছি। এই মানুষ গুলোই আবার রাতে খাবার টেবিলে বসে খেতে-খেতে বিশ্বজন কে জ্ঞান দেবে -" সারা দেশে কি হচ্ছে, মানুষে মানুষে ভেদ থাকা ঠিক না, মানুষ ধর্ম জাতি নিয়ে কেন লড়ে?"
অথচ দেখ কাজের দিনে, কাজ ভুলে নিজেদের স্কুল নিয়ে লড়ছে যেখানে এরা নিজেরাই জানে এই প্রত্যেকটা স্কুল নিজের ক্ষমতায় শিক্ষায় বলীয়ান, এদের এই ঠুনকো তর্ক-বিতর্কে কোনো স্কুলেই কিছু লাভ ক্ষতি হবেনা। আসলে এরা লড়ছে নিজেদের স্কুলের নামে একটা আলীক প্রথম স্থানের জন্য- আমার কাছে তো আমার-তোর আর ওদের তিনটে স্কুল; সব গুলাই সেরা, এই স্কুল থেকেই আমার ঘরে পাঁচজন মানুষ সমাজে সৎ পথে বেঁচে নিজের জীবিকা খুঁজে পেয়েছে। স্কুলের সঠিক শিক্ষা ছিল বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে " - এই বলে নয়না দেবী চুপ হলেন। সবাই নিশ্চুপ, সুনীল-অনিল থতমত খেয়ে দাড়িয়ে আছে, সুবিমল বাবু সিলিং এর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করছেন, রিয়া স্কুল থেকে ফিরে এই ঘটনার ঘনঘটায় তাজ্জব হয়ে গেছ।

চারদিকে এক অখণ্ড নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, হঠাৎ এর মধ্যে রাতুল নয়না দেবী কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল: "না ঠামমি তুমি জাননা! দাদাই, কাকাই, বাবা-মা, তোমার স্কুলের থেকেও একটা ভালো স্কুল আছে। সেটা সব থেকে ভালো স্কুল ; সেই স্কুল টা আমার স্কুল"।
রাতুলের এই  কথা শুনে নয়না দেবী হেসে রাতুলকে  কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল : "একদম ঠিক বলেছ দাদুভাই, আমার সোনার স্কুল সব থেকে ভালো, কে বলেছে আমাদের স্কুল সেরা! তোমার স্কুল টাই সেরা স্কুল, আমাদের ভবিষ্যত "।
এই শুনে সবাই হাসতে থাকল।।

©️অভ্র‌জ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"