বিদ্যুৎ এর ঈশ্বর।।
এই তো ভাবছেন পুরাণ এর কথামালা হাতে নিয়ে স্মরণ করব বজ্র ধারণকারী দেবরাজ ইন্দ্র কে! না সেদিকে যাচ্ছিই না। বরং আজকের দিনে আমাদের সমাজে বজ্রধারী ইন্দ্রের বরপুত্র কারা আছেন,সেই নিয়েই একটু আলোচনা করা যাক। একটু খেয়াল করে দেখলেই আপনি চিনতে পারবেন- জ্যান্ত বজ্রধারী ইন্দ্রদের।
একটু পিছনে চলে যান, মানে নব্বই এর দশক। সাদা কালো থেকে কিছু কিছু রঙ্গীন দিশার দশক। ধরে নিন সেদিন প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের উত্তেজক ক্রিকেট ম্যাচ। ব্যস, আপনি কিছু না হলেও মনেমনে তিরিশ বছর পিছিয়ে গেছেন। ভারত-পাকিস্তান এর ম্যাচ হবে বলে সকাল থেকে উত্তেজিত, রবিবার হলে ছুটির দিন আর বাকি সাপ্তাহিক দিন হলে প্রায় ছুটি-ছুটি চলছে দফতরে, কাছারিতে স্কুলে কলেজে। সব কাজ গুছিয়ে সাজিয়ে বসেছেন দূরদর্শন এর সামনে। টস হয়ে গেছে খেলা শুরু হব-হব করছে।
এমন সময় আচম্বিতে ইন্দ্রদেব এর আবির্ভাব হবে মঞ্চে। তিনি দূর দফতরে বসে হঠাৎ আপনবলে বলীয়ান হয়ে বজ্র-বিদ্যুুত কে বললেন: নে, তুই এবার এই পাড়ায়, এই অঞ্চলে একটু টুকিটকি খেলা শুরু কর দেখিনি!
এদিকে আপনিতো মনোযোগ দিয়ে দেখছেন : বোলার বল হাতে দৌড়তে শুরু করেছে, বিশাল জোরে ব্যাটসম্যান বল হাকিয়েছে- বলটা লাফ দিয়ে গগনে বিরাজ করছে নীচে ফিল্ডার তালুবন্দী করবে বলে ফন্দি আটছে আর আপনি উত্তেজনায় কাঁপছেন, হঠাৎ অন্ধকার নেমে এল সামনে।
আপনি অবাক হয়ে দেখছেন দূরদর্শন কে! সে চুপ হয়ে গেছে। আপনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবলেন কি হোল, তারপর মুহূর্তমধ্যে অনুধাবন করলেন বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ হয়েছে; আপনার বাড়ির, পাড়ার সবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ!
ব্যস আপনি তেলে-বেগুনে জ্বলে একবার সেই অদৃশ্য ইন্দ্রদেব দের অভিশম্পাত করছেন আবার অনুনয় বিনয় করছেন, মানত করছেন তবুও সেই বিদ্যুতের দেখা নাই রে বিদ্যুত এর দেখা নাই!
এই ইন্দ্রদেব রা এতই বলশালী ছিলেন তারা - মহাভারত শুরুর পর্বে: সময় যখন বলছে" আমিই কাল আমিই সব" - ঠিক তখন সত্যি স্ক্রিন কে করে দিত "কালো"।
এই বার ভাবুন সেই যুগে আপনি সেদিনের পর্ব মিস করলেন কিন্তু আপনার অফিসের সহকর্মী, কলেজের বন্ধু ইন্দ্র দেবের কৃপায় সেই পর্ব দেখেছেন; এরপর- আপনি পরের দিন আলোচনায় সাইড সিন তো দূর গ্যালাক্সির শেষতম বিন্দুতে অবস্থান করেছেন।
সেই ইন্দ্র দেবের দল আপনাকে অনেক বিনিদ্র রাত জাগিয়েছে, সন্ধ্যের সময় বিদ্যুুুত সরবরাহ বন্ধ করে পাশের বাড়ির ঘোষ দা, বোস বাবু-মিত্র দের সাথে মিত্রলাপ করিয়েছে, ছোটদের পাশে বসিয়ে অন্ধকার তারকাখচিত আকাশে কালপুরুষ , ধ্রুবতারা , সপ্তর্ষি চিনিয়েছে। মোম, প্রদীপের, হ্যারিকেনের আলোয় হাতের ছায়ায় ফুটে উঠেছে হরিণ, শার্দুল থেকে ময়ূর এর ছায়া। আবার হঠাৎ বিদ্যুত আগমনের ঝলকে সারা পাড়া কেঁপে উঠেছে হর্ষ শব্দব্রহ্মে।
বজ্রধারী ইন্দ্রের বরপুত্র রা কিন্তু এই তিরিশ বছরে আপদে-বিপদে, ঝড়-জল-বৃষ্টি আয়লা আমফান সবেতেই আপনাদের সাহায্য করেছে; প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আপনার ঘরে আলো বাতাস পৌছে দেবার জন্য লড়ে গেছেন।
না, এই ইন্দ্র দেবের একচেটিয়া অধিকারও চিরস্থায়ী হয়নি। প্রযুক্তির বিশ্বায়নের পথে গোবর্ধন পর্বত রূপে মুঠোফোন ও ইনভার্টার আজ এসে গেছে আপনাদের জীবনে, আজ বিদ্যুত অফিসের ইন্দ্রদেব বিদ্যুত বন্ধ করলেও দুনিয়া সচল থাকে: ইন্দ্রদেবও গোবর্ধন ধারীর কাছে আবেদন করে নিজের আস্তিত্ব বজায় রেখেছে লিথিয়াম ব্যাটারিতে। অনেক ভালো কিছুই এসেছে জীবনে। শুধু হারিয়ে গেছে সেই অপেক্ষা, অন্ধকার পাড়ায় ছাদেছাদে পরিবারের কলতান; আজ খোঁজই পাওয়া যায়না পাশের ফ্ল্যাটের 4 তলায় ঘোষ দা না বোস দা থাকেন!
ইন্দ্রদেব এর হারে দুনিয়া এগিয়েছে অনেক দূরে শুধু কাছের-পাশের পরিচয় গুলোর থেকে বিদ্যুত ঝলক সরে গেছে ধীরেধীরে বহুদূরে।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন