"বন্ধু চল, বলটা দে"

"উফ্ফ, আজ আবার বন্ধুত্বের দিন। চারদিকে সবাই নিজের নিজের বন্ধুদের শুভেচ্ছা কামনা করে বেশ পুলকিত হচ্ছে! পিং পিং করে হোয়াটসঅ্যাপ এর লেফট গ্রুপেও নিশ্চয়ই এতক্ষণে আদিখ্যেতার ঝড় বয়ে চলেছে। ধুস, এই সব মাখো মাখো ব্যাপার পোষায় না" - বলে নিজেই মোবাইল টা বিছানায় ছুড়ে ফেলেদিল সুনীল। নিরলস ভাবে উদাস হয়ে চেয়ে রইল ৪৩ ইঞ্চি টিভির বিশাল স্ক্রিনে।

আজ রবিবার তাই, অফিসের তাড়াহুড়ো নেই সেক্টর ফাইভের এক বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত সুনীলের। সারা সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের মধ্যেই কেটে যায় ওর। শনি-রবি পরিবারের সাথে সময় কাটায়। পরিবার বলতে স্ত্রী-পুত্র-বাবা-মা নিয়ে সুখী সংসার। সপ্তাহভর অফিসের এতো কাজের মধ্যে বাড়ির কাজে বিশেষ  সময় দিতে পারে না। তাই, সপ্তাহান্তে বাড়ির বিভিন্ন কাজ, বাজার করা থেকে টুকটাক এদিক সেদিক ঘুরে আসতে আসতেই আবার নতুন সপ্তাহ এসে কড়া নাড়ে শিয়রে। এই একভাবেই বয়েচলেছিল সুনীল এর সময় সারণী। একঘেয়ে জীবনপথে নিজের জন্য একটু সময় বের করতে গিয়ে বিফলরত সুনীল মানসিক ভাবে হাফিয়ে উঠছিল। মন মরুভূমি তে এক মরূদ্যানের সন্ধানে আকুল হয়েছিল সুনীলের মন। তখনই সুনীলের জীবনে একটি বিশেষ ঘটনা ঘটল।
সুনীলের স্মৃতিতে ধরা দিল সেই দিনের ঘটনাটা!

মাস তিনেক আগে হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে একদিন এক ফোন এলো সুনীলের মুঠোফোনে, প্রথমে বুঝতেই পারেনি কে কথা বলছে? বেশ বিস্মিত হয়েছিল ফোন রিসিভ করে। প্রথম-প্রথম আপনি আজ্ঞের পরে সোজাসুজি তুই তুকারি তে সম্বোধন শুরু হল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে। বিস্মিত হলো সুনীল!
অনেক যুগ তো বাবা-মা আর আত্মীয় পরিজন ছাড়া কেউ বিশেষ তুই-তুকারি করে সম্বোধন করেনা। অফিসের কেউ তো এই ভাবে খেলার ছলে  ফোন করবে না! তাহলে কে?
একটু পরে কথা বলে সুনীল বুঝল এ আর কেউ না! ওর ছোটবেলার স্কুলফ্রেন্ড বিমল ওকে ফোন করেছে। সুনীল তো হতবাক! এখন, ওর জীবনে বন্ধু শব্দটা হারিয়ে যাওয়া এক স্মৃতি!
সুনীল মনে মনে কৌতূহলী হলো: বিমল সেই স্কুল ছাড়ার বিশ বছর পরে ওর সাথে কেন যোগযোগ করছে, নম্বর কোথায় পেল?

বিমলই কথাপ্রসঙ্গে কৌতূহল এর নিরসন করল ; সুনীলের অফিসের এক কর্মী বিমলের আত্মীয় । কথায় কথায় একদিন সেই আত্মীয় সুনীলের কথা আর সুনীলের স্কুলের কথা বলায় বিমল অনুধাবন করেছে, কিন্তু নিশ্চিত ছিল না। তাই প্রথমে আপনি আজ্ঞে করে শুরু করেছে, নিশ্চিত হয়েই তুই-তুকারি শুরু করেছে।
শেষে সুনীল কে জানিয়েছিল ওদের স্কুল ব্যাচ এর একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। সেখানে প্রায় সবাই আছে। বিমল; সুনীল কে ঐ গ্রুপে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সুনীল বেশ অবাক বিমলের ফোনালাপে। প্রথমে একটু পিছিয়ে এসে বলল : দেখ আমি সমাজিক মাধ্যমে মানে ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সচল নই, তাই কতটা কি যোগযোগ করতে পারব বা সময় দিতে পারব সেই ব্যপারে নিজেই সন্দিহান আমি। বিমল বলল, আচ্ছা তুই গ্রুপে তো আয় আগে, আমি তোকে গ্রুপে নিয়ে নিয়েছি ।

সুনীলের এই ব্যাপারটা মনে-মনে ভালোও লাগল। নিজের পরিবারের বাইরে এই ভাবে ওর নিজের সত্বার উপর ভালোবেসে স্বপ্রণোদিত অধিকার বোধের প্রয়োগ কেউ বহুযুগ পরে করল; এক হারিয়ে ফেলা: স্কুলবন্ধু । সুনীল বিমলকে সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে ফেলে আসা অতীত দিনের সুখস্মৃতি আস্বাদন করতে উদ্যত হল, স্কুলগ্রুপে ঢুকল।

তারপর প্রতিদিন সেই গ্রুপে ভ্রমণ শুরু হল সুনীলের। সব হারিয়ে যাওয়া বন্ধু দের এক এক করে খুঁজে পেল, মনে মনে ভাবল আরে এই ছেলেটা ক্লাসে ছিল নাকি! সব ভূলে মেরেছি একেবারে। স্কুলগ্রুপ টা একটা আড্ডার যায়গা হল। এ যেন সব পেয়েছির আসর।
কাজের ফাঁকে, অফিস যাতায়াতের সময় ধীরেধীরে সময় দেওয়া শুরু হল গ্রুপে। শনি-রবি দুপুরে বা গভীর রাতে দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা, গল্প , তর্ক-বিতর্ক, হাসি-মজা, স্কুলের স্মৃতিচারণ অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকল।
ভিন্ন পেশায় যুক্ত বিভিন্ন বন্ধুর দৃষ্টিতে অনেক নতুন বিষয়ে জ্ঞাত হল সুনীল। মাঝে মাঝে  তর্ক-বিতর্ক মাত্রাও ছাড়াতে শুরু করল। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয় উত্থাপিত হলেই ও দেখত গ্রুপে বেশ দলেদলে ঝগড়া, খেউড় চলছে। সুনীল নিজের রাজনৈতিক মতকে প্রচ্ছন্নই রাখত, বিশেষ জড়াত না এইসব আলোচনায়।

তবে ,এতদিন চুপ থাকলেও সুনীল হঠাৎ কালকে জড়িয়ে পড়ল এই তর্ক-বিবাদে। ঘটে গেল একটি খারাপ ব্যাপার। টিভির স্ক্রিনে তাকিয়েও সুনীল মনে করল কালকে রাতের সেই বিশ্রী বিশৃঙখলা যার জন্য সারারাত ছটফট করেছে ও।

কাল রাতে গ্রুপে, সুনীল কে ওর এক বন্ধু রঞ্জন উপহাস করে বলে বসল সুনীলের মতন উদাসীন,  অরাজনৈতিক চরিত্রের জন্য দেশের উন্নতি আটকে আছে, এরা কোনো কিছুতে নিজদের জড়াবে না; শুধু আখের গোছাতে ব্যস্ত।
এই কথা গুলো শুনে যেন কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিল সুনীলের হৃদয়ে।
সুনীল মনক্ষুণ্ণ হয়ে উত্তর দিল ও চায় না ওর রাজনৈতিক মতবাদ ও সর্বসমক্ষে আসুক । এই শুনে অন্য দুই-এক বন্ধু বলল: কই আমরা তো আনছি,প্রকাশ্যে বলছি। নিজের পছন্দের দলের স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছি। বিপক্ষ এর ভূল ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করছি। তুই কেন আসবি না এই আলোচনায়? তুই কি সাতে পাঁচে থাকিস না কেস নাকি? এই ভাবে আর কতদিন চালাবি! 

সুনীল দেখল ওকে, ওর নিজস্ব মতের বিরুদ্ধাচরণ  করতে বলা হচ্ছে। আর সেই কাজ না করলে ওকে নিয়ে মজা করছে সবাই। নিজেকে এত অপমানিত বোধ করায় সোজা গ্রুপ থেকে বেরিয়ে এল। মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো আর কোনোদিন ঐ গ্রুপের, ঐ বন্ধুদের ছায়াও দেখবে না।

সেই থেকে মন টা কেমন জমাট বেধে আছে, তাই রবিবারের আলসে সকালে সবাই যখন নিদ্রামগ্ন, ও চুপচাপ বাইরের বসার ঘরে এসে টিভি চালিয়ে দিয়েছে - দেখছে না কিছুই।

একটু পরেই সকাল সকাল হঠাৎ বিমল ফোন করল , সুনীল প্রথমে ধরল না। সুনীল দেখল বিমল পুনরায় ফোন করছে। আনিচ্ছা সত্ত্বেও রিসিভ করল বিমলের ফোন, গম্ভীরভাবে বলে উঠল বল !
ওদিকে বিমল হাসতে হাসতে বলছে: আরে সুনীল! তোর গলাটা হঠাৎ জনি লিভার থেকে অমিতাভ বচ্চনের মতন শোনাচ্ছে! কি হল,  তুই গ্রুপ থেকে বেরিয়ে এলি কেন ভাই?
সুনীল বলল: দেখ - ঐ গ্রুপে আমাকে অপমান করেছে, আমি নিজের অপমান নিয়ে কোথাও থাকতে পারব না । তোর সাথে এমনি একান্ত যোগাযোগ রাখব। কিন্তু গ্রুপ এ আমি আর নেই।
বিমল একটু শান্ত হয়ে বলল: ও,আচ্ছা বুঝেছি। ওরা তোকে কালকে অনেক কিছু বলেছে। তোর খারাপ লেগেছে। এই ভাবে ওদের বলা টা ঠিক হয়নি। কিন্তু তাই বলে হঠাৎ গ্রুপ ছাড়বি কেন?
সুনীল উদ্বেলিত হয়ে বলল: নিজের অপমান নিয়ে আমি ঐ গ্রুপে থাকতে পারব না।

বিমল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে স্মিত হেসে কিছু ক্ষণ থেমে বলল: আচ্ছা, তোর অপমান হয়েছে, তুই থাকবি না সেটাও বুঝলাম। কিন্তু কোথায় থাকবি না?
যেটা তুই গ্রুপ ভাবছিস সেটা তো তোর হারিয়ে যাওয়া ক্লাসরুম! সেই ক্লাসরুমে আমার যা অধিকার তোর তা অধিকার, তোকে যে উপহাস করেছে তারও সমান অধিকার।
কোনোদিন ক্লাসরুমে তোকে কেউ অপমান করলে মারলে ধরলে তুই কি করেছিস? তুই ও উদম মেরেছিস, চেচিয়েছিস অথবা নালিশ করেছিস। কিন্তু ক্লাস থেকে কি বেরিয়ে গেছিস? ক্লাসতো ত্যাগ করিসনি! কারণ ক্লাসে হাজার কিছু হয়ে যাক শেষ অব্ধি ক্লাস টাই আমাদের পরিচয়। তুই আমি আমরা আমাদের স্কুলের একটা ব্যাচ, এই পরিচয় কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
ঐ গ্রুপে সবাই তোর বিরুদ্ধে কথা বললেও কারোর সাহস নেই তোকে তোর নিজস্ব অধিকার থেকে বঞ্চিত করার। ওখানে সবাই সবার রাজা, তুইও তাই।

সুনীল একটু ভেবে নিয়ে বলল: তাহলে যখন অপমান হবে আমার আমি কি করব । বসে বসে শুনে যাব?  তোরা কেউ কিছু তো বললি না।

বিমল একটু  খিল খিল করে হেসে বলল: ওরে ক্লাসে মুরগী লড়াই হলে লোকে কি মুরগী লড়াই থামায়? না লড়াই টা দেখে। তোকে খোঁচা মারল আর তুইও হাউ মাউ খাউ করে লাফিয়ে পড়লি , আমরা চুপচাপ মুরগী লড়াই টা দেখছিলাম। কেন, তুই দেখিস না? আগের সপ্তাহে আমি যেমন রঞ্জনের সাথে শব্দের মাধ্যমে মারপিট করছিলাম খুব তো মজা নিলি। আমি দেখিনি ভাবছিস! একটা করে বার্তা সেন্ড করছি আর সাথে সাথে সবাই হা করে সেটা গিল্ছে।

তারপর পেলব  কণ্ঠে বিমল বলল: সুনীল, এতো ভাবিস না। এটা তোর ছোট্ট বেলার সেই ক্লাস রুম। এখানে আমরা অপরিণত মস্তিষ্কে সবাই সবার ছোট্ট ছোট্ট হাত ধরে এক সাথে বড় হয়েছি। আমাদের মধ্যে মজা, মারপিট, হাসি ,উপহাস যেমন হবে আবার কেউ একজন বিপদে পড়লে যে যেখানে থাকুক ঝাপিয়ে পড়বে , যদি দূরত্বের জন্য সেই মুহূর্তে পাশেও না দাড়াতে পারে দেখবি দুর থেকেই যতটা ব্যবস্থা করবার প্রত্যেকে করবেই। তুই নিজেও কিন্তু করেছিস । চলে আয় ভাই।

এই গ্রুপ টা দিনের শেষে আমাদের এসকেপ রুট সারাদিনের অফিসের ঝামেলা,  ব্যবসার চাপ, পরিবারের সমস্যা, ছেলে মেয়ের পড়াশুনার চিন্তা,  দেশ-কাল সব কিছুর অভাব অভিযোগ এর যায়গা এই গ্রুপ। এইখানে এলে তোর থেকে কেউ কিছু দাবি করবে না কারণ সবাই সবার বন্ধু এখানে, আর বন্ধুত্ব এমন এক টান যেখানে স্বার্থের কোনো স্থান নেই।

সুনীল এর গলা ভারী, ঢোঁক গিলে বলছে আমি যদি এখন আবার গ্রুপে ঢুকি আমাকে নিয়ে সবাই  তো হাসবে।
বিমল হো হো করে হেসে বলল: হ্যা তাতে তো তোর দুই মুষ্টি কেশ্যাগ্রউৎপাটিত হবে তাই না! চল আর বেশী কথা বলিস না, এইবার ঢোক গ্রুপে।

সুনীল হেসে বলল, হ্যা ঠিক আছে গ্রুপে সংযুক্ত কর। আর ঐ গুলোর মজা দেখাচ্ছি। ঠিক, এটা আমারও গ্রুপ আমিও থাকছি।
ফোন টা কেটে দিল সুনীল, একটু পরে দেখল টিংটিং করে একটা বার্তা এল গ্রুপে সংযুক্তির।সামনের টিভিতে বন্ধুত্ব দিবস উপলক্ষে একটি গান বেজে উঠল:

বন্ধু চল:
"বন্ধু চল, বলটা দে
রাখবো হাত তোর কাঁধে
গল্পেরা ওই ঘাসে
তোর টিমে, তোর পাশে।।"

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"